বাংলাদেশ রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর (আরএনবি) চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামকে ঘিরে বদলি বাণিজ্য, নিয়োগে অনিয়ম এবং বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর নানা অভিযোগ ডালপালা মেলতে শুরু করেছে। দায়িত্ব ও প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে একটি শক্তিশালী বদলি সিন্ডিকেট গড়ে তোলার মাধ্যমে বাহিনীর সুশৃঙ্খল পরিবেশ বিনষ্ট করা হচ্ছে বলে সদস্যদের ভেতর তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। রেলওয়ের সম্পদ ও গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব সুরক্ষার দায়িত্বে থাকা একটি বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাকে ঘিরে ওঠা এসব গুরুতর অভিযোগ সাধারণ সদস্য থেকে শুরু করে সংশ্লিষ্টদের হতবাক করেছে।
বাহিনীর ভুক্তভোগী একাধিক সদস্যের দাবি, পূর্বাঞ্চলে দায়িত্ব নেওয়ার পর গত এক বছরের মধ্যেই ৮ শতাধিক আরএনবি সদস্যকে নিয়ম-বহির্ভূতভাবে বদলি করা হয়েছে। এসব বদলি ও পদায়নের নেপথ্যে প্রশাসনিক প্রয়োজনীয়তার চেয়ে ব্যক্তিগত স্বার্থ ও অর্থ লেনদেনের সম্পর্কই ছিল মুখ্য। সিপাহীদের ক্ষেত্রে ২০ থেকে ৩০ হাজার টাকা, পোস্টিং হাবিলদারদের ক্ষেত্রে ৫০ থেকে ৬০ হাজার টাকা এবং গুরুত্বপূর্ণ ও লাভজনক স্থানে পোস্টিং পেতে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায় করা হতো। এ ছাড়া সাব-ইন্সপেক্টরদের জন্য ৬০ থেকে ৮০ হাজার টাকা এবং চিফ ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে ১ লাখ ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকা পর্যন্ত অর্থ লেনদেনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ উঠেছে।
চিফ কমান্ড্যান্টের অপকর্মের পরিধি কেবল পূর্বাঞ্চলেই সীমাবদ্ধ ছিল না। এর আগে পশ্চিমাঞ্চলে দায়িত্ব পালনকালে বদলি-পদায়নের লোভ দেখিয়ে বাহিনীর বিভিন্ন সদস্যের কাছ থেকে প্রায় ১৮ লাখ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার ঘটনা ঘটে। তবে হঠাৎ করে তাঁর বদলি হয়ে যাওয়ায় কথা দিয়েও প্রত্যাশিত পোস্টিং দিতে ব্যর্থ হন তিনি। এতে ক্ষুব্ধ হয়ে পাওনাদার সদস্যরা তাঁর কার্যালয়ে চড়াও হয়ে টাকা ফেরতের জোর দাবি জানান। পরবর্তীতে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনীর সহকারী প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইমাম হোসেন উজ্জ্বলের মধ্যস্থতায় ভুক্তভোগীরা সেই অর্থ ফেরত পান। এ বিষয়ে কথা বললে মধ্যস্থতার বিষয়টি স্বীকার করে তিনি জানান যে, বাহিনীর কল্যাণেই তিনি এগিয়ে এসেছিলেন এবং টাকা ফেরত পাওয়া সংক্রান্ত তথ্যটি পুরোপুরি সত্য।
ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে আর্থিক অনিয়মের পাশাপাশি জহিরুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রীর নামে গড়ে তোলা হয়েছে প্রকাণ্ড সম্পদের পাহাড়। অনুসন্ধানে দেখা যায়, ২০১৪ সালে ঢাকার মিরপুরের সেনপাড়া মৌজায় প্রায় ৪ কোটি ৮৮ লাখ টাকা মূল্যের একটি যৌথ বাড়ি ক্রয়ে জহিরুল ইসলাম একাই ২ কোটি টাকা বিনিয়োগ করেন। এ ছাড়া ঢাকার শহীদবাগে ‘সিপ্রিং ডেল’ ভবনে প্রায় ৮০ লাখ টাকা মূল্যের একটি ১ হাজার ৫০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং উত্তরার ১৮ নম্বর সেক্টরে রাজউক উত্তরা অ্যাপার্টমেন্ট প্রকল্পে ৬৫ লাখ টাকা মূল্যের আরও একটি ফ্ল্যাটের মালিক তিনি। এমনকি চিফ কমান্ড্যান্ট পদে পদোন্নতি পাওয়ার পরপরই ঢাকা-মেট্রো-গ-৪২-০৮৭১ নম্বরের প্রায় ৩৫ লাখ টাকা মূল্যের একটি ব্যক্তিগত বিলাসবহুল গাড়িও নিজের বহরে যুক্ত করেন তিনি।
বিতর্কিত এই কর্মকর্তার নিজের সম্পদের পাশাপাশি তাঁর স্ত্রী কাজী জিন্নাতুন নাহারের নামেও একাধিক স্থাবর সম্পত্তির হদিস পেয়েছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। অনুসন্ধানী তথ্য অনুযায়ী, ২০১২ সালে কুমিল্লার কান্দিরপাড়ের ঝাউতলা মৌজায় ২০ লাখ টাকা মূল্যের একটি ফ্ল্যাট কেনেন তাঁর স্ত্রী। ২০১৮ সালে একই এলাকায় আরও একটি ২০ লাখ টাকার ফ্ল্যাট নিজের নামে নিবন্ধন করেন তিনি। কেবল কুমিল্লাতেই নয়, রাজধানী ঢাকার রমনা থানাধীন কাকরাইলের সার্কিট হাউস রোডে ‘কনকর্ড গ্র্যান্ড রুবি’ নামের ১৪ তলা ভবনে প্রায় ২ কোটি টাকা মূল্যের ১ হাজার ৭৫০ বর্গফুটের একটি অভিজাত ফ্ল্যাট রয়েছে কাজী জিন্নাতুন নাহারের নামে।
জহিরুল ইসলামের বিরুদ্ধে নিয়োগ বাণিজ্যের অভিযোগও নতুন নয়। এর আগে ২০১৭ সালে ১৮৫ জন আরএনবি সিপাহী নিয়োগের সময় ব্যাপক অনিয়ম ও জালিয়াতির আশ্রয় নেওয়ার অভিযোগ ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে। সেই ঘটনায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অনুসন্ধান চালায় এবং পরবর্তীতে একটি মামলা দায়ের করে। তবে অভিযুক্ত কর্মকর্তার দাবি, সম্প্রতি ওই মামলাটির আইনি নিষ্পত্তি হয়েছে।
এসব পর্বতসম অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য নিতে চিফ কমান্ড্যান্ট মো. জহিরুল ইসলামের কার্যালয়ে একাধিকবার যাওয়া হলেও সাংবাদিক শুনেই তিনি দেখা করতে অস্বীকৃতি জানান। তাঁর পক্ষে জানানো হয়, তিনি কোনো সংবাদমাধ্যমের মুখোমুখি হবেন না। অন্যদিকে একই বিষয়ে বক্তব্য ও ব্যাখ্যা জানার জন্য রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের মহাব্যবস্থাপকের (জিএম) কার্যালয়ে গিয়েও তাঁর সাক্ষাৎ মেলেনি। পরবর্তীতে মোবাইল ফোনে বারবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
রেলওয়ের মতো অত্যন্ত সংবেদনশীল ও রাষ্ট্রীয় জরুরি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানের শীর্ষ পদের কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন আশঙ্কাজনক দুর্নীতির অভিযোগে তীব্র উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে। সংশ্লিষ্ট সচেতন মহলের মতে, প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে ও সঠিক সত্য উদ্ঘাটনে দ্রুত একটি নিরপেক্ষ উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। তদন্তের মাধ্যমে সত্য প্রমাণিত হলে দোষীর বিরুদ্ধে কঠোর দৃষ্টান্তমূলক আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা এবং অন্যথায় অবস্থান স্পষ্ট করার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় এই প্রতিষ্ঠানের জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা সময়ের দাবি।
