হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশনের কাচের দরজাটা পার হলেই চেনা জগৎটা কেমন যেন পর হয়ে যায়। কারো কাঁধে আধভাঙা মলিন একখান ব্যাগ, কারো চোখে বুকচাপা কান্না, আবার কারো মুখে পরিবারের মুখে দুটো ডাল-ভাতের ব্যবস্থা করার শেষ আকুতি। জীবনের আনন্দ, রঙ আর সব স্বপ্নকে একটা মেটালিক ট্রাঙ্ক আর পাসপোর্টের ভেতরে মুড়ে নিয়ে তারা পা বাড়ান অচেনা প্রবাসে। মরুভূমির ৪৫ ডিগ্রি সেলসিয়াসের প্রখর উত্তাপ, মধ্যপ্রাচ্যের তপ্ত রোদ কিংবা দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার কোনো আলো-আঁধারির কারখানার নিঃশব্দ আতুড়ঘরে তারা দিনের পর দিন নিজেদের হাড়-মাংস ক্ষয় করেন। আর মাস শেষে সেই হাড়ভাঙা খাটুনির ঘাম আর রক্তে ভিজেই সচল থাকে আমাদের দেশের অর্থনীতির প্রধান রক্তনালি, যাদের আমরা মুখরোচক বড় বুলি দিয়ে ডাকি—‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’।
কিন্তু এই মেকি তকমায় কি তাদের রক্ত জল করা শ্রমের আসল মর্যাদা মেলে? আমাদের জাতীয় বাজেটের স্বস্তির নিঃশ্বাস, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের শক্ত স্তম্ভ, কিংবা রাজপথের মেগা প্রজেক্টগুলোর গল্পের নেপথ্যে এই মানুষগুলোর অবদান অনস্বীকার্য। অথচ যে মানুষগুলো নিজের জীবন বাজি রেখে একটা পুরো দেশের অর্থনৈতিক চাকাকে টিকিয়ে রাখছেন, তাদের নিজেদের জীবনেরই যেন কোথাও কোনো নিরাপত্তা নেই।
বিজ্ঞাপন
তাদের এই অনিশ্চিত যাত্রার শুরুটা কিন্তু বিদেশের মাটিতে হয় না, হয় নিজ দেশের মাটিতেই। গ্রামের অসৎ দালালের সাজানো স্বপ্ন, ভিসা সিন্ডিকেটের অমানবিক টাকা চোষা আর চড়া সুদের ঋণের বোঝা ঘাড়ে নিয়ে জীবনের শুরুতেই তারা নিঃস্ব হয়ে যান। এরপর বিদেশের মাটিতে পা রেখেই যখন আকামা (কাজের অনুমতি) না পাওয়া, চুক্তি অনুযায়ী কাজ বা বেতন না থাকা, কিংবা এক কামরায় পশুদের মতো গাদাগাদি করে থাকার বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, তখন সেই রঙিন স্বপ্ন রূপ নেয় এক বিভীষিকাময় ট্র্যাজেডিতে। আর নারী শ্রমিকদের অবস্থা তো আরো ভয়াবহ; গৃহকর্মী হিসেবে গিয়ে অকথ্য মানসিক ও শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকেই যখন কাঠের কফিনে মুড়ে লাশ হয়ে দেশে ফেরেন, তখন আমাদের সমাজ আর রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে মেকি সমবেদনা ছাড়া আর কিছুই জোটে না।
সবচেয়ে বড় আয়রনি হলো, বিমানবন্দরে তারা নামেন দ্বিতীয় শ্রেণির নাগরিকের মতো। প্রবাসী কল্যাণ ডেস্কের উদাসীনতা, ট্রলি না পাওয়া, ব্যাগের জিনিস চুরি, কর্মচারীদের কটু কথা আর এয়ারপোর্টের বাইরে সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ার করুণ অভিজ্ঞতা প্রায় প্রতিটি প্রবাসীর জীবনের এক তেতো বাস্তবতা। যৌবনের সবচেয়ে মূল্যবান সময়টা বিদেশের মাটিতে বিসর্জন দিয়ে, বয়সকালে শূন্য হাতে যখন তারা ভিটেমাটিতে ফেরেন, তখন না পান কোনো সম্মানজনক সামাজিক সুরক্ষা, না থাকে জীবন চালানোর মতো কোনো ব্যবস্থা। এই অবহেলা আর অমানবিকতার শেষ কোথায়? অভিবাসী শ্রমিকদের কেবল ‘টাকা পাঠানোর যন্ত্র’ না ভেবে, রক্তমাংসের মানুষ হিসেবে তাদের নিরাপত্তা দেওয়া এখন সময়ের দাবি।
প্রথমত, রক্তচোষা দালাল সিন্ডিকেট একদম মূল থেকে উপড়ে ফেলতে হবে। রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর ওপর সরকারের কঠোর নজরদারি চাই। সরকারি উদ্যোগে একদম স্বল্প ও সুষম খরচে নিরাপদে প্রবাসে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে, যেন ভিটেমাটি বিক্রি করে কাউকে পথের ফকির হতে না হয়।
দ্বিতীয়ত, দক্ষতা বাড়িয়ে আর আইনি সুরক্ষার বর্ম দিয়ে তাদের বিদেশে পাঠাতে হবে। প্রবাসে যাওয়ার আগেই কাজের প্রশিক্ষণ ও সংশ্লিষ্ট দেশের শ্রম আইন শেখানো বাধ্যতামূলক করা দরকার। পাশাপাশি বিদেশের মাটিতে থাকা প্রতিটি বাংলাদেশ দূতাবাসে শক্তিশালী ‘আইনি সহায়তা সেল’ রাখতে হবে, যাতে বিপদে পড়লে একজন শ্রমিক অনুভব করেন, রাষ্ট্র তার পাশে আছে।
তৃতীয়ত, বিমানবন্দরে নেমে যেন তাদের আর চোখের জল ফেলতে না হয়। ভিআইপিদের মতো লালগালিচা না মিলুক, অন্তত দেশের অর্থনীতি বাঁচিয়ে রাখা এই আসল বীরদের যেন প্রাপ্য সম্মান ও দ্রুত সেবাটুকু দেওয়া হয়।
সর্বোপরি, শূন্য হাতে দেশে ফেরা প্রবাসীদের জন্য বিশেষ সামাজিক সুরক্ষা ও পুনর্বাসন তহবিল গঠন করতে হবে। সহজ শর্তে ঋণ আর মোটামুটি অঙ্কের হলেও একটি পেনশনের ব্যবস্থা রাখা উচিত। এতে করে শেষ বয়সে এসে তাদের আর কারো দয়ার ওপর বাঁচতে হবে না।
রেমিট্যান্সের চকচকে সংখ্যা দিয়ে দেশের জিডিপি মাপা খুব সহজ, কিন্তু সেই প্রতিটি সেন্টের পেছনে কতটুকু চোখের জল আর বুকচাপা কষ্ট লুকিয়ে আছে, তা উপলব্ধি করার বিবেক রাষ্ট্রকে দেখাতে হবে। যে মানুষগুলো বিদেশের মাটিতে রোদে পুড়ে পুরো দেশের মান বাঁচাচ্ছেন, রাষ্ট্র যদি তাদের নিরাপত্তা ও ন্যূনতম সম্মানটুকু দিতে না পারে, তবে ‘রেমিট্যান্স যোদ্ধা’ শব্দটা কেবলই এক হৃদয়হীন উপহাস হয়ে রয়ে যাবে।
লেখক : শিক্ষার্থী, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা কলেজ
