রাশিয়ার তেল শোধনাগারগুলোতে আবারও হামলা চালানোর ঘোষণা দিয়েছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কি। যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা তথ্য আদান-প্রদান এবং স্টারলিংক স্যাটেলাইট ইন্টারনেট সেবায় প্রবেশাধিকার সীমিত করার ঘটনায় ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেছেন, রুশ তেল শোধনাগারে হামলা বন্ধ রাখার বিধিনিষেধ আর কার্যকর নেই।
লন্ডনে ফিন্যান্সিয়াল টাইমসকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে জেলেনস্কি বলেন, তেল শোধনাগারে হামলা চালানোর ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা উঠে গেছে। আমরা আর অপেক্ষা করছি না।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে জেলেনস্কির সম্পর্কের টানাপোড়েনের মধ্যেই তাঁর এই ঘোষণা এলো। রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের জ্বালানি বাণিজ্যের উদ্যোগ এবং ইউক্রেনের রুশ জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধে মার্কিন চাপ নিয়ে প্রকাশ্যেই অসন্তোষ জানিয়ে আসছেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
গত সপ্তাহে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে জানান, রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ডিজেল সরবরাহে সম্মত হয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচনের আগে জ্বালানির দাম কমানোর উদ্যোগের অংশ হিসেবে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানান ট্রাম্প। তবে এই সিদ্ধান্ত যুক্তরাষ্ট্রের দুই প্রধান রাজনৈতিক দলের সদস্যদের সমালোচনার পাশাপাশি ইউরোপীয় মিত্রদের মধ্যেও ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
ফিন্যান্সিয়াল টাইমসের প্রতিবেদনে বলা হয়, রাশিয়ার সঙ্গে ট্রাম্পের ব্যবসায়িক সমঝোতা এবং পুতিনের প্রতি তাঁর ইতিবাচক মনোভাব নিয়ে সমালোচনা করেছেন জেলেনস্কি। ইউক্রেনের সামরিক কর্মকর্তাদের মার্কিন কর্মকর্তারা সতর্ক করে বলেছিলেন, রাশিয়ার জ্বালানি স্থাপনায় হামলা বন্ধ না করলে গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়া হতে পারে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব পিয়ার্স মরগানের ইউটিউব অনুষ্ঠানেও ট্রাম্প প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেন জেলেনস্কি। ট্রাম্প প্রশাসনের আচরণকে বিশ্বাসঘাতকতা মনে করেন কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি হ্যাঁ বলেন। রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি চুক্তিকে ক্রেমলিনের সহজ বিজয় বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
জেলেনস্কি বলেন, শক্তিশালী এক অংশীদারকে হারানো দুঃখজনক। ইউক্রেনের ভূখণ্ড, জনগণ ও শিশুদের নিরাপত্তার প্রসঙ্গ তুলে তিনি বলেন, ট্রাম্প যখন এক পক্ষকে বেছে নেন, তখন তা কষ্টদায়ক। তাঁর মতে, নিরপেক্ষ অবস্থানে থাকলে মাঝখানেই থাকতে হবে, ভুল পক্ষের দিকে যাওয়া যাবে না। এটি ইতিহাসের সঠিক পক্ষ নয়।
তিনি আরও বলেন, রাশিয়া চায় ট্রাম্প দুর্বল থাকুন। যুক্তরাষ্ট্রের নির্বাচন নিয়ে মস্কোর তেমন কোনো মাথাব্যথা নেই বলেও মন্তব্য করেন ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট।
এদিকে রাশিয়ার ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের জন্য মার্কিন গোয়েন্দা তথ্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এসব তথ্যের মাধ্যমে রুশ ক্ষেপণাস্ত্র উৎক্ষেপণস্থল, হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু ও আঘাত হানার সময় সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। তবে সম্প্রতি ক্ষেপণাস্ত্র হামলার আগাম সতর্কবার্তা কমে যাওয়ায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
ইউক্রেনের কর্মকর্তারা এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে ব্যাখ্যা চাইলে মার্কিন কর্মকর্তারা আবহাওয়াকে দায়ী করেন। তবে ইউক্রেন ও ইউরোপের কয়েকজন কর্মকর্তা সন্দেহ প্রকাশ করেছেন, গোয়েন্দা তথ্য সরবরাহে বিঘ্নটি ইচ্ছাকৃতভাবে ঘটানো হয়েছে। তাঁদের আশঙ্কা, এতে রণক্ষেত্রে রাশিয়া সুবিধা পেতে পারে।
গোয়েন্দা তথ্য নিয়ে উদ্বেগের পাশাপাশি ইলন মাস্কের মালিকানাধীন স্পেসএক্সের স্টারলিংক সেবায় বিধিনিষেধও ইউক্রেনের সামরিক কার্যক্রমে প্রভাব ফেলেছে বলে জানিয়েছেন দেশটির কর্মকর্তারা। ইউক্রেনের কর্তৃপক্ষ বলেছে, সামরিক কাজে ব্যবহৃত স্টারলিংকের উন্নত সংস্করণ স্টারশিল্ডের কিছু সেবা সীমিত করায় তারা অপ্রস্তুত অবস্থায় পড়ে।
জেলেনস্কির দাবি, স্টারশিল্ডের সেবায় বিঘ্নের সুযোগ নিয়ে রাশিয়া রাতভর ভারী হামলা চালিয়েছে। রাশিয়ার জেটচালিত শাহেদ ড্রোন প্রতিহত করতে ইউক্রেনীয় বাহিনী স্যাটেলাইট যোগাযোগব্যবস্থাটি ব্যবহার করে বলেও জানান তিনি। এই সিদ্ধান্তের কারণে বহু মানুষের প্রাণহানি ঘটতে পারে বলে সতর্ক করেন জেলেনস্কি। একই সঙ্গে সেবাটি আবার চালু করার আহ্বান জানান তিনি।
তবে মাস্ক বলেছেন, স্টারশিল্ডের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ যুক্তরাষ্ট্র সরকারের হাতে। এটির গতি বা ব্যবহার সীমিত করার সিদ্ধান্ত মার্কিন সামরিক বাহিনী ও প্রেসিডেন্টের এখতিয়ারভুক্ত। অন্যদিকে স্টারলিংক একটি বাণিজ্যিক সেবা, যা স্পেসএক্সের মালিকানাধীন ও নিয়ন্ত্রিত। তাঁর দাবি, স্টারলিংক বেসামরিক বা প্রতিরক্ষামূলক কাজে ব্যবহারের জন্য; আক্রমণাত্মক সামরিক অভিযানে এটি ব্যবহার করা অনুচিত।
এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে হোয়াইট হাউস ও পেন্টাগনের সঙ্গে যোগাযোগ করেছে সিএনএন।
এদিকে ইউরোপীয় নেতাদের সমর্থন জোরদার করতে গত এক সপ্তাহ ধরে তৎপরতা চালাচ্ছেন জেলেনস্কি। বুধবার লন্ডনে যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী অ্যান্ডি বার্নহাম ও রাজা তৃতীয় চার্লসের সঙ্গে পৃথক বৈঠক করেন তিনি। একই সময়ে রাশিয়ার ড্রোন ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ইউক্রেনের ছয় লাখের বেশি মানুষ বিদ্যুৎবিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছেন বলে জানান জেলেনস্কি।
সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোতে রাশিয়া ও ইউক্রেন—উভয় পক্ষই একে অপরের জ্বালানি অবকাঠামো লক্ষ্য করে বিমান হামলা জোরদার করেছে। তবে রণক্ষেত্রে বড় ধরনের অগ্রগতি তুলনামূলকভাবে সীমিত থাকায় জ্বালানি স্থাপনাগুলোতে হামলা এখন যুদ্ধের গুরুত্বপূর্ণ কৌশলগত অংশ হয়ে উঠেছে।
সূত্র: সিএনএন
এমএস/
