ঢাকা থেকে গাজীপুরে দ্রুত যাতায়াতের স্বপ্ন দেখিয়ে শুরু হয়েছিল বাস র্যাপিড ট্রানজিট (বিআরটি) প্রকল্প। পরিকল্পনা ছিল— বিশেষ বাসে মাত্র ২০ থেকে ৩০ মিনিটে বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরে পৌঁছানো যাবে। কিন্তু, ১৪ বছর পর সেই গণপরিবহন ব্যবস্থা চালুর বদলে প্রকল্পের বিশেষ লেন ও স্টেশন অপসারণ করে এই রাস্তাকে সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার।
এতে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে, হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত অবকাঠামোর কতটুকু কাজে লাগানো যাবে, সড়ক রূপান্তরে কত টাকা ব্যয় হবে এবং দীর্ঘসূত্রতা ও ব্যর্থতার দায় কার?
গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে ঢাকা-গাজীপুর বিআরটি প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্ত হয়। পরদিন সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের পাঠানো চিঠিতে বিআরটি করিডোরের স্টেশন ও লেন বিভাজক অপসারণ করে সড়কটিকে দুই পাশে তিনটি করে মোট ছয় লেনের সাধারণ মহাসড়কে রূপান্তরের কথা জানানো হয়। পাশাপাশি দুটি দুই লেনের ওভারপাস চার লেনে উন্নীত করার উদ্যোগ নেওয়ার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
প্রকল্পটি আনুষ্ঠানিকভাবে বন্ধ করতে উন্নয়ন সহযোগীদের সঙ্গে আলোচনা করে আইনি জটিলতা নিরসনের কথাও বলা হয়েছে।
বেড়েছে প্রকল্পের ব্যয়
২০১২ সালের নভেম্বরে জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটির (একনেক) সভায় প্রকল্পটি প্রথম অনুমোদন পায়। এর প্রাথমিক ব্যয় ধরা হয়েছিল প্রায় ২ হাজার ৪০ কোটি টাকা। পরবর্তী সময়ে তা সংশোধন করে ব্যয় নির্ধারণ করা হয় ৪ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা।
২০২৫ সালে ব্যয় বাড়িয়ে প্রায় ৬ হাজার ৫৯৭ কোটি টাকা এবং প্রকল্পের মেয়াদ ২০২৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাড়ানোর প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা অনুমোদন পায়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এ পর্যন্ত প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮১১ কোটি টাকা।
অর্থাৎ প্রাথমিক বরাদ্দের তুলনায় প্রকল্পের ব্যয় অনেক বেড়েছে। অথচ, যে বিশেষ বাসসেবা চালুর উদ্দেশ্যে প্রকল্পটি নেওয়া হয়েছিল, তা পূর্ণাঙ্গভাবে চালু হয়নি। এখন নির্মিত অবকাঠামোর একাংশ অপসারণের সিদ্ধান্তে নতুন করে ব্যয় ও সম্পদের ব্যবহার নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
অবকাঠামোর কতটুকু কাজে লাগবে
ঢাকার বিমানবন্দর থেকে গাজীপুরের শিববাড়ী পর্যন্ত প্রায় ২০ কিলোমিটার করিডোরে সড়কের মাঝখানে বিশেষ বাস চলাচলের জন্য পৃথক লেন এবং যাত্রী ওঠানামার জন্য স্টেশন নির্মাণ করা হয়। নির্দিষ্ট বাস লেন ও আধুনিক টিকিটিং ব্যবস্থার মাধ্যমে দ্রুত যাতায়াত নিশ্চিত করাই ছিল প্রকল্পটির মূল লক্ষ্য।
কিন্তু, নির্মাণকাজ দীর্ঘায়িত হওয়ায় প্রত্যাশিত সুফল মেলেনি। বিভিন্ন স্থানে স্টেশন অসমাপ্ত থাকার পাশাপাশি যাত্রীদের ওঠানামার জন্য নির্মিত পদচারী সেতুর লিফট ও চলন্ত সিঁড়ির ব্যবহার নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। সড়কের মাঝখানে স্থাপিত কংক্রিটের বিভাজক ও লোহার প্রতিবন্ধক কিছু জায়গায় চলাচলের পরিসরও সংকুচিত করেছে।
এখন এসব স্থাপনা অপসারণ করে সাধারণ মহাসড়ক নির্মাণের সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নে কোন অবকাঠামো রাখা হবে, কোনটি ভাঙতে হবে এবং ওভারপাস কীভাবে সম্প্রসারণ করা হবে, তার কারিগরি ও আর্থিক হিসাব প্রয়োজন। একইসঙ্গে পথচারী পারাপার, পানি নিষ্কাশন, বাস থামার স্থান ও নিরাপদ চলাচলের ব্যবস্থাও নিশ্চিত করতে হবে।
দুর্ভোগের অবসান চান যাত্রীরা
গাজীপুরের চান্দনা চৌরাস্তা দীঘিরচালা এলাকার বাসিন্দা মোহাম্মদ আবু হানিফা এই প্রতিবেদককে বলেছেন, “বিআরটি প্রকল্পের কাজের কারণে বছরের পর বছর যানজটে আটকে থাকতে হয়েছে। ভেবেছিলাম, কাজ শেষ হলে দ্রুত যাতায়াত করতে পারব। এখন শুনছি, প্রকল্পই বন্ধ করে দেওয়া হচ্ছে। এত বছর মানুষের কষ্ট আর এত টাকা খরচের পরিণতি কী হলো, সেটাই জানতে চাই।"
স্থানীয় বাসিন্দা ও রোটারি ক্লাব অব গাজীপুরের (বনরূপা) সাবেক সভাপতি মো. মাসুম বিল্লাহ বলেন, “বিশেষ বাস চলবে নাকি সাধারণ বাস চলবে, তা নিয়ে আমরা পড়ে নেই। আমাদের দরকার সময়মতো গন্তব্যে পৌঁছানো। অফিস বা কারখানায় যেতে প্রতিদিন কত সময় নষ্ট হয়, তা ভুক্তভোগীরাই জানেন। নতুন সিদ্ধান্তে সত্যিই যানজট কমে কি না, সেটাই দেখতে চাই।”
প্রকল্প বন্ধের পরও রয়ে গেছে প্রশ্ন
বিআরটি পরিচালনার জন্য গঠিত ঢাকা বাস র্যাপিড ট্রানজিট কোম্পানি বন্ধ করে এর কার্যক্রম সড়ক ও জনপথ অধিদপ্তরের (সওজ) আওতায় নেওয়ার প্রস্তাবও মন্ত্রিসভায় গৃহীত হয়েছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে ১৫ দিনের মধ্যে অগ্রগতি প্রতিবেদন দিতে এবং কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতি মাসের ৩ তারিখের মধ্যে অগ্রগতি জানাতে বলা হয়েছে।
গাজীপুর সড়ক বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী তানভীর আহমেদ জানিয়েছেন, এ বিষয়ে তারা এখনো লিখিত নির্দেশনা পাননি। আনুষ্ঠানিক চিঠি পেলে সে অনুযায়ী কার্যক্রম নেওয়া হবে।
তবে প্রকল্প বন্ধের সিদ্ধান্তের পরও ব্যয় বৃদ্ধি, দীর্ঘসূত্রতা, নকশাগত ত্রুটি ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে ওঠা প্রশ্নগুলোর নিষ্পত্তি জরুরি হয়ে পড়েছে। একইসঙ্গে নির্মিত অবকাঠামোর ভবিষ্যৎ ব্যবহার এবং নতুন সড়ক নির্মাণে সম্ভাব্য ব্যয়ের হিসাবও প্রকাশ করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের পর গাজীপুরবাসীর প্রত্যাশা, নতুন পরিকল্পনা যেন শুধু সড়কের লেন বাড়ানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং যানজট কমানো, গণপরিবহন উন্নয়ন ও নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়।
