এবার শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল আর্জেন্টিনা
আর্জেন্টিনার প্রেসিডেন্ট হাভিয়ের মাইলেইয়ের কঠোর ব্যয় সংকোচন নীতির প্রতিবাদে ফুঁসে উঠেছেন দেশটির শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা। শিক্ষা খাতে বাজেট ছাঁটাই, বেতন ও বৃত্তির তীব্র সংকট এবং গবেষণার সুযোগ সংকুচিত হওয়ার প্রতিবাদে তারা রাজপথে নেমে এসেছেন। রাজধানী বুয়েনস এইরেসে বিক্ষোভ চলাকালে পুলিশের সঙ্গে রক্তক্ষয়ী সংঘর্ষে নিরাপত্তাকর্মীসহ বেশ কয়েকজন আহত হন। এই ঘটনায় অন্তত ২৫ জনকে আটক করা হয়েছে। বিক্ষোভের অংশ হিসেবে বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞান ও প্রাকৃতিক বিজ্ঞান অনুষদের একটি ভবন এক দিনের জন্য নেন আন্দোলনকারীরা। সেখানে সরকারের নীতির বিরুদ্ধে ব্যানার টানিয়ে তারা স্লোগান দেন, ‘এভাবে আর চলতে পারে না’। শিক্ষার্থীদের আশঙ্কা, সরকারি বাজেট কাটের কারণে ফ্রিতে উচ্চশিক্ষার সুযোগ এখন চরম হুমকির মুখে পড়েছে। উপযুক্ত বেতন না পেয়ে অনেক শিক্ষকই বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে চলে যাচ্ছেন। ২০২৩ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে প্রেসিডেন্ট মাইলেই সরকারি খাতে হাজার হাজার কর্মী ছাঁটাই, একাধিক মন্ত্রণালয় বিলুপ্ত এবং সার্বিক ভর্তুকি কমানোর মতো কঠোর পদক্ষেপ নেন। এতে মাসে মূল্যস্ফীতি কমে প্রায় ২ শতাংশে নামলেও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রা এবং শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতের ওপর চরম নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। সম্প্রতি বিশ্বব্যাংক ও ওয়াশিংটন সফরকালে প্রেসিডেন্ট মাইলেই দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির দাবি করলেও বিরোধীদের অভিযোগ—সাধারণ জনগণের ওপর অস্বাভাবিক খরচের বোঝা চাপিয়েই এই হিসাব দেখানো হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর অর্থায়ন বজায় রাখতে কংগ্রেসে একটি বিল পাস হলেও প্রেসিডেনশিয়াল ভেটো এবং সরকারের অর্থ ছাড় না করার অজুহাতে তা থমকে আছে। এ নিয়ে দেশটির এক ফেডারেল আদালত সরকারকে প্রতিদিন ১ লাখ পেসো জরিমানা পর্যন্ত করেছেন। আন্দোলনকারীরা অবিলম্বে শিক্ষা খাতে নিয়মিত বাজেট বরাদ্দ ও প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নের দাবি জানিয়েছেন। বুয়েনস এইরেস বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগের অধ্যাপক মারিয়া তেরেসা দে হেসুস জানান, মাসে প্রায় ৭০০ ডলার আয় করেও তার পক্ষে সংসারের খরচ চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। আলজাজিরাকে তিনি বলেন, ‘শেষ চেষ্টা হিসেবে আমি এই বিক্ষোভে এসেছি। আমি একজন অধ্যাপক। শিক্ষকতা ও গবেষণা করতে ভালোবাসি। আমার এখানে থাকার কথা নয়।’ অন্যদিকে, অনেকেই সরকারের পরিকল্পনার ওপর আস্থা হারিয়েছেন। তাদের অভিযোগ, মাইলেই সরকার একটি সুবিধাভোগী গোষ্ঠীর স্বার্থ রক্ষা করছে, আর তার অর্থনৈতিক পরিকল্পনার ব্যয় বহন করতে হচ্ছে দেশের সাধারণ মানুষকে। সূত্র: আলজাজিরা

কাল কি হবে ভারতে? দিল্লিতে তিরঙ্গা মিছিলের ডাক
ভারতের দিল্লির কনট প্লেসে শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) তিরঙ্গা মিছিল করার ক্ষেত্রে ককরোচ জনতা পার্টি (সিজেপি) ও দলটির প্রতিষ্ঠাতা অভিজিৎ দীপকের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন দিল্লি হাইকোর্ট। তবে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ‘সম্ভাব্য সব ধরনের ব্যবস্থা’ নেওয়ার বিষয়ে পুলিশের আশ্বাস আদালতের নথিতে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। শুক্রবার বিকেল ৫টায় কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে জাতীয় পতাকা হাতে জমায়েতের আহ্বান জানিয়েছেন অভিজিৎ দীপকে। সিজেপির দুই সদস্য সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকার গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে এ মিছিলের ডাক দিয়েছেন তিনি। এ কর্মসূচির বিরুদ্ধে আদালতে আবেদন করেন পালিকা বাজারের লাইসেন্সধারী এক ব্যবসায়ী অনিল কুমার গুপ্ত। তার আশঙ্কা, সেন্ট্রাল পার্কে বিক্ষোভ হলে ওই এলাকার ব্যবসায়িক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে এবং ব্যবসায়ীসহ সেখানে কর্মরত অন্য ব্যক্তিরা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারেন। শুনানিতে দিল্লি পুলিশ আদালতকে জানায়, আবেদনকারীর উত্থাপিত আশঙ্কার বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হবে। মামলাটির পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করা হয়েছে ৩ নভেম্বর। গ্রেপ্তারের প্রতিবাদে তিরঙ্গা মিছিলের ডাক আগামী ১৬ অক্টোবর দেশজুড়ে ‘লেহরা দো তিরঙ্গা’ কর্মসূচির ডাক দিয়েছেন দীপকে। তিনি মানুষকে জাতীয় পতাকা নিয়ে দিল্লির কনট প্লেসের সেন্ট্রাল পার্কে বিকেল ৫টায় জড়ো হওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। অন্য শহরগুলোতেও একই ধরনের জমায়েত আয়োজনের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। এর কয়েক দিন আগে সিজেপির সদস্য সৌরভ দাস ও আশুতোষ রানকাকে পাঁচ দিনের বিচার বিভাগীয় হেফাজতে পাঠিয়ে তিহার কারাগারে নেওয়া হয়। দিল্লি পুলিশ নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল হিসেবে জন্তর মন্তরের স্বীকৃতি প্রত্যাহার করার এক দিন পর সেখানে প্রবেশের অভিযোগে তাদের সিজেপি কর্মী অজিঙ্কা শিন্দের সঙ্গে গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। গ্রেপ্তারের আগে সিজেপির সদস্যরা প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে বিক্ষোভ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পুলিশের ভাষ্য, অনুমতি ছাড়া প্রবেশ, নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ লঙ্ঘন এবং শান্তি বজায় রাখার মুচলেকার শর্ত ভঙ্গের অভিযোগে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। ১৬ অক্টোবরের মিছিলের বিরোধিতা করে করা আবেদনে বলা হয়, সেন্ট্রাল পার্ক নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল নয়। সেখানে জমায়েত হলে যান চলাচল, জনসাধারণের চলাচল এবং কনট প্লেসের বাণিজ্যিক কার্যক্রম ব্যাহত হতে পারে। বিশেষ করে উৎসবের মৌসুমে এ ধরনের কর্মসূচি সমস্যা তৈরি করতে পারে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়। এর আগে দিল্লি পুলিশ জন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থলের তালিকা থেকে বাদ দিয়ে বিকল্প স্থান হিসেবে রামলীলা ময়দান, বুরারি গ্রাউন্ড ও সিবিডি গ্রাউন্ড চিহ্নিত করেছিল বলে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে। সূত্র: হিন্দুস্তান টাইমস

বিজেপির অভিযোগ / ভারতে ‘বাংলাদেশের মত আন্দোলন’ চাইছেন রাহুল গান্ধী
ভারতে ‘বাংলাদেশের মতো নৈরাজ্য’ সৃষ্টি করে কেন্দ্রের ক্ষমতায় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করছেন কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী ও তার অনুসারীরা—এমন অভিযোগ করেছে ভারতের ক্ষমতাসীন দল বিজেপি। আজ বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) নয়াদিল্লিতে বিজেপির সদর দপ্তরে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে দলটির মুখপাত্র প্রদীপ ভান্ডারি এ অভিযোগ করেন। এ সময় তিনি অল ইন্ডিয়া স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশনের (আইসা) নেত্রী নেহা বোরার একটি কথিত মন্তব্যের প্রসঙ্গ তুলে ধরেন। তার দাবি, বাংলাদেশের তরুণদের নেতৃত্বে গড়ে ওঠা আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত হওয়ার কথা বলেছেন নেহা বোরা। ভান্ডারি অভিযোগ করেন, নেহা বোরার বক্তব্য এবং রাহুল গান্ধীর সাম্প্রতিক প্রতিবাদ মিছিলে তার উপস্থিতি প্রমাণ করে, ভারতে অস্থিরতা সৃষ্টি করে কেন্দ্রের ক্ষমতায় পরিবর্তন আনার ষড়যন্ত্র করছে কংগ্রেস ও রাহুল গান্ধীর অনুসারীরা। বিজেপির এই মুখপাত্রের দাবি, এক সাক্ষাৎকারে নেহা বোরা বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের আন্দোলন থেকে অনুপ্রাণিত এবং বাংলাদেশে যা ঘটেছে, তা ভারতেও হওয়া উচিত। ভান্ডারি বলেন, ‘এগুলো নেহা বোরার কথা হলেও রাহুল গান্ধীরই মতামত।’ তিনি আরও অভিযোগ করেন, ভারতে বাংলাদেশের মতো জেন-জি আন্দোলন গড়ে তোলার চেষ্টা চলছে। এর মূল লক্ষ্য হলো ‘ক্ষমতার পরিবর্তন’। ভান্ডারির ভাষ্য, এটি রাজনৈতিক প্রতিরোধ নয়; বরং নৈরাজ্যপূর্ণ মিছিল ও বিদ্রোহ। তার দাবি, রাহুল গান্ধীর লক্ষ্য গণতান্ত্রিক উপায়ে প্রতিবাদ জানানো নয়, বরং নৈরাজ্যকে বৈধতা দেওয়া। এর মাধ্যমে ভারতের রাষ্ট্রব্যবস্থা ও গণতন্ত্রের বিরুদ্ধে লড়াই চালানো হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেন তিনি। বিজেপির এই নেতা আরও বলেন, রাহুল গান্ধীর নেতৃত্বে গণতান্ত্রিক উপায়ে ক্ষমতায় ফিরতে ব্যর্থ হওয়ায় তিনি কথিত ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে নিজের পরিবারকে আবারও ক্ষমতায় আনতে চাইছেন। তবে বিজেপির এসব অভিযোগের বিষয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের সময় পর্যন্ত কংগ্রেস বা নেহা বোরার পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

মদিনায় মিসাইল হা'মলার অভিযোগ নিয়ে যা বলল হুথিরা
ইসলাম ধর্মের দ্বিতীয় পবিত্রতম শহর মদিনায় সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের ক্রুজ মিসাইল ভূপাতিত করার দাবি পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করেছে হুথি বিদ্রোহীরা। সশস্ত্র এ গোষ্ঠীর সামরিক শাখার মুখপাত্র ইয়াহিয়া সারি বলেছেন, আজ বৃহস্পতিবার সৌদিতে কোনো হামলাই চালানো হয়নি। এর আগে সৌদি আরবের নেতৃত্বাধীন সামরিক জোটের মুখপাত্র তুর্কি আল মালিকি এক্সে বলেছেন, ‘মদিনায় ক্রুজ মিসাইল ধ্বংস করা হয়েছে।’ এর আগেও মক্কা ও মদিনায় হুথিরা হামলা চালিয়েছে বলে অভিযোগ করেছিল সৌদি আরব। যার সবগুলোই প্রত্যাখ্যান করে ইরান সমর্থিত হুথি বিদ্রোহীরা। এখন নতুন করে আবারও তাদের বিরুদ্ধে ক্রুজ মিসাইল ছোড়ার অভিযোগ আনল সৌদি। এদিকে এএফপির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সৌদি আরব এবং সৌদি সমর্থিত ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের ৩৭ দিনে ইয়েমেনের নতুন ১৫ হাজার কিলোমিটার এলাকার দখল নিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। হুথিদের দাবি, সৌদির বিমানবন্দর ও তেল স্থাপনাগুলো তাদের বৈধ লক্ষ্যবস্তু। ইয়েমেনে সৌদি বাহিনীর হামলার জবাব হিসেবেই এসব আক্রমণ চালানো হচ্ছে বলে জানিয়েছে তারা। বার্তা সংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত এক সপ্তাহে সৌদি আরবে হুথিদের হামলা বেড়েছে। এর মধ্যে শনিবার রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে হামলায় ১৩ জন নিহত হন। রয়টার্সকে তিনটি সূত্র জানিয়েছে, মঙ্গলবার রাতে পূর্বাঞ্চলীয় শহর ধাহরানে সৌদি আরামকোর স্থাপনায় হামলার পর আগুন কয়েকটি তলায় ছড়িয়ে পড়ে। তবে সৌদি আরবের জ্বালানি মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, হামলায় সীমিত পরিসরে আগুনের ঘটনা ঘটেছে।

আরব আমিরাতে ভিসা জটিলতা: সমস্যা কোথায়, করণীয় কি?
সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা নিয়ে অনিশ্চয়তা নতুন করে প্রবাসী সমাজে উদ্বেগ তৈরি করেছে। কেউ নতুন ভিসা পেতে সমস্যায় পড়ছেন, কেউ নবায়ন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন, আবার কেউ ছুটিতে বাংলাদেশে এসে ভিসা বাতিলের খবর পেয়ে কর্মস্থলে ফিরতে পারছেন না। তবে এই পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে গেলে শুধু ভিসা বাতিলের সংখ্যা কিংবা প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দিকে তাকালেই হবে না; দেখতে হবে ভিসার শর্ত, অভিবাসনবিধি, নিয়োগপ্রক্রিয়া এবং প্রবাসীদের ব্যক্তিগত দায়িত্বের বিষয়গুলোও। আমিরাতে বসবাসরত বাংলাদেশিদের বড় একটি অংশ নিয়মিত চাকরি করেন, ব্যবসা পরিচালনা করেন এবং পরিবারের ভরণপোষণের জন্য কঠোর পরিশ্রম করেন। তাঁদের অনেকেই বছরের পর বছর বৈধভাবে বসবাস করে দেশের অর্থনীতিতে রেমিট্যান্স পাঠাচ্ছেন। কিন্তু কিছু ব্যক্তির অনিয়ম, জাল কাগজপত্র ব্যবহার কিংবা প্রতারণার মাধ্যমে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা পুরো বাংলাদেশি সম্প্রদায়ের জন্য নেতিবাচক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। এর প্রভাব বৈধভাবে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক নতুন আবেদনকারীদের ওপরও পড়ার আশঙ্কা থাকে। বাংলাদেশের অর্থনীতিতে প্রবাসীদের অবদান বোঝার জন্য রেমিট্যান্সের পরিসংখ্যান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম তিন মাস জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর বাংলাদেশে প্রবাসী আয় এসেছে প্রায় ৮.৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। শুধু সেপ্টেম্বর মাসেই এসেছে প্রায় ২.৭৫ বিলিয়ন ডলার। এই বিপুল বৈদেশিক মুদ্রা দেশের অর্থনীতি, বৈদেশিক লেনদেন এবং অসংখ্য পরিবারের জীবনযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সংযুক্ত আরব আমিরাতও বাংলাদেশের রেমিট্যান্সের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস। বাংলাদেশ ব্যাংকের দেশভিত্তিক হিসাবে ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জুলাই-আগস্ট সময়ে আমিরাত থেকে এসেছে প্রায় ৫০৫.১ মিলিয়ন মার্কিন ডলার। ওই সময়ে সৌদি আরব, যুক্তরাজ্য ও যুক্তরাষ্ট্র থেকে বেশি রেমিট্যান্স আসায় আমিরাত ছিল দেশভিত্তিক তালিকার চতুর্থ স্থানে। সংযুক্ত আরব আমিরাত বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ রেমিট্যান্সের উৎস। এই আয় পাঠানোর পেছনে রয়েছেন অসংখ্য বাংলাদেশি শ্রমিক, কর্মী ও ব্যবসায়ী, যাঁদের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ ভিসার স্থিতিশীলতার সঙ্গে জড়িত। ভিসা আবেদন একটি আইনি ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়া। আবেদনকারীর পরিচয়, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির তথ্য, নিয়োগকর্তার নথি এবং অন্যান্য প্রয়োজনীয় কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই করা হতে পারে। এ ক্ষেত্রে জাল সনদ, ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, ভুল তথ্য কিংবা অসাধু মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আবেদন করলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ভিসা প্রত্যাখ্যান, নবায়নে জটিলতা কিংবা অন্যান্য আইনি সমস্যার ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। একই সঙ্গে জাল কাগজপত্র বা প্রতারণার মাধ্যমে ভিসা পাওয়ার চেষ্টা বৈধভাবে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক অন্যদের জন্যও সমস্যা তৈরি করতে পারে। এ ধরনের অনিয়মের কারণে যাচাই-বাছাই আরও কঠোর হওয়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে প্রকৃত যোগ্যতা ও বৈধ নথি থাকা সত্ত্বেও অন্য আবেদনকারীদের অতিরিক্ত যাচাই কিংবা দীর্ঘসূত্রতার মুখোমুখি হতে হতে পারে। ভিসা জটিলতার কারণ হিসেবে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে আসে। কিছু বাংলাদেশি দক্ষ কর্মী বা ‘স্কিলড’ ক্যাটাগরিতে ভিসা নিয়ে নির্দিষ্ট পেশায় কাজ করার চুক্তি করলেও বাস্তবে অন্য ধরনের কাজে যুক্ত হচ্ছেন। এ ধরনের ঘটনা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে এলে কর্মীর যোগ্যতা, ভিসায় উল্লেখিত পেশা, নিয়োগকর্তার তথ্য এবং প্রকৃত কাজের মধ্যে সামঞ্জস্য নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে। ফলে নিয়োগপ্রক্রিয়া ও কাজের অনুমতি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের সতর্কতা বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। তাই কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়েরই উচিত চুক্তির শর্ত মেনে চলা এবং কাজ বা পেশা পরিবর্তনের প্রয়োজন হলে যথাযথ আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা। প্রবাসীদের মধ্যে ভিসার শর্ত সম্পর্কে অস্পষ্ট ধারণাও কখনো কখনো জটিলতা বাড়ায়। উদাহরণস্বরূপ, আমিরাতের সাধারণ নিয়মে আবাসিক ভিসাধারী কেউ টানা ১৮০ দিনের বেশি দেশের বাইরে থাকলে সাধারণত তাঁর আবাসিক অনুমতি বাতিল হওয়ার ঝুঁকি থাকে। তবে এ নিয়মের ব্যতিক্রম রয়েছে এবং ভিসার ধরন ও ব্যক্তির পরিস্থিতি অনুযায়ী বিধান ভিন্ন হতে পারে। তাই ছুটিতে বাংলাদেশে যাওয়ার আগে নিজের ভিসার শর্ত যাচাই করা, প্রয়োজন হলে নিয়োগকর্তা বা স্পনসরের সঙ্গে যোগাযোগ করা এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে নিশ্চিত তথ্য নেওয়া গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে, ভিসা ও অভিবাসনবিধি ছাড়াও স্বাগতিক দেশের জননিরাপত্তা, জনশৃঙ্খলা এবং অনুমতিহীন সমাবেশ-সংক্রান্ত আইন মেনে চলা বিদেশি নাগরিকদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কোনো দেশে বসবাসের অর্থ শুধু চাকরি করা বা ব্যবসা পরিচালনা নয়; সেই দেশের আইন ও সামাজিক নিয়মের প্রতিও শ্রদ্ধাশীল থাকা। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবেদনশীল তথ্য প্রকাশ, অনুমতি ছাড়া সমাবেশে অংশগ্রহণ কিংবা আইনবিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়লে গুরুতর পরিণতি হতে পারে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে বিভিন্ন নামে-বেনামে গড়ে ওঠা সংগঠন, রাজনৈতিক দলের শাখা এবং মাত্রাতিরিক্ত রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের বিষয়টিও আলোচনায় রাখা প্রয়োজন। সংযুক্ত আরব আমিরাতে বাংলাদেশিদের বিভিন্ন রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের তৎপরতা চোখে পড়ার মতো। তবে অন্যান্য দেশের প্রবাসীদের ক্ষেত্রে এমন কর্মকাণ্ড একই মাত্রায় দেখা যায় না। প্রবাসে সংগঠন গঠন কিংবা সামাজিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা নিজে থেকেই অপরাধ নয়; কিন্তু এসব কার্যক্রম আমিরাতের প্রচলিত আইন, অনুমতির শর্ত ও জনশৃঙ্খলার বিধানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হওয়া জরুরি। অসংখ্য সংগঠন, রাজনৈতিক দলের শাখা এবং মাত্রাতিরিক্ত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে প্রবাসীদের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। কেউ কেউ প্রশ্ন তুলছেন এসব সংগঠনের প্রয়োজনীয়তা ও কার্যকারিতা নিয়ে। বিশেষ করে অনুমতি ছাড়া সভা-সমাবেশ, রাজনৈতিক কর্মসূচি কিংবা আইনবিরোধী সাংগঠনিক তৎপরতা ব্যক্তি ও সংশ্লিষ্ট সংগঠনের জন্য আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। কোনো সংগঠনের কর্মকাণ্ডের কারণে যেন সাধারণ ও আইন মেনে চলা বাংলাদেশি প্রবাসীদের কর্মসংস্থান, ভিসা কিংবা সামাজিক মর্যাদা নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ সৃষ্টি না হয়, সে বিষয়ে দায়িত্বশীল আচরণ প্রয়োজন। যেমন, ২০২৪ সালের জুলাইয়ে আমিরাতে বিক্ষোভে অংশ নেওয়ার ঘটনায় ৫৭ জন বাংলাদেশির বিরুদ্ধে কঠোর সাজা ঘোষণার ঘটনা এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ। ওই ঘটনায় তিনজনকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড, ৫৩ জনকে ১০ বছর এবং একজনকে ১১ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল। পরে ২০২৪ সালের ৩ সেপ্টেম্বর আমিরাতের প্রেসিডেন্ট তাঁদের ক্ষমা করেন এবং দেশে ফেরত পাঠানোর প্রক্রিয়া নেওয়ার নির্দেশ দেন। ঘটনাটি প্রবাসীদের জন্য একটি সতর্কবার্তা। স্বাগতিক দেশের আইন লঙ্ঘনের অভিযোগে বিদেশি নাগরিকদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। প্রবাসী বাংলাদেশিদের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো অসাধু দালাল ও মধ্যস্থতাকারীদের প্রতারণা। বিদেশে চাকরি কিংবা ভিসার আশায় অনেক মানুষ তাঁদের সঞ্চিত অর্থ ব্যয় করেন। কেউ কেউ ভুয়া চাকরির প্রস্তাব, অবাস্তব বেতনের প্রতিশ্রুতি কিংবা দ্রুত ভিসা করে দেওয়ার আশ্বাসে প্রতারিত হন। কেউ প্রয়োজনীয় নথি যাচাই না করেই অর্থ দিয়ে বসেন, আবার কেউ জানেন না যে তাঁদের হয়ে জমা দেওয়া কাগজপত্রের সত্যতা যাচাই করা কতটা জরুরি। এ ধরনের পরিস্থিতি থেকে রক্ষা পেতে অনুমোদিত নিয়োগপ্রক্রিয়া অনুসরণ, অর্থ লেনদেনের প্রমাণ সংরক্ষণ এবং ভিসা বা চাকরির তথ্য সরকারি বা অনুমোদিত সূত্রে যাচাই করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশ সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিদেশে অবস্থিত দূতাবাস ও কনস্যুলেট এবং জনশক্তি নিয়োগ-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব রয়েছে। বিদেশে যাওয়ার আগে কর্মীদের জন্য সহজবোধ্য তথ্য ও সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করা যেতে পারে। কোন ধরনের ভিসায় কী শর্ত প্রযোজ্য, চাকরির চুক্তিতে কী কী বিষয় যাচাই করতে হবে, নিয়োগকর্তা পরিবর্তন করলে কী প্রক্রিয়া অনুসরণ করতে হয় এবং ভিসা-সংক্রান্ত সমস্যা হলে কোথায় অভিযোগ জানাতে হবে, এসব তথ্য বাংলায় সহজভাবে পৌঁছে দেওয়া দরকার। আমিরাতে অবস্থানরত বাংলাদেশি কমিউনিটি সংগঠন, সামাজিক সংগঠন ও গণমাধ্যমও এ ক্ষেত্রে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে। গুজবের পরিবর্তে যাচাইকৃত তথ্য প্রচার, ভিসা-সংক্রান্ত নিয়মের ব্যাখ্যা এবং প্রতারণার ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরি করা জরুরি। কোনো ভিসা বাতিলের খবর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে যাচাই ছাড়াই সেটিকে সবার জন্য প্রযোজ্য নিয়ম হিসেবে প্রচার করা উচিত নয়। এতে অযথা আতঙ্ক ছড়ায় এবং অসাধু ব্যক্তিরা সেই সুযোগে প্রতারণার সুযোগ নেয়। একই সঙ্গে বৈধ প্রবাসীদের অভিযোগকে গুরুত্ব দিয়ে দেখার বিষয়টিও উপেক্ষা করা যাবে না। কোনো ব্যক্তি দীর্ঘদিন নিয়ম মেনে বসবাসের পর ভিসা বাতিলের শিকার হলে তাঁর কাছে সিদ্ধান্তের কারণ জানার সুযোগ থাকা উচিত। ভুল তথ্য, প্রশাসনিক জটিলতা কিংবা অন্য কোনো সমস্যার কারণে সিদ্ধান্ত হয়ে থাকলে তা পর্যালোচনার কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। যাঁদের অভিযোগের যৌক্তিক ভিত্তি রয়েছে, তাঁদের জন্য যথাযথ প্রক্রিয়ায় প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ থাকা উচিত। আর যাঁদের ক্ষেত্রে আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ পাওয়া যায়, তাঁদের বিষয়টি আইন অনুযায়ী নিষ্পত্তি করতে হবে। প্রবাসীদের স্বার্থ রক্ষার প্রশ্নে সরকার ও ব্যক্তির দায়িত্বকে একে অপরের বিপরীতে দাঁড় করানোও সমাধান নয়। সরকারকে কূটনৈতিক যোগাযোগ, তথ্য যাচাই, অভিযোগ নিষ্পত্তি এবং বৈধ কর্মসংস্থানের সুযোগ নিয়ে কাজ করতে হবে। অন্যদিকে, প্রত্যেক প্রবাসীকে নিজের কাগজপত্রের সত্যতা, ভিসার শর্ত, চাকরির বৈধতা এবং স্বাগতিক দেশের আইন সম্পর্কে সচেতন থাকতে হবে। কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান প্রতারণার আশ্রয় নিলে তার দায় নির্দিষ্টভাবে নির্ধারণ করা উচিত; সেই দায় পুরো বাংলাদেশি জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো ন্যায়সংগত নয়। আমিরাতে বাংলাদেশিদের ভিসা পরিস্থিতির স্থায়ী উন্নয়নের জন্য প্রয়োজন স্বচ্ছ তথ্য, দায়িত্বশীল আচরণ এবং দুই দেশের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মধ্যে কার্যকর যোগাযোগ। ভিসা বাতিলের প্রকৃত কারণগুলো চিহ্নিত করা গেলে কোন সমস্যার সমাধান কূটনৈতিক আলোচনার মাধ্যমে সম্ভব, কোথায় প্রশাসনিক পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন এবং কোথায় ব্যক্তিগত অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার, তা স্পষ্ট হবে। বিদেশে কর্মসংস্থান বাংলাদেশের লাখো পরিবারের জীবিকার সঙ্গে জড়িত। তাই একজন প্রবাসীর অনিয়ম যেমন অবহেলার বিষয় নয়, তেমনি কোনো বৈধ প্রবাসীর ন্যায্য অধিকারও উপেক্ষা করা যায় না। জাল কাগজপত্র, প্রতারণা ও আইনবিরোধী কর্মকাণ্ড থেকে দূরে থাকা যেমন প্রত্যেকের দায়িত্ব, তেমনি বৈধভাবে বিদেশ যেতে ইচ্ছুক মানুষের জন্য স্বচ্ছ ও ন্যায়সংগত প্রক্রিয়া নিশ্চিত করাও জরুরি। ব্যক্তির অনিয়মের দায় ব্যক্তির ওপরই নির্ধারিত হোক, আর বৈধ প্রবাসীদের অধিকার রক্ষায় এগিয়ে আসুক সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ। এই ভারসাম্যই হতে পারে ভিসা জটিলতা কমানোর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ পথ।

