বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজা শুরু হচ্ছে আজ শুক্রবার (১৬ অক্টোবর)। আজ দুর্গাষষ্ঠী। দেবীর মূল প্রতিমায় আজ থেকে পূজা হবে। আগামী বুধবার বিজয়া দশমী পর্যন্ত ছয় দিন ঢাকঢোল ও কাঁসরের বাদ্যে মুখর থাকবে পূজামণ্ডপগুলো।
আজ পূর্বাহ্ণ (সকাল) ৯টা ৫৭ মিনিটের মধ্যে দেবী দুর্গার ষষ্ঠাদি কল্পারম্ভ ও ষষ্ঠীবিহিত পূজা হবে। সায়ংকালে (সন্ধ্যায়) দেবীর আমন্ত্রণ ও অধিবাস।
এবার দেবী দুর্গা আসছেন ঘোটকে (ঘোড়ায়)। বিদায় নেবেন নৌকায়। হিন্দু শাস্ত্রমতে, শ্বশুরবাড়ি কৈলাস থেকে কন্যারূপে দেবী বাপের বাড়ি বেড়াতে মর্ত্যলোকে আজ আসছেন। অসুর শক্তির কাছে পরাভূত দেবতারা স্বর্গলোকচ্যুত হয়েছিলেন। এই অশুভ শক্তিকে বিনাশ করতে একত্র হন দেবতারা। অসুর শক্তির বিনাশে অনুভূত হলো এক মহাশক্তির আবির্ভাব। দেবতাদের তেজরশ্মি থেকে আবির্ভূত হলেন অসুরবিনাশী দেবী দুর্গা।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে বৃহস্পতিবার রাজধানীর ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলা অঙ্গনে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময় সভা করেছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ এবং মহানগর সার্বজনীন পূজা কমিটির নেতারা।
এ সময় সংগঠন দুটি জানিয়েছে, এবার দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি দুর্গাপূজা হচ্ছে। গত বছর ৩২ হাজার ৩৫১টি দুর্গাপূজা হয়েছিল। আর ঢাকা মহানগরে এবার ২৫৮টি পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর ২৬১টি পূজার আয়োজন করা হয়েছিল।
এবার মহাসপ্তমী দুই দিন। আগামীকাল শনিবার ও পরদিন রোববার মহাসপ্তমী। আগামী সোমবার মহা অষ্টমী, মঙ্গলবার মহানবমী এবং বুধবার বিজয়া দশমী ও দেবী বিসর্জন। বিজয়ার দিন বিকেল ৩টায় হবে ঢাকাসহ সারা দেশে শোভাযাত্রা।
মণ্ডপে মণ্ডপে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি
সরেজমিন বৃহস্পতিবার দেখা যায়, দুর্গাপূজার মণ্ডপে মণ্ডপে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি চলছে। রাজধানীর রমনা কালীমন্দিরে দেখা যায়, প্রতিমা স্থাপন করা হলেও তা পলিথিন দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। এছাড়া মন্দির প্রাঙ্গণে আলোকসজ্জা করা হয়েছে। তৈরি করা হয়েছে গেট ও মঞ্চ।
ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির মেলা অঙ্গনের মণ্ডপেও প্রতিমা স্থাপন করা হয়েছে। প্রতিমা সাদা পর্দা দিয়ে ঢেকে রাখা হয়েছে। তখন চলছিল শেষ পর্যায়ের কাজ।
৩৩ হাজার ৮৫১ মণ্ডপে কঠোর নিরাপত্তা
শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে সারা দেশে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এ বছর প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব আয়োজনের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং, স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয় যাচাই এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, স্থানীয় প্রশাসন ও পূজা উদযাপন কমিটিগুলোর সমন্বয়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলেছেন, শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, সুশৃঙ্খল ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে দেশব্যাপী সর্বোচ্চ নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে। এ লক্ষ্যে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থাকে নিয়ে সমন্বিত প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
এবার দেশে ৩৩ হাজার ৮৫১টি দুর্গাপূজা হচ্ছে। গত বছর ৩২ হাজার ৩৫১টি দুর্গাপূজা হয়েছিল। আর ঢাকা মহানগরে এবার ২৫৮টি পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গত বছর ২৬১টি পূজার আয়োজন করা হয়েছিল।
স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক
পূজামণ্ডপে দায়িত্ব পালনকারী স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয় নিশ্চিত করতে বিশেষ ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। প্রতিটি মণ্ডপের স্বেচ্ছাসেবকদের তালিকা সংশ্লিষ্ট থানায় জমা এবং তালিকা যাচাইয়ের পর তাদের পরিচয়পত্র দেওয়া হয়েছে। পূজার সময় দর্শনার্থীদের চলাচল নিয়ন্ত্রণ, শৃঙ্খলা বজায় রাখা এবং আয়োজকদের বিভিন্ন কাজে সহায়তা করেন স্বেচ্ছাসেবকেরা।
নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহে নির্দেশনা
পূজামণ্ডপে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে জরুরি পরিস্থিতিতে ব্যবহারের জন্য ২৪ ঘণ্টা বিকল্প জেনারেটর ও চার্জার লাইটের ব্যবস্থা রাখতে বলা হয়েছে। উৎসব চলাকালে বিদ্যুৎ সরবরাহে কোনো সমস্যা দেখা দিলে যাতে পূজার আনুষ্ঠানিকতা ও নিরাপত্তা কার্যক্রম ব্যাহত না হয়, সেজন্য আগাম প্রস্তুতি রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিকল্প বিদ্যুৎ সরঞ্জাম ব্যবহারের উপযোগী রয়েছে কি না, তা আগেই পরীক্ষা করে নেওয়ার প্রয়োজনীয়তার কথাও বলা হয়েছে।
দুর্গাপূজায় অনুদান পাঁচ কোটি টাকা
দুর্গাপূজা উপলক্ষে সরকারি ছুটি বৃদ্ধি এবং পূজামণ্ডপের জন্য সরকারি অনুদান বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। দীর্ঘদিনের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে পূর্ববর্তী অন্তর্বর্তী সরকার দুর্গাপূজার সরকারি ছুটি এক দিন থেকে বাড়িয়ে দুই দিন করেছিল। চলতি বছর প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ছুটি আরো এক দিন বাড়িয়ে তিন দিন নির্ধারণ করেছেন। প্রধানমন্ত্রী নিজ উদ্যোগে পূজামণ্ডপগুলোতে দেওয়া সরকারি অনুদানের পরিমাণ চার কোটি টাকা থেকে বাড়িয়ে পাঁচ কোটি টাকা করেছেন।
নিরাপত্তা তদারকিতে আনসার-ভিডিপি মহাপরিচালক
শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, নির্বিঘ্ন ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপন নিশ্চিত করতে সারা দেশে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা গ্রহণ করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। এরই অংশ হিসেবে রাজধানীর ধানমন্ডি সার্বজনীন পূজা উদযাপন কমিটির পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করে নিরাপত্তা প্রস্তুতি ও মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন কার্যক্রম তদারকি করেছেন বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) পূজামণ্ডপ পরিদর্শনকালে তিনি সার্বিক নিরাপত্তাব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করেন এবং দায়িত্বরত আনসার-ভিডিপি সদস্যদের সঙ্গে মতবিনিময় করেন। এ সময় তিনি নিরাপত্তা প্রস্তুতিতে সন্তোষ প্রকাশ করেন। পাশাপাশি দায়িত্ব পালনে সর্বোচ্চ সতর্কতা, পেশাদারিত্ব ও শৃঙ্খলা বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করেন।
মহাপরিচালক বলেন, এবারের দুর্গাপূজার নিরাপত্তাব্যবস্থায় আধুনিক প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার নিশ্চিত করা হয়েছে। ‘শারদীয় সুরক্ষা অ্যাপ’-এর মাধ্যমে দায়িত্বরত সদস্যদের প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থাপনার আওতায় আনা হয়েছে। এর ফলে মাঠপর্যায়ের পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ, তথ্য আদান-প্রদান এবং দ্রুত সমন্বিত পদক্ষেপ গ্রহণ সহজ হচ্ছে।
দুর্গাপূজার নিরাপত্তায় ৬ হাজারের বেশি এসআরবি
দুর্গাপূজা ঘিরে কোনো হুমকি বা নিরাপত্তার শঙ্কা নেই বলে জানিয়েছেন স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়নের (এসআরবি) মহাপরিচালক (ডিজি) মো. আহসান হাবীব পলাশ। তিনি জানান, উৎসবের সার্বিক নিরাপত্তায় বাহিনীটির ৬ হাজারের বেশি সদস্য নিয়োজিত রয়েছেন এবং প্রতিদিন মাঠে থাকবেন প্রায় আড়াই হাজার সদস্য।
বৃহস্পতিবার (১৫ অক্টোবর) সন্ধ্যায় রাজধানীর মিরপুর কেন্দ্রীয় মন্দিরের নিরাপত্তা ব্যবস্থা পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ তথ্য জানান।
শারদীয় দুর্গাপূজা নির্বিঘ্ন, শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপনে সারা দেশে ব্যাপক নিরাপত্তা প্রস্তুতি নিয়েছে সরকার। এ বছর প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে দুর্গোৎসব আয়োজনের প্রেক্ষাপটে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি, ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং, স্বেচ্ছাসেবকদের পরিচয় যাচাই এবং নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
এসআরবি ডিজি বলেন, দেশব্যাপী পূজামণ্ডপের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমাদের ১৫টি ব্যাটালিয়নের মোট ৬ হাজারের অধিক সদস্য সার্বক্ষণিক দায়িত্ব পালন করছেন। এর মধ্যে প্রতিদিন গড়ে ২ হাজার ৪৫৭ জন সদস্য বিশেষ নিরাপত্তা ডিউটিতে নিয়োজিত থাকছেন।
গুরুত্বপূর্ণ এলাকা ও সড়কগুলোতে প্রতিদিন ৫৪৯টি পিকআপ টহল এবং ৪৪৭টি মোটরসাইকেল টহল চলমান রয়েছে বলেও জানান তিনি।
