কেনিয়ার এক ধর্মগুরু পল ম্যাকেঞ্জিকে ১৯১ জনকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। নিহতদের মধ্যে একজন ছাড়া বাকি সবাই শিশু। ম্যাকেঞ্জি তাঁর অনুসারীদের নির্দেশ দিয়েছিলেন, তারা যেন নিজেদের সন্তানদের না খাইয়ে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেয়। তাঁর দাবি ছিল, এভাবে মারা গেলে শিশুরা ‘যিশুর সঙ্গে মিলিত হতে’ পারবে।
ম্যাকেঞ্জির ধর্মীয় মতবাদ অনুযায়ী, শিক্ষা গ্রহণ নিষিদ্ধ ছিল এবং আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থাকে ‘অশুভ’ বলে মনে করা হতো। ম্যাকেঞ্জির ধর্মীয় গোষ্ঠীর আরও ২৮ জন নেতাকেও হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা হয়েছে। তাঁরা সবাই নিজেদের নির্দোষ দাবি করেছিলেন। বারবার তাঁরা বলেছেন, কাউকে জোর করে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়া হয়নি।

কেনিয়ার বন্দরনগরী মোমবাসায় আট ঘণ্টা ধরে রায় পড়ে শোনান বিচারক ডায়ানা মোচাচে। তিনি বলেন, ম্যাকেঞ্জির অনুসারীরা বিশ্বাস করতেন, তিনি ‘যিশুর মুখপাত্র।’ মামলায় ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে অভিযুক্ত একজন বলেন, ম্যাকেঞ্জি তাঁর অনুসারীদের জানিয়েছিলেন, কেউ যদি উপবাস করার নির্দেশ অমান্য করে, তাহলে ‘লাথি ও ঘুষি মেরে তাকে স্বর্গে পাঠাতে হবে।’
বিচারক বলেন, যে বনে ধর্মীয় গোষ্ঠীটির ঘাঁটি ছিল, সেখানে মৃতদের কবর দেওয়াকে ‘বিয়ে’ বলা হতো। তাঁর ভাষায়, যারা মারা যেত, তাদের ‘যিশুর সঙ্গে বিয়ে হয়েছে’ বলে উদ্যাপন করা হতো। এক সাক্ষী জানান, এক গর্ভবতী নারীকে তাঁর নবজাতক সন্তানকে বুকের দুধ খাওয়াতে নিষেধ করা হয়েছিল। শিশুটি ১২ দিন পর মারা যায়। সাক্ষী বলেন, ‘ওই নারীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল, যেন তিনি উপবাস করতে করতে মারা যান এবং তাঁর সন্তানদের অনুসরণ করেন।’
ম্যাকেঞ্জির সাবেক নিরাপত্তাপ্রধান এনোস আমানিয়া এনগালাকেও প্রথমে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। পরে তিনি সমঝোতার মাধ্যমে দোষ স্বীকার করে মামলার পক্ষে সাক্ষী হতে রাজি হন। ম্যাকেঞ্জি ও তাঁর ধর্মীয় গোষ্ঠীর অন্য নেতাদের বিরুদ্ধে আরও অনেক মামলা চলছে। এসব মামলার মধ্যে রয়েছে সন্ত্রাসবাদ, উগ্রপন্থায় জড়িয়ে পড়তে মানুষকে প্ররোচিত করা এবং শিশুদের শিক্ষা থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ।
তবে হত্যা-সংক্রান্ত সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগে এই প্রথম ম্যাকেঞ্জির বিরুদ্ধে রায় দেওয়া হলো। আগামী ৬ নভেম্বর তাঁর সাজা ঘোষণা করা হবে। ২০২৩ সালে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। কেনিয়ার উপকূলের কাছে শাকাহোলা বনে অগভীর কবর থেকে ৪০০ টির বেশি মরদেহ উদ্ধারের পর এই গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। দেশটির বিভিন্ন এলাকা থেকে অনুসারীদের নিয়ে ম্যাকেঞ্জি ওই বনে বসতি গড়েছিলেন।
ছয় সন্তানকে হারিয়েছেন এক বাবা
৪৮ বছর বয়সী স্টিফেন মুয়িতি জানান, ধর্মীয় গোষ্ঠীটির কারণে তিনি তাঁর ছয় সন্তানকেই হারিয়েছেন। ম্যাকেঞ্জির সঙ্গে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়া ব্যক্তিদের মধ্যে তাঁর সাবেক স্ত্রীও রয়েছেন। আদালতের বাইরে বিবিসিকে তিনি বলেন, ‘সব অভিযুক্ত দোষী সাব্যস্ত হওয়ায় আমি খুশি।’
রায় ঘোষণার আগে নিজের পরিবারের একটি ছবি হাতে নিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে মুয়িতি বলেছিলেন, ‘আমার ছয় সন্তানই শাকাহোলা বনে মারা গেছে। আমি শুধু আমার ছেলে স্যামুয়েলের দেহাবশেষ খুঁজে পেয়েছিলাম এবং তাকে কবর দিতে পেরেছিলাম।’ অগভীর কবরগুলো খুঁড়ে মরদেহ বের করার ভয়াবহ কাজের জন্য কাছের একটি শহর থেকে ১৭ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাঁদের কেউ কেউ দিনে মাত্র ৮ ডলার বা ৬ পাউন্ড পারিশ্রমিক পেতেন।

কবর খোঁড়ার কাজে যুক্ত জেমস বিবিসিকে বলেন, ‘আমরা যে কবরই পেয়েছি, তাতেই অন্তত তিনটি মরদেহ ছিল। কিছু দেহাবশেষ ছিল মাত্র কয়েক সপ্তাহ বয়সী শিশুর।’ তিনি আরও বলেন, ‘একবার আমরা একটি কবরের ভেতর সারি করে রাখা ১২টি শিশুর মরদেহ পেয়েছিলাম। দৃশ্যটি ছিল ভয়াবহ। মরদেহগুলো কাপড়ের মতো সাজিয়ে রাখা হয়েছিল। একটি মরদেহের ওপর আরেকটি।’
কবর খোঁড়ার কাজে যুক্ত ব্যক্তিরা জানান, কিছু শিশুর হাত-পা বাঁধা ছিল এবং তাদের দেহ বিছানার চাদরে মোড়ানো ছিল। ম্যাকেঞ্জির অনেক অনুসারী কেনিয়ার অন্য এলাকা থেকে এসেছিলেন। তবে তাঁদের মধ্যে এমন লোকও ছিলেন, যাঁদের স্থানীয় বাসিন্দারা চিনতেন। কারণ, ওই ধর্মীয় গোষ্ঠীর সদস্যরা প্রায়ই প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র কিনতে এবং গালানা নদী থেকে পানি আনতে কাছের শাকাহোলা শহরে যেতেন। নদীটি শহরের মধ্য দিয়ে বয়ে গেছে।
আরেকজন গোরখোদক সালিম কারিসা বলেন, ‘আমরা কখনো কখনো মোটরসাইকেলে করে লোকজনকে বনের ভেতরে নিয়ে যেতাম। কিন্তু সবকিছু এত পরিকল্পিত ও গোপনে করা হতো যে ভেতরে আসলে কী ঘটছে, তা কেউ বুঝতে পারত না।’
বিবিসির প্রতিবেদনে মোহামেদ মাদির তোলা একটি ছবিতে দেখা যায়, স্টিফেন মুয়িতি রায়ের বিষয়ে সন্তোষ প্রকাশ করছেন।
শিক্ষা ও চিকিৎসাকে ‘অশুভ’ বলতেন ম্যাকেঞ্জি
২০০৩ সালে ম্যাকেঞ্জি ‘গুড নিউজ ইন্টারন্যাশনাল মিনিস্ট্রিজ’ নামে একটি ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলেন। পরবর্তী ১৬ বছরে প্রতিষ্ঠানটির জনপ্রিয়তা বাড়তে থাকে। কেনিয়ার বিভিন্ন এলাকায় এর শাখা গড়ে ওঠে এবং হাজারো মানুষ এর অনুসারী হন। তাঁর ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান ‘টাইমস টিভি’ নামে একটি টেলিভিশন চ্যানেলও চালাত। এই চ্যানেলে মালিন্দি শহরে অবস্থিত তাঁর গির্জা থেকে দেওয়া ধর্মীয় বক্তব্য প্রচার করা হতো।
ম্যাকেঞ্জি তাঁর ‘শেষ সময়’ বা পৃথিবীর শেষ পর্ব নিয়ে দেওয়া ধর্মীয় বক্তব্যে নানা ষড়যন্ত্রতত্ত্ব প্রচার করতেন। তিনি শিক্ষাকে ‘অশুভ’ বলতেন, চিকিৎসাসেবাকে ‘ধর্মীয় মতবাদের বিরোধী’ বলে দাবি করতেন এবং ডিজিটাল পরিচয়পত্রকে ‘শয়তানের চিহ্ন’ হিসেবে বর্ণনা করতেন।

ম্যাকেঞ্জির ছেলে ড্যান পল ম্যাকেঞ্জি জানান, তিনি ওই গির্জায় ক্যামেরাম্যান হিসেবে কাজ করতেন। তিনি বলেন, ‘শিশুরা পেছনে বসত, বড়রা বসত মাঝখানে। আর সবাই সকালজুড়ে ধর্মীয় গান গাইত।’ নিজেকে ধর্মযাজক হিসেবে পরিচয় দেওয়া ম্যাকেঞ্জি দুপুরে জ্বালাময়ী ধর্মীয় বক্তব্য দেওয়া শুরু করতেন। এসব বক্তব্যের কিছু অংশে তিনি মানুষের শরীর থেকে ‘অশুভ আত্মা তাড়ানোর’ কথা বলতেন।
২০১৯ সালে গির্জার প্রধান কেন্দ্রটি বন্ধ হয়ে যায়। এরপর পল ম্যাকেঞ্জি শাকাহোলা বনে চলে যান এবং তাঁর অনুসারীদেরও সেখানে যেতে উৎসাহিত করেন।
অসুস্থ হয়েও চিকিৎসা পাননি অনুসারীরা
২৩ বছর বয়সী পিটার শুকরানি জানান, তাঁর মা তখন তাঁকে নিয়ে শাকাহোলা বনে চলে গিয়েছিলেন। আট বছর বয়সে তিনি ম্যাকেঞ্জির গির্জায় যাওয়া শুরু করেন। তিনি ম্যাকেঞ্জিকে নিজের ‘আধ্যাত্মিক পিতা’ বলে বর্ণনা করেন এবং বলেন, তিনি কখনোই তাঁর সম্পর্কে খারাপ কিছু বলবেন না।
বনে থাকার সময় শুকরানি অসুস্থ হয়ে পড়েন। কিন্তু সেখানে ওষুধ ব্যবহার নিষিদ্ধ থাকায় তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি হয়। শুকরানি বলেন, ‘আমার মা আমাকে যে ওষুধগুলো খেতে দেওয়া হতো, সেগুলো ফেলে দিতেন। কারণ, তিনি বিশ্বাস করতেন, একমাত্র ঈশ্বরই আমাকে সুস্থ করতে পারবেন।’
ওই বসতিকে বিশাল বনজুড়ে ছড়িয়ে থাকা মাটির ঘরগুলোর একটি এলাকা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। শুকরানি বলেন, ‘আমরা শান্তিতে স্বাভাবিক জীবন যাপন করতাম। কয়েক দিন উপবাস করতাম, তারপর অল্প কিছু খাবার খেতাম।’
২০২৩ সালের মার্চ মাসে স্থানীয় পশুপালকেরা প্রথম মরদেহের সন্ধান পাওয়ার সময়ের মধ্যে শত শত মানুষ মারা গিয়েছিলেন। কবর খোঁড়ার কাজে যুক্ত সালিম কারিসা বলেন, ‘আমরা কাউকে বনের বাইরে নিয়ে আসতাম। কিন্তু তাঁদের শরীর এত দুর্বল হয়ে পড়েছিল যে আমাদের হাতের মধ্যেই মারা যেতেন।’
শুকরানিও বনের ভেতর থেকে উদ্ধার হওয়া ব্যক্তিদের একজন। উদ্ধারের আগ পর্যন্ত তিনি কয়েক সপ্তাহ ধরে অসুস্থ ছিলেন এবং বিছানায় পড়ে ছিলেন। কিন্তু তাঁর মা প্রয়োজনীয় ওষুধ ফেলে দেওয়ায় তাঁর শারীরিক অবস্থার আরও অবনতি ঘটে। শুকরানি বলেন, ‘আমার মা বিশ্বাস করতেন, পাদরি ম্যাকেঞ্জির মতবাদ অনুযায়ী ওষুধ অশুভ।’ তিনি আরও বলেন, ‘শাকাহোলা বন থেকে আমাকে উদ্ধার করা না হলে আমি মারা যেতাম।’
প্রতিবেদনে পিটার শুকরানির বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে যে, বনে থেকে গেলে তাঁর মৃত্যু হতে পারত। তারপরও তিনি ম্যাকেঞ্জিকে একজন ভালো মানুষ বলে মনে করেন।
এত মৃত্যুর পরও ম্যাকেঞ্জির প্রতি বিশ্বাস
মরদেহগুলো পচে যাওয়ার কারণে এখনো অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা যায়নি। আদালতের নথিতে কয়েকটি মরদেহকে ‘অজ্ঞাতপরিচয় বালক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ক্ষেত্রে কবরের অবস্থান এবং মরদেহ উদ্ধারের তারিখ দিয়ে পরিচয় নির্ধারণের চেষ্টা করা হয়েছে।
ম্যাকেঞ্জির অনুসারীরা উপবাসে, শ্বাসরোধে এবং মারধরে মারা গেছেন। তাঁদের মধ্যে নারী, পুরুষ ও শিশুরা ছিলেন। এত মানুষের কষ্ট ও মৃত্যুর পরও এবং নিজেও কষ্টের মধ্য দিয়ে যাওয়ার পরও শুকরানি মনে করেন, ম্যাকেঞ্জি এমন একজন ‘ভালো মানুষ, যিনি আমার যত্ন নেন’।
রায় ঘোষণার আগে শুকরানি বলেন, ‘ম্যাকেঞ্জি কাউকে জোর করে উপবাস করাননি। মানুষ নিজেদের বিশ্বাস থেকে নিজেরাই এসব সিদ্ধান্ত নিয়েছিল।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমি এখনো তাঁকে ভালোবাসি এবং তিনি এখনো আমার পাদরি।’
অন্যদিকে, ম্যাকেঞ্জির ছেলে ড্যান মনে করেন, তাঁর বাবাকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা উচিত। রায় ঘোষণার আগে তিনি বলেন, ‘তিনি ছিলেন নেতা। মানুষ তাঁর দিকে তাকিয়ে থাকত, তাঁকে অনুসরণ করত। তাই গণহত্যার জন্য তিনিই দায়ী, তিনিই একজন হত্যাকারী।’
