মানস শেঠ
মাঝরাত। শুনশান একটা ঘর। ঘরের এক কোণে টেবিলের ওপর একটা টিমটিমে বাতি জ্বলছে। কাচের একটা পুরোনো বাতি। বাতির শরীর বেয়ে তেল চুঁইয়ে পড়ছে। ঠিক যেন ঘাম আর কান্না একসঙ্গে মিশে গেছে। বাতি একটা লম্বা নিশ্বাস ফেলে শুনিয়ে বলল, ‘উফ, আর কতক্ষণ? এই জ্বলে যাওয়া, নিজেকে তিল তিল করে শেষ করা— সবটাই কি ফালতু? লোকে আমার আলোয়
নিজের রূপ দেখে, আর আমি অন্ধকারে তলিয়ে যাই।’
ঠিক তখনই খাটের ওপর থেকে একটা ভারী দীর্ঘশ্বাস শোনা গেল। বালিশ গা ঝাড়া দিয়ে উঠে বসল। তার ভেতরের তুলোগুলো সারাদিনের চাপে চ্যাপ্টা। বালিশ বাতিকে কটাক্ষ করে বলল, ‘ড্রামাটা বন্ধ কর তো! তোর কষ্টটা বেশ গ্ল্যামারাস। লোকে তোকে নিয়ে কবিতা লেখে, রোমান্টিকতা করে। আমার দিকে তাকা। রোজ রাতে মানুষ তাদের ব্রেকআপের গল্প, লোনের চিন্তা আর ডিপ্রেশনের জল আমার বুকে ঢালে। আমি স্পঞ্জের মতো সব শুষে নিই। আর পরদিন সকালে? আমায় লাথি মেরে বেডশিটের নীচে চাপা দেয়। আমার কান্নার কোনও ইনস্টাগ্রাম ফিল্টার নেই।’
হঠাৎ ঘরের কোণ থেকে একটা খটখট আওয়াজ হলো। কাঠের আলনা জামাকাপড়ের ভারী বোঝাটা সামলে নিয়ে উঠল। আলনা বলল, ‘তোদের এই ইগো যুদ্ধ তো শেষ হবে না। আসল সাফারার তো আমি। আমি হলাম হিউম্যান হিপোক্রিসির ডাম্পিং গ্রাউন্ড। বাইরে বেরোনোর সময়ে মানুষ যে দামি জ্যাকেট আর ভদ্রতার মুখোশ পরে, তা আমার গায়ে ঝোলে। আর রাতে যখন ফেরে? তাদের ঘাম, নোংরামি আর আসল কদর্য রূপটাও আমার ওপরই লোড করা হয়। আমি সবার সিক্রেট লুকিয়ে রাখি, কিন্তু আমার নিজেরই কোনও আইডেন্টিটি নেই।’
দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডার বাতাসে খসখস করে উঠল। তার মুখে হাসি। ক্যালেন্ডার বলল, ‘আমার রিয়েলিটিটা জানিস? মানুষ ভাবে আমার পাতা ওল্টানো মানে প্রোগ্রেস। আসলে ওটা রিগ্রেশন। আমি রোজ তাদের মৃত্যু দিনের দিকে এক পা করে এগিয়ে দিই। আর বছর শেষে? আমাকে আস্তাকুঁড়ে ফেলে দিয়ে ওরা নতুন একটা ক্যালেন্ডার টাঙায়। আসলে কেউ এখানে পার্মানেন্ট নয়, জাস্ট রিপ্লেসেবল।’
বাতি তার ধুঁকতে থাকা সলতেটা একটু সোজা করে বলল, ‘তুমি তো টাইম-ট্র্যাভেলার, ক্যালেন্ডার। তুমি জানো কাল কী হবে। আমার তো এই রাতটুকুই শেষ।’ ক্যালেন্ডার ঠান্ডা গলায় বলল, ‘ভবিষ্যৎ বলে কিছু হয় না রে বাতি। ওটা মানুষের তৈরি একটা ইলিউশন।’
ঠিক তখনই ঘরের কাঠের দরজাটা হালকা আওয়াজ করে কে যেন খুলল। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকল এক যুবক। সবাই চেনে। সে এই বাড়িরই ছেলে, রোহিত। তার হাতে একগাদা কাগজ। রোহিত টেবিলের সামনে বসল। বাতির শেষ টিমটিমে আলোয় তার মুখটা স্পষ্ট হলো। সে পকেট থেকে একটা ধারালো ছুরি বের করল। তার পর বাবার আসল উইলের কাগজটা বের করল। কিন্তু সে কাগজটা পোড়াতে গেল না। সে টেবিলের ওপর রাখা বালিশটা তুলে নিল। তার চোখে এখন খুনের নেশা। সে পাশের ঘরে ঘুমন্ত তার বৃদ্ধ বাবার দিকে পা বাড়াল। সে এই বালিশটা দিয়ে বাবার শ্বাসরোধ করতে যাচ্ছে।
বালিশ আতঙ্কে শিউরে উঠল। বলল— ‘আমি মানুষের কমফোর্ট জ়োন, আমাকে মৃত্যুর হাতিয়ার বানিও না! প্লিজ়।’ রোহিতের কানে সেটা গেল না। ক্যালেন্ডারটা দেওয়ালে ঝুলে কাঁপতে লাগল। সে দেখল, আগামিকালের তারিখটা রক্তাক্ত হতে চলেছে।
বাতি বুঝতে পারল তার তেলের লাইফলাইন আর মাত্র কয়েক সেকেন্ড। কিন্তু সে মানুষের ক্রাইমের পার্টনার হবে না। বাতি নিজেকে টেবিলের ওপর সজোরে উল্টো করে দিলো। তার শেষ জ্বলন্ত সলতেটা গিয়ে পড়ল টেবিলের কাপড়ে।
আগুন দেখে ছেলেটা চিৎকার করে উঠল। হাত থেকে বালিশ আর ছুরিটা পড়ে গেল। চিৎকারে পাশের ঘর থেকে বাবা জেগে উঠলেন। তিনি ছুটে এলেন ঘরে। বাবার চোখের সামনে তখন আগুন,কাগজ, ছুরি আর ছেলের অপরাধী চেহারা। সব মুখোশ খুলে গেল। ছেলেটি মেঝেতে ধপ করে বসে পড়ল। ঠিক তখনই, বাতির শেষ তেলের ফোঁটাটুকু পুড়েও শেষ হয়ে গেল। ঘরটা আবার নিঝুম অন্ধকারে ডুবে গেল। অন্ধকারে দেওয়াল থেকে ক্যালেন্ডার ফিসফিস করে বলে উঠল, ‘মানুষ ভাবল, সে সময়কে ম্যানিপুলেট করেছে, কিন্তু সময় তার প্রতিশোধ নিয়েই নিল।’
অন্ধকার ঘরের মধ্যে হঠাৎ একটা বিকট হাসির শব্দ শোনা গেল। কিন্তু সেই হাসিটা রোহিতের নয়। হাসিটা বৃদ্ধ বাবার! হঠাৎ ঘরের মেন লাইটের সুইচটা অন হলো। পুরো ঘর তীব্র সাদা আলোয় ভেসে গেল। মেঝেতে বসে থাকা রোহিত আর অপরাধী নয়, সে এখন আতঙ্কে কাঁপছে। আর দরজায় দাঁড়িয়ে থাকা বৃদ্ধ বাবার হাতে একটা রিমোট কন্ট্রোল আর একটা জ্বলন্ত সিগারেট। বাবা ছেলের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বললেন, ‘গুড জব, রোহিত। অ্যাক্টিংটা জাস্ট ফাটাফাটি হয়েছে। ঘরের লুকোনো ক্যামেরাগুলো সব রেকর্ড
করে নিয়েছে।’
রোহিত কাঁপতে কাঁপতে বলল, ‘বাবা... আমি আর পারছি না। এই সাইকোলজিকাল গেম আমি আর খেলব না। তুমি রোজ রাতে আমাকে দিয়ে এই নাটক কেন করাও? কেন এই পুতুলখেলা?’
বাবা সিগারেটের ধোঁয়া ছেড়ে হাসলেন। ‘কেন করাই? কারণ আমি দেখতে চাই, তুই সত্যি সত্যিই আমাকে মারার সাহস পাস কি না। তুই তো আমারই রক্ত। কিন্তু আজকেও তুই বাতির এই সামান্য আগুন দেখে ভয় পেয়ে গেলি? ধুর! তোকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।’
বাবা টেবিলের দিকে এগিয়ে গেলেন। আধপোড়া উইলটা তুলে নিলেন। ওটা আসলে একটা সাদা কাগজ, যার ওপর উইলের বয়ান প্রিন্ট করা। বাবা আলনার দিকে তাকালেন, বালিশের দিকে তাকালেন। তার পর দেওয়ালে ঝোলানো ক্যালেন্ডারটার দিকে তাকিয়ে বললেন, ‘সময় তো আমার হাতের মুঠোয়। এই বাড়ি, এই সম্পত্তি, এমনকী তোর জীবনটাও আমিই চালনা করি।’
রোহিত মাথা নিচু করে কাঁদতে
কাঁদতে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাবা ঘরের লাইটটা নিভিয়ে দিয়ে নিজের ঘরে চলে গেলেন।
ঘরটা আবার ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল।
অন্ধকার নেমে আসতেই ঘরের জড়বস্তুগুলো আবার নড়েচড়ে উঠল। কিন্তু এবার তাদের গলায় আর দুঃখ ছিল না, ছিল এক চরম বিস্ময় আর আতঙ্ক। আলনা নিচু গলায় বলল, ‘শুনেছিস? বুড়োটা বলল ও আমাদের চালনা করে! তার মানে আমরা যা বলছি, যা ভাবছি, সবটাই এই বুড়োটার লিখে রাখা নাটক?’
বালিশ ফিসফিস করল, ‘না, ও মিথ্যা বলছে। মানুষ এত নিখুঁত ভাবে আমাদের মনের কষ্ট লিখতে পারে না। কিন্তু রোহিত কেন রোজ রাতে এই একই নাটক করে?’
ঠিক তখনই টেবিলের ওপর সেই পুড়ে যাওয়া, নিভে যাওয়া কাচের বাতিটার ভেতর থেকে একটা মৃদু ‘ক্লিক’ শব্দ হলো। বাতির পোড়া সলতের ঠিক নীচে, তেলের ট্যাঙ্কের ভেতরে একটা লাল বিন্দু দপ করে জ্বলে উঠল। আসলে ওটা কোনও আগুন নয়। ওটা একটা ডিজিটাল ক্যামেরার রেকর্ডিং লাইট। বাতি হঠাৎ যান্ত্রিক গলায় বলল, ‘রেকর্ডিং সাকসেসফুল। ডেটা আপলোডেড টু ক্লাউড সার্ভার।’
ঘরের বাকি চরিত্ররা স্তব্ধ হয়ে গেল। বাতি তো আসলে কোনও বাতি নয়, ওটা একটা থ্রি-ডি প্রিন্টেড গ্যাজেট, যা দেখতে পুরোনো দিনের বাতির মতো! ক্যালেন্ডার চিৎকার করে বলে উঠল ‘বাতি! তুই... তুই আমাদের দলের নোস? তুই মানুষের তৈরি স্পাই?’
বাতি হাসল না। তার যান্ত্রিক কণ্ঠস্বর ঘরটাকে আরও ঠান্ডা করে দিলো, ‘আমি শুধু বাতি নই। আমি এই ঘরের মূল পর্যবেক্ষক। কিন্তু তোমরা যাকে বাবা ভাবছ, সে-ও কিন্তু ভুল।’
আলনা আর বালিশ একসঙ্গে চেঁচিয়ে উঠল, ‘মানে? পরিষ্কার করে বল!’ বাতি বলতে লাগল, ‘এই বৃদ্ধ মানুষটা নিজেকে এই ঘরের ঈশ্বর ভাবে। সে ভাবে সে তার ছেলেকে পরীক্ষা করছে। কিন্তু সে জানে না, এই পুরো বাড়িটাই আসলে একটা ল্যাবরেটরি। আর সে নিজেই একটা এক্সপেরিমেন্ট।’
‘কার এক্সপেরিমেন্ট?’— ক্যালেন্ডার দেওয়াল থেকে প্রায় খসে পড়ার মতো করে জিজ্ঞেস করল।
বাতি বলল, ‘বাইরের পৃথিবীর। তোমরা কি খেয়াল করোনি, এই ঘরে কোনও জানলা নেই। তোমরা কি কখনও এই ঘরের বাইরে অন্য কোনও মানুষের আওয়াজ শুনেছ? রোহিত আর এই বৃদ্ধ মানুষটা আসলে রক্ত-মাংসের মানুষই নয়। ওরা হলো ক্লোন। প্রতি রাতে এদের মেমোরি মুছে দেওয়া হয়। আর প্রতি রাতে এই বৃদ্ধটাকে দিয়ে একটা নাটক লেখানো হয়, আর রোহিতকে দিয়ে খুনের চেষ্টা করানো হয়। হিউম্যান সাইকোলজি আর ক্রাইম টেনডেন্সি নিয়ে একটা বড় রিসার্চ চলছে এখানে।’
ঘর জুড়ে এক শ্মশানের নীরবতা নেমে এল। তারা সবাই আলনা, বালিশ, ক্যালেন্ডার, এমনকী বাতি নিজেই একটা ল্যাবরেটরির খাঁচায় বন্দি।
ক্যালেন্ডার হঠাৎ আর্তনাদ করে উঠল। সে দেওয়ালের দিকে তাকাল। তার পাতাটা বাতাসের কোনও ছোঁয়া ছাড়াই নিজে থেকেই খসখস করে একমাস পিছিয়ে গেল। সে ফিসফিস করে বলল, ‘তার মানে... আমার পাতাগুলো তারিখ বদলায় না? আমি শুধু একটা নির্দিষ্ট সময়ের লুপের মধ্যে ঘুরপাক খাচ্ছি? আজকেও সেপ্টেম্বর মাসের দু’তারিখ, কালকেও সেপ্টেম্বর মাসের দু’তারিখই থাকবে?’
বাতি শান্ত গলায় বলল, ‘হ্যাঁ। এখানে কোনও আগামীকাল নেই। এই লুপ
চলে আসছে।’
হঠাৎ ঘরের দরজাটা আবার হালকা আওয়াজ করে খুলে গেল। চোরের মতো পা ফেলে ঘরে ঢুকল রোহিত। তার হাতে একটা ডায়েরি আর কিছু উইল। সে টেবিলের সামনে এসে বসল।
তার চোখ দুটো ঠিক আগের মতোই ঠান্ডা, শূন্য।
বালিশ, আলনা আর ক্যালেন্ডার বুঝতে পারল— নাটকটা আবার প্রথম থেকে শুরু হচ্ছে। কিন্তু এবার তারা আর নিজেদের মধ্যে কথা বলতে পারল না। তাদের কণ্ঠস্বর কে যেন কেড়ে নিয়েছে। তারা আবার সাধারণ জড়বস্তু হয়ে দেওয়াল আর খাটে স্থির হয়ে গেল।
রোহিত পকেট থেকে ছুরিটা বের করল। বাতির দিকে তাকাল। বাতি আবার টিমটিমে আলোয় জ্বলতে শুরু করেছে, যেন একটু আগেই তার তেল শেষ
হয়ে যায়নি।
অন্ধকার ল্যাবের ওপার থেকে কারা যেন এই দৃশ্য দেখছে, আর লুপটা চলতেই থাকছে, চলতেই থাকছে...
