ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম আল-জাজিরা ও বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ১৭ অক্টোবর ফ্রান্সের বিভিন্ন স্থানে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং সরকারি জনসেবার মান নিয়ে বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এসব কর্মসূচির একপর্যায়ে কয়েকটি এলাকায় সংঘর্ষ, ভাঙচুর ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। কর্তৃপক্ষের দেওয়া হিসাব অনুযায়ী, এসব ঘটনায় প্রায় ২ হাজার ৫০০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
শনিবারের বিক্ষোভ ঘিরে বাড়ছে নিরাপত্তা প্রস্তুতি, ফ্রান্সে নতুন করে বিক্ষোভের ডাক দিয়েছে শিক্ষার্থী সংগঠন এবং ‘ইয়েলো ভেস্ট’ আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কর্মীরা। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিনিয়োগ বৃদ্ধি, জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো এবং সরকারি জনসেবার উন্নয়নসহ বিভিন্ন দাবিতে শনিবারের কর্মসূচি পালনের প্রস্তুতি চলছে।
গত সপ্তাহের সহিংসতার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে পুলিশ মোতায়েন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু। প্রয়োজনে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামরিক বাহিনীর সহায়তা নেওয়ার বিষয়টিও বিবেচনা করা হচ্ছে। তবে পরিস্থিতি মোকাবিলায় আপাতত দেশজুড়ে জরুরি অবস্থা জারির প্রয়োজন নেই বলে জানিয়েছেন ম্যাক্রোঁ। তাঁর মতে, বিদ্যমান আইনি কাঠামোর মধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব।
প্রেসিডেন্ট শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দাবি এবং সহিংসতায় জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ডকে পৃথকভাবে বিবেচনা করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। তাঁর অবস্থান অনুযায়ী, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় শান্তিপূর্ণ প্রতিবাদের অধিকার স্বীকৃত হলেও জননিরাপত্তা বিঘ্নিত করা কিংবা সম্পদ ধ্বংসের ঘটনা গ্রহণযোগ্য নয়।
জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবা নিয়ে ক্ষোভ, ফ্রান্সে সাম্প্রতিক বিক্ষোভের পেছনে রয়েছে নিত্যপ্রয়োজনীয় ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিস্থিতি এবং সরকারি জনসেবায় ব্যয় সংকোচন নিয়ে উদ্বেগ। বিক্ষোভকারীদের একাংশ এসব বিষয়ে সরকারের নীতিগত পরিবর্তন এবং কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করছেন। দীর্ঘদিনের এসব অসন্তোষ নতুন করে রাজপথে প্রকাশ পাওয়ায় সরকারের সামনে দ্বিমুখী চ্যালেঞ্জ তৈরি হয়েছে। একদিকে বিক্ষোভের কারণে জননিরাপত্তা ও স্বাভাবিক জনজীবন সচল রাখা, অন্যদিকে নাগরিকদের দাবির বিষয়ে গ্রহণযোগ্য সমাধান উপস্থাপন করা।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তৎপরতা বাড়ানোর পাশাপাশি সরকারের নীতিগত পদক্ষেপও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বিশেষ করে জীবনযাত্রার ব্যয় ও জনসেবার মান নিয়ে মানুষের উদ্বেগ নিরসনে কী ধরনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, তা পরিস্থিতির ভবিষ্যৎ গতিপথ নির্ধারণে ভূমিকা রাখতে পারে। ফ্রান্সের পরিস্থিতি নিয়ে বিদেশি নেতাদের বক্তব্যের সমালোচনা, ফ্রান্সের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা নিয়ে বিদেশি নেতাদের মন্তব্যেরও সমালোচনা করেছেন ম্যাক্রোঁ। তাঁর অভিযোগ, কয়েকজন বিদেশি নেতা ফ্রান্সের পরিস্থিতিকে নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থে ব্যবহার করছেন।
আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ফ্রান্সের বিক্ষোভকে অভিবাসন সমস্যার সঙ্গে যুক্ত করে মন্তব্য করেছেন। অন্যদিকে, ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু ফ্রান্সে উগ্রপন্থী ইসলামের বিস্তার নিয়ে বক্তব্য দিয়েছেন। সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনগুলোতে এসব দাবির পক্ষে তাঁদের কোনো প্রমাণ উপস্থাপনের কথা উল্লেখ করা হয়নি।
ম্যাক্রোঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিক্ষোভের ঘটনাগুলোর সঙ্গে সরাসরি বিদেশি হস্তক্ষেপের দৃশ্যমান প্রমাণ নেই। তবে এসব ঘটনার পর বিদেশ থেকে তথ্যের অপব্যবহার এবং বিভ্রান্তিকর প্রচারণা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি।সরকারের সামনে কঠিন পরীক্ষা, সাম্প্রতিক সহিংসতা ফ্রান্সের আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থার প্রস্তুতি ও কার্যকারিতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন তুলেছে। একই সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্য এবং সরকারি জনসেবার মান নিয়ে নাগরিকদের দীর্ঘদিনের অসন্তোষও সামনে এসেছে।
সরকারের জন্য এখন শুধু বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করাই নয়, বরং নাগরিকদের উদ্বেগের সমাধানে কার্যকর ও বিশ্বাসযোগ্য উদ্যোগ নেওয়াও জরুরি। শনিবারের কর্মসূচিতে পরিস্থিতি কোন দিকে অগ্রসর হয়, তার ওপর সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ অনেকাংশে নির্ভর করতে পারে। ফলে আসন্ন বিক্ষোভ ফরাসি প্রশাসনের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার সক্ষমতার পাশাপাশি চলমান সামাজিক ও রাজনৈতিক অসন্তোষ মোকাবিলায় সরকারের ভূমিকারও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠতে পারে।
The post ফ্রান্সে বিক্ষোভ ঘিরে ম্যাক্রোঁর কঠোর বার্তা, ‘বিশৃঙ্খলা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া হবে না’ appeared first on ভোরের চেতনা.
