জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি ও তরুণদের উদ্বেগ দূর করতে সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে চলমান আন্দোলনের অংশ হিসেবে শনিবার প্যারিসে বড় ধরনের বিক্ষোভ হয়েছে। দিনের শুরুতে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল চললেও শেষ পর্যায়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের প্রায় দুই ঘণ্টা সংঘর্ষ হয়। এ সময় পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করে।
প্যারিস থেকে এএফপি জানায়, বৃষ্টির মধ্যে ট্রামস্টপের ছাউনির নিচে দাঁড়িয়ে কাঁদানে গ্যাসে ধোঁয়াচ্ছন্ন রাস্তায় সংঘর্ষের দৃশ্য দেখছিলেন কয়েকজন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী। তাঁদের একজন ২৩ বছর বয়সী মাইক। তরুণদের উদ্বেগ নিরসনে ফ্রান্স সরকারের ব্যর্থতার প্রতিবাদ জানাতে তিনি মিছিলে যোগ দেন।
পদবি প্রকাশে অনিচ্ছুক মাইক বলেন, ‘আমাদের মনে হয়, ফ্রান্সের বয়স্ক জনগোষ্ঠী আমাদের অবহেলা করছে।’
বিক্ষোভকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ছুড়লে পুলিশ পাল্টা ধাওয়া করে এবং লাঠিপেটা করে। পুলিশের এমন ভূমিকা দেখে মাইক ও তাঁর বন্ধুরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওঠেন।
তিনি প্রশ্ন করেন, ‘চারপাশে তাকিয়ে দেখুন, এরা তো কিশোর-কিশোরী। কিশোরদের কাঁদানে গ্যাস ছুড়ে ও লাঠিপেটা করা কি স্বাভাবিক?’
২৪ বছর বয়সী আরেক শিক্ষার্থী জেসিকা, যিনিও পদবি প্রকাশ করতে চাননি, পুলিশের পদক্ষেপের কারণে বিক্ষোভ করার অধিকার নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
তিনি বলেন, ‘আমি কিছুতেই বুঝতে পারছি না, এত সহিংসতা কেন। আমার মনে হচ্ছে, প্রতিবাদ জানানোর অধিকারকে পদদলিত করা হচ্ছে।’
এক সপ্তাহ আগে দাঙ্গার ঘটনার পর নতুন করে বিক্ষোভ মোকাবিলায় সরকারের প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে শনিবার ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৭০ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েন করা হয়।
প্যারিসের মূল মিছিলে ১ লাখ ১০ হাজার থেকে ২ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন বলে পৃথক হিসাব দিয়েছে কর্তৃপক্ষ ও আয়োজক শ্রমিক ইউনিয়ন সিজিটি।
সেপ্টেম্বরের শেষ দিকে এ আন্দোলনের সূচনা হয়। প্রথমে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা শিক্ষার পরিবেশ নিয়ে প্রতিবাদ শুরু করেন। পরে জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি নিয়ে ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়লে আন্দোলন দেশজুড়ে বিস্তৃত হয়। এতে আরও বিপুলসংখ্যক মানুষের সমর্থন যুক্ত হয়।
শনিবারের বিক্ষোভের শুরুতে প্যারিসের পূর্বাঞ্চলের সড়ক ধরে মিছিল এগিয়ে যাচ্ছিল। এ সময় লাউডস্পিকারে বাজছিল ফরাসি পপসংগীত। বিক্ষোভকারীরা বিভিন্ন স্লোগান দিচ্ছিলেন, আর পুরো পরিবেশ ছিল উৎসবমুখর।
সাউথ পার্ক কার্টুনের কয়েকটি চরিত্রের ছবি এবং ‘তোমরা আমাদের ভবিষ্যৎ ধ্বংস করেছ, হারামজাদারা’ লেখা একটি প্ল্যাকার্ড হাতে দাঁড়িয়ে ছিলেন লরেলেই ভ্যান ডার পুল। জনপ্রিয় ওই কার্টুনের বিখ্যাত একটি সংলাপের আদলে তৈরি প্ল্যাকার্ডটি দেখে কয়েকজন থেমে হাসেন এবং ছবি তোলেন।
বহুতল আবাসিক ভবনের জানালা থেকে বাসিন্দারা মিছিলকারীদের উদ্দেশে উল্লাস প্রকাশ করেন। বিক্ষোভকারীরাও পাল্টা উচ্ছ্বাস দেখান। এ সময় রাস্তায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে নাচের ছোট ছোট আসরও বসে।
তবে মিছিলের শেষ প্রান্তে পৌঁছানোর পর পরিস্থিতি বদলে যায়। সেখানে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে ছিলেন পুলিশ সদস্যরা, পাশে ছিল পুলিশের ভ্যান। এএফপির এক সাংবাদিক ঘটনাস্থলে দেখতে পান, পুলিশ বারবার বিক্ষোভকারীদের ওপর চড়াও হচ্ছে এবং কাঁদানে গ্যাস ও লাঠি ব্যবহার করছে। বিক্ষোভকারীদের মধ্যে অনেকেই ছিলেন তরুণ।
এ সময় শুধু প্রথম নাম প্রকাশ করা ডেভিড নামের এক বিক্ষোভকারীকে বিচলিত দেখাচ্ছিল। তাঁর মুখে কাটা দাগ ছিল। তিনি জানান, এক পুলিশ কর্মকর্তা তাঁর দিকে লাঠি ছুড়ে মারলে তিনি আহত হন।
ডেভিড বলেন, ‘পুলিশ সবার দিকে এগিয়ে এসে নিচু হতে ও পেছনে সরে যেতে বলছিল। তারা মানুষকে ফেলে দিচ্ছিল, বিক্ষোভকারীদের মারধর করছিল।’
রাত নামার সঙ্গে সঙ্গে পুলিশ রাস্তাঘাট খালি করতে শুরু করে। এ সময় বিক্ষোভকারীরাও ছত্রভঙ্গ হয়ে যেতে থাকেন।
সহিংসতার ঘটনায় হতাশ হলেও আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ জেসিকা।
তিনি বলেন, ‘ভবিষ্যৎ নিয়ে আমি উদ্বিগ্ন নই। কারণ, আমি বিশ্বাস করি, একটি জাতি হিসেবে আমরা ঐক্যবদ্ধ এবং নিজেদের অধিকার আদায়ে সবাই লড়ছি।’
এমএমটি
-20261025035523.jpg&w=1440&q=75)