ফ্র্যাঞ্চাইজির আগের সব সিরিজ ও ফিল্মকে ছাপিয়ে গেল ‘দ্য একেন : কেরালায় কুরুক্ষেত্র’। লিখছেন দেবত্রী ঘোষ
পুরুলিয়ার এক আশ্রমে হঠাৎ উধাও হয়ে যাওয়া পান্নার হার খুঁজে দিয়ে সদ্য রহস্যের সমাধান সেরেছে ‘একেনবাবু’। কলকাতা ফিরে যাওয়ার আগে, ফুরফুরে মেজাজে বাংলার পশ্চিমি অঞ্চলের শোভা ভোগ করছিল থ্রি মাস্কেটিয়ার্স। আর সেই সুযোগেই কারা যেন গাড়ি থামিয়ে আচমকাই তুলে নিয়ে গেল একেনকে। বাপি আর প্রমথ হকচকিয়ে গিয়ে, তারপর ধাওয়া করেও ধরতে পারল না তাদের। কাট টু : সিরিজ শেষেই আভাস ছিল একেনবাবুকে (অনির্বাণ চক্রবর্তী) অপহরণকারীরা কোথায় নিয়ে গিয়ে থাকতে পারে, আর পরের অ্যাডভেঞ্চার ভারতের কোন রাজ্যে হতে চলেছে। সেই কথামতোই পরিচালক জয়দীপ মুখোপাধ্যায় পুজোর ছুটিতে বড় পর্দায় এনে ফেললেন বর্তমানের আট থেকে আশির প্রিয় গোয়েন্দা একেনকে। তার কাণ্ডকারখানা তথা রকমারি কেলেঙ্কারির ঝুড়ি এবার কেরলের প্রেক্ষাপটে।
ছবি শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা যায়, একেনকে তুলে এনেছিল অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের লোকেরা। আর একেনের খোঁজে তার দুই শাগরেদ বাপি (সুহোত্র মুখোপাধ্যায়) আর প্রমথও (সোমক ঘোষ) এসে পড়েছে কোচিতে।
এই ছবির গল্প শুরু থেকেই গতি নিয়েছে। কোচি বিমানবন্দর থেকে বেরনোর প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বিজ্ঞানী মিহির সেনকে (কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়) অপহরণ করে নেয় ‘আবু ঘানি’ দলের দুষ্কৃতীরা। সেই দলের মাথা ইরফান ফাজিল (ঋত্বিক চক্রবর্তী)। নামে ফাজিল থাকলেও সে যে সব কাজের সঙ্গে যুক্ত, তাতে ফাজলামি নেই একফোঁটাও। এখন এই মিহির সেন অপহরণের সঙ্গে একেনবাবুর অপহরণের কোনও যোগসূত্র আছে কি! আর সেই যোগসূত্রেই লুকিয়ে আছে এই গল্পের আসল টুইস্ট। ছবি শুরুর কিছুক্ষণের মধ্যেই বোঝা যায়, একেনকে তুলে এনেছিল অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের লোকেরা। আর একেনের খোঁজে তার দুই শাগরেদ বাপি (সুহোত্র মুখোপাধ্যায়) আর প্রমথও (সোমক ঘোষ) এসে পড়েছে কোচিতে। অ্যান্টি টেররিস্ট স্কোয়াডের মাথা সুমন্ত (সুব্রত দত্ত) একেনবাবুর সাহায্য চায় ইরফান ফাজিলকে বন্দি করার জন্য। কিন্তু সেটা করতে গেলে অনেকটাই ঝুঁকি নিতে হবে দর্শকের প্রিয় গোয়েন্দাকে। এখন দেখার একেন তার প্রত্যুৎপন্নমতিত্ব এবং অ্যাকশনের জোরে কতদূর যেতে পারে।
কেরলের মতো নয়নাভিরাম রাজ্যে কখনও কোচি থেকে আলেপ্পির ব্যাকওয়াটার, আবার কখনও পেরিয়ার নদীর তীর থেকে মুন্নারের জলপ্রপাত – এই সব জায়গায় ঘুরে তবেই মিলেছে ধাঁধার চাবিকাঠি।

প্রথম থেকেই উত্তেজনায় ভরপুর এই ছবিতে রয়েছে বেশ কিছু জটিলতা। একেনবাবুর এই রহস্য সমাধান কিন্তু সহজ নয়। অনেকগুলো প্রশ্নের সম্মুখীনও হতে হয় তাকে। যেমন ‘নিউক্লিয়ার সিমুলেশন’ আসলে কী? তার সঙ্গে হরপ্পার শিলালিপির-ই বা যোগসূত্র কী? ইরফান কেনই বা মিহির সেনকে ধরে নিয়ে গেল? সে কেন ‘অপারেশন আতিশ’ করার জন্য মুখিয়ে আছে? গোড়া থেকে মনযোগ দিয়ে না দেখলে দর্শক বেশ কিছু গুরুত্বপূর্ণ অংশ মিস করে যাবেন। এছাড়া একেনবাবুর জনপ্রিয় ত্রয়ীর সঙ্গে এই ছবিতে জুড়ে গিয়েছে ঋত্বিক চক্রবর্তী, রাইমা সেন, কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়ের মতো বেশ কিছু অভিজ্ঞ অভিনেতা। তাঁদের প্রত্যেকের চরিত্র এই গল্পের জরুরি অংশ। কেরলের মতো নয়নাভিরাম রাজ্যে কখনও কোচি থেকে আলেপ্পির ব্যাকওয়াটার, আবার কখনও পেরিয়ার নদীর তীর থেকে মুন্নারের জলপ্রপাত – এই সব জায়গায় ঘুরে তবেই মিলেছে ধাঁধার চাবিকাঠি।
একেন-সুলভ রহস্য সমাধানের ভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে চিরাচরিত ইয়ার্কি-ঠাট্টা, ভুলভাল প্রবাদ বলার মজা তো রয়েছেই, সেই সঙ্গে টানটান অ্যাকশন এবং মালয়ালম ভাষাও বলতে শোনা যাবে অনির্বাণকে।

সুজন দাশগুপ্তর ‘একেনবাবু’ সিরিজের এই গল্পকে চিত্রনাট্যের রূপ দিয়েছেন পদ্মনাভ দাশগুপ্ত। তিনিও রয়েছেন ছোট্ট একটি চরিত্রে। গল্পে আগাগোড়াই থ্রিলের বাঁধুনি শক্ত থেকেছে। সেই সঙ্গে, এই ছবিতে অনির্বাণ চক্রবর্তীকে অ্যাকশনে সক্রিয় হতে দেখা গিয়েছে। অ্যাকশন পরিচালক রাজেশ কন্নন সেগুলির যথাযথ রূপ দিয়েছেন। একেন ফ্র্যাঞ্চাইজির অন্যান্য ছবি ও সিরিজের তুলনায় এই গল্পে দর্শকের পাওনার ঝুলিতে থাকছে অনেক বেশি কিছু। একেন-সুলভ রহস্য সমাধানের ভঙ্গির সঙ্গে সঙ্গে চিরাচরিত ইয়ার্কি-ঠাট্টা, ভুলভাল প্রবাদ বলার মজা তো রয়েছেই, সেই সঙ্গে টানটান অ্যাকশন এবং মালয়ালম ভাষাও বলতে শোনা যাবে অনির্বাণকে। তিনিই যে এই ছবির চুম্বক, তাতে সন্দেহের অবকাশ নেই। তাঁর ‘দুই নয়নের মণি’ বাপি (সুহোত্র) ও প্রমথ (সোমক) তাঁকে যোগ্য সঙ্গত দিয়েছেন বরাবরের মতো। বিশেষ করে বাপি চরিত্রে সুহোত্রর অনায়াস অভিনয় নজর কাড়ে। সোমক-ও সাবলীল। তবে একেনবাবু সিরিজের এই কিস্তিতে দারুণ পাওনা ইরফান ফাজিলের চরিত্রে ঋত্বিক চক্রবর্তীর অভিনয়। আগাগোড়া ভিলেনের চরিত্রে সংযত অভিনয় তাঁর। স্বল্প পরিসরে রাইমা সেন চমক দেন। অম্বরীশ ভট্টাচার্য ও কমলেশ্বর মুখোপাধ্যায়কে ভালো লাগে।
টুবানের ক্যামেরায় কেরালার বৈচিত্রময় সৌন্দর্য ধরা পড়েছে। ছবি দেখতে দেখতে বেড়ানো হয়ে যাবে। গল্পের সঙ্গে পরিচালকের করা র্যাপ ও শুভদীপ গুহর আবহসংগীত দিব্যি খাপ খেয়ে গিয়েছে। প্রায় দু’ঘণ্টার এই ছবির গতি টানটান রাখার জন্য জয়দীপ মুখোপাধ্যায়ের প্রশংসা প্রাপ্য। পুজোর মরশুমে খুদে থেকে প্রাপ্তবয়স্ক- সকলেই একেন-ম্যাজিকে মত্ত হবেন বলেই আশা করা যায়। আর এই ছবি দেখার পর, পর্দায় খুকুকে দেখার দাবি যে আরও বাড়বে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই।
