কৃষ্ণনগরের বুড়িমা। ছবি: Facebook
Published on
:
3 min read
নিলয় ভট্টাচার্য
দুর্গাপুজো মিটতেই এ বার কালীপুজোর প্রস্তুতি শুরু। আর তার পরেই জগদ্ধাত্রী পুজো। কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজোর কথা সকলেরই জানা। হাজার হাজার মানুষের ভিড় পুজো মণ্ডপগুলিতে। গত কয়েক বছরে ক্রমাগত ভিড় বেড়েছে কৃষ্ণনগরে। সকাল-বিকেল-সন্ধে-মাঝরাত, প্যান্ডেলে প্যান্ডেলে শুধুই মানুষের ভিড়। অঞ্জলি থেকে ঘট বিসর্জন, বিসর্জনের শোভাযাত্রা— কৃষ্ণনগরের রাস্তায় তিল ধারণের জায়গা থাকে না। যে কোনও মুহূর্তে পদপিষ্টের ঘটনা ঘটে যেতে পারেই বলেই মত অনেকের। দুর্গাপুজোয় কলকাতার চোরবাগানে যে ঘটনা ঘটল, তার পর অনেকেরই মনে উদ্বেগ। এত ভিড়, ম্যানেজ করতে পারবে তো পুজো কমিটি? কয়েকটি পুজো কমিটির রাশ এ বার নতুন লোকের হাতেও। সমস্যা হবে না তো? জেলায় কর্মরত একাধিক প্রাক্তন পুলিশ কর্তাও মানছেন, কৃষ্ণনগরে ওই সময়টা যেকোনও দুর্ঘটনা ঘটে যেতে পারে।
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের শহর কৃষ্ণনগরের ঐতিহ্যমণ্ডিত জগদ্ধাত্রী পুজোর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ চাষাপাড়া বুড়িমা। এখানে মণ্ডপসজ্জা বা থিমে কোনও জাঁকজমক নেই। কিন্তু যেমন তার নয়ন ভুলানো রূপ, তেমন তার সাজ। চোখ ফেরানো যায় না। সেই টান আর বিশ্বাস-ভক্তিকে পাথেয় করে বছর বছর হাজার হাজার মানুষ এসে হাজির হন কৃষ্ণনগরে। ভক্তদের মানতের কেজি কেজি সোনার গয়নায় সেজে ওঠেন বুড়িমা।সরু গলির মধ্যে সংকীর্ণ জায়গায় যে কোনও সময়ে এমন বিপদ হতে পারে।
পুজো দিতে ভোররাত থেকেই দীর্ঘ লাইনে দাঁড়ান অগণিত পুণ্যার্থী। সময় যত গড়ায়, ততই বাড়তে থাকে ভক্তদের ভিড়। কিন্তু এই বিপুল জনসমাগম সামলানোই এখন প্রশাসন ও পুজো উদ্যোক্তাদের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ। সম্প্রতি কলকাতার চোরবাগান সর্বজনীনে দুর্গাপুজো চলাকালীন ঘটে যাওয়া পদপিষ্টের ঘটনায় নিরাপত্তা নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। সেই ঘটনার পরে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন উঠছে, কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী পুজোয় অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে কতটা প্রস্তুত নদিয়ার প্রশাসন?
রাজা কৃষ্ণচন্দ্রের ঐতিহ্যের শহর কৃষ্ণনগর কি চোরাবাগানের ঘটনা থেকে শিক্ষা নেবে? চাষাপাড়া বুড়িমার পুজোয় অগণিত ভক্তের নিরাপদ দর্শন নিশ্চিত করতে এ বার অতিরিক্ত সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে? ভিড় নিয়ন্ত্রণে বিশেষ পরিকল্পনা করছে কি কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলা? দর্শনার্থীদের প্রবেশ ও বেরোনোর পৃথক পথ, পর্যাপ্ত ব্যারিকেড, সিসিটিভি নজরদারি, পুলিশ মোতায়েন এবং স্বেচ্ছাসেবকদের ভূমিকা— এই বিষয়গুলি ঘিরেই এখন প্রশ্ন। পাশাপাশি, জরুরি পরিস্থিতিতে অ্যাম্বুল্যান্স, চিকিৎসা পরিষেবা এবং দ্রুত উদ্ধারকাজের ব্যবস্থা কতটা প্রস্তুত, সে দিকেও সকলের নজর।
পুজো উদ্যোক্তাদের তরফে ভিড় সামলানোর বিশেষ পরিকল্পনা থাকছে কি না, অতিরিক্ত ভিড় হলে কী ভাবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা হবে? চাষা পাড়া বুড়িমা পুজো কমিটির সাধারণ সম্পাদক কেষ্ট পাল জানান, ভিড় নিয়ন্ত্রণ থেকে শুরু করে জনসমাগম গোটা প্রক্রিয়াই পুলিশ প্রশাসনের নির্দেশ মতো হবে। কেষ্ট পাল বলেন, ‘কলকাতায় সদ্য একটা বিপর্যয় ঘটে গিয়েছে। তাই আমরা ব্যক্তিগত ভাবে কোনওরকম ঝুঁকি নিতে চাই না। গোটা বিষয়টি আমরা পুলিশ প্রশাসনের উপর ছেড়ে দিচ্ছি। তারা যে ভাবে নির্দেশ দেবে, আমরা পুজো কমিটি সে ভাবে পালন করব।’
অন্যদিকে চাষাপাড়া বুড়িমার কাছে ভক্তদের যাতে দর্শন বা পুজো দিতে যাতে কোনও অসুবিধা না হয়, তার ব্যবস্থাও করা হবে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। অন্যদিকে কৃষ্ণনগরের আরও এক ঐতিহ্যবাহী কাঁঠালপোতা ছোটোমা পুজো কমিটির প্রাক্তন কর্তা দেবাশিস রায় জানান, কলকাতার মতো কৃষ্ণনগরে এমন ঘটনা ঘটার মতো পরিস্থিতি সম্ভবত নেই। কৃষ্ণনগরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পুজো হয়। এক জায়গায় জনসমাগম হয় না। শুধুমাত্র বুড়িমার কাছে ভিড় উপচে পড়ে। অন্যদিকে ছোটোমার মণ্ডপে যে ভিড় হয়, তাতে পুলিশ এবং কমিটির সদস্য ভলান্টিয়াররা গোটা প্রক্রিয়া সামাল দিতে পারেন। এখানে সিসিটিভির ব্যবস্থা থাকে। কৃষ্ণনগরের জগদ্ধাত্রী নিয়ে উদ্বিগ্ন হওয়ার মতো কিছু নেই।
কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রী পুজো নিয়ে এখনও পর্যন্ত সমন্বয় কমিটির মিটিংয়ের দিন তারিখ ধার্য হয়নি। তবে কৃষ্ণনগর উত্তর বিধানসভা কেন্দ্রের বিধায়ক তারকনাথ চট্টোপাধ্যায় জানান, পুলিশ এবং পুজো উদ্যোক্তাদের নিয়ে সমন্বয় কমিটির মিটিং হবে। তখনই বিস্তারিত আলোচনা হবে। তবে বিধায়ক বলেন, ‘এ বার পুলিশকে বলব প্রত্যেক এন্ট্রি এবং এগজ়িট গেট যাতে আগের থেকে বড় করা হয় এবং রাস্তা জুড়ে যে সমস্ত পুজোগুলো হয়, সেখানে যথাযথ চেকিং হয়। পুলিশ প্রশাসনের সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেক বারোয়ারি পুজো উদ্যোক্তাদের বলব বেশি করে ভলান্টিয়ার মোতায়েন করার জন্য।’
কৃষ্ণনগরে জগদ্ধাত্রীর ভাসানে দীর্ঘ দিনের ঐতিহ্য বেহারাদের কাঁধে বওয়া বাঁশের মাচা বা ‘সাঙ’-এ প্রতিমা বহন। আর এই প্রথা পালনের দিনেই নানান সমস্যা তৈরি হয়। কারণ, এ শহর ছাড়ার সময়ে সব প্রতিমাকেই কৃষ্ণনগর রাজবাড়ির নহবতখানা ছুঁয়ে যেতে হবে জলঙ্গি নদীর কদমতলা ঘাটে। বিভিন্ন পুজো কমিটি মুখোমুখি হয়। সেখানেই অহেতুক কিছু অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়। পাশাপাশি রাজপথে এতো পরিমাণ মানুষ থাকে যে, চোরবাগানের মতো ঘটনা ঘটে যেতে পারে। জেলা পুলিশ যদিও যথেষ্ট তৎপর থাকে। তবুও স্থানীয়রাই বলছেন, ‘ঠিক মতো ক্রাউড ম্যানেজমেন্ট না করতে পারলে বড় ঘটনা ঘটে যেতে পারে।’
কৃষ্ণনগর পুলিশ জেলার সুপার অতুল ভি জানান, জেলাশাসকের সঙ্গে কথা বলে জগদ্ধাত্রী পুজোর সমস্ত উদ্যোক্তাদের নিয়ে সমন্বয় সভার আয়োজন করা হবে। সেখানেই সমস্ত কিছু সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।