বাংলাদেশের অন্যতম ইসলামী ব্যক্তিত্ব, পীর ও ধর্ম সংস্কারক হজরত মাওলানা মুহম্মদ আযীযুর রহমান নেছারাবাদী, কায়েদ সাহেব হুজুর (রহ.) প্রতিষ্ঠিত ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসার প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়েছে।
শুক্রবার (১৬ অক্টোবর) গাজীপুরের পূবাইলে আপন ভূবন রিসোর্টে এই পুনর্মিলনী অনুষ্ঠিত হয়। মাদরাসার প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সংগঠন ফ্রেন্ডস অ্যাসোসিয়েশন অব এনএস ফ্যামিলি (ফ্যানস ফ্যামিলি) এই পুনর্মিলনীর আয়োজন করে।

অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য ও বিএনপির জাতীয় ধর্মবিষয়ক সম্পাদক রফিকুল ইসলাম জামাল। প্রধান বক্তা ছিলেন ইসলামী আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান। বিশেষ অতিথি ছিলেন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটি সদস্য ও গভর্নর এবং ধর্মবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের অধীনে ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশের বোর্ড অব গভর্নরসের গভর্নর আলহাজ মাও. শাহ্ মো. নেছারুল হক, ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসার সাবেক অধ্যক্ষ আবু জাফর মো. সালেহ চাঁদপুরী। এ ছাড়া মিছবাহুল উলুম কামিল মাদরাসা ঢাকার অধ্যক্ষ ড. মহিউদ্দিন আহমদসহ ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসার সাবেক ও বর্তমান শিক্ষার্থীবৃন্দ উপস্থিত ছিলেন।
গুরুত্বপূর্ণ বক্তব্য দেন পুনর্মিলনী বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক হাজি সিদ্দিকুর রহমান এবং সদস্যসচিব ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. আরিফুর রহমান। এ ছাড়া এনএস কামিল মাদরাসার বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। পুনর্মিলনীতে উপস্থিত ছিলেন মাদরাসার দেড় সহস্রাধিক শিক্ষক-শিক্ষার্থী। দিনভর নানা অনুষ্ঠান ও আনন্দ-উৎসবে মুখর ছিল আয়োজন। পাশাপাশি, এনএসের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীদের সঙ্গে দেশের খ্যাতিমান বিনোদনশিল্পীরাও এ আয়োজনে তাদের পরিবেশনা তুলে ধরেন।

ঝালকাঠি-১ আসনের সংসদ সদস্য রফিকুল ইসলাম জামাল বলেন, ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসাটি ঝালকাটি জেলায় হওয়ায় এবং আমি ঝালকাটি জেলার একজন সদস্য হওয়ায় গর্ববোধ করছি। ইসলাম শিক্ষায় বাংলাদেশে এই প্রতিষ্ঠানটি অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে।
‘আল-ইত্তেহাদ মায়াল ইখতেলাফ’ তথা ‘মতানৈক্যসহ ঐক্য’ নীতির প্রবর্তক হজরত কায়েদ সাহেব হুজুর (রহ.)-এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে তিনি বলেন, আমরা ঝালকাঠির লোক খুব বেশি গর্বিত, কারণ হুজুরের মতো একজন মানুষকে পেয়েছি। সবসময় বিপদে যাকে আমারা স্মরণ করতাম, যার কাছে গেলে অনেক বিপদের মধ্যেও সান্ত্বনা পেতাম, তার দোয়া নিতাম। তার আদর্শ ধারণ করা ঐতিহ্যবাহী এই প্রতিষ্ঠানের অনেক শিক্ষার্থীই বাংলাদেশের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে আছেন এবং ইসলামী শিক্ষাসহ ধর্মীয় মূল্যবোধের একটি দেশ গড়ার জন্য কাজ করে যাচ্ছেন।

সবাইকে ঐক্যবদ্ধ থাকার আহ্বান জানিয়ে তিনি আরও বলেন, আপনারা যারা আজকে অরাজনৈতিক আদর্শ ধরে রেখে হজরত কায়েদ সাহেব হুজুরের (রহ.) জীবনের আদর্শ বাস্তবায়ন করার জন্য ওই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান থেকে শিক্ষা নিয়েছেন। আপনারা হুজুরের আদর্শ ধারণ করে বাংলাদেশের মুসলিম উম্মাহকে শক্তিশালী করার জন্য সবাই ঐক্যবদ্ধ থাকবেন।
শিক্ষার্থীদের পাশে থাকার ওয়াদা করে এই সংসদ সদস্য বলেন, জনগণের নির্বাচিত একজন প্রতিনিধি হিসেবে বাংলাদেশ সরকারের কাছ থেকে আপনাদের যে কোনো প্রয়োজন যদি আপনারা আমাকে জানান, হজরত কায়েদ সাহেব হুজুরের (রহ.) আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য আপনারা যে পদক্ষেপ নেবেন, তা বাস্তবায়নের জন্য আমি আমার সর্বোচ্চ চেষ্টা করব। আমি আপনাদেরকে সফল করার চেষ্টা করব, ইনশাআল্লাহ।
পরিশেষে বলতে চাই, এই পুনর্মিলনী আগামীতে মহামিলনে আপনারা ঐক্যবদ্ধ হবেন। এ বছর দাওয়াত দিয়েছেন আনন্দিত হয়েছি, বারবার নিমন্ত্রণ করলে আমি আপনাদের পাশে থাকার ওয়াদা করছি।
ইসলামী আরবী বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইস চ্যান্সেলর প্রফেসর ড. মোহাম্মদ আবু জাফর খান বলেন, আজকে এই অনুষ্ঠানে এসে আমি এতটাই সমৃদ্ধ হয়েছি, একটি কাজ যদি নিখুঁত হয় ও আল্লাহকে রাজি-খুশির জন্য হয়, তাহলে আল্লাহওয়ালাদের বাগান পরিপূর্ণ হয়ে যায়।
তিনি বলেন, অ্যাডভোকেট আরিফের নেতৃত্বে আজকে ভিন্ন একটি চিত্র দেখে গেলাম নেছারাবাদের ছাত্ররা উদ্যোক্তা। এই অনুষ্ঠানে স্পন্সর করে অনুষ্ঠানটিকে সাফল্যমন্ডিত করতে আপ্রাণ চেষ্টা করেছেন নেছারাবাদের এক পাল শিল্প উদ্যোক্তা।
তিনি আরও বলেন, আমি আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে শুকরিয়া আদায় করছি, নেছারাবাদের অনেক শিক্ষার্থী বিভিন্ন পাবলিক বিশ্ববিদ্যালযয়ে শিক্ষকতায় যুক্ত আছেন। অনেক শিক্ষার্থী ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার ও বিসিএস অফিসার। এ ছাড়া, আপনারা যারা উদ্যোক্তা হিসেবে হুজুরকে সামনে রেখে এই বৈশ্বিক জীবনে এগিয়ে যাচ্ছেন নিঃসন্দেহে এটি নেছারাবাদের একক কৃতিত্ব নয়, এর সঙ্গে শিক্ষকদের অক্লান্ত পরিশ্রম জড়িত। সেইসব নিবেদিত শিক্ষকরাই আমাদের তৈরি করেছেন। আজকের এই দিনে তাদের স্মরণ করছি।
মোহাম্মদ আবু জাফর খান বলেন, আমার মনে হয় এই অনুষ্ঠানটি এক সময় হাজার হাজার ছাড়িয়ে যাবে। একটি অনুরোধ করতে চাই, আপনারা যারা এগিয়ে এসেছেন। এই প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে ত্যাগ-তিতিক্ষায় সম্পৃক্ত হয়েছেন, আমি বিশ্বাস করি আল্লাহ আপনাদের প্রত্যেকের দান-অনুদানকে কবুল করবেন। আমিও বাংলাদেশের সব ফাজিল-কামিল মাদরাসায় আলেম তৈরিতে ব্রত থাকতে পারি, সেই আশাবাদ ব্যক্ত করছি।
সবশেষে তিনি বলেন, ধন্যবাদ যারা এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছেন। অ্যাডভোকেট আরিফুর রহমানসহ সবাই অক্লান্ত পরিশ্রম করেছেন। নিজের দায়িত্বের পাশাপাশি এরকম একটি প্রোগ্রাম আয়োজন করা, মাসব্যাপী পরিশ্রম করে সবাইকে সুসংগঠিত করা। কে খেলো কে খেলো না, কে আসলো কে আসলো না-এই সবকিছু করতে যদি আমরা বিবেচনায় রাখি, যে কোনো ত্রুটি-বিচ্যুতি দেখব না। বছরে একবার বা দুই বছরে একবার হলেও আবার নেছারাবাদকে উজ্জীবিত করব। সারা বাংলাদেশসহ বিশ্বের নানা প্রান্তে ছড়িয়ে দেবো নেছারাবাদ।
পুনর্মিলনী বাস্তবায়ন কমিটির আহ্বায়ক সিদ্দিকুর রহমান বলেন, ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থী এবং অন্যান্য যারা শুভাকাঙ্ক্ষী আছেন তাদের নিয়ে একটি ফাউন্ডেশন গঠন করে ফ্রেন্ডস ফ্যামিলিকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার চেষ্টা করব। এর পাশাপাশি একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলারও উদ্যোগ নেব। এ বিষয়ে একটি ফরম সবাইকে দেওয়া হয়েছে। যারা আগ্রহী তারা ফরমটি পূরণ করে মতামত জানাবেন।
পুনর্মিলনী বাস্তবায়ন কমিটির সদস্যসচিব ও সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল অ্যাডভোকেট মো. আরিফুর রহমান বলেন, ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থীদের জনপ্রিয় এই সংগঠন ফ্যানস ফ্যামিলি দিন দিন তার লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। সংগঠনটির প্রতিটি অনুষ্ঠানে হাজার হাজার শিক্ষার্থী সাড়া দিয়ে একত্রিত হচ্ছেন। যার মাধ্যমে প্রমাণিত হচ্ছে, ফ্যানস ফ্যামিলি ঝালকাঠি এন এস কামিল মাদরাসার সাবেক শিক্ষার্থীদের একটি আস্থা ও ভালোবাসার প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, এ বছর প্রায় ১৫০০ শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করেছেন। নির্ধারিত সময়ের পরে রেজিস্ট্রেশন বন্ধ করে দেওয়ায় অনেক শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করতে পারেননি। তবে আগামীতে আমরা আরও বড় আকারে এই প্রোগ্রামের আয়োজন করবো।
সংগঠনের ভবিষৎ পরিকল্পনা নিয়ে তিনি বলেন, ফ্যানস ফ্যামিলিকে একটি ফাউন্ডেশনে রূপান্তরিত করে আত্মমানবতার সেবামূলক কাজ করতে চাই। সারা দেশে বিভিন্ন শিক্ষা সহায়ক কার্যক্রম- আর্থিক প্রতিষ্ঠান, দাতব্য প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, স্কুল-কিন্ডার গার্ডেন ও মসজিদ-মাদরাসাসহ বিভিন্ন কাজে ভূমিকা রাখার জন্য চেষ্টা করব। এ ছাড়া প্রতিবছর নির্দিষ্ট একটি সময়ে আমরা এই পুনর্মিলনীর আয়োজন করব।
এদিন ঝালকাঠি এনএস কামিল মাদরাসার বিভিন্ন ব্যাচের প্রাক্তন ও বর্তমান শিক্ষার্থীরা অনুষ্ঠানে অংশ নেন। তারা এনএস কামিল মাদরাসার বিভিন্ন স্মৃতিচারণে ফিরে যান ক্যাম্পাসের দিনগুলোর স্মরণে। মরহুম শিক্ষক ও ছাত্রদের মোনাজাতের মাধ্যমে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘটে।
