আজকের পত্রিকা ডেস্ক

গণতন্ত্র ক্ষুণ্ন করা এবং দেশের অর্থনীতি সঠিকভাবে পরিচালনায় ব্যর্থতার অভিযোগ এনে তিউনিসিয়ার প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদের বিরুদ্ধে রাজধানী তিউনিসে এক বিশাল বিক্ষোভ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়েছে। গতকাল শনিবারের এই গণবিক্ষোভে হাজার হাজার সাধারণ তিউনিসীয় নাগরিক অংশ নেন, যা সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে সাইদের শাসনের বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হিসেবে দেখা হচ্ছে।
লন্ডন থেকে প্রকাশিত মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক সংবাদমাধ্যম আল আরব আল–জাদিদ বা দ্য নিউ আরবের খবরে বলা হয়েছে, তিউনিসিয়ার প্রধান শ্রমিক ইউনিয়ন ইউজিটিটি এবং বিভিন্ন সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা এই আন্দোলনের নেতৃত্ব দেন। তিউনিসিয়া বর্তমানে এক ভয়াবহ অর্থনৈতিক সংকট, সরকারি পরিষেবা ভেঙে পড়া, পানি ও বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং ওষুধসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের তীব্র সংকটের মুখোমুখি। এমনই এক চরম পরিস্থিতির মধ্যে এই বিক্ষোভের ডাক দেওয়া হয়।
উল্লেখ্য, ২০২১ এবং ২০২২ সালে প্রেসিডেন্ট কায়েস সাইদ দেশের পার্লামেন্ট ভেঙে দিয়ে, বহু বিচারককে চাকরিচ্যুত করে এবং নিজস্ব ডিক্রি জারির মাধ্যমে দেশের সমস্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কুক্ষিগত করেন। তৎকালীন সময়ে বিরোধীরা তাঁর এই পদক্ষেপকে ‘অভ্যুত্থান’ বা ক্যু বলে আখ্যায়িত করেছিলেন।
মানবাধিকার সংগঠনগুলোর দাবি, কায়েস সাইদ সুশীল সমাজ, সাংবাদিক এবং বিরোধী রাজনীতিকদের ওপর দমন-পীড়ন বহুগুণ বাড়িয়ে দিয়েছেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করে সাইদ দাবি করেছেন, তিনি কোনো একনায়ক নন। উল্টো তাঁর অভিযোগ, দেশের মধ্যে সামাজিক অসন্তোষ ছড়িয়ে দিতে তার রাজনৈতিক বিরোধীরাই কৃত্রিম অর্থনৈতিক সংকট তৈরি করছে।
দীর্ঘদিন ধরে দলীয় বিভাজনের কারণে তিউনিসিয়ার বিরোধী দলগুলো এতদিন বড় কোনো আন্দোলন গড়ে তুলতে পারছিল না। তবে এবার সেই চিত্র বদলে গেছে। বিরোধীদের এই বিরল ঐক্যের মুখে পড়ে প্রেসিডেন্ট সাইদ এখন বড় ধরনের রাজনৈতিক চাপে পড়েছেন। গত শনিবারের এই মিছিলে বিভিন্ন রাজনৈতিক মতাদর্শের বিরোধী দল ছাড়াও আইনজীবী, চিকিৎসক, সাংবাদিক, বেকার যুবক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন। তারা তিউনিসিয়ার ঐতিহাসিক ‘হাবিব বুরগুইবা এভিনিউ’তে মার্চ করেন। ২০১১ সালের বিখ্যাত আরব বসন্ত বা গণ-অভ্যুত্থানের সময়ও এই এভিনিউটিই আন্দোলনকারীদের প্রধান কেন্দ্রবিন্দু ছিল।
সমাবেশে বক্তব্য দিতে গিয়ে ইউজিটিটির প্রধান সালাহএদ্দিন সালমি বলেন, ‘নীরবতা আর মেনে নেওয়া হবে না। একজন মানুষের হাতে সমস্ত ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করে কোনো রাষ্ট্র গঠিত হতে পারে না।’
বিক্ষোভ প্রতিরোধে রাজধানীজুড়ে শত শত পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। পুলিশি বেষ্টনীর মধ্যেই বিক্ষোভকারীরা জোর গলায় স্লোগান দেন, ‘আর কোনো ভয় নেই, ক্ষমতা জনগণের!’ এবং ‘জেলখানা ভরে গেছে, মানুষ আজ ক্ষুধার্ত!’ তারা ২০১১ সালের শান্তিপূর্ণ বিপ্লবের সেই ঐতিহাসিক স্লোগানটিও আবার মুখে তুলে নেন—‘জনগণ এই শাসন ব্যবস্থার পতন চায়!’
বিক্ষোভকারীরা অবিলম্বে গ্রেপ্তারকৃত সাইদের সমালোচকদের মুক্তি এবং ট্রেড ইউনিয়নগুলোর অধিকারের ওপর হামলা বন্ধের দাবি জানান। পাশাপাশি ব্যানার-ফেস্টুন হাতে নিয়ে দেশের ক্রমবর্ধমান বেকারত্ব ও পরিবেশ দূষণ নিয়ে চরম হতাশা প্রকাশ করেন।
তিউনিস থেকে প্রায় ২৫০ কিলোমিটার (১৫৫ মাইল) দক্ষিণে অবস্থিত স্ফ্যাক্স শহর থেকে আন্দোলনে যোগ দেওয়া ইয়াসিন ঘারসেলি নামের এক বিক্ষোভকারী বলেন, ‘আর নয়, এবার যথেষ্ট হয়েছে! দেশ ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। আমরা পানি ও বিদ্যুতের ঘাটতিসহ একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে দিন কাটাচ্ছি।’ তিনি দৃঢ়তার সাথে যোগ করেন, ‘নিজের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়াতে আমি স্ফ্যাক্স থেকে এখানে এসেছি। আমি দেশের শেষ কণ্ঠস্বর হয়ে গেলেও লড়াই ছাড়ব না।’

