আগামী দুই বছরের মধ্যে বিশ্ববাজারে স্বর্ণের দাম অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে নতুন উচ্চতায় পৌঁছাতে পারে বলে ধারণা করছেন বিনিয়োগকারীরা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর বিপুল পরিমাণ স্বর্ণ কেনা, মার্কিন ডলারের ওপর আস্থার সংকট এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা এ মূল্যবৃদ্ধির পেছনে প্রধান ভূমিকা রাখছে। ফাইনান্সিয়াল টাইমসের এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানানো হয়েছে।
ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিলের সাময়িক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বর মাসে বিশ্বের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো প্রায় ৬৩ টন স্বর্ণ কিনেছে। গত দুই বছরের মধ্যে এটিই কোনো এক মাসে সর্বোচ্চ স্বর্ণ কেনার রেকর্ড। যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর কিছু দেশ স্বর্ণ বিক্রি করলেও নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে মূল্যবান এই ধাতুর প্রতি কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর আগ্রহ এখনো শক্তিশালী রয়েছে।
এদিকে, মার্কিন ফেডারেল রিজার্ভ সুদের হার বাড়াতে পারে—এমন জল্পনায় সম্প্রতি স্বর্ণের দাম কমেছে। প্রতি ট্রয় আউন্সের মূল্য ২ শতাংশ কমে ৪ হাজার ৭৫ ডলারে নেমে আসে। তবে এই পতন দীর্ঘস্থায়ী হবে না বলে আশা করছেন কয়েকজন তহবিল ব্যবস্থাপক। তাঁদের ধারণা, বাজারে স্বর্ণের দাম আবারও উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়তে পারে। চলতি বছরের জানুয়ারিতে প্রতি ট্রয় আউন্স স্বর্ণের দাম ৫ হাজার ৫০০ ডলার ছাড়িয়ে সর্বকালের সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছেছিল।
ট্রয় অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের ফান্ড ম্যানেজার শার্লট ইয়ংয়ের মতে, প্রচলিত মুদ্রাব্যবস্থার ওপর মানুষের আস্থা কমে যাওয়া এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকারি ঋণ বেড়ে চলার প্রেক্ষাপটে স্বর্ণ আর্থিক নিরাপত্তার অন্যতম কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠেছে। একই ধরনের প্রবণতার কথা তুলে ধরেছেন আয়ন ইনভেস্টমেন্টসের কর্মকর্তা পল কারন এবং অ্যালাইড গোল্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা পিটার মারোনে। তাঁদের মতে, মার্কিন ডলারের ওপর আস্থা কমে যাওয়ায় বিভিন্ন ফ্যামিলি অফিস ও উন্নয়নশীল দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলো বন্ডের পরিবর্তে স্বর্ণের মজুত বাড়ানোর দিকে ঝুঁকছে।
স্বর্ণ কেনার এই প্রবণতায় চীনের কেন্দ্রীয় ব্যাংকও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। পিপলস ব্যাংক অব চায়না গত কয়েক মাস ধরে ধারাবাহিকভাবে নিজেদের রিজার্ভে স্বর্ণ যোগ করছে। বর্তমানে দেশটির মোট রিজার্ভের প্রায় ৯ শতাংশ, অর্থাৎ আনুমানিক ২ হাজার ৪১০ টন স্বর্ণ রয়েছে।
এন্ডেভার মাইনিংয়ের প্রধান নির্বাহী ইয়ান ককারিল এবং স্ট্যান্ডার্ড চার্টার্ডের সুকি কুপারও মনে করেন, বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতি স্বর্ণের বাজারকে শক্তিশালী ভিত্তি দিচ্ছে। তাঁদের মূল্যায়ন অনুযায়ী, কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ধারাবাহিক ক্রয়, বৈশ্বিক অনিশ্চয়তা এবং প্রচলিত মুদ্রার প্রতি আস্থার সংকট আগামী দিনগুলোতে স্বর্ণের চাহিদা ধরে রাখতে পারে।
সব মিলিয়ে সাম্প্রতিক দরপতন সত্ত্বেও স্বর্ণের বাজার নিয়ে বিনিয়োগকারীদের দীর্ঘমেয়াদি প্রত্যাশা ইতিবাচক। কেন্দ্রীয় ব্যাংকগুলোর ক্রয় অব্যাহত থাকলে এবং বৈশ্বিক অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা না কমলে আগামী দুই বছরে স্বর্ণের দাম নতুন রেকর্ড গড়তে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
