আলবেনিয়ার রাজধানী তিরানায় টানা পঞ্চম দিনের মতো সরকারবিরোধী বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে দাঙ্গা পুলিশের সংঘর্ষ হয়েছে। শনিবার দিনভর চলা এ সংঘর্ষে দুই পক্ষের বহু মানুষ আহত হয়েছেন। এ ঘটনায় ৮০ জনের বিরুদ্ধে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির অভিযোগ আনা হয়েছে। এ ছাড়া শত শত মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে অথবা তাদের বিরুদ্ধে তদন্ত চলছে।
বার্তা সংস্থা বিবিসির প্রতিবেদনে বলা হয়, মুখোশ পরা বিক্ষোভকারীদের বড় একটি অংশ উচ্চমাধ্যমিক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী। তারা শিক্ষা মন্ত্রণালয় ভবন রক্ষায় নিয়োজিত পুলিশের দিকে পাথর ও পেট্রলবোমা ছুড়তে থাকেন। জবাবে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে। এ সময় প্রথমবারের মতো রাবার বুলেট ব্যবহারের খবরও পাওয়া গেছে।
বিক্ষোভকারীদের অনেকে কাঁদানে গ্যাসের প্রভাব থেকে বাঁচতে গ্যাস মাস্ক ও মুখোশ পরেছিলেন। তাদের সহায়তায় স্বেচ্ছাসেবকেরা চোখ ধোয়ার জন্য স্যালাইন সরবরাহ করেন। বিকেলের দিকে বিক্ষোভের কেন্দ্রস্থল হয়ে ওঠে শহরের প্রধান সড়কে অবস্থিত প্রধানমন্ত্রী এদি রামার কার্যালয়। সেখানে বিক্ষোভকারীর সংখ্যা আগের দিনগুলোর তুলনায় অনেক বেড়ে যায়।
পুলিশের দিকে একের পর এক পাথর ও আতশবাজি ছোড়েন বিক্ষোভকারীরা। পুলিশ পাল্টা কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এ সময় একটি গাড়িতে আগুন জ্বলতে দেখা যায়। পুলিশ ও অ্যাম্বুলেন্সের সাইরেনেও মুখর হয়ে ওঠে এলাকা। সন্ধ্যার দিকে দাঙ্গা পুলিশকে সহায়তা করতে বিশেষ বাহিনী মোতায়েন করা হয়।
দুর্নীতির অভিযোগ ঘিরে আন্দোলন
গ্রীষ্মের শুরুতে শুরু হওয়া এ বিক্ষোভ ধীরে ধীরে বৃহত্তর সরকারবিরোধী আন্দোলনে রূপ নিয়েছে। সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ তুলে প্রধানমন্ত্রী এদি রামার পদত্যাগ দাবি করছেন বিক্ষোভকারীরা।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া ১৯ বছর বয়সী চিকিৎসাবিজ্ঞানের শিক্ষার্থী জর্জ বলেন, তারা ১৩৫ দিন শান্তিপূর্ণভাবে আন্দোলন করেছেন। এখন ফ্রান্সের মতো আন্দোলনের মাধ্যমে পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন তারা। তার ভাষ্য, সরকার শান্তি চায় না বলেই বিক্ষোভকারীরা সহিংসতার পথে যাচ্ছেন।
তিরানার ১৭ বছর বয়সী বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থী ক্লেয়া বলেন, অধিকার আদায়ের দাবিতে শিক্ষার্থীরা ক্লাস বর্জন করে আন্দোলনে যোগ দিয়েছেন।
বিক্ষোভকারীরা বলছেন, তারা শুধু বর্তমান সরকার নয়, বরং পুরো দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক ব্যবস্থার পরিবর্তন চান। এ পরিস্থিতিতে সাংবাদিক ও পরিবর্তনের পক্ষে সক্রিয় কর্মী ওসমান স্তাফা এক বছরের জন্য নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের প্রস্তাব দিয়েছেন। তার মতে, ওই সরকার নতুন নির্বাচনের আয়োজন করতে পারে।
অভিযোগ অস্বীকার রামার
আলবেনিয়ার ক্ষমতাসীন সোশ্যালিস্ট পার্টির নেতা এদি রামা টানা ১৩ বছর ধরে দেশটির ক্ষমতায় রয়েছেন। শনিবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে তিনি দেশের অর্জনগুলো স্মরণ রাখার আহ্বান জানান। তার অভিযোগ, বিরোধী ডেমোক্রেটিক পার্টি এবং দেশের অগ্রযাত্রা থামিয়ে দিতে চাওয়া কিছু বিদেশি শক্তি বিক্ষোভে ভূমিকা রাখছে। তবে কোনো বিদেশি শক্তির নাম উল্লেখ করেননি তিনি।
আলবেনিয়ার ইউরোপীয় ইউনিয়নে (ইইউ) যোগদানের লক্ষ্য ২০৩০ সালের মধ্যে পূরণের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন রামা। দীর্ঘদিন ধরে ইউরোপীয় মহলে তার ভাবমূর্তি ছিল একজন সংস্কারপন্থী নেতা হিসেবে। তবে সাম্প্রতিক বিক্ষোভ ও দুর্নীতির তদন্ত সেই ভাবমূর্তিকে চাপে ফেলেছে।
২০১৯ সালে ইইউ ও যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে গঠিত বিশেষ কৌঁসুলি দপ্তরের তদন্তও রামার সরকারের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। সম্প্রতি দেশটির প্রভাবশালী গোয়েন্দাপ্রধান ভ্লোরা হাইসেনিকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে ব্যবসায়ী ও সাবেক সরকারি কর্মকর্তা এরগিস আগাসিকে বিচার এড়াতে সহায়তা করার অভিযোগ রয়েছে। আগাসি বর্তমানে গ্রেপ্তার রয়েছেন।
আগাসি তার আইনজীবীর মাধ্যমে অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এবং দুর্নীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা নেই বলে দাবি করেছেন। হাইসেনি কৌঁসুলিদের জানিয়েছেন, গোয়েন্দা সংস্থায় নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টা হিসেবে তিনি আগাসির সঙ্গে যোগাযোগ করেছিলেন।
আলবেনিয়ার কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের দাবি, আগাসি প্রধানমন্ত্রী রামা ও সংগঠিত অপরাধী চক্রগুলোর মধ্যে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছেন। রামা আগাসিকে চেনার কথা স্বীকার করলেও কোনো অবৈধ লেনদেন সম্পর্কে জানার কথা অস্বীকার করেছেন।
রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক লুৎফি দেরভিশির মতে, অতিরিক্ত ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করার কারণে রামা এখন জনগণের ক্ষোভের প্রধান লক্ষ্য হয়ে উঠেছেন।
আলবেনিয়ার ১৪০ আসনের সংসদে রামার সোশ্যালিস্ট পার্টির ৮৩টি আসন রয়েছে। দেশটিতে পরবর্তী সংসদ নির্বাচন ২০২৯ সালের আগে হওয়ার কথা নয়। ফলে চলমান বিক্ষোভ তার সরকারের ওপর কতটা প্রভাব ফেলবে, তা এখনো অনিশ্চিত।
