Published on
:
2 min read
নেপালের বিধ্বংসী বন্যার কয়েক সপ্তাহ আগেই স্পষ্ট সঙ্কেত দিয়েছিল নাসা ও ইসরোর যৌথ উপগ্রহ ‘নিসার’ (NISAR)। কিন্তু সেই বিপদ সঙ্কেত সঠিক সময়ে নজরে পড়েনি কারও। হায়দরাবাদের ন্যাশনাল রিমোট সেন্সিং সেন্টারের (এনআরএসসি) বিজ্ঞানীদের একটি গবেষণায় উঠে এসেছে এই চাঞ্চল্যকর তথ্য। চলতি বছরের ২৬ অগস্টের নেপালের ভয়াবহ বন্যায় মৃত্যু হয়েছে হাজারেরও বেশি। ১২ জন গবেষকের তৈরি এই গবেষণাপত্রটি সম্প্রতি ‘জার্নাল অফ ইন্ডিয়ান সোসাইটি অফ রিমোট সেন্সিং’-এ প্রকাশিত হয়েছে। রসুয়া জেলার এই মর্মান্তিক বিপর্যয়ের উপর এটিই প্রথম বৈজ্ঞানিক পর্যালোচনা।
উপগ্রহে ধরা পড়া ছবি
NISAR উপগ্রহের এল-ব্যান্ড ব়্যাডারে ২০ জুন থেকে ১৯ অগস্টের সমস্ত তথ্য খতিয়ে দেখা হয়েছে। তাতে দেখা গিয়েছে, যে পাহাড়ি ঢালে ধস নেমেছিল, সেখানে দীর্ঘদিন ধরে মাটি কাঁপছিল। ওই এলাকার মাটি দ্রুত সরে যাচ্ছিল ও বিপজ্জনক অবস্থায় ছিল। ২৬ জুলাই থেকে ১৯ অগস্টের মধ্যে মাটির নড়াচড়া আরও বেড়ে যায়। উপগ্রহের বেশ কয়েকটি ছবিতে মাটি প্রায় পাঁচ মিটারের বেশি সরে যেতে দেখা গিয়েছে। বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, বিপর্যয় ঘটে যাওয়ার পরে আগের ছবির সঙ্গে মেলাতে গিয়ে বিষয়টি ধরা পড়ে। প্রায় ১৩০ কোটি ডলার (ভারতীয় মুদ্রায় প্রায় ১২,৩৪২.৯১ কোটি রুপি) মূল্যের এই উপগ্রহ ২০২৫ সালের ৩০ জুলাই মহাকাশে পাঠানো হয়েছিল। এটি প্রতি ১২ দিন অন্তর পৃথিবীর তথ্য পাঠায়।
যে ভাবে নামল বিপর্যয়
২৬ অগস্ট সকালে লাংটাং লিরুং শৃঙ্গের উত্তরে ঝুলন্ত হিমবাহ ভেঙে পড়ে। জায়গাটি প্রায় ৫,১৩০ মিটার উঁচুতে অবস্থিত। সেখান থেকে প্রায় ৯ কোটি ৯০ লাখ ঘনমিটার হিমবাহের বরফ ও পাথর খসে পড়ে। গবেষকদের মতে, এই বরফের স্তূপ প্রায় ১১৫টি এম্পায়ার স্টেট বিল্ডিংয়ের সমান। পুরো ধ্বংসাবশেষ প্রায় ২,১৭০ মিটার নীচে আছড়ে পড়ে। এর পর উপত্যকা ধরে প্রায় ৫.৯ কিলোমিটার রাস্তা ভেসে গিয়ে হড়পা বান নেমে আসে। লেন্দে খোলা এবং ত্রিশূলী নদীর প্রায় ৭২ কিলোমিটার এলাকা বন্যায় পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। ভেঙে পড়ে রাস্তাঘাট, সেতু, বাড়িঘর এবং সুড়ঙ্গ। নেপাল-চিন বাণিজ্য করিডরেও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। প্রথম ঘটনার প্রায় তিন ঘণ্টা পরে দ্বিতীয়বার ফের ধস নামে। এতে নদীর গতিপথ আটকে একটি কৃত্রিম হ্রদ তৈরি হয়।
মৃত্যুর মিছিল ও ভূকম্পন
নেপালের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষের তথ্য অনুযায়ী, ২১ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত ১,৪৫১ জনের দেহ উদ্ধার হয়েছে। এখনও নিখোঁজ রয়েছেন ৫,৭৪৫ জন। গবেষণাপত্রে বলা হয়েছে, ভূমিকম্পের কারণে এই বিপর্যয় ঘটেনি।
জলবায়ু পরিবর্তন ও সতর্কবার্তা
বিজ্ঞানীরা জানিয়েছেন, ২০২৬ সালের গ্রীষ্মকালে পাহাড়ে অস্বাভাবিক গরম পড়েছিল। এর ফলে বরফ দ্রুত গলতে শুরু করে। দুর্বল হয়ে পড়ে পাহাড়ি ঢালের বাঁধ। উত্তরাখণ্ডের ২০২১ সালের চামোলি বিপর্যয়ের উদাহরণ টেনে তাঁরা সতর্ক করেছেন। গবেষকদের মতে, এমন বিপদ ভবিষ্যতে আরও বাড়তে পারে। নাসার জেট প্রোপালশন ল্যাবরেটরি জানিয়েছে, NISAR উপগ্রহের সমস্ত তথ্য আলাস্কা স্যাটেলাইট ফ্যাসিলিটি এবং ISRO-র ভূনিধি পোর্টালে নিখরচায় পাওয়া যায়। তবে বিজ্ঞানীদের দাবি, উপগ্রহ কেবল বিপজ্জনক এলাকা চিহ্নিত করতে পারে। ঠিক কখন ধস নামবে, তা আগাম বলা সম্ভব নয়। তাই হিমালয়ের ২৫ হাজারেরও বেশি হিমবাহের উপর নজর রাখতে স্বয়ংক্রিয় ব্যবস্থা এবং পাহাড়ে নজরদারি কেন্দ্র তৈরি করা জরুরি।
