নীলকণ্ঠ পাখিকে মহাদেবের দূত বলা হয়। লোকবিশ্বাস, এই পাখি কৈলাসে গিয়ে পার্বতীর মর্ত্য থেকে রওনা হওয়ার খবর মহাদেবকে দিয়ে থাকে। ইতিমধ্যেই রওনা দিয়েছেন মা! কিন্তু সেই খবর কৈলাসে মহাদেবের কাছে পৌঁছবে কে? বঙ্গে যে উল্লেখযোগ্য ভাবে কমেছে নীলকণ্ঠ পাখি! যে পশ্চিমাঞ্চলে এ পাখির ছড়াছড়ি ছিল। শরৎ এলেই আরও বেশি ভাবে দেখা মিলতো। এখন সেই ছবিও উধাও। তাই রাজবাড়ি-সহ বনেদি বাড়ি গুলিতে দশমীতে নীলকণ্ঠ পাখি ওড়ানোর রীতিতে কাটছাঁট হয়ে গিয়েছে। যদিও বন্যপ্রাণ সংরক্ষণ আইনে বনদপ্তরের পদক্ষেপে ওই রীতি থেকে পিছু হঠতে বাধ্য হয়েছে ওই পরিবারগুলি। পাখি নিয়ে গবেষণা করা মানুষজন বলছেন, এক দশকের বেশি সময় ধরে এই পাখি কমতে শুরু করেছে। কমার সংখ্যাটা কম বেশি ৫০ শতাংশ। তবে শুধু নীলকণ্ঠ নয়। চড়ুই, ধনেশ, মদনটাকের মতো অনেক পাখিই কমছে এই বাংলায়।
কেন বিপন্ন নীলকণ্ঠ? পাখির ছবি তোলা বা নানান পক্ষী নিয়ে কাজ করা মানুষজনের কথায়, নীলকণ্ঠ কমে যাওয়ার প্রাথমিক কয়েকটি কারণ সামনে এলেও এখনও সুনির্দিষ্ট তথ্য মেলেনি। ‘স্টেট অব ইন্ডিয়াস বার্ড-২০২৩’-র কাছে বিভিন্ন পাখি নিয়ে নানান রিপোর্ট জমা পড়লেও নীলকণ্ঠ-র বিপন্নতা নিয়ে সেভাবে অনুসন্ধান রিপোর্ট জমা পড়েনি। তবে পক্ষী গবেষকদের কথায়, ধানের জমি, বৈদ্যুতিক তারের উপর বসে থাকা এই পাখি পড়েছে খাদ্য সঙ্কটে। চাষের জমিতে অতিমাত্রায় কীটনাশক ব্যবহারের ফলে পোকা মাকড়, কীটপতঙ্গ কমেছে। ফলে এই পাখি খাবারের অভাবে পড়েছে। কারণ, নীলকণ্ঠ সাধারণভাবে এই পোকামাকড় খায়। নগরায়ণে কেটে ফেলা হচ্ছে বড় বড় গাছ। ফলে তাদের আবাস নিয়েও বিপন্ন তারা। এছাড়া মোবাইল টাওয়ার অন্যতম কারণ। মোবাইল টাওয়ার থেকে নির্গত বিকিরণের ফলে রীতিমতো প্রজনন ক্ষমতা হারাচ্ছে এই পাখি। এমনকি তড়িৎ চুম্বকীয় ক্ষেত্রের মধ্যে পড়ে পাখির ডিম ফুটতেও সমস্যা হচ্ছে বলে প্রাথমিকভাবে মনে করছেন পাখি নিয়ে কাজ করা গবেষকরা।
তবে শুধু নীলকণ্ঠ পাখি নয়। দেশের বিভিন্ন শহর, গ্রাম, বনাঞ্চলে পক্ষীকুলের উপরে তড়িৎ চুম্বকীয় বিকিরণের প্রভাব যাচাই করতে ঘরের আনাচে কানাচে ঘুরে বেড়ানো চড়ুই-র উপর সমীক্ষা চালিয়েছিলেন গবেষকরা। সেই গবেষণায় দেখা গিয়েছে মোবাইল টাওয়ার যত বেড়েছে ততই কমেছে বিভিন্ন পাখির সংখ্যা। যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য ভাবে রয়েছে নীলকন্ঠ। তবে শুধু এ দেশে নয় পশ্চিমের দেশগুলোতেও পাখি কমে যাওয়ার অন্যতম কারণ ওই টাওয়ার। আন্তর্জাতিক সমীক্ষাতেও এই চাঞ্চল্যকর তথ্য উঠে এসেছে। পুরুলিয়া বনবিভাগের ডিএফও অঞ্জন গুহ বলেন, “নানান কারণে বিভিন্ন পাখির সংখ্যা কমছে। তার মধ্যে নীলকণ্ঠ পাখি রয়েছে। বিভিন্ন পর্যবেক্ষণ ও রিপোর্ট থেকে আমরা পদক্ষেপ নিচ্ছি।” পাখি নিয়ে কাজ করা শহর পুরুলিয়ার বাসিন্দা আলোকচিত্রী বরুণ রাজগড়িয়া বলেন, “২০১২-১৩ সাল পর্যন্তও পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলিতে নীলকন্ঠ পাখি ব্যাপকভাবেই দেখা যেত। কিন্তু তারপর থেকে কমতে শুরু করেছে।”
নীলকন্ঠ পাখিকে মহাদেবের দূত বলা হয়। লোকবিশ্বাস এই পাখি কৈলাসে গিয়ে পার্বতীর মর্ত্য থেকে রওনা হওয়ার খবর মহাদেবকে দিয়ে থাকে। আবার রামায়ণ অনুযায়ী রাবণ বধের আগে নীলকন্ঠ পাখির দর্শন পেয়েছিলেন রামচন্দ্র।
একনজরে মহাদেবের দূত
- ইংরেজি নাম-ইন্ডিয়ান রোলার
- বৈজ্ঞানিক নাম-Coracias benghalensis
- খাদ্য তালিকায় পোকামাকড় রয়েছে বলে ‘কৃষকবন্ধু’ নামে পরিচিত
- আবাসস্থল ভারতীয় উপমহাদেশ
- ২৫-৩৫ সেমি লম্বা
