Published on
:
3 min read
এই সময়, হলদিয়া: ‘উই শ্যাল ওভারকাম—আমরা করব জয়’। শিল্প নিয়ে রাজ্যের হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারে যে তাঁর সরকার কসুর করবে না, মুখ্যমন্ত্রীর দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে বারবার এক কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী। শিল্পায়নের পথে কোনও বাধা যে মেনে নেওয়া হবে না— রাজ্যের শাসকদলের তরফে সেই বার্তা দিতে শোনা গিয়েছে বঙ্গ–বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্যকেও। রাজ্যে শিল্পয়ানের নতুন দিশায় যে তাঁর সরকার এগিয়ে চলেছে— তার নিদর্শন হিসেবে বুধবার শিল্পনগরী হলদিয়ায় একগুচ্ছ নতুন প্রকল্পের ঘোষণা করেন তিনি।
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস লিমিটেডের (এইচপিএল) সহযোগী সংস্থা অ্যাডপার্মা প্রাইভেট লিমিটেডের ফেনল ও অ্যাসিটোন উৎপাদন কারখানার উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘স্বামীজির চরৈবেতি মন্ত্রে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। আজ একটি ঐতিহাসিক দিন, সোনালি দিন। এইচপিএল এই কারখানা তৈরিতে ছ’হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগ করেছে। প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ ভাবে যথাক্রমে ৪০০ এবং এক হাজার কর্মসংস্থান হয়েছে। আরও ১০ হাজার কোটি টাকা বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে সংস্থাটির। এর পাশাপাশি ৯৮ একর জমির উপরে পেপসির একটি নতুন কারখানা এবং ৫০ একর জমির উপরে প্রোভিস তাদের কারখানা খুলতে চলেছে।’ হলদিয়া ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (এইচডিএ) তরফ থেকে ইতিমধ্যেই জমি দেওয়া হয়েছে। শিগগিরই রাজ্য মন্ত্রিসভা এতে অনুমোদন দিয়ে দেবে বলে তিনি জানান।
মুখ্যমন্ত্রীর কথায়, ‘শিল্পপতি সঞ্জীব গোয়েঙ্কাও ইতিমধ্যে আমার সঙ্গে দেখা করে হলদিয়ায় তাঁদের বিদ্যুৎ উৎপাদন সংস্থা হলদিয়া এনার্জির উদ্বৃত্ত জমিতে আর একটি প্লান্ট তৈরির আগ্রহ দেখিয়েছেন। ব্যারাকপুর অঞ্চলেও একটি প্লান্ট খুলতে আগ্রহী তিনি। এ ছাড়া ইনল্যান্ড ওয়াটারওয়েজ় লিমিটেড এবং ইন্ডিয়ান অয়েলও সম্প্রসারণ প্রকল্প হাতে নিয়েছে।’ আগামী এক বছরের মধ্যে হলদিয়ায় বিপুল শিল্পায়ন হবে বলেই তাঁর দাবি।
শুধু কারখানা তৈরি নয়, পূর্ব মেদিনীপুরের হলদিয়ার এই কারখানার কর্মীদের স্বার্থ ও নিরাপত্তার কথা মাথায় রেখে দ্রুত একটি ট্রমা সেন্টার এবং বার্ন ইউনিট খোলার কথাও জানিয়েছেন শুভেন্দু। তিনি বলেন, ‘সম্প্রতি রাজ্যের বেশ কিছু কারখানায় আগুন লাগার ঘটনা ঘটেছে। আমাদের শ্রমিক বন্ধুরা কারখানায় কাজ করতে গিয়ে অনেক সময়ে দুর্ঘটনায় পড়েন। এখান থেকে আহত, দগ্ধ শ্রমিককে কলকাতায় চিকিৎসার জন্য নিয়ে যেতে অনেকটা সময় লেগে যায়। সে কথা মাথায় রেখে হলদিয়ায় একটি ট্রমা সেন্টার ও বার্ন ইউনিট খোলা হবে।’ মুখ্যমন্ত্রী জানান, এর জন্য এইচডিএ ১৮ কোটি টাকা, ইন্ডিয়ান অয়েল পাঁচ কোটি টাকা দিয়েছে। এর পাশাপাশি কেন্দ্রের ন্যাশনাল হেলথ মিশন থেকে পাঁচ কোটি টাকা পাওয়া গিয়েছে। আগামী বছরের জুনের মধ্যেই ৫০ বেডের এই ট্রমা সেন্টার তৈরি হয়ে যাবে।
হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস-এর মালিক সংস্থা ‘দ্য চ্যাটার্জি গ্রুপ’ (টিসিজি)-এর চেয়ারম্যান পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়ের ঢালাও প্রশংসা করেন শুভেন্দু। তাঁকে ‘দরদি, মরমি’ বাঙালি বলে সম্বোধন করে তিনি বলেন, ‘পূর্ণেন্দুবাবু রাজ্যের কাছে ঈশ্বরের উপহার, পশ্চিমবঙ্গের বন্ধু। কারখানার সম্প্রসারণ সমেত সেখানে রেল যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তোলার মতো বহু পরিকল্পনা রয়েছে তাঁর। ওঁর হাত ধরেই আত্মনির্ভর বাংলার পথচলা শুরু হলো বলা চলে।’
এইচপিএল-এর কারখানা সমেত হলদিয়া ও রাজ্যের বিভিন্ন শিল্পগোষ্ঠীর কারখানায় দক্ষ শ্রমিক সরবরাহের জন্যও উদ্যোগী হয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী। এর জন্য রাজ্যের উচ্চশিক্ষা মন্ত্রী জগন্নাথ চট্টোপাধ্যায়ের উদ্দেশে দুর্গাচক আইটিআই পরিদর্শন করে প্রয়োজনীয় পরিকাঠামো তৈরির নির্দেশ দেওয়ার পাশাপাশি কেন্দ্রীয় সরকারের ‘সেন্ট্রাল ইনস্টিটিউট অফ পেট্রোকেমিক্যালস ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড টেকনোলজি’ এবং ‘হলদিয়া ইনস্টিটিউট অফ টেকনোলজি’ থেকেও দক্ষ কর্মী তৈরির উপরে জোর দিয়েছেন তিনি।
শুভেন্দু বলেন, ‘এই রাজ্যে দেশের যে কোনও প্রান্ত থেকে মানুষ এসে কাজ করতে পারেন। আমাদের কোনও সেক্টরিয়ান ভিউ থাকবে না। কিন্তু, পূর্ণেন্দুবাবু চাইছেন বেশি করে স্থানীয় দক্ষ কর্মী তৈরি ও নিয়োগ করতে।’
দীপাবলির আগে রাজ্য সরকার নতুন শিল্পনীতি প্রকাশ করবে বলেও এ দিন তিনি জানান। ইতিমধ্যেই এই সংক্রান্ত মন্ত্রিগোষ্ঠী শিল্পনীতি জমা দিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী বলেন, ‘তা থেকে দু’টি জিনিস আমরা বাদ দিয়েছি। এক, জঙ্গি ট্রেড ইউনিয়নিজ়ম এবং সংস্থার পদস্থ কর্তাদের শারীরিক ভাবে নিগ্রহ করা এবং দুই, জঘন্য জমি নীতি, ইনসেনটিভ তুলে দেওয়া এবং সিন্ডিকেট রাজ।’ প্রথম কারণে ৩৪ বছরের বাম জমানায় ৫০ হাজার শিল্প বন্ধ হয়েছে এবং দ্বিতীয় কারণে এই রাজ্যে কোনও শিল্প আসেনি বলেও তিনি জানান।
অনুষ্ঠানে ছিলেন রাজ্যের শিল্পমন্ত্রী তাপস রায়, মুখ্যসচিব মনোজ আগরওয়াল, মুখ্যমন্ত্রীর উপদেষ্টা সুব্রত গুপ্ত–সহ অনেকেই। পূর্ণেন্দু বলেন, ‘বহু ওঠাপড়ার মধ্যে দিয়ে আজ হলদিয়া পেট্রোকেমিক্যালস এই জায়গায় পৌঁছেছে। পূর্বতন সরকারের সঙ্গে মনোমালিন্যে ১০ বছরের সর্বনিম্ন স্তরে পৌঁছে গিয়েছিল সংস্থাটি। সেখান থেকে ঘুরে দাঁড়ানো আমার কাছে অগ্নিপরীক্ষা ছিল, যাতে আমি সফল হয়েছি।’