টিফিনের ফাঁকে কেউ ব্যস্ত গল্পে, কেউবা তপ্তরোদে মাঠে খেলায় মগ্ন। কেউ আবার ভিড় করেছে ঝাল মুড়ির দোকানে। টিফিনের ঘণ্টা বাজতেই এমন দৃশ্য দেখা গেল রংপুরের পীরগাছা উপজেলার একটি বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের। যেন স্বাভাবিক ছন্দে সবকিছু করছেন শিক্ষার্থীরা। এরই মধ্যে কয়েকজন শিক্ষার্থী দৌঁড়ে গিয়ে টিউবওয়েলের পানি দিয়ে হাত-মুখ পরিষ্কার করল। অথচ পাশেই ছিল উন্নতমানের ‘অকার্যকর ওয়াশব্লক’।
শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেল, করোনার তীব্রতার সময় ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পুনরায় খোলার পর সংক্রমণ ঠেকাতে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে বিভিন্ন প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছিল। তখন স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখার জন্য ওয়াশ ব্লক তৈরির মাধ্যমে (WASH- Water, Sanitation and Hygiene) হাত ধোয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছিল। কিন্তু মহামারির পর আবার আগের অবস্থায় ফেরাতে এখন সেই ওয়াশ ব্লকটি ব্যবহার করা হচ্ছে না। এর কারণ, সাবান-পানির ব্যবস্থা না থাকাসহ সংস্কারের অভাব। ফলে ওয়াশ ব্লকটি এখন অকার্যকর অবস্থায় পড়ে আছে।
এটি শুধু পীরগাছা উপজেলার কান্দিরহাট হাই স্কুল এণ্ড কলেজের চিত্র নয়। উপজেলার অধিকাংশ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সরকারি, বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ওয়াশ ব্লকে পানির সংযোগ বিচ্ছিন্ন, নয়তো বেসিন ভাঙা বা সাবান-পানির ব্যবস্থা না থাকায় পুরো পরিস্থিতি আবার আগের অস্বাস্থ্যকর অবস্থায় ফিরে গেছে।
সম্প্রতি ঢাকা পোস্টের প্রতিবেদকের সঙ্গে এ নিয়ে কথা হলে কান্দিরহাট হাই স্কুল এণ্ড কলেজের সহকারী শিক্ষক আমিনুল ইসলাম জুয়েল বলেন, করোনাকালে সংক্রমণ রোধ ও স্বাস্থ্য সুরক্ষায় যে ‘ওয়াশ ব্লক’ (হাত ধোয়ার আধুনিক বেসিন ও স্যানিটেশন ব্যবস্থা) চালুর জরুরি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। তখন সবাই সংক্রমিত হওয়ার ঝুঁকি এড়াতে সাবান-পানি ব্যবহার করে স্কুল-কলেজের বাইরেও যেখানে ওয়াশ ব্লক পেয়েছে সেখানেই ভালোভাবে হাত ধুয়ে পরিষ্কার থাকার চেষ্টা করেছে। কিন্তু মহামারি-পরবর্তী সময়ে এখন এটি যেন শুধুই গল্প।

তিনি বলেন, রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে উপজেলার বেশিরভাগ ওয়াশ ব্লকই এখন অকেজো হয়ে পড়েছে। শুধু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানই নয় বরং সবখানে ওয়াশ ব্লক ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণে বড় ধরনের স্থবিরতা ও অবনতি হয়েছে। এর জন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাবকে দুষছেন তিনি।
মহামারির ধাক্কা সামলে যেভাবে পরিবর্তন এসেছে
করোনাকালে শিক্ষার্থীদের মাঝে যেভাবে বাধ্যতামূলক হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা হয়েছিল, পরিস্থিতি স্বাভাবিক হওয়ার পর সেই সচেতনতামূলক কার্যক্রমে শিথিলতা এসেছে। শিক্ষক এবং অভিভাবক—উভয় পক্ষ থেকেই স্বাস্থ্যবিধি বজায় রাখার ব্যাপারে আগের মতো কড়াকড়ি নেই।
মহামারির ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর জরুরি স্বাস্থ্যবিধি উদ্যোগগুলো মুখ থুবড়ে পড়ার পেছনে প্রধানত কয়েকটি কারণ ও বর্তমান বাস্তবতা লক্ষণীয়। বিশেষ কওে তদারকি ও জবাবদিহিতার অভাব, বাজেট ও রক্ষণাবেক্ষণ সংকট, অভ্যাসের ধারাবাহিকতা না থাকা এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা সংশ্লিষ্ট নির্মাণাধীন প্রকল্পের ধীরগতি।
সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়গুলোতে ওয়াশ ব্লক বা বেসিন সংস্কার এবং নিয়মিত সাবান-হ্যান্ডওয়াশ কেনার জন্য স্থায়ী কোনো ফান্ডের অভাব রয়েছে। ফলে ছোটখাটো ত্রুটি (যেমন: ট্যাপ নষ্ট হওয়া, পাইপ ফেটে যাওয়া) দেখা দিলেও তা আর মেরামত করা হয় না। অনেক বিদ্যালয়ে সরকারিভাবে স্থায়ী ওয়াশ ব্লক নির্মাণের প্রকল্প হাতে নেওয়া হলেও বছরের পর বছর ধরে তা ঝুলে আছে। আবার কোথাও তৈরি করার আর সেভাবে ব্যবহার করা হয়নি। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, মহামারির ধাক্কা সামলে ওঠার পর মানুষ স্বাভাবিক জীবনযাপনে ফেরার ফলে স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনের অভ্যাসে এখন প্রতিনিয়ত পরিবর্তন হচ্ছে। একারণে এখন আর মুখে মস্ক পরা, হাত ধোয়া, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো বাধ্যবাধকতা নেই।
এ পরিস্থিতিতে শিক্ষার্থীদের সুন্দর ভবিষ্যত ও স্বাস্থ্যসুরক্ষায় বিদ্যালয়গুলোতে পুনরায় স্বাস্থ্যকর পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে সরকারি অনুদানের পাশাপাশি স্থানীয় উদ্যোগে প্রয়োজন। একইসঙ্গে শিক্ষার্থীদের সংক্রামক রোগ থেকে দূরে রাখতে নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস বজায় রাখার ওপর প্রাতিষ্ঠানিক জোর দেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সচেতন শিক্ষক ও অভিভাবকগণ।

এ ব্যাপারে রংপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রাক্তন শিক্ষক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, মহামারির ধাক্কা সামলে ওঠার পর বিদ্যালয়গুলোতে অপরিচ্ছন্ন টয়লেট দৈনিক জীবাণুমুক্ত করার সেই কড়াকড়ি এখন আর নেই। ফলে টয়লেটগুলো আগের মতোই অস্বাস্থ্যকর ও অপরিচ্ছন্ন অবস্থায় ফিরে গেছে। তা ছাড়া করোনাকালে তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা অনেক অস্থায়ী ওয়াশ স্টেশন এখন ভেঙে পড়েছে বা পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে।
তিনি আরও বলেন, মহামারির সময় আলাদা ব্লকের ওপর জোর দেওয়া হলেও, বর্তমানে অনেক প্রাথমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ছাত্র-ছাত্রীদের আলাদা কোনো ওয়াশব্লক নেই, যা শিক্ষার্থীদের বিশেষ করে ছাত্রীদের জন্য চরম অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনেক শিক্ষার্থীই অজানা ‘ওয়াশ ব্লক’ কী,
বিভাগীয় মহানগরী রংপুরসহ এর আশপাশের বিভিন্ন উপজেলায় অন্তত অর্ধশত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শতাধিকের বেশি শিক্ষার্থীর কাছে জানতে চাওয়া হয়েছিল ‘ওয়াশ ব্লক ব্যবহার করা হয় কিনা’। এর জবাবে কেউ চুপচাপ ছিল, আবার কারো এ প্রশ্ন ছিল বিস্ময়ের। তবে উন্নত স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীদের কেউ কেউ বলতে পারলেও গ্রামে পড়ুয়া শিক্ষার্থীদের বেশির ভাগের কাছেই ওয়াশ ব্লক অচেনা, এমনকি স্বাস্থ্যসুরক্ষা সম্পর্কেও উদাসীন।
মিঠাপুকুর সরকারি মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিপড়ুয়া এক শিক্ষার্থী নাম না প্রকাশের শর্তে বলে, আমাদের স্কুলে করোনাকালে ওয়াশব্লক যে ছিল, এটা আমি জানতাম না আজই প্রথম শুনলাম। আমরা যে টয়লেট ব্যবহার করি সেটা অবস্থা ভীষণ খারাপ। সেখানে পর্যাপ্ত পানি থাকে না। প্রস্রাব-পায়খানা করার পর জীবাণুমুক্ত হতে সাবান কিংবা হ্যান্ডওয়াশ ব্যবহারের ব্যবস্থাও নেই। স্কুল এসে খাবার আগে-পরে হাত ধোয়ার প্রয়োজন হলে টিউবওয়েল ছাড়া উপায় নেই। আর যে ওয়াশব্লক করোনাকালে তৈরি করা হয়েছিল সেটাতে এখন পানির ট্যাপ, সাবান এমনকি পানি সরবরাহের সংযোগটিও নেই। পুরোপুরি অচল অবস্থায় পড়ে আছে।
নগরীর শাপলা চত্বর কলেজ রোডে আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায় শিক্ষার্থীদের অনেকেই টিউবওয়েল এবং ওযুখানার ট্যাপের পানি ব্যবহার করছে। তাদের মধ্যে নিঃশ্বাস নামে এক শিক্ষার্থীর সঙ্গে কথা হলে সে বলে, ওয়াশ ব্লক দেখেনি, এটা কি তাও জানি না।

বিদ্যালয়টির প্রধান শিক্ষক মো. রহমত আলম ঢাকা পোস্টকে বলেন, সম্প্রতি নতুন ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। পুরোনো অবকাঠামো এখন আর নেই, একারণে ওয়াশব্লক ছিল কিনা অনেক শিক্ষার্থীই তা জানে না। তবে এখন উন্নতমানের ওয়াশ ব্লক না থাকলেও ওযুখানার পাশাপাশি টিউবওয়েলে হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। আমরা শিক্ষার্থীদেরকে স্বাস্থ্যসুরক্ষার ব্যাপারে সচেতন করার চেষ্টা করে থাকি। তবে করোনা মহামারির ধাক্কা কেটে যাওয়ার পর জরুরি স্বাস্থ্যবিধি উদ্যোগগুলো মুখ থুবড়ে পড়ায় এখন কারো মধ্যে সংক্রমিত হবার সেই ভয়ভীতি নেই।
শহর-গ্রাম সবখানেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে প্রাথমিকের শিশুরা
করোনাকালের স্বাস্থ্যবিধি প্রতিপালনে এখন আর মাস্ক পরা, স্যানিটাইজার ব্যবহার এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার মতো কড়াকড়ি নিয়মগুলো এখন আর দেখা যায় না বললেই চলে। এ কারণে শিশু শিক্ষার্থীদেও মধ্যে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার তেমন বালাইও নেই। শহর-গ্রাম সবখানেই স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে প্রাথমিকের শিশুরা। বিশেষ করে বিদ্যালয়ে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার না করা, নিয়মিত ভালোভাবে হাত না ধোয়াসহ স্কুল ফিডিংয়ের খাবার গ্রহণের আগে ও পরে সাবান দিয়ে হাত পরিষ্কার না করায় প্রতিনিয়ত উঁকি দিচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি।
গাইবান্ধার প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোর দুর্বল স্যানিটেশন ব্যবস্থার কারণে চরম স্বাস্থ্যঝুঁকিতে রয়েছে শিশুরা। জেলার শহর ও গ্রামের ১ হাজার ৪৬৬টি বিদ্যালয়ে বিশেষ করে শিক্ষার্থীদের স্যানিটেশন ব্যবস্থা অত্যন্ত নাজুক এবং চরম উদ্বেগজনক। বিদ্যালয়ের টয়লেট ও ওয়াশব্লকগুলোর সিংহভাগই স্বাস্থ্য সম্মত নয়। এ ছাড়া এসবের বড় একটি অংশ একেবারেই ব্যবহার অনুপযোগী। আবার এমনও স্কুল রয়েছে যেখানে পাকা টয়লেটই নেই!
সরেজমিনে গাইবান্ধা পৌর শহরের পশ্চিম গোবিন্দপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দেখা যায়, শিশুদের জন্য টয়লেট ও প্রস্রাবখানা থাকলেও সেখানে ময়লার ছড়াছড়ি। প্রচণ্ড দুর্গন্ধে প্রবেশ করায় দায়। কমট থেকে শুরু করে কড়িডোর-সর্বত্রই ব্যবহারের অনুপযোগী। নেই স্যান্ডেল, সাবান, ভেঙে আছে সাবান রাখার পাত্র। সবগুলোতে বদনাও নেই। বেসিনে হাত ধোঁয়ার দুটি ট্যাপের একটি ট্যাপ নষ্ট। চোখে পড়েনি পরিষ্কার করার কোনো ধরণের উপকরণ।
একই চিত্র দেখা গেছে রংপুর নগরীর আলমনগর স্টেশন রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। সেখানে ওয়াশ ব্লক থাকলেও সেটি পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে। শিশু শিক্ষার্থীদের পানি পান থেকে শুরু করে হাত ধোয়ায় একমাত্র ভরসা টিউবওয়েল। এখানকার টয়টেলের অবস্থাও খুব একটা স্বাস্থ্যসম্মত নয়। এমনকি দুপুরে স্কুল ফিডিংয়ের খাবার খাওয়ার আগে ও পরে শিক্ষার্থীদের হাত ধুতে দেওয়া যায়নি।
এ ছাড়া গাইবান্ধার পূর্ব রাধাকৃষ্ণপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাকা টয়লেট নেই। ছাত্ররা যেখানে-সেখানে প্রস্রাব করছে। মাঠের মাঝ বরাবার কিনারায় ছোট্ট একটি টিনের টয়লেট স্থাপন করা হয়েছে। যেটাতে নেই স্যান্ডেল-সাবান, এমনকি পর্যাপ্ত পানিও নেই। বালতিতে করে রাখা হয়েছে পানি। এই স্কুলেও জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া ট্যাপ-বেসিন পরিত্যক্ত অবস্থায় রয়েছে।

আলমনগর স্টেশন রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিশু শিক্ষার্থী আব্দুল্লাহ্, মুসা, আফিয়া ও অনিক ঢাকা পোস্টকে জানায়, তারা টিউবওয়েলের পানি পান করে। ওয়াশ ব্লক আছে কিন্তু সেটি ব্যবহার করা হয় না। খাবার আগে ও পরে নিয়মিত হাত পরিষ্কার করতে শিক্ষকরা বললেও অনেকে তা করে না।
হাত ধোয়ার অভ্যাস ভুলে বাড়ছে সংক্রমণ ঝুঁকি
হাত ধোয়ার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়টিকে হালকাভাবে নেয়ার পাশাপাশি স্বাস্থ্যসুরক্ষায় সচেতনতার অভাবে শিশুদের মধ্যে ডায়রিয়া, সর্দি, কাশিসহ বিভিন্ন জীবাণুবাহিত রোগের সংক্রমণ ঝুঁকি বাড়ছে। শিক্ষার্থীদের নিয়মিত তদারকি না করার কারণে হাত ধোয়ার অভ্যাসটি ঝিমিয়ে পড়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে রক্ষণাবেক্ষণের অভাব, সাবানের অপর্যাপ্ততা ও শিক্ষকদের অনীহার কারণে বিষয়টি এখন অনেকটাই গুরুত্বহীন।
কুড়িগ্রামের চিলমারী উপজেলার থানাহাট পাইলট বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ের সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী শাকিরা জাহান সায়মা ঢাকা পোস্টকে বলে, আমাদের স্কুলে ওয়াশ ব্লক আছে। কিন্তু করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা কমে যাওয়ার পর এখন আর কেউ আগের মতো হাত ধোয়ার জন্য বলাবলি করে না। ফলে টিফিনের আগে বা খেলাধুলার পর হাত ধোয়ার যে অভ্যাস ছিল সেটার প্রতি অনীহা তৈরি হয়েছে।
কুড়িগ্রামের এক স্কুল শিক্ষাথীর অভিভাবক আসাদুল ইসলাম বলেন, আমাদের শহরের স্কুলগুলোতে হাত ধোয়ার অভ্যাস তেমন একটা চোখে পড়ে না। মানুষকে সচেতন হতে হবে। হাত ধোয়ার অভ্যাস ভুলে যাওয়ায় অপরিষ্কার হাত দিয়ে চোখ, নাক বা মুখ স্পর্শ করার মাধ্যমে যে কোনো সংক্রামক জীবাণু সহজেই শিশুদের শরীরে প্রবেশ করে। তাই হাত ধোয়ার এই উদাসীনতা সামগ্রিক জনস্বাস্থ্যকে এক বড় ঝুঁকিতে ফেলছে।
রংপুরের আলমনগর স্টেশন রোড সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোছা. ঘনুফা খাতুন ঢাকা পোস্টকে বলেন, করোনাকালে নিয়মিত সাবান ও স্যানিটাইজার সরবরাহ করা হলেও, বর্তমানে বহু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়ার বেসিনগুলোতে সাবান থাকে না, অনেক ক্ষেত্রে পানির সংযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে গেছে। এটা শুধু আমাদের বিদ্যালয়ে নয়, সবখানে প্রায় একই অবস্থা। আমরা শিক্ষার্থীদের খাবার দেওয়ার আগে ও পরে হাত ধোয়ার জন্য বলে থাকি কিন্তু বাড়ি থেকে এই অভ্যাস গড়ে না ওঠায় অনেকে সেটা করে না।
হাত ধোয়ার বেসিন আছে সাবান নেই
পঞ্চগড় সদর ও বোদা উপজেলার ছয়টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় ঘুরে পাঁচটি বিদ্যালয়ে সাবানের সংকট কিংবা হাত ধোয়ার ব্যবস্থা অকার্যকর থাকার চিত্র নজরে পড়ে। তবে ব্যতিক্রম ময়দানদিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। সেখানে বেসিনে সাবান রয়েছে। শিক্ষার্থীরাও জানিয়েছে, তারা নিয়মিত সাবান পায়।
শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত পঞ্চগড়-২ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, হাত ধোয়ার বেসিনে সাবান নেই। বিদ্যালয়ের শৌচাগারেও পাওয়া যায়নি সাবান। চতুর্থ শ্রেণির শিক্ষার্থী সিমি ও রাইয়ান জানায়, হাত ধোয়ার সময় তারা সাবান পায় না।

বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ঝর্ণা ইয়াসমিন বলেন, খাবার খাওয়ার আগে সাবান দিয়ে হাত ধোয়া জরুরি। এ কারণে নিয়মিত সাবান দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বাইরের লোকজনের যাতায়াতের কারণে সাবান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে।
সদর উপজেলার ডোকরোপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে করোনাকালে দুটি হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করা হয়েছিল। এখন সেই বেসিন দুটি বন্ধ রাখা হয়েছে। বিদ্যালয়ের বারান্দায় থাকা আরেকটি বেসিনে নেই সাবান।
একই চিত্র নীলফামারী জেলাতেও। সেখানে জনস্বাস্থ্য কার্যালয়ের অধীনে ২০২১-২২ অর্থবছরে কমিউনিটি ক্লিনিক, হাসপাতাল, বিদ্যালয়সহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ৩০টি হাত ধোয়ার বেসিন বসানো হয়। তবে সেসময়ে কিছুদিন এসব ব্যবহার করা হলেও এখন আছে পরিত্যক্ত অবস্থায়।
কিশোরগঞ্জ উপজেলার কিশোরীগঞ্জ বহুমুখী মডেল উচ্চ বিদ্যালয়ে সেসময়ে একটি বেসিন বসানো হয়েছে। পানি সরবরাহ সংকট, কর্তৃপক্ষের দায়িত্বহীনতা ও মানুষের ব্যবহার আগ্রহ না থাকায় এখন পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে আছে বেসিনটি।
নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আলিম ইসলাম বলেন, বেসেনটি দীর্ঘসময় ধরে পরিত্যক্ত আছে। আমরা টিফিনের সময়ে ভাত খেয়ে বাহিরে গিয়ে হাত ধুয়ে থাকি।
লালমনিরহাটে শহর ও গ্রামাঞ্চলের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে করোনাকালের স্বাস্থ্য সচেতনতার প্রবণতা নেই বললেই চলে। অধিকাংশ ওয়াশব্লক এখন আর সচল নেই। বর্তমানে বেশির ভাগ প্রতিষ্ঠানে শৌচাগারের পাশে থাকা বেসিনেই শিক্ষার্থীদের হাত ধোয়ার ব্যবস্থা রয়েছে। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে সেই বেসিনও রয়েছে পরিত্যক্ত অবস্থায়, সেখানে নিয়মিত সাবান ও পানির সরবরাহ কতটা নিশ্চিত, তা নিয়ে রয়েছে প্রশ্ন।
শহরে হাত ধোয়ার চর্চা, গ্রামে অনীহা-অবহেলা
ঠাকুরগাঁওয়ের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে করোনাকালে নির্মাণ করা হয় হাত ধোয়ার বেসিন ও ওয়াশ ব্লক। তবে মহামারি-পরবর্তী এসব উদ্যোগের ধারাবাহিকতায় দেখা যাচ্ছে ভিন্নতা। শহরাঞ্চলের কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হাত ধোয়া ও পরিচ্ছন্নতার কার্যক্রম চালু থাকলেও গ্রামে বেশিরভাগ বিদ্যালয়ে নষ্ট হচ্ছে বেসিন ও পানির ট্যাপ। কোথাও আবার সাবান-পানির অভাবে ব্যহত হচ্ছে হাত ধোয়ার অভ্যাস। আবার কোথাও অবকাঠামো থাকা সত্ত্বেও শিক্ষার্থীদের একটি অংশ হাত না ধুয়েই শ্রেণিকক্ষে ফিরছে। ফলে করোনাকালে তৈরি করা স্বাস্থ্যসচেতনতার উদ্যোগ কতটা টেকসই হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।

স্থানীয় একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী মাহিন বলে, আমাদের বিদ্যালয়ে হাত ধোয়ার জন্য বেসিন আছে। তবে মাঝে মাঝে বেসিনের পানির ট্যাপ নষ্ট হয়ে যায়। তখন ঠিকমতো হাত ধোয়া যায় না। স্যাররা আমাদেরকে নিয়মিত হাত ধোয়ার কথা বললেও অনেক শিক্ষার্থী তা মেনে চলে না।
শহর থেকে একটু দূরে গ্রামাঞ্চলের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী তাবাসসুম বলে, আগের তুলনায় এখন বিদ্যালয়ে হাত ধোয়া কম হয়। অনেক সময় বেসিনে সাবান ও পানি পাওয়া যায় না। তখন হাত ধোয়ার ইচ্ছা থাকলেও তা সম্ভব হয় না।
হাত ধোয়া কেবল অভ্যাস নয়, রোগ থেকে বাঁচার সহজ হাতিয়ার
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাবান ও পরিষ্কার পানি দিয়ে সঠিকভাবে হাত ধোয়া সংক্রমণ প্রতিরোধের অন্যতম কার্যকর উপায়। পাশাপাশি স্বাস্থ্য সুরক্ষায় করোনাকালীন সচেতনতা ধরে রাখার পাশাপাশি শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নিয়মিত হাত ধোয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা জরুরি। খাবার তৈরির আগে ও খাওয়ার আগে, টয়লেট ব্যবহারের পর এবং ময়লা স্পর্শ করার পর সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার অভ্যাস ব্যক্তিগত ও পারিবারিক স্বাস্থ্য সুরক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কুড়িগ্রাম সিভিল সার্জন ডা. স্বপন কুমার বিশ্বাস জানান, হাত ধোয়া কেবল একটি সাধারণ অভ্যাস নয়, এটি অনেক প্রাণঘাতী রোগ থেকে বাঁচার সবচেয়ে সহজ ও সাশ্রয়ী হাতিয়ার। ডেঙ্গু ও হাম-রুবেলার এই ভয়াবহ সময়ে শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে হলে হাত ধোয়ার অভ্যাসকে আবার ফিরিয়ে আনতেই হবে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে সুস্থ রাখতে এখনই সরকার, শিক্ষক ও অভিভাবকদের সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করা জরুরি।
জনস্বাস্থ্যের খোঁজ নেই, শিক্ষা অফিসে নেই সঠিক পরিসংখ্যান
গাইবান্ধা জেলায় ১৪৬৬টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের কতটিতে ওয়াশ ব্লক রয়েছে জানাতে পারেনি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস। তবে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অফিস সূত্র জানিয়েছে, দপ্তরটি পিইডিপি-৪ প্রকল্পের আওতায় ৬৫৭ এবং জিপিএস প্রকল্পের আওতায় ২১২টিসহ জেলায় মোট ৮৬৯টি বিদ্যালয়ে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ করেছে। এ ছাড়া এ দুই প্রকল্পের আওতায় ৪৫৩টি বিদ্যালয়ে হাত ধোয়ার বেসিন স্থাপন করেছে দপ্তরটি।
রংপুর বিভাগের অন্য জেলাগুলোতে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসে নেই ‘ওয়াশ ব্লক সংরক্ষণ ও হাত ধোয়ার তদারকি’-সংক্রান্ত সঠিক তথ্য। আর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর বলছে, প্রকল্প অনুযায়ী ওয়াশ ব্লক বা টয়লেট নির্মাণ করে হস্তান্তর করা পর্যন্ত তাদের দায়িত্ব। এরপর শিক্ষা অফিসসহ সংশ্লিষ্টদের দায়িত্ব এসবের তদারকি করা।
তবে শিক্ষা ও জনস্বাস্থ্য সংশ্লিষ্ট সরকারি কোনো প্রতিষ্ঠানের কাছেই নেই হাত ধোয়ার সুবিধার ওপর জরিপ, সাধারণ কোনো পরিসংখ্যান। পানি ও সাবানের নিয়মিত সরবরাহ নিশ্চিত না করা, অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণের জন্য কোনো বরাদ্দ বা নির্দেশনা না থাকার পাশাপাশি সুবিধা অকার্যকর ওয়াশ ব্লকগুলো সচল করতে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়া নিয়ে সংশ্লিষ্টদের ভূমিকা অনেকটা দায়সাড়া।

জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর রংপুরের নির্বাহী প্রকৌশলী পঙ্কজ কুমার সাহা ঢাকা পোস্টকে জানান, রংপুর মহানগরসহ জেলার অন্তত ৩০৪টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়াশ ব্লক নির্মাণ এবং ১৩৩টিতে বিশেষ নলকূপ স্থাপন করা হয়। এ ছাড়া গুরুত্বপূর্ণ সরকারি অফিস, হাটবাজার, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং জনবহুল এলাকাতে করোনাকালে ১৭টি হ্যান্ডওয়াশ বেসিন নির্মাণ করা হয়েছিল। বর্তমানে এসব কি অবস্থায় রয়েছে এবং ব্যবহার উপযোগী কিনা, তা জানা নেই বলেও জানিয়েছে এই কর্মকর্তা।
হাত ধোয়ার সুবিধা জানেন না শিক্ষা কর্মকর্তারা
প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার নিশ্চিত করা এবং হাত ধোয়ার সুবিধা নিয়ে কোনো জরিপ হয়েছে কিনা—এ বিষয়ে জানতে চাইলে রংপুর জেলা শিক্ষা প্রাথমিক কর্মকর্তা এ এম শাহজাহান সিদ্দিক ঢাকা পোস্টকে বলেন, আমরা মূলত কাজ করি লেখাপড়া নিয়ে, সেটাই ঠিক মতো করতে পারছি না। হাত ধোয়া নিয়ে ওইভাবে আমাদের কাজ করার সুযোগ নেই। আমরা খোঁজখবর রাখি কিন্তু হাত ধোয়ার সুবিধা আছে কিনা এমন বিষয়ে জরিপ বা পরিসংখ্যান নেই। তবে যেসব ওয়াশ ব্লক কিংবা টয়লেট ব্যবহার উপযোগী নয় সংস্কার করা দরকার, সেগুলোর তালিকা পেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, ওয়াশ ব্লকে ছোট যেসব সমস্যা হয়, সেগুলো বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটিই সমাধান করে। তা ছাড়া বিদ্যালয়ের আনুসাঙ্গিক ফান্ড থেকেও হ্যান্ডওয়াশ, সাবানসহ অন্যান্য জিনিসপত্র কেনা হয়ে থাকে। কমবেশি আমাদের সব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে টয়লেট রয়েছে। কোথাও কোথাও একাধিক টয়লেটও রয়েছে। তবে সরকারিভাবে ৫০৮টি ওয়াশব্লক তৈরি করা হয়েছিল। এর বাইরে যেসব রয়েছে তার সঠিক সংখ্যা জানা নেই। কারণ সরকারি, বেসরকারি এবং ব্যক্তি উদ্যোগে করোনাকালে অনেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ওয়াশব্লক তৈরি করা হয়েছিল। পরবর্তীতে যথাযথ সংরক্ষণ ও তদারকি না হওয়ায় এখন অধিকাংশ ওয়াশ ব্লকই ব্যবহার হচ্ছে না।
রংপুর জেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এনায়েত হোসেন ঢাকা পোস্টকে বলেন, জেলায় স্কুল ও মাদ্রাসা মিলে অন্তত ৭৭১টি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান রয়েছে। করোনাকালে সরকারি-বেসরকারি উদ্যোগে এসবের যতগুলোতে ওয়াশব্লক তৈরি করা হয়েছিল, তার বেশির ভাগই এখন অচল। তবে কতগুলো ভালো আছে কিংবা ব্যবহার উপযোগী রয়েছে এর সঠিক পরিসংখ্যান কাছে নেই। অনেক স্কুলে ওয়াশ ব্লকের পানির সংযোগ নষ্ট, কোথাও সাবান আছে আবার নেই। কোথাও কোথাও পানির ট্যাপ পর্যন্ত চুরি হয়ে গেছে। বেশির ভাগই অপরিষ্কার-অপরিচ্ছন্ন, বলতে গেলে স্বাস্থ্যসম্মত অবস্থায় নেই। এসব চালু করতে সংস্কার করা দরকার। এর জন্য বরাদ্দের প্রয়োজন রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বেশির ভাগ ওয়াশ ব্লক শিক্ষার্থীরাই নষ্ট করে ফেলেছে। তবে সব জায়গাতেই পানির ব্যবস্থা রয়েছে। স্বাস্থ্যসম্মত টয়লেট ব্যবহার, ভালোভাবে হাত ধোয়া, সাবান ব্যবহার করাসহ স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলার ব্যাপারে শিক্ষার্থীদের উৎসাহিত ও সচেতন করতে শিক্ষকদের শ্রেণিকক্ষে আলোচনা করার ব্যাপারে আমাদের নিদের্শনা দেয়া রয়েছে।
প্রতিবেদনটি তৈরিতে সহযোগিতা করেছেন মাসুম বিল্লাহ (গাইবান্ধা), নুর হাসান (পঞ্চগড়), মমিনুল বাবু (কুড়িগ্রাম), মুরাদ মুর্শিদ (লালমনিরহাট), শাহজাহান লেলিন (নীলফামারী) ও রেদওয়ান মিলন (ঠাকুরগাঁও)।
এএমকে
