প্রায় দেড় শতাব্দী আগে প্রবল খরা, ফসলহানি, প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও খাদ্য সংকটের সম্মিলিত আঘাতে এশিয়া ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে লাখ লাখ মানুষের মৃত্যু হয়েছিল। ইতিহাসবিদদের বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, ১৮৭৬ থেকে ১৮৭৯ সালের দুর্ভিক্ষে মৃতের সংখ্যা কয়েক কোটি পর্যন্ত হতে পারে। সেই বিপর্যয়ের পেছনে বড় ভূমিকা ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী এল নিনোর। আধুনিক বিজ্ঞান এখন আগাম সতর্কবার্তা দিতে সক্ষম হলেও জলবায়ু পরিবর্তন, যুদ্ধ ও খাদ্য সরবরাহের অনিশ্চয়তা নতুন করে উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
ক্ষুধার ভয়াবহতায় ভেঙে পড়েছিল সমাজ : ১৮৭০-এর দশকের শেষভাগে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে এমন এক দুর্ভিক্ষ দেখা দিয়েছিল, যার বিবরণ আজও শিউরে ওঠার মতো। ভারত, চীন, ব্রাজিলসহ বিভিন্ন দেশে দীর্ঘস্থায়ী খরা ও বৃষ্টির অভাবে ফসল উৎপাদন ভেঙে পড়ে। মাঠে ফসল ছিল না, খাদ্যের দাম সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে গিয়েছিল, আর দরিদ্র পরিবারগুলোর সামনে বেঁচে থাকার পথ ক্রমেই সংকুচিত হয়ে আসছিল। সমসাময়িক বিবরণে অনাহার, খাদ্যের জন্য সংঘাত, পরিবার থেকে বিচ্ছিন্নতা এবং মানুষের চরম অসহায়তার কথা উঠে এসেছে। কোথাও মানুষ গাছের শিকড়, চামড়ার টুকরা ও অনুপযোগী খাবার খেয়ে বেঁচে থাকার চেষ্টা করেছে। অনাহার থেকে বাঁচতে বহু মানুষ ঘরবাড়ি ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিল। কিন্তু অপরিচ্ছন্ন শিবির ও জনাকীর্ণ বসতিতে কলেরা, গুটিবসন্তসহ বিভিন্ন সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ে।
এই দুর্ভিক্ষের ভয়াবহতা শুধু বৃষ্টির অভাব কিংবা ফসলহানির কারণে তৈরি হয়নি। খাদ্যের মজুত, পরিবহন, বণ্টন ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্তও সংকটকে আরও গভীর করেছিল। ইতিহাসবিদ মাইক ডেভিস তার লেট ভিক্টোরিয়ান হলোকাস্টস গ্রন্থে এ সময়ের দুর্ভিক্ষকে বৈশ্বিক মাত্রার বিপর্যয় হিসেবে বিশ্লেষণ করেছেন।
দুর্ভিক্ষের পেছনে ছিল শক্তিশালী এল নিনো : এল নিনো হলো ক্রান্তীয় প্রশান্ত মহাসাগরের মধ্য ও পূর্বাঞ্চলে সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রা স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যাওয়ার একটি প্রাকৃতিক আবহাওয়াগত ঘটনা। এর প্রভাবে বায়ুম-লের চলাচল ও বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে যেতে পারে। কোনো অঞ্চলে অতিবৃষ্টি ও বন্যা দেখা দেয়, আবার অন্য অঞ্চলে দীর্ঘস্থায়ী খরা দেখা দিতে পারে।
১৮৭৭-৭৮ সালের এল নিনো ছিল অত্যন্ত শক্তিশালী। আধুনিক গবেষণায় ঐতিহাসিক সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার তথ্য পুনর্বিশ্লেষণ করে এর তীব্রতার প্রমাণ পাওয়া গেছে। ওই সময় ভারত, উত্তর চীন, উত্তর-পূর্ব ব্রাজিল ও আফ্রিকার বিভিন্ন অঞ্চলে ভয়াবহ খরা দেখা দিয়েছিল। কিছু এলাকায় এল নিনোর আগেই বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় পরপর কয়েকটি মৌসুমে ফসলের ক্ষতি হয়।
তবে এল নিনো একাই এত বিপুল প্রাণহানির কারণ ছিল না। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সঙ্গে খাদ্যবণ্টনের ব্যর্থতা, দুর্বল যোগাযোগব্যবস্থা, দারিদ্র্য ও শাসনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা যুক্ত হয়ে দুর্ভিক্ষকে ভয়াবহ রূপ দিয়েছিল।
প্রশাসনিক ব্যর্থতায় বেড়েছিল প্রাণহানি : তৎকালীন ব্রিটিশ শাসিত ভারতে দুর্ভিক্ষের মধ্যেও কর আদায় ও খাদ্য রপ্তানি অব্যাহত থাকার সমালোচনা করেছেন ইতিহাসবিদেরা। অন্যদিকে, চীনের বিভিন্ন অঞ্চলে শস্যের মজুত ব্যবস্থাপনায় অনিয়ম, দুর্নীতি এবং পরিবহনব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা খাদ্য সংকট মোকাবিলাকে কঠিন করে তোলে।
উত্তর চীনের শানসি প্রদেশে খরার কারণে জলপথে পণ্য পরিবহন ব্যাহত হয়েছিল। পাহাড়ি পথে খাদ্য পৌঁছানো ছিল দুরূহ। ফলে কোথাও খাদ্য থাকলেও তা ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে পৌঁছানো সম্ভব হয়নি।
এই অভিজ্ঞতা দেখায়, খাদ্য সংকটের সময় শুধু উৎপাদন বাড়ানো যথেষ্ট নয়। খাদ্য কোথায় আছে, কারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে এবং কীভাবে দ্রুত সহায়তা পৌঁছানো যাবেÑ এসব প্রশ্নের কার্যকর উত্তরও প্রয়োজন।
আধুনিক বিজ্ঞান কি আগাম বিপদের সংকেত দিতে পারে?
১৮৭০-এর দশকে আবহাওয়ার বৈশ্বিক পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল সীমিত। পরবর্তী সময়ে আবহাওয়াবিদ গিলবার্ট ওয়াকার বায়ুম-লীয় চাপের দীর্ঘমেয়াদি তারতম্য শনাক্ত করেন। পরে জ্যাকব বজার্কনেস সমুদ্রপৃষ্ঠের তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে বায়ুম-লীয় প্রবাহের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করেন। এর ফলে এল নিনো ও এর বিপরীত পর্যায় লা নিনার বৈশ্বিক প্রভাব বোঝার ক্ষেত্রে বড় অগ্রগতি ঘটে।
বর্তমানে উপগ্রহ, সমুদ্রের ভাসমান পর্যবেক্ষণযন্ত্র, বৃষ্টিমাপক যন্ত্র এবং কম্পিউটারভিত্তিক আবহাওয়ার পূর্বাভাসের মাধ্যমে এল নিনোর বিকাশ পর্যবেক্ষণ করা সম্ভব। এসব তথ্য ব্যবহার করে খরা, অতিবৃষ্টি ও কৃষি উৎপাদনের সম্ভাব্য ঝুঁকি সম্পর্কে আগাম সতর্কবার্তা দেওয়া যায়।
তবে পূর্বাভাস শতভাগ নির্ভুল নয়। এল নিনোর প্রভাব অঞ্চলভেদে আলাদা হয় এবং একই ধরনের তাপমাত্রার পরিবর্তন প্রতিবার একই মাত্রার দুর্যোগ সৃষ্টি করে না। তাই কোনো নির্দিষ্টসংখ্যক মানুষের মৃত্যু অনিবার্য বলে ধরে নেওয়ার সুযোগ নেই।
আগামী ছয় মাসে অতি শক্তিশালী এল নিনোর কারণে চার লাখ পঞ্চাশ হাজারের বেশি মানুষের মৃত্যুর আশঙ্কা নিয়ে যে দাবি করা হয়েছে, তার নির্ভরযোগ্য গবেষণাভিত্তি ও হিসাবপদ্ধতি স্পষ্ট না হলে সংখ্যাটিকে নিশ্চিত পূর্বাভাস হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
জলবায়ু পরিবর্তন বাড়াচ্ছে উদ্বেগ : বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে তাপপ্রবাহ, খরা ও অতিবৃষ্টির ঝুঁকি বাড়ছে। জীবাশ্ম জ্বালানি পোড়ানোর ফলে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি দীর্ঘমেয়াদে চরম আবহাওয়ার ক্ষতি আরও বাড়াতে পারে। তবে জলবায়ু পরিবর্তন ও এল নিনো এক বিষয় নয়। এল নিনো একটি প্রাকৃতিক জলবায়ুগত চক্র, আর বৈশ্বিক উষ্ণায়ন হলো দীর্ঘমেয়াদি তাপমাত্রা বৃদ্ধির প্রবণতা। দুটি একসঙ্গে ঘটলে কিছু অঞ্চলে ঝুঁকি আরও জটিল হতে পারে।
এদিকে যুদ্ধ, জ্বালানি ও সারের মূল্যবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে বিঘœ খাদ্যের দাম বাড়িয়ে দিতে পারে। আমদানিনির্ভর দরিদ্র দেশগুলোয় এর প্রভাব বেশি পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। আন্তর্জাতিক খাদ্যসহায়তা কমে গেলে পরিস্থিতি আরও কঠিন হয়ে উঠতে পারে।
পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে প্রয়োজন আগাম প্রস্তুতি : বিশেষজ্ঞদের মতে, দুর্ভিক্ষ প্রতিরোধে প্রথমেই দরকার শক্তিশালী আগাম সতর্কীকরণ ব্যবস্থা। খরা ও ফসলহানির পূর্বাভাস পাওয়া গেলে আগেভাগে খাদ্য মজুত, কৃষিঋণ, বীজ ও সেচের ব্যবস্থা করা সম্ভব। একই সঙ্গে দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য নগদ সহায়তা, খাদ্য বিতরণ ও সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচি প্রস্তুত রাখতে হবে।
কৃষিতে বৃষ্টিনির্ভরতা কমাতে পানি সংরক্ষণ, কার্যকর সেচব্যবস্থা, খরাসহিষ্ণু ফসলের জাত এবং ফসলের বৈচিত্র্য বাড়ানো জরুরি। খাদ্য পরিবহন ও সংরক্ষণের অবকাঠামো উন্নত করা গেলে উৎপাদন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও এক অঞ্চল থেকে অন্য অঞ্চলে খাদ্য সরবরাহ করা সহজ হবে।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো, দুর্যোগের সময় খাদ্যের ন্যায্য বণ্টন নিশ্চিত করা। বাজারে খাদ্য থাকলেও দরিদ্র মানুষের কেনার সামর্থ্য না থাকলে ক্ষুধা দূর হবে না। তাই খাদ্যের দাম নিয়ন্ত্রণে কার্যকর পদক্ষেপ, স্বচ্ছ মজুতব্যবস্থা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী জরুরি আমদানির সুযোগ রাখতে হবে।
১৮৭০-এর দশকের মহাদুর্ভিক্ষ দেখিয়েছে, প্রাকৃতিক বিপর্যয়কে ভয়াবহ মানবিক দুর্যোগে পরিণত করতে প্রশাসনিক ব্যর্থতা ও বৈষম্য বড় ভূমিকা রাখতে পারে। আজ বিজ্ঞান অনেক এগিয়েছে, যোগাযোগব্যবস্থা উন্নত হয়েছে এবং আন্তর্জাতিক সহায়তার সুযোগও রয়েছে। এসব সুবিধা কাজে লাগিয়ে আগাম প্রস্তুতি ও ন্যায্য খাদ্যবণ্টন নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতের শক্তিশালী এল নিনোর প্রভাব মোকাবিলা করা সম্ভব।
