পরিবারের সদস্যদের নিয়ে সমুদ্রের নীল জলরাশির পাশে ছুটি কাটাতে গিয়েছিলেন তারা। কথা ছিল, কয়েকটি দিন কাটবে আনন্দে, প্রিয়জনদের সঙ্গে জমবে গল্প, স্মৃতির পাতায় যুক্ত হবে সুন্দর কিছু মুহূর্ত। কিন্তু কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকতসংলগ্ন টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ আগুন মুহূর্তেই সবকিছু কেড়ে নিল। ছুটির আনন্দ পরিণত হলো স্বজন হারানোর বেদনায়। গতকাল শনিবার সকালে ওই রিসোর্টে লাগা আগুনে একই পরিবারের ছয়জনসহ অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। আহত হয়েছেন আরও ছয়জন। নিহতদের মধ্যে পাঁচ বছর বয়সী শিশুও রয়েছে। কাঠের তৈরি রিসোর্টটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর প্রাণ বাঁচাতে অনেকে ছোটাছুটি করলেও শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাননি। অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির অগ্নিনিরাপত্তা ও অনুমোদন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স এবং কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের অনুমোদন- কোনোটিই
ছিল না প্রতিষ্ঠানটির।
শনিবার সকাল ৭টার দিকে মেরিন ড্রাইভসংলগ্ন পাটুয়ারটেক এলাকার রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের তিনটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণ ও উদ্ধারকাজ শুরু করে। সকাল ১০টার দিকে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসে। এরপর শুরু হয় উদ্ধার অভিযান। ফায়ার সার্ভিসকে সহযোগিতা করেন বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি), পুলিশ ও কোস্ট গার্ডের সদস্যরা।
দুপুর ২টা পর্যন্ত রিসোর্টটি থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধারের তথ্য নিশ্চিত করেন কক্সবাজার ফায়ার সার্ভিস স্টেশনের উপসহকারী পরিচালক সৈয়দ মোরশেদ হোসেন। তিনি জানান, রিসোর্টের সব কক্ষ তল্লাশি করা সম্ভব হয়নি।
পরিবারের সদস্যদের নিয়ে গত বৃহস্পতিবার রিসোর্টটিতে বেড়াতে আসেন ঢাকার বনশ্রীর বাসিন্দা মো. আশিকুল ইসলাম। তার সঙ্গে ছিলেন স্ত্রী ইসরাত জাহান মালিহা ও স্ত্রীর ছোট বোন লায়লা জাহান নাবিলাসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা।
আশিকুল ইসলামের ভাষ্য অনুযায়ী, আগুন লাগার আগে পরিবারের দুজন সদস্য সৈকতে ঘুরতে বের হন। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি রিসোর্টের দোতলা থেকে লাফ দিয়ে বাইরে বের হতে সক্ষম হন। এ ঘটনায় তার পরিবারের ছয়জন নিখোঁজ ছিলেন। পরে উদ্ধার হওয়া মরদেহের মধ্যে তার স্ত্রী ও শ্যালিকাসহ ছয়জনকে পাওয়া যায়।
সর্বশেষ পাওয়া তথ্যে নিহতদের মধ্যে ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), ফারিহা কবির (৩৩), ফায়িজান আহম্মেদ (৫) ও আশুলিয়ার নাসরিন আক্তার মুক্তার (২৮) পরিচয় পাওয়া গেছে। নিহতদের মধ্যে আলভী ও নাফিস তেহামি জেরিফ মালিহা ও নাবিলার কাজিন; ফারিহা কবির জেরিফের বড় বোন এবং ফায়িজান তাদের ভাগ্নে বলে পারিবারিক সূত্রে জানা গেছে।
অগ্নিকাণ্ডে আহত ছয়জনকে কক্সবাজার জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের মধ্যে রয়েছেন মুগদা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তার স্ত্রী নাফিজা নেওয়াজ খান (২৯), মান্নান (৩৪), মেহেরুন্নেসা (৩০), মাসুদ (৩০) ও সামিদা (৩২)।
কক্সবাজারের জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, ফায়ার সার্ভিসের নেতৃত্বে উদ্ধারকারী দল ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করেছে। আহত ছয়জনকে হাসপাতালে নেওয়া হলে তাদের মধ্যে চারজনকে ভর্তি করা হয়। বাকি দুজনকে প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে ছেড়ে দেওয়া হয়। আগুন লাগার কারণ তখনও নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
সরেজমিন দেখা যায়, রিসোর্টটির কক্ষগুলোর মেঝে, দেয়াল ও সিঁড়ির বড় অংশ কাঠের তৈরি। সামনের সড়কের পাশে কাঠের খুঁটির ওপর তৈরি রেস্তোরাঁর একটি অংশও ছিল। স্থানীয়দের ধারণা, স্থাপনাটিতে ব্যবহৃত কাঠের বেশিরভাগ ঝাউগাছের। কিছু কাঠ আকাশমণি ও গামারিরও হতে পারে।
ঘটনাস্থলে স্থানীয় বাসিন্দা ও পাশের দোকানের মালিক গিয়াস উদ্দিন এবং জালিয়াপালং ইউনিয়নের আনসার-ভিডিপি কমান্ডার মোহাম্মদ আজিজের সঙ্গে কথা হয়। তারা জানান, সকাল সাড়ে ৬টার দিকে সিলিন্ডার বিস্ফোরণের মতো শব্দ শুনেছিলেন। এরপর বাইরে এসে আগুন দেখতে পান।
গিয়াস উদ্দিন বলেন, সকাল ৭টার দিকে বিস্ফোরণের শব্দ শুনে তিনি ঘটনাস্থলে ছুটে আসেন। তখন রিসোর্টে থাকা পর্যটকদের কান্নাকাটি ও ছোটাছুটি করতে দেখেন। কিন্তু দাউ দাউ করে জ্বলতে থাকা আগুন ও ধোঁয়ার কুণ্ডলীর কারণে ভেতরে ঢুকে কাউকে উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি।
আগুনে তার চা-কফির দোকানের একটি ফ্রিজ ও দোকানের কিছু অংশ পুড়ে গেছে বলেও জানান তিনি।
গিয়াস উদ্দিনের দাবি, চট্টগ্রামের বোয়ালখালীর মোহাম্মদ তানভীর তার মায়ের ওয়ারিশদের কাছ থেকে ২০ শতক জমি কিনে সেখানে স্থাপনা নির্মাণ করেন। আগুনে রিসোর্টের পাশের দোকানের একটি ফ্রিজ ও কিছু কাঠও পুড়ে গেছে। রিসোর্টের মালিক তানভীরের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও সাড়া পাওয়া যায়নি। তাকে ঘটনাস্থলেও পাওয়া যায়নি।
রিসোর্টের পেছনে রয়েছে একটি সুপারিবাগান। বাগানের মালিক নুরুল ইসলাম বলেন, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। এরপর রান্নার গ্যাসের সিলিন্ডার বিস্ফোরিত হয়েছে বলে তার ধারণা।
নুরুল ইসলাম বলেন, রিসোর্টটির দ্বিতীয় ও তৃতীয় তলার মেঝে কাঠের তৈরি ছিল। আগুনে কাঠ পুড়ে যাওয়ায় অতিথিরা সম্ভবত নিচে নামতে পারেননি। বের হওয়ার বিকল্প কোনো পথও ছিল না। অনেকে বাথরুমে আশ্রয় নিয়েও রক্ষা পাননি। মেরিন ড্রাইভের ইনানী সৈকতে এ ধরনের ভয়ংকর ঘটনা আগে ঘটেনি বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ঘটনাস্থলে পৌঁছে তারা রিসোর্টের দায়িত্বশীল কাউকে পাননি। রিসোর্টের মালিক মো. তানভীরকেও সেখানে পাওয়া যায়নি। তার মুঠোফোন বন্ধ ছিল।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টের ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ। এদিকে আগুনের সূত্রপাত সম্পর্কে প্রাথমিকভাবে রান্নাঘরের চুল্লিকে দায়ী করা হলেও তদন্ত শেষ হওয়ার আগে নিশ্চিতভাবে কিছু বলা যাচ্ছে না।
জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, রান্নাঘরের চুল্লি থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে। অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটকে (এডিএম) প্রধান করে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন ও অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনে ফায়ার সার্ভিসের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জানান, টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টের ফায়ার সার্ভিসের লাইসেন্স ছিল না। এ বিষয়ে আগে সতর্ক করা হলেও কর্তৃপক্ষ প্রয়োজনীয় বৈধতা নেয়নি বলে জানান তিনি।
অন্যদিকে কক্সবাজার উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ জসিম উদ্দিনের বক্তব্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটির ওই কর্তৃপক্ষের অনুমোদনও ছিল না।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ অনুসন্ধানে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠনের পাশাপাশি রিসোর্টটির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে আটক করেছে পুলিশ।
গতকাল বিকাল সাড়ে ৪টার দিকে উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আতিকুর রহমান মজুমদার আটকের বিষয়টি নিশ্চিত করেন। তিনি জানান, জিজ্ঞাসাবাদের জন্য সুমনকে থানায় রাখা হয়েছে। এ বিষয়ে বিস্তারিত পরে জানানো হবে।
অগ্নিকাণ্ডের পর রিসোর্টটির মালিক তানভীর আহমেদসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত তথ্য পাওয়া যায়নি। তদন্তের মাধ্যমে আগুনের প্রকৃত কারণ, অগ্নিনিরাপত্তাব্যবস্থার ঘাটতি এবং অনুমোদনহীনভাবে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার বিষয়গুলো স্পষ্ট হবে বলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা আশা করছেন।
