Published on
:
4 min read
ভালোবাসার কি কোনও ধর্ম হয়? ঈশ্বরের কাছে পৌঁছনোর পথই বা আলাদা হবে কেন? কেউ তাঁকে আল্লাহ বলে ডাকেন, কেউ যিশুর কাছে প্রার্থনা করেন, কেউ আবার দুর্গা, কালী কিংবা শিবের আরাধনায় খুঁজে পান মনের শান্তি। বিশ্বাসের ভাষা আলাদা হতে পারে, কিন্তু ভালোবাসা আর মানবিকতার ভাষা তো অভিন্ন — হোক ‘যত মত, তত পথ’। সেই বিশ্বাসকেই যেন বাস্তবের মাটিতে প্রতিষ্ঠা করেছেন ভারতীয় ফুটবলের প্রাক্তন তারকা মেহতাব হোসেন (Mehtab Hossain)।
মুসলিম পরিবারের সন্তান মেহতাব হিন্দু পরিবারের মেয়ে মৌমিতার সঙ্গে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ার পর তাঁর বিশ্বাসকে আপন করে নিয়েছেন। শুধু জীবনসঙ্গী হিসেবে নয়, স্ত্রীর ধর্মীয় আবেগের সঙ্গে একাত্ম হয়ে বাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন করেন মেহতাব।
মৌমিতার কাছেও ধর্মীয় বিশ্বাস ও ধর্মাচরণের ভিন্নতা আলাদা করে চোখে পড়ে না। কারণ বিশ্বাসের ফারাক ভালোবাসার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়নি, বরং একে-অন্যের সংস্কৃতি ও আবেগকে সম্মান করার মধ্য দিয়েই তৈরি হয়েছে নতুন এক বন্ধন। বাঙালির শ্রেষ্ঠ উৎসব দুর্গাপুজো — শুধু দেবী আরাধনার উপলক্ষ নয়, দুই পরিবারের কাছাকাছি আসারও যোগসূত্রও। দুই পরিবারের সদস্য, বন্ধু, আত্মীয়স্বজন — সবাইকে নিয়ে সেই বাড়ির পুজো হয়ে ওঠে সম্প্রীতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
তবে গত দু’বছর ধরে মেহতাবদের বাড়িতে দুর্গাপুজোর আয়োজন করা সম্ভব হয়নি। গত বছর (২০২৫) মেহতাবের বাবার মৃত্যুর পরে শোকের আবহে বন্ধ ছিল পুজো। আর এ বারও অন্য এক গুরুত্বপূর্ণ কারণে পুজোর আয়োজন করা যায়নি। কিন্তু পুজো বন্ধ থাকলেও তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকা আবেগ কিংবা আগামী দিনে আবার সবাইকে নিয়ে উৎসব করার ইচ্ছেটুকু কমেনি মৌমিতার। বরং পরের বার আবার সবাইকে নিয়ে হইহই করে পুজো করার অপেক্ষায় রয়েছেন তাঁরা। মৌমিতা বলেন, ‘দু’বছর পুজো বন্ধ থাকল বলে যে সব শেষ হয়ে গেল, তা তো নয়! পরের বার আবার পুজো হবে। সবাইকে নিয়ে আগের মতো হইহই করে উৎসব করব আমরা। পরিবারের সবাই একসঙ্গে থাকব, আনন্দ করব— এটাই তো চাই।’
‘ঈশ্বরের কাছে সবাই সমান’
ধর্মীয় পরিচয়ের চেয়ে মানুষের পরিচয়ই যে বড়, সেই বিশ্বাসে বরাবর আস্থা রাখেন মেহতাব ও মৌমিতা। মেহতাবের কথায়, ‘সত্যি বলতে, ছোটবেলা থেকে আমার বাড়িতে কখনও ধর্ম নিয়ে বাড়াবাড়ি দেখিনি। আমিও কোনও দিন ধর্মকে মানুষের মধ্যে বিভেদ তৈরির মাপকাঠি হিসেবে দেখিনি। আমার জন্ম মুসলিম পরিবারে হয়েছে বলে আমার নাম মেহতাব। হিন্দু পরিবারে জন্মালে হয়তো অন্য নাম হতো। কিন্তু তাতে মানুষ হিসেবে আমার পরিচয় তো বদলে যেত না!’ এর পরেই মেহতাবের সংযোজন, ‘আমার কাছে ঈশ্বর এক। কেউ তাঁকে আল্লাহ বলে ডাকেন, কেউ যিশু বলে প্রার্থনা করেন, কেউ দুর্গা, কালী বা শিবের আরাধনা করেন। নাম আলাদা হতে পারে, বিশ্বাসের পথ আলাদা হতে পারে, কিন্তু সবার প্রার্থনার মধ্যে তো শান্তি, ভালো থাকা আর মঙ্গলের কামনাই থাকে। ঈশ্বরের কাছে সবাই সমান। তা হলে আমরা মানুষে মানুষে ভেদাভেদ করব কেন?’
কথাগুলো নিছক কোনও বার্তা নয়, মেহতাবের জীবনের বিশ্বাসও। মৌমিতা যখন বাড়িতে দুর্গাপুজো করার ইচ্ছের কথা প্রথম জানিয়েছিলেন, তখন স্ত্রীর ধর্মীয় পরিচয় কিংবা নিজের পরিবারের বিশ্বাসের সঙ্গে সেই ইচ্ছের কোনও সংঘাত খুঁজে পাননি মেহতাব। বরং প্রিয় মানুষের স্বপ্নকে সম্মান করাটাই তাঁর কাছে ছিল সবচেয়ে স্বাভাবিক সিদ্ধান্ত। মেহতাবের কথায়, ‘মৌমিতা পুজো করার কথা বলেছিল। আমি দ্বিতীয় বার ভাবিনি। ওর ইচ্ছেটাই আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমার পরিবারের লোকেরাও কোনও আপত্তি করেনি। সবাই মিলে আনন্দের সঙ্গে পুজোয় অংশ নিয়েছি। আমার মনে হয়, নিজের বাড়িতে অন্যের বিশ্বাসকে জায়গা করে দিতে পারলে কারও বিশ্বাস ছোট হয়ে যায় না। বরং পরিবারের বন্ধন আরও মজবুত হয়।’
‘আমাদের বাড়ির পুজোয় ধর্মের পরিচয় নয়, সবাই আপন’
মেহতাবের স্ত্রী মৌমিতার কাছেও এই পুজো শুধুই কয়েক দিনের উৎসব নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে নিজের শিকড়, পারিবারিক আবেগ এবং ভালোবাসার মানুষের সঙ্গে নিজের বিশ্বাস ভাগ করে নেওয়ার আনন্দ। যে বাড়িতে এক সময় পুজোর আয়োজনের কথা ভাবা ছিল স্বপ্ন, সেই বাড়িতেই দুই পরিবারের সবাইকে নিয়ে দুর্গার আরাধনা করার অভিজ্ঞতা তাঁর কাছে ভীষণই স্পেশাল এবং বড় আবেগের বিষয়। মৌমিতা বলেন, ‘আমার পরিবার আর মেহতাবের পরিবার — দু’পক্ষের সবাই মিলে পুজোর আয়োজন করতাম। কখনও মনে হয়নি, আমরা আলাদা ধর্মের মানুষ বলে এখানে কোনও সমস্যা হতে পারে। কেউ কোনও দিন আমাকে আলাদা করে দেখেননি। বরং সবাই খুব আনন্দ করে পুজোয় যোগ দিতেন। আমাদের বাড়ির পুজোয় কে হিন্দু, কে মুসলিম, সেই হিসেবটা কখনও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেনি। সবাই এসেছেন, আনন্দ করেছেন, একসঙ্গে সময় কাটিয়েছেন।’
তাঁর কথায়, ‘আমার কাছে সবচেয়ে বড় প্রাপ্তি হলো, মেহতাব আমার ইচ্ছেটাকে নিজের করে নিয়েছে। শুধু ও নয়, ওর পরিবারের মানুষও আমাকে আপন করে নিয়েছেন। একটা পুজোকে কেন্দ্র করে দুই পরিবারের এত মানুষ একসঙ্গে আনন্দ করছেন, সবাই মিলে উৎসবের আয়োজন করছেন — এর চেয়ে ভালো লাগার আর কী হতে পারে! আমাদের বাড়ির পুজোটা তাই শুধু আমাদের পরিবারের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি। জাতি-ধর্ম নির্বিশেষে সকলের মিলনমেলায় পরিণত হয়েছিল।’
একটি বাড়ির পুজো কী ভাবে অনেক মানুষের আপন হয়ে ওঠার জায়গা তৈরি করতে পারে, তারই উদাহরণ মেহতাব-মৌমিতার দুর্গোৎসব। সেখানে অঞ্জলি, প্রসাদ, উৎসবের আনন্দের পাশাপাশি জায়গা পেয়েছিল পারস্পরিক শ্রদ্ধা আর ভালোবাসা। যে উৎসবকে ঘিরে বাঙালির আবেগ বছরের পর বছর ধরে বেঁচে থাকে, সেই উৎসবই তাঁদের জীবনে হয়ে উঠেছিল দুই পরিবারের হৃদয়ের সেতু।
প্রেমের পথে বাধা ছিল, আজ দুই পরিবার এক সুতোয়
বারুইপুরের বাসিন্দা মেহতাব ও মৌমিতার প্রেমের গল্পও কম চড়াই-উতরাই পেরিয়ে আসেনি। মৌমিতা যখন কোচিংয়ে যেতেন, সেই সময়েই দু’জনের চোখা চাওয়া-চাওয়ি, ধীরে ধীরে পরিচয়, তার পর ভালো লাগা থেকে ভালোবাসা। একে-অপরকে কাছ থেকে চিনতে চিনতে কখন যে দু’জন দু’জনের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে উঠেছিলেন, তা বুঝতেই পারেননি তাঁরা। কিন্তু সম্পর্কের কথা যখন দুই পরিবার জানতে পারে, তখন পরিস্থিতি সহজ ছিল না। ভিন্ন ধর্মের দুই মানুষের সম্পর্ক মেনে নেওয়া নিয়ে তৈরি হয়েছিল নানা বাধা, আপত্তি আর মানসিক টানাপড়েন।
তবে ভালোবাসার উপর আস্থা হারাননি মেহতাব ও মৌমিতা। সব বাধা পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত একে-অপরের জীবনসঙ্গী হয়েছেন তাঁরা। আজ মৌমিতা মেহতাবের সুখ-দুঃখের সঙ্গী, তাঁর জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ। আর যে দুই পরিবারের মধ্যে এক সময় এই সম্পর্ককে ঘিরে ঝড় উঠেছিল, সময়ের সঙ্গে সেই দুই পরিবারের মধ্যেই তৈরি হয়েছে আত্মীয়তার বন্ধন। সেই বন্ধনকেই আরও দৃঢ় করেছে বাড়ির দুর্গাপুজো। একসঙ্গে উৎসব পালন, একে-অপরের আবেগকে সম্মান করা এবং পারিবারিক আনন্দ ভাগ করে নেওয়ার মধ্য দিয়ে দুই পরিবারের দূরত্ব ক্রমশ মুছে গিয়েছে। মেহতাব ও মৌমিতার কাছে তাই এই পুজো শুধু দেবী দুর্গার আরাধনা নয়, তাঁদের ভালোবাসার জয়ও।
মেহতাবের বাড়ির দুর্গাপুজো এ বার হচ্ছে না। কিন্তু এই পুজোকে ঘিরে তৈরি হওয়া সম্প্রীতির গল্প থেমে নেই। কারণ, ধর্মের পরিচয় আলাদা হলেও একসঙ্গে পথ চলার স্বপ্ন দেখতে কোনও বাধা নেই। ভালোবাসার মানুষের বিশ্বাসকে সম্মান করা, তাঁর আনন্দকে নিজের আনন্দ করে নেওয়া এবং দুই পরিবারকে এক সুতোয় বেঁধে রাখার মধ্যেই তো উৎসবের প্রকৃত সার্থকতা।