একটা সময় গান রেকর্ড করার ভালো মাইক্রোফোন ছিল না। ছাদের ওপর সাধারণ অ্যান্ড্রয়েড ফোনে সংগীতের অনিশ্চিত পথে যাত্রা শুরু করা ‘কুঁড়েঘর’, এখন পেরিয়েছে এক দশক। হয়েছে নিজস্ব স্টুডিও। দেশ-বিদেশে করা হয়েছে প্রায় পাঁচ শতাধিক শো। মফস্বল থেকে উঠে আসা তাসরিফ খান-এর এসব প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তির গল্প বলেছেন দৈনিক খবরের কাগজকে। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন আরফান হোসাইন রাফি
সংগীতযাত্রার এক দশক পূর্ণ হয়েছে। এই যাত্রার দিকে ফিরে তাকালে কেমন লাগে?
অদ্ভুত একটা অনুভূতি! কারণ, আমরা যখন জার্নিটা শুরু করেছি, তখন আমাদের কিছুই ছিল না। না ফিন্যান্সিয়ালি স্টেবল ছিলাম, না আমাদের একটা রেকর্ড করার ভালো মাইক্রোফোন ছিল, না একটা ভালো ডিভাইস ছিল ভিডিও করার! একটা অ্যান্ড্রয়েড ফোন, ছাদে খালি পায়ে বসে গান করা আর ১২০০ টাকার সাউন্ড বক্স নিয়েই শুরু হয়েছিল এই যাত্রা। শুরুর দিকে স্টেজে উঠে মাইক্রোফোন কীভাবে ব্যালেন্স করতে হয়, সেটাও ঠিকমতো বুঝতাম না। এর মধ্যেই কনসার্ট, রেডিও ও টেলিভিশনের অনুষ্ঠান শুরু হয়ে যায়। আজ আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের নিজস্ব স্টুডিও আছে, দেশে-বিদেশে মিলিয়ে পাঁচ শতাধিক শো করে ফেলেছি। সব মিলিয়ে যাত্রাটা রোমাঞ্চকর রোলার কোস্টার রাইডের মতো। এই উত্থান, এই পতন, কোনো কোনো গান হিট হচ্ছে, কোনো কোনোটা হচ্ছে না।
কভার গান দিয়ে শুরু করলেও এখন মৌলিক গানে বেশি মনোযোগী। এই পরিবর্তনের পেছনে কী ছিল?
শুরুতে মানুষ আমাদের চিনত না। তাই ফোক, লালনগীতি ও হিন্দি ম্যাশআপের মাধ্যমে শ্রোতাদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করেছি। পরিকল্পনা ছিল, মানুষ আমাদের গান পছন্দ করলে মৌলিক গান করব। শ্রোতাদের সাড়া পাওয়ায় ‘আমার কাছে তুমি মানে’, ‘ময়নারে’ ও ‘ব্যাচেলর’-এর মতো মৌলিক গান নিয়ে কাজ শুরু করি।
এসব গানে প্রত্যাশা কতটা পূরণ হয়েছে?
আমরা বড় পরিকল্পনা করে সবকিছু প্রস্তুত হওয়ার অপেক্ষায় থাকিনি। শুরুতে বিনা পারিশ্রমিকে শো করেছি। প্রথম পারিশ্রমিক পেয়েছিলাম গাড়িভাড়া বাদে পাঁচ হাজার টাকা। পরে ধীরে ধীরে সরঞ্জাম উন্নত করেছি, মিউজিক ভিডিও বানিয়েছি। আমাদের প্রথম দিকের একটি ভিডিও হয়েছিল কোনো লাইট, মেকআপ বা শুটিং ইউনিট ছাড়াই, শুধু একটি ডিএসএলআর ক্যামেরা দিয়ে। এক ছোট ভাই বিনামূল্যে করে দিয়েছিল। আমার মনে হয়, আস্তে আস্তে শুরু করে দিলে একটা না একটা সময় লক্ষ্যে পৌঁছানো সম্ভব। আমরা এখনো লক্ষ্যে পৌঁছাইনি, আমরা সেই লক্ষ্যের পথেই হাঁটছি।
সাগরপাড় নিয়ে তুমুল জনপ্রিয় একটি গান আছে আপনার গাওয়া...
গানটি যখন আপলোড করছি, তখন বুঝিনি যে, এই পরিমাণ ব্লাস্ট করবে। এখন বলতে গেলে, যদি একটা গান দিয়ে কুঁড়েঘরকে পরিচয় করাতে হয়, তা হলে এটাই হবে ‘তাই তো আইলাম সাগরে’ গানটা। দেশের এমন কোনো প্রান্ত নাই, যেখানে আমি গিয়েছি আর এই গানটা কাউকে গাইতে বা আমাকে রিকোয়েস্ট করতে শুনি নাই।
গানটি কীভাবে তৈরি হয়েছিল?
এটা শীতকালে আমার রুমে একটা কাঁথার নিচে শুয়ে শুয়ে লেখা। গান লেখার ক্ষেত্রে আমি প্রেম করি কি না, ছ্যাঁকা খাইলাম কি না, এটা আসলে আমার কাছে ম্যাটার করে না। গান লেখার ক্ষেত্রে আমার কল্পনাশক্তি অনেক প্রখর, এটা আমার বিশ্বাস। আমি কল্পনা করছিলাম, আমার যদি ঢাকায় থাকতে ইচ্ছে না করে, আমার মন না বসে, আমার সাগরে যেতে ইচ্ছে করে, তখন আমার মাথায় লাইনগুলো আসে। তো আমি একটু একটু করে গানের সুর করছি আগে, লিখছি পরে। মাথায় সুরটা চলতেছিল, কী রকম সুর হতে পারে। আমার মন বসতেছে না, আমি কল্পনায় আমার সাগরে চলে গেছি-এমন একটা অনুভূতি থেকে মাথায় সুরটা আসে। তারপর সুরের সঙ্গে ১৫ থেকে ২০ মিনিট সময় নিয়ে ফোনের মধ্যে নোট করে করে পুরোটা লিখে ফেলছিলাম। এ গানটার একটা কাহিনি আমার মনে পড়ে। আমি যখন ‘সাগরপারে’ গানটা প্রায় লিখে ফেলছি, তখন কাঁথার নিচে শুয়ে শুয়ে একটু জোরে জোরে গাইতেছিলাম। আমার পাশে তানজিব শোয়া ছিল। ও বিরক্ত হয়ে গেছে যে আমি গুনগুন করে কী করতেছি! তো ও আমাকে একদম ধমক দিয়ে আমার বিছানা থেকে উঠায় অন্য রুমে পাঠাইয়া দিছে। ওই রুমে বসেও আমি গানটা কমপ্লিট করছি। কিন্তু একটা লাইনে আমি শুধু আটকে গেছিলাম। পরের দিন লাইনটা লিখছিলাম। লাইনটা ছিল, ‘এই যে পারতাম যদি থাইকা যাইতে এই সাগরের পারে’। তাইলে আমি আসলে কী করতাম, এই প্রশ্নের উত্তরটা মেলাতে পারছিলাম না। আমার একবার মনে হয়, মাঝি হইতাম। একবার মনে হয়, ব্যবসা করতাম। এমনকি এটাও মিলাইতে পারতেছিলাম না, গোসল করতাম কি না! তারপর আমার একটা ‘সারভাইভাল’ লাইন দরকার ছিল। এইটাই সারাদিন মাথায় ঘুরতেছিল। এমন কিছু একটা, যেটা প্রতীকী লাইন, যেটার সঙ্গে মানুষ নিজের মতো করে কানেক্ট করতে পারবে। তখন মনে হইছে, ‘ঝিনুকমালা গাঁইথা কাটায় দিতাম জীবনটারে’। তো সেভাবে করে ‘সাগরপারে’ গানটা শেষ করছি ।
বিভিন্ন ধরনের গান করছেন। নির্দিষ্ট কোনো ধারায় থিতু হওয়ার ইচ্ছা আছে?
না, একেবারেই ইচ্ছে নেই। একটি নির্দিষ্ট জনরায় আটকে থাকতে চাই না। ফোক, প্রেমের গান, আড্ডার গান থেকে রক– বিভিন্ন ধারায় কাজ করতে ভালো লাগে। ‘ব্যাচেলার’, ‘আমার কাছে তুমি মানে’ ও ‘রাজার রাজ্য সবাই গোলাম’ এক ধরনের গান নয়। সামনে ‘জীবনের চাকা’ নামে হার্ডকোর রক গানও আসছে।
এক দশকে কুঁড়েঘরের সবচেয়ে স্মরণীয় মুহূর্ত কোনটি?
কুঁড়েঘরের ইমোশনাল ব্যাপার অনেকগুলো। যেমন- প্রথম যখন আমরা ভারতের মাটিতে শো করতে যাই, ওখানকার একজন মন্ত্রীসহ সাংস্কৃতিক মন্ত্রণালয়ের অনেক সদস্য দাঁড়িয়ে হাত তালি দিচ্ছিলেন। এটা আমার জন্য একটা বিশাল সম্মানের মুহূর্ত। আমি আসলে কোনোদিন কল্পনাও করিনি যে, আমার মতো মফস্বল থেকে আসা একটা ছেলে, যে ঠিকমতো কোনোদিন গান শোনে নাই, গান শেখে নাই, তার গান শুনতে বুয়েট-ঢাকা মেডিকেলের মতো প্রতিষ্ঠানের (যেখানে দেশের সবচেয়ে মেধাবীরা পড়াশোনা করেন) ছাত্ররা আসবেন।
রবীন্দ্র সরোবরে কনসার্টটিকে কুঁড়েঘরের ঐতিহাসিক কনসার্ট হিসেবে অভিহিত করেন। এর কারণ কী?
রবীন্দ্র সরোবরে আমি আর জিসান খান শুভ গিয়েছিলাম। ও আমার ছোট ভাই। কুঁড়েঘর ব্যান্ডের একদম শুরুর দিকে, প্রথম তিন মাস ও আমাদের সঙ্গে ছিল। পরে ও আলাদা ব্যান্ড গঠন করে। েআমরা সেখানে গিয়ে দেখলাম, অনেকটা ফান্ডরেইজিংয়ের মতো একটি আয়োজন চলছে। অনেক মানুষ মোমবাতি জ্বালিয়ে গান গাইছিলেন। বড় একটি আসর বসেছিল। আয়োজকদের অনুমতি নিয়ে আমরা সেখানে বসেছিলাম। তারা গান গাইছিলেন, তাদের গানের বিরতিতে আমরা গিটার বাজিয়ে একটি গান গাইছিলাম। গাওয়ার সময় আমি চোখ বন্ধ করে ছিলাম। গান শেষ করে চোখ খুলে দেখি, আমাদের চারপাশে অনেক মানুষ জড়ো হয়েছেন। কিন্তু গানের শেষের দিকে আমার গিটারের তার ছিঁড়ে গিয়েছিল। তখন আমি আরেকজনের কাছে গিটার চাইলাম। সেখানে যারা আয়োজক দলের সদস্য ছিলেন, তাদের একজনের কাছে গিটার ছিল। তিনি একটু দূরে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি তার কাছে গিটার চেয়ে হাত বাড়াতেই তিনি পা দিয়ে আমার হাত সরিয়ে দিয়েছিলেন। ঘটনাটি আমাকে ভীষণ অপমানিত করেছিল। প্রচণ্ড কষ্ট পেয়েছিলাম। সেদিন সেখান থেকে চলে আসার সময় মনে মনে জেদ করেছিলাম, একদিন না একদিন ইনশাআল্লাহ, এই মঞ্চেই হাজার হাজার দর্শকের সামনে পারফর্ম করব।
আমার সেই স্বপ্ন পূরণ হতে প্রায় ১০ বছর লেগেছে। ২০১৬ সালে যে অভিজ্ঞতা হয়েছিল, ২০২৬ সালে এসে সেই একই মঞ্চে পারফর্ম করার সুযোগ পেয়েছি। অবশেষে রবীন্দ্র সরোবরে হাজার হাজার দর্শকের সামনে গান গাওয়ার স্বপ্ন পূরণ হয়েছে। তখন আমার মাথায় দুটি বিষয় কাজ করছিল। প্রথমত, এই মঞ্চে পারফর্ম করতে হবে। দ্বিতীয়ত, যেদিন আমাকে গিটার ধরতে দেওয়া হয়নি, সেদিনের কষ্টটা মনে ছিল। তাই ঠিক করেছিলাম, যেদিন এখানে পারফর্ম করব, সেদিন যে গিটার বাজিয়ে গান গাইব, সেই গিটারটি কোনো একজন দর্শককে উপহার দেব। এমন কাউকে, যিনি গান ভালোবাসেন কিংবা গিটার বাজাতে পারেন। সেদিন রবীন্দ্র সরোবরে পারফর্ম করার পর প্রথম গানটি গেয়েই আমি আমার গিটারটি একজন দর্শককে উপহার দিয়েছিলাম। সেই কারণেই কনসার্টটি আমার কাছে ঐতিহাসিক।
