আন্তর্জাতিক ডেস্ক
সাইবার হামলার মাধ্যমে সুপারমার্কেটের ফ্রিজিং সিস্টেম অকেজো করে বিপুল পরিমাণ পচনশীল খাদ্যদ্রব্য ধ্বংস এবং জীবনযাত্রার ব্যয়বৃদ্ধির প্রতিবাদে ছড়িয়ে পড়া সহিংস দাঙ্গা-লুটপাটের ধাক্কায় ফ্রান্সে খাদ্য সরবরাহ শৃঙ্খল (ফুড সাপ্লাই চেইন) চরম সংকটের মুখে পড়েছে। দেশটির খাদ্য নিরাপত্তা ও পাইকারি-খুচরা ডিস্ট্রিবিউশন ব্যবস্থার ওপর এই দ্বিমুখী আঘাতকে নজিরবিহীন বলে অভিহিত করেছেন খাত সংশ্লিষ্টরা।
নজিরবিহীন সাইবার হামলায় খাদ্য ধ্বংস
সম্প্রতি ফ্রান্সজুড়ে প্রায় ৭০০টি সুপারমার্কেটের হিমায়ন ব্যবস্থা (রেফ্রিজারেশন সিস্টেম) লক্ষ্য করে এক বড় ধরনের সাইবার হামলা চালানো হয়েছে। হ্যাকাররা ডেনিশ সরঞ্জাম সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান ‘ড্যানফোস’ এবং মার্কিন কোম্পানি ‘কোপল্যান্ড’-এর রিমোট কন্ট্রোল সফটওয়্যারের নিরাপত্তাত্রুটি ব্যবহার করে রাতারাতি ফ্রিজারগুলোর নিয়ন্ত্রণ নেয়।
নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার পর ফ্রিজারগুলোকে ঠান্ডা রাখার বদলে কৃত্রিমভাবে টানা ৬ ঘণ্টারও বেশি সময় তাপমাত্রা ৫০ ডিগ্রি সেলসিয়াস পর্যন্ত বাড়িয়ে দেওয়া হয়। এর ফলে ইন্টারমার্শে, লিফ্লার্ক, কোঅপারেটিভ ইউ, গ্রুপমেন্ট মাসকেটিয়ার্স, ক্যারেফোরএবং মোনোপ্রির মতো প্রধান প্রধান সুপারমার্কেট চেইনের হাজার হাজার হিমায়িত ও সতেজ খাবারের মজুত পুরোপুরি নষ্ট হয়ে যায়।
বেশ কিছু স্থানে অতিরিক্ত উত্তাপের কারণে আগুনের ঘটনাও ঘটে এবং সুপারমার্কেটগুলো পচা খাবার ফেলে দিতে বাধ্য হয়, যার ফলে সার্বিক ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়ায় কোটি কোটি ইউরো। কোঅপারেটিভ ইউ-এর সিইও ডোমিনিক শেলশার এ ঘটনাকে ফরাসি জনগণের খাদ্য সরবরাহের ওপর অভূতপূর্ব আঘাত হিসেবে বর্ণনা করেছেন।
ফরাসি অর্থমন্ত্রী রোল্যান্ড লেসকিউর পার্লামেন্টে স্বীকার করেছেন যে, এ হামলা দেশের খাদ্য নিরাপত্তার মূল জায়গায় আঘাত হেনেছে।
দেশজুড়ে দাঙ্গা ও লুটপাট: ৩ হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান ক্ষতিগ্রস্ত
সাইবার বিপর্যয়ের সঙ্গেই যুক্ত হয় দেশের অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। শিক্ষাব্যবস্থার সংকট নিয়ে শিক্ষার্থীদের শুরু করা আন্দোলন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় জীবনযাত্রার আকাশচুম্বী খরচ ও জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির বিষয়ও। শিক্ষার্থী, শ্রমিক ইউনিয়ন ও কৃষকদের আন্দোলন সহিংস দাঙ্গায় রূপ নেয়। প্যারিস, মার্সেই, লিওঁ, রেন, বোর্দো ও লিমোজসহ বিভিন্ন শহরে মুখাপোশ পরা সুযোগসন্ধানীরা দোকানে হামলা চালিয়ে ব্যাপক লুটপাট ও ভাঙচুর চালায়।
ফরাসি সরকারের তথ্য অনুযায়ী, দেশজুড়ে ৩,০০০টিরও বেশি ব্যবসা প্রতিষ্ঠান লুটপাট বা ভাঙচুরের শিকার হয়েছে। অন্যতম প্রধান সুপারমার্কেট চেইন ক্যারেফোর-এর প্রধান নির্বাহী আলেকজান্দ্রে বোম্পার্ড জানান, তাদের চেইনের ১৯টি আউটলেটসহ মোট ৫০টি স্টোর সরাসরি আক্রান্ত হয়েছে এবং সার্বিকভাবে খুচরা বিক্রয় খাতের প্রায় ১,৫০০টি দোকান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। পণ্য চুরি, দোকান ভাঙচুর, অতিরিক্ত নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন এবং রাত্রিকালীন কারফিউয়ের কারণে ক্যারেফোর তাদের বার্ষিক মুনাফার লক্ষ্যমাত্রা কমাতে বাধ্য হয়েছে।
লজিস্টিকস ও পরিবহন অচলাবস্থা: থমকে গেছে লাস্ট-মাইল ডেলিভারি
দাঙ্গা নিয়ন্ত্রণে দেশটির প্রধান শহরগুলোতে কারফিউ ও জনসমাবেশে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। সড়ক অবরোধ, মেট্রো ও বাস রুট পরিবর্তন এবং কড়া নিরাপত্তার কারণে বাণিজ্যিক এলাকা ও ওয়্যারহাউসগুলোতে পণ্যবাহী যানবাহন চলাচলে জটিলতা দেখা দিয়েছে।
লজিস্টিকস বিশেষজ্ঞরা জানান, খুচরা বিক্রয়কেন্দ্র ও ডিস্ট্রিবিউশন হাবগুলোতে সময়মতো মালামাল পাঠানো কঠিন হয়ে পড়েছে। ফরাসি সড়ক নেটওয়ার্ক পুরো ইউরোপের পণ্য পরিবহনের গুরুত্বপূর্ণ সংযোগস্থল হওয়ায়, এই আঞ্চলিক পরিবহন অচলাবস্থা পুরো ইউরোপীয় সরবরাহ শৃঙ্খলেই বড় ধরণের অনিশ্চয়তা তৈরি করেছে।
সামনে এলো দুই সংকট
ফরাসি খাদ্য সরবরাহ চেইনে চলমান এই বিপর্যয় দুটি ভিন্নমাত্রিক ঝুঁকিপূর্ণ দিক উন্মোচন করেছে–
ডিজিটাল ও আইওটি নির্ভরতার ঝুঁকি: আধুনিক খাদ্য সংরক্ষণ ব্যবস্থা ইন্টারনেট-সংযুক্ত রিমোট নিয়ন্ত্রণের ওপর নির্ভরশীল। পুরোনো সফটওয়্যার আপডেট না থাকা ও সিস্টেম ইন্টারনেটে উন্মুক্ত রাখার সুযোগে কোনো শারীরিক উপস্থিতি ছাড়াই পুরো দেশের খাদ্য সঞ্চয় এক রাতে অকেজো করে দেওয়া সম্ভব হয়েছে।
ভৌত সরবরাহ ব্যবস্থার ধস: সাইবার হামলায় অভ্যন্তরীণ মজুত নষ্ট হওয়ার পরপরই রাজপথে দাঙ্গা ও পরিবহন ব্লকেড তৈরি হওয়ায় বিকল্প উৎস থেকে দ্রুত সুপারমার্কেটগুলোতে খাবার পৌঁছানোর পথ বন্ধ হয়ে যায়।
এ অবস্থায় মালামাল ধ্বংস ও নিরাপত্তার খরচ বাড়ায় সুপারমার্কেটগুলোর পরিচালনা ব্যয় বেড়ে গেছে। এর ফলে ভবিষ্যতে খুচরা পর্যায়ে খাদ্যদ্রব্যের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
কোঅপারেটিভ ইউর সিইও ডোমিনিক শেলশার বলেন, ফরাসি জনগণের খাদ্য সংরক্ষণের অত্যাবশ্যকীয় ডিভাইসে আঘাত হানা অভূতপূর্ব ও অত্যন্ত গুরুতর অপরাধ।
ফরাসি সাইবার নিরাপত্তা সংস্থা এএনসিসিআই এবং প্যারিস প্রসিকিউটর কার্যালয় বর্তমানে এ ঘটনার আন্তর্জাতিক সংযোগ ও ডিজিটাল দুর্বলতা তদন্ত করছে।
অন্যদিকে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ফুড অ্যান্ড অ্যাগ্রিকালচার কমিশনার ক্রিস্তফ হ্যানসেন উল্লেখ করেছেন, খাদ্য ব্যবস্থাকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার বা ক্ষতিগ্রস্ত করা এখন বাস্তব সত্যে পরিণত হয়েছে, যা সাইবার ও ফিজিক্যাল উভয় নিরাপত্তা জোরদারের তাগিদ দেয়।
