বিমানবন্দর থেকে গাজীপুর পর্যন্ত বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প বাতিল এবং এর অবকাঠামো ভেঙে ফেলার সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনার দাবি জানিয়েছে ঢাকাস্থ গাজীপুর সাংবাদিক ফোরাম। সংগঠনটির নেতারা বলেছেন, প্রকল্পে অনিয়ম, দুর্নীতি বা পরিকল্পনার ত্রুটি থাকলে নিরপেক্ষ তদন্ত করে দায়ীদের শাস্তি দিতে হবে। তবে প্রায় শেষ হয়ে আসা অবকাঠামো ভাঙার আগে এর যৌক্তিকতা ও প্রভাব স্বচ্ছভাবে মূল্যায়ন করা জরুরি।
আজ শনিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে আয়োজিত গোলটেবিল বৈঠকে এ দাবি জানানো হয়। বক্তারা বলেন, নির্মাণকাজের কারণে গাজীপুর ও উত্তরার মানুষ ১৪ বছর ধরে যানজট আর ভোগান্তি সয়েছেন। এখন অবকাঠামো ভেঙে নতুন করে সড়ক বানাতে গেলে সেই দুর্ভোগ আরও বাড়বে।
‘অপরিকল্পিত প্রকল্প’ তবে বিকল্প কী?
বৈঠকে গাজীপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপি নেতা অধ্যাপক এসএম রফিকুল ইসলাম বাচ্চু বলেন, বিআরটি প্রকল্পটি অপরিকল্পিতভাবে নেওয়া হয়েছিল। যথাযথ পরিকল্পনা ও সমন্বয় থাকলে এটি মানুষের উপকারে আসতে পারত।
গাজীপুর-৪ (কাপাসিয়া) আসনের সংসদ সদস্য সালাহউদ্দিন আইয়ুবী বলেন, প্রকল্প বাতিলের পর গাজীপুরের মানুষকে কী ধরনের পরিবহন সুবিধা দেওয়া হবে, সেটিই আসল প্রশ্ন। তাই বাতিলের পাশাপাশি বিকল্প ব্যবস্থা কী হবে, তা স্পষ্ট করতে হবে।
বৈঠকে বক্তারা বলেন, প্রকল্পে দুর্বলতা থাকলে তা সংশোধন করে জনস্বার্থে ব্যবহারের সুযোগও ভেবে দেখা উচিত। অবকাঠামো ভেঙে নতুন মহাসড়ক বানানোর আগে অর্থনৈতিক, কারিগরি ও জনস্বার্থের দিকগুলো পর্যালোচনা করা দরকার।
এর আগে গত মঙ্গলবার এক বিবৃতিতে ফোরামের সভাপতি ফয়সাল আলম ও সাধারণ সম্পাদক রাশেদুল হক একই দাবি জানান। সিদ্ধান্তের কারণ জনসমক্ষে প্রকাশেরও আহ্বান জানান তারা। বিবৃতিতে বলা হয়, এই মহাসড়ক দিয়ে গাজীপুরসহ দেশের ১৮ জেলার মানুষ যাতায়াত করেন। নতুন করে নির্মাণকাজ শুরু হলে সবার ভোগান্তি বাড়বে।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত
গত ১৮ অক্টোবর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে প্রকল্পটি বাতিলের সিদ্ধান্ত হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের বিআরটি শাখার উপসচিব তাসলিমা আহমেদ পলির সই করা চিঠিতে সিদ্ধান্তটি জানানো হয়।
চিঠিতে বলা হয়েছে, করিডরের স্টেশন ও লেন বিভাজক সরিয়ে দুই দিকে তিনটি করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়ক করা হবে। দুই লেনের দুটি ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করার কথাও বলা হয়। সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে জরুরি ভিত্তিতে পদক্ষেপ নিতে বলা হয়েছে, আর সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন পাঠাতে হবে। উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা মিটিয়ে প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করার নির্দেশও আছে চিঠিতে।
চার বছরের প্রকল্প ১৪ বছরে, ব্যয় দ্বিগুণ
প্রায় ২০ কিলোমিটার দীর্ঘ বিআরটি প্রকল্পটি নেওয়া হয় ২০১২ সালে। পরিকল্পনা ছিল বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত সড়কের মাঝখানে আলাদা লেনে বিশেষ বাস চালানো। কাজ শেষ হওয়ার কথা ছিল ২০১৬ সালে, অর্থাৎ চার বছরে। সেই সময়সীমা পেরিয়ে আরও ১০ বছর কেটে গেছে, কিন্তু একটি বাসও চালু হয়নি।
প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি), ফরাসি উন্নয়ন সংস্থা (এএফডি) ও গ্লোবাল এনভায়রনমেন্ট ফ্যাসিলিটি (জিইএফ)। বাস্তবায়নের দায়িত্বে ছিল সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তর, সেতু বিভাগ এবং স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি)। তিন সংস্থার মধ্যে দায়িত্বের এই ভাগাভাগিকেই বিশেষজ্ঞরা সমন্বয়হীনতার বড় কারণ হিসেবে দেখিয়েছেন।
শুরুতে প্রকল্পের ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। তিন দফা সংশোধনের পর তা দাঁড়ায় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকায়, অর্থাৎ ব্যয় বেড়েছে দ্বিগুণের বেশি। এই হিসাবে প্রতি কিলোমিটারে ব্যয় দাঁড়ায় ২১৩ কোটি টাকার বেশি। এখন পর্যন্ত খরচ হয়েছে ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা, যা মোট বরাদ্দের প্রায় দুই-তৃতীয়াংশ।
এই প্রকল্পের ব্যর্থতার প্রভাব পড়েছে অন্য প্রকল্পেও। বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে উত্তরা থেকে কেরানীগঞ্জ পর্যন্ত আরেকটি বিআরটি পথ নির্মাণের কথা ছিল। গাজীপুর-বিমানবন্দর অংশ সময়মতো চালু না হওয়ায় সেটিও বাতিল হয়ে যায়।
বিশেষজ্ঞ সুপারিশ বনাম আপত্তি
বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) পুরকৌশল বিভাগের অধ্যাপক সামছুল হকের নেতৃত্বে একটি বিশেষজ্ঞ দল প্রকল্পের কারিগরি দিক পর্যালোচনা করে। তাদের প্রতিবেদনে পরিকল্পনা ও নকশার ত্রুটি এবং সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতার কথা উঠে আসে। দলটি প্রকল্প বাতিল করে বিদ্যমান অবকাঠামো উন্নত মহাসড়ক হিসেবে ব্যবহারের সুপারিশ করে।
তবে কাজ প্রায় ৯৭ শতাংশ শেষ হওয়ার পর প্রকল্প বাতিল নিয়ে আপত্তি তুলেছে ‘গাজীপুর ঐতিহ্য ও উন্নয়ন’ নামের আরেকটি সংগঠন। ফলে বিপুল সরকারি ব্যয়, দীর্ঘ জনভোগান্তি এবং প্রায় শেষ হওয়া অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
