কালবেলা · টেক
উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রতলের ইন্টারনেট ক্যাবলে হামলার হুমকি ইরানের
২৪/১০/২০২৬

যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল আবারও ইরানে হামলা চালালে পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলের সমুদ্রতলে থাকা যোগাযোগ ক্যাবল লক্ষ্য করে হামলার বিস্তারিত পরিকল্পনা করেছে তেহরান। ইরানের দুই জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা বার্তা সংস্থা রয়টার্সকে এ তথ্য জানিয়েছেন।
ওয়াশিংটনের সঙ্গে কূটনৈতিক আলোচনা ব্যর্থ হলে নতুন করে সংঘাত শুরু হতে পারে এবং সে ক্ষেত্রে আঞ্চলিক সমুদ্রতলের যোগাযোগ ক্যাবল হামলার লক্ষ্যবস্তু হতে পারে; ইরানি কর্মকর্তাদের এমন হুঁশিয়ারির পর এ তথ্য সামনে এলো।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই দুই কর্মকর্তা হামলার পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত জানাননি। ঠিক কোথায় বা কীভাবে হামলা চালানো হতে পারে, সে বিষয়েও স্পষ্ট করে কিছু বলেননি তারা। তবে তাদের একজন জানান, হামলার পর যোগাযোগব্যবস্থা মেরামতের কাজ বাধাগ্রস্ত করার চেষ্টা করবে ইরান, যাতে ইন্টারনেট সংযোগসহ বিভিন্ন যোগাযোগসেবা দীর্ঘ সময় বিঘ্নিত থাকে।
ওই কর্মকর্তা বলেন, ইরানে হামলা হলে আর কোনো সীমারেখা থাকবে না। সমুদ্রতলের ক্যাবল থেকে শুরু করে গোপন সামরিক ঘাঁটিসহ সবকিছুই লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
ওয়াশিংটনকে সতর্ক করে তিনি বলেন, আগুন নিয়ে খেলবেন না। সমুদ্রতলের ক্যাবলগুলোর অবস্থান ও ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে ইরানের পূর্ণ ধারণা রয়েছে এবং দেশটি সহজেই সেগুলো ধ্বংস করতে পারে।
এর আগে বুধবার ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনীর (আইআরজিসি) রাজনৈতিকবিষয়ক উপপ্রধান ইয়াদোল্লাহ জাভানি বলেছিলেন, ইরানের অবকাঠামোতে হামলা হলে হরমুজ প্রণালির নিচ দিয়ে যাওয়া সাতটি গুরুত্বপূর্ণ ইন্টারনেট ক্যাবলকে লক্ষ্যবস্তু করতে পারে তেহরান।
বিশ্ব ইন্টারনেটে কতটা প্রভাব পড়তে পারে
জাতিসংঘের সংস্থা আন্তর্জাতিক টেলিযোগাযোগ ইউনিয়নের তথ্য অনুযায়ী, বিশ্বজুড়ে ইন্টারনেট যোগাযোগের প্রায় ৯৯ শতাংশই সমুদ্রতলের ক্যাবলর মাধ্যমে পরিচালিত হয়। তবে হরমুজ প্রণালিতে হামলার ফলে বিশ্বব্যাপী ইন্টারনেট ব্যবস্থায় বড় ধরনের প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তুলনামূলক কম।
টেলিযোগাযোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান টেলিজিওগ্রাফির গবেষণা পরিচালক অ্যালান মল্ডিন বলেন, আন্তর্জাতিক ব্যান্ডউইথের এক শতাংশেরও কম হরমুজ প্রণালি দিয়ে প্রবাহিত হয়। ফলে সেখানে হামলার প্রভাব বৈশ্বিক পর্যায়ে সীমিত থাকতে পারে।
ইরান ও ওমানের মাঝখানে অবস্থিত হরমুজ প্রণালি পারস্য উপসাগরকে ওমান উপসাগর ও আরব সাগরের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
ইরানি নিরাপত্তা কর্মকর্তাদের বক্তব্যের বিষয়ে মন্তব্য চেয়ে রয়টার্স যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর ও ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে যোগাযোগ করলেও তারা সাড়া দেয়নি। উপসাগরীয় দেশগুলোর পক্ষ থেকেও তাৎক্ষণিক কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
আরও কঠোর জবাব দেওয়ার প্রস্তুতি
সমুদ্রতলের ক্যাবলে সম্ভাব্য হামলার পরিকল্পনা থেকে বোঝা যায়, যুক্তরাষ্ট্র আবারও সামরিক অভিযান শুরু করলে আগের চেয়ে কঠোর জবাব দিতে হবে বলে মনে করছে ইরানের নেতৃত্ব।
চলতি মাসে ইরানের জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা মোহসেন রেজাই সতর্ক করে বলেছিলেন, নতুন করে সংঘাত শুরু হলে উপসাগরীয় অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল অবকাঠামো যেমন, তথ্যকেন্দ্র ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-সংক্রান্ত স্থাপনা লক্ষ্যবস্তু হতে পারে।
ইরানের দ্বিতীয় নিরাপত্তা কর্মকর্তা বলেন, উপসাগরীয় দেশগুলো এসব অবকাঠামোয় বিপুল বিনিয়োগ করেছে। সমুদ্রতলের ক্যাবলের কোনো ক্ষতি হলে ওয়াশিংটনকে দায়ী করা উচিত, তেহরানকে নয়।
ওয়াশিংটনভিত্তিক মিডল ইস্ট ইনস্টিটিউটের ইরান কর্মসূচির পরিচালক অ্যালেক্স ভাতাঙ্কা বলেন, নতুন করে যুদ্ধ শুরু হওয়া ঠেকানো এবং ওয়াশিংটনের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই এ ধরনের হুমকির উদ্দেশ্য। এর মাধ্যমে উপসাগরীয় সরকার ও মার্কিন কোম্পানিগুলোর মধ্যে ওই অঞ্চলে বিনিয়োগ নিয়ে উদ্বেগ বাড়াতে চাইছে তেহরান।
ভাতাঙ্কার মতে, ট্রাম্পের নীতির কারণে তাদের বিনিয়োগ পরিকল্পনায় কী ধরনের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে, তা নিয়ে উপসাগরীয় দেশগুলোর সরকার ও করপোরেট নির্বাহীরা যেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ওপর চাপ সৃষ্টি করেন, সেটিই চায় তেহরান।
বিশ্লেষকদের মতে, একাধিক ক্যাবল বিচ্ছিন্ন হলে ইন্টারনেটের গতি কমে যেতে পারে। পাশাপাশি আর্থিক লেনদেন, অনলাইন বাণিজ্য ও ক্লাউড কম্পিউটিং সেবায় বিঘ্ন ঘটতে পারে। তবে ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করবে সেবা প্রদানকারীরা কত দ্রুত বিকল্প পথে তথ্যপ্রবাহ চালু করতে পারেন এবং বিকল্প সংযোগগুলোর সক্ষমতা কতটা, তার ওপর।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যুদ্ধ চলাকালে ক্ষতিগ্রস্ত ক্যাবল মেরামত করা কঠিন হতে পারে। এর সঙ্গে বিমার ব্যয় বৃদ্ধি এবং অন্য দেশের জলসীমায় প্রবেশের অনুমতি পেতে বিলম্ব যুক্ত হলে মেরামতের কাজ আরও জটিল হয়ে উঠবে।
গত মার্চে সংযুক্ত আরব আমিরাতে অ্যামাজন ওয়েব সার্ভিসেসের দুটি স্থাপনায় সরাসরি ইরানি হামলা হয়। বাহরাইনে প্রতিষ্ঠানটির আরেকটি স্থাপনার কাছের অবকাঠামোও ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই মাসে যুদ্ধের তীব্রতা বাড়ার সময় আইআরজিসি মাইক্রোসফট, গুগল, অ্যাপল ও এনভিডিয়াসহ কয়েকটি মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিকে বৈধ লক্ষ্যবস্তু হিসেবে উল্লেখ করেছিল।
তবে স্থলভিত্তিক সংযোগের মাধ্যমে ইন্টারনেটের তথ্যপ্রবাহ বিকল্প পথে পরিচালনা করা সম্ভব। যোগাযোগব্যবস্থার স্থিতিশীলতা বাড়াতে উপসাগরীয় দেশ ও মার্কিন প্রযুক্তি কোম্পানিগুলো এ ধরনের অবকাঠামো সম্প্রসারণেও বিনিয়োগ করছে।
মাইক্রোসফট ২০৩০ সালের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যে সমুদ্রতল ও স্থলভিত্তিক যোগাযোগ অবকাঠামো উন্নয়নে ৪০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে।
সূত্র : রয়টার্স
মূল প্রতিবেদনে যান ↗