মোঃ সারোয়ার পারভেজ বাবু নেত্রকোনা
২৪ অক্টোবর ২০২৬, ১৮:৫১ পিএম
একদিকে সীমান্তঘেঁষা পাহাড়, সাদামাটির টিলা, পাহাড়ি নদী ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতি; অন্যদিকে দিগন্তজোড়া হাওর, বর্ষার অথৈ জলরাশি, শীতের অতিথি পাখি আর হেমন্তের সোনালি ধানখেত। প্রকৃতির এমন বিচিত্র সৌন্দর্য ছড়িয়ে রয়েছে নেত্রকোনার দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরী উপজেলায়। যথাযথ পরিকল্পনা, অবকাঠামো উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এই তিন উপজেলাকে পর্যটনকেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা গেলে বদলে যেতে পারে জেলার অর্থনৈতিক চিত্র। সৃষ্টি হতে পারে কর্মসংস্থানের নতুন সুযোগ, সম্প্রসারিত হতে পারে স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্য। তবে বিপুল সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও যোগাযোগসংকট, পর্যাপ্ত পর্যটনসুবিধার অভাব, অপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা ও সরকারি উদ্যোগের ধীরগতিতে এখনো বিকশিত হয়নি এ অঞ্চলের পর্যটনশিল্প।
দুর্গাপুরের প্রধান আকর্ষণ বিজয়পুরের সাদামাটির পাহাড়, গারো পাহাড়ের পাদদেশ, সোমেশ্বরী নদী, বিরিশিরি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কালচারাল একাডেমি, সুসং রাজবাড়ি, রানীখং মিশন, কমলা রানীর দিঘি ও হাজং মাতা রাশিমণির স্মৃতিসৌধ। বিশেষ করে বিজয়পুরের সাদামাটির রঙিন টিলা ও খননকাজে সৃষ্ট নীল পানির লেক পর্যটকদের কাছে অনন্য আকর্ষণ।
এ ছাড়া লক্ষ্মীপুরের গারো পাহাড় ও ঐতিহ্যবাহী বটতলা, রংধনু পর্যটন স্পট এবং পাহাড়ে ট্রেকিংয়ের সুযোগ দুর্গাপুরের পর্যটন আকর্ষণকে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে। পাহাড়, নদী, খনিজসম্পদ ও নৃ-সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের সমন্বয়ে দুর্গাপুর হতে পারে দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় প্রকৃতিনির্ভর পর্যটন গন্তব্য।
তবে এ অঞ্চলের পরিবেশ সংরক্ষণ বড় চ্যালেঞ্জ। সাদামাটি উত্তোলন, পাহাড়ের প্রাকৃতিক গঠন পরিবর্তন এবং সোমেশ্বরী নদীতে অপরিকল্পিত বালু-পাথর উত্তোলন পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলছে। ফলে পর্যটন বিকাশের পাশাপাশি পাহাড়, নদী ও খনিজ এলাকার প্রাকৃতিক ভারসাম্য রক্ষা জরুরি।
দুর্গাপুরের পাশের সীমান্তবর্তী উপজেলা কলমাকান্দাও প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে সমৃদ্ধ। ভারতের মেঘালয় পাহাড়ের পাদদেশে অবস্থিত এ উপজেলার রংছাতি, লেংগুরা ও খারনৈ ইউনিয়নের পাহাড়ি জনপদ পর্যটকদের আকর্ষণ করার মতো অসাধারণ প্রাকৃতিক বৈশিষ্ট্য ধারণ করে।
বিশেষ করে রংছাতি ইউনিয়নের পাঁচগাঁও গ্রামের চন্দ্রডিঙ্গা পাহাড়, লেংগুরা টিলা, গারো পাহাড়ের দৃশ্য, পাতলা বন এবং ফুলবাড়ী এলাকার সাত শহীদের সমাধি উল্লেখযোগ্য দর্শনীয় স্থান। পাহাড়ি পরিবেশ, সবুজ বনভূমি, সীমান্তবর্তী গ্রামীণ জীবন ও প্রাকৃতিক সৌন্দর্য মিলিয়ে কলমাকান্দায় গড়ে উঠতে পারে পাহাড় ও প্রকৃতিনির্ভর পর্যটনকেন্দ্র।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত সাত শহীদের সমাধিও এ উপজেলার গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক সম্পদ। ১৯৭১ সালের ২৬ জুলাই নাজিরপুর এলাকায় পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখযুদ্ধে সাতজন বীর মুক্তিযোদ্ধা শহীদ হন। পরে তাঁদের ফুলবাড়ী এলাকায় সমাহিত করা হয়। এই স্মৃতিস্থানকে যথাযথ সংরক্ষণ ও তথ্যসমৃদ্ধ করে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক পর্যটনের আওতায় আনার সুযোগ রয়েছে।
পাঁচগাঁও চন্দ্রডিঙ্গা পর্যটনকেন্দ্রের জন্য নির্মিত রিসোর্সটি দীর্ঘদিন অব্যবহৃত থাকার বিষয়টি ২০২৫ সালের অক্টোবরে জেলা প্রশাসনের প্রকাশিত তথ্যে উঠে আসে। প্রয়োজনীয় সংস্কার করে পর্যটকদের জন্য এটি চালুর উদ্যোগের কথা জানানো হয়েছিল। কিন্তু এ ধরনের স্থাপনা নির্মাণের পর কার্যকর ব্যবস্থাপনা ও রক্ষণাবেক্ষণ না থাকলে বিনিয়োগের সুফল পাওয়া কঠিন।
নেত্রকোনার পূর্ব প্রান্তের হাওরবেষ্টিত উপজেলা খালিয়াজুরী যেন প্রকৃতির আরেক বিস্ময়। বর্ষায় চারদিকে অথৈ জলরাশি, নৌকার চলাচল আর দিগন্তজোড়া জলাভূমি; শুষ্ক মৌসুমে সেই হাওরেই জেগে ওঠে সবুজ ও সোনালি ধানের মাঠ। ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রকৃতির এমন রূপবদল পর্যটকদের জন্য ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতা তৈরি করতে পারে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার আয়তন প্রায় ২৯৭ দশমিক ৬৪ বর্গকিলোমিটার। এখানে ১৩৪টি হাওরের মোট আয়তন প্রায় ২৩ হাজার ২৮০ হেক্টর। ধনু ও ধলাই নদী ছাড়াও কীর্তনখোলা, গোবিন্দডোবা, লক্ষ্মীপুর, উত্তরবন্ধ, খৈড়তলা, লেপসিয়া ও জগন্নাথপুর হাওর এ অঞ্চলের উল্লেখযোগ্য জলাভূমি।
বর্ষায় হাওরের বুক চিরে নৌভ্রমণ, সূর্যাস্ত ও জ্যোৎস্না উপভোগ, শীতকালে অতিথি পাখি দেখা এবং হেমন্তে কৃষিজীবনের বৈচিত্র্য পর্যটকদের জন্য আকর্ষণীয় হতে পারে। বিশেষ করে হেমনগর হাওর ও কান্দা পর্যটন বিকাশের গুরুত্বপূর্ণ সম্ভাবনাময় এলাকা।
হেমনগর কান্দায় ২৬ একর খাসজমিতে পর্যটনকেন্দ্র গড়ে তোলার উদ্যোগের কথা সরকারি প্রকাশনায় উল্লেখ রয়েছে। কয়েক বছর আগে জমি চিহ্নিত করে প্রকল্প প্রস্তাবের কথাও জানা যায়। তবে উদ্যোগটির বর্তমান অগ্রগতি ও বাস্তবায়ন পরিস্থিতি স্পষ্ট নয়।
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি পাঁচহাট জামে মসজিদ ও চানপুর হাসার আখড়ার মতো ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যও খালিয়াজুরীর পর্যটন আকর্ষণ বাড়াতে পারে। বিশেষ করে চানপুর হাসার আখড়ায় প্রাচীন মঠ ও মন্দির রয়েছে। এসব ঐতিহ্য যথাযথ সংরক্ষণ ও প্রচারের মাধ্যমে ধর্মীয়-সাংস্কৃতিক পর্যটনের নতুন সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
তিন উপজেলার পর্যটন বিকাশে প্রধান প্রতিবন্ধকতা যোগাযোগ ও পর্যাপ্ত অবকাঠামোর অভাব। দুর্গাপুরের দর্শনীয় স্থানগুলোতে যাতায়াতের ক্ষেত্রে কিছু এলাকায় সড়কের মান, নদী পারাপার ও পরিবহনসুবিধার সীমাবদ্ধতা রয়েছে। পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে মানসম্মত আবাসন, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, খাবারের ব্যবস্থা, পার্কিং, তথ্যকেন্দ্র ও নিরাপত্তা পর্যাপ্ত নয়।
কলমাকান্দার চন্দ্রডিঙ্গা, পাতলা বন ও সীমান্তবর্তী পাহাড়ি এলাকায় পর্যটকদের যাতায়াত সহজ করতে সড়ক, নির্দেশনাব্যবস্থা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। পাশাপাশি সীমান্ত এলাকার বিধিনিষেধ ও নিরাপত্তা নির্দেশনা মেনে পর্যটন পরিচালনা করতে হবে।
খালিয়াজুরীর সমস্যা আরও প্রকট। সরকারি উপজেলা পোর্টালের তথ্য অনুযায়ী, উপজেলার মোট সড়কের দৈর্ঘ্য ৪২৯ কিলোমিটার হলেও পাকা সড়ক মাত্র ৪ কিলোমিটার। ফলে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি নৌপথের ওপর নির্ভর করতে হয়। পর্যটকদের নিরাপদ নৌভ্রমণ, নির্দিষ্ট নৌরুট, পর্যাপ্ত ঘাট, আবাসন, খাবার ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা না থাকায় বড় পরিসরে পর্যটন পরিচালনা কঠিন।
এ ছাড়া তিন উপজেলার পরিবেশগত ঝুঁকিও বিবেচনায় নিতে হবে। পাহাড় কাটা, নদী থেকে অপরিকল্পিত বালু উত্তোলন, প্লাস্টিক বর্জ্য, হাওরে অতিরিক্ত শব্দ ও অনিয়ন্ত্রিত নৌযান প্রকৃতির স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট করতে পারে।
পরিকল্পিত পর্যটন চালু হলে তিন উপজেলার স্থানীয় অর্থনীতিতে বহুমুখী প্রভাব পড়বে। দুর্গাপুরে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ, পরিবহন, নৌভ্রমণ, ট্যুর গাইড, হস্তশিল্প ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পণ্যের বাজার সম্প্রসারিত হতে পারে।
কলমাকান্দায় পাহাড়কেন্দ্রিক পর্যটন, স্থানীয় গাইড, পরিবহন, খাবারের দোকান, ক্ষুদ্র আবাসন ও স্থানীয় পণ্যের বাজার গড়ে উঠতে পারে। অন্যদিকে খালিয়াজুরীতে নৌযান পরিচালনা, হাওরভিত্তিক আবাসন, স্থানীয় খাবার, মাছ ও কৃষিপণ্য বিপণন এবং নৌভ্রমণের মাধ্যমে নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বিশেষ করে তরুণদের প্রশিক্ষণ দিয়ে পর্যটনসংশ্লিষ্ট কাজে যুক্ত করা গেলে স্থানীয় পর্যায়ে আয় বাড়বে।
দুর্গাপুরে পর্যটন হাব গড়ে তোলার বিষয়ে ইতোমধ্যে নতুন উদ্যোগের আভাস মিলেছে। জাতীয় সংসদের ডেপুটি স্পিকার ব্যারিস্টার কায়সার কামালের উদ্যোগে বাংলাদেশ পর্যটন করপোরেশন দুর্গাপুর ও কলমাকান্দায় আধুনিক পর্যটন মডেল স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে জেলা প্রশাসকের কাছে তথ্য চেয়েছে। প্রস্তাবিত প্রকল্পের জন্য উপযুক্ত স্থানে ন্যূনতম ২০ একর জমি নির্বাচনের বিষয়টিও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হলে দুই উপজেলার পর্যটন বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
নেত্রকোনার জেলা প্রশাসক খন্দকার মুশফিকুর রহমান পর্যটন সম্ভাবনা প্রসঙ্গে বলেছেন, জেলার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এক অনন্য সম্পদ। পর্যটনমুখী এলাকাগুলোকে আধুনিক সুযোগ-সুবিধার আওতায় আনতে পরিকল্পনা নিয়ে কাজ করা হচ্ছে। তাঁর মতে, পরিকল্পিত অবকাঠামো গড়ে তোলা গেলে নেত্রকোনা পর্যটনের নতুন গন্তব্য হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে।
পর্যটনসংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্গাপুর, কলমাকান্দা ও খালিয়াজুরীর স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নিয়ে সমন্বিত পর্যটন মহাপরিকল্পনা গ্রহণ করা প্রয়োজন। দুর্গাপুরে পাহাড়, নদী, সাদামাটি ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে কেন্দ্র করে প্রকৃতিনির্ভর ও ঐতিহ্যভিত্তিক পর্যটন গড়ে তুলতে হবে। কলমাকান্দায় পাহাড়, বনভূমি, সীমান্তবর্তী প্রাকৃতিক সৌন্দর্য ও মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিকে কেন্দ্র করে পর্যটন অবকাঠামো গড়ে তোলা যেতে পারে। অন্যদিকে খালিয়াজুরীতে হাওরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য অক্ষুণ্ন রেখে ইকো-ট্যুরিজমের ব্যবস্থা করা যেতে পারে।
এ জন্য পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপদ যাতায়াত, নির্দিষ্ট নৌরুট ও ঘাট, লাইফ জ্যাকেট, পর্যাপ্ত নিরাপত্তা, পরিচ্ছন্ন শৌচাগার, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পর্যটক তথ্যকেন্দ্র, বসার স্থান, পার্কিং ও জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় জনগোষ্ঠীকে সম্পৃক্ত করে পর্যটন ব্যবস্থাপনা গড়ে তোলা জরুরি। বড় স্থাপনা নির্মাণের আগে পরিবেশগত প্রভাব যাচাই এবং স্থানীয় মানুষের মতামত নেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পেতে হবে।
দুর্গাপুরের পাহাড়-নদী, কলমাকান্দার সীমান্তঘেঁষা সবুজ পাহাড় এবং খালিয়াজুরীর বিস্তীর্ণ হাওর—প্রকৃতির এই তিন ভিন্ন রূপ নেত্রকোনাকে দেশের অন্যতম বৈচিত্র্যময় পর্যটন জেলায় পরিণত করার সম্ভাবনা রাখে। প্রয়োজন সরকারি-বেসরকারি বিনিয়োগ, কার্যকর পরিকল্পনা ও পরিবেশবান্ধব ব্যবস্থাপনা। সম্ভাবনাকে কাগজে সীমাবদ্ধ না রেখে বাস্তবে রূপ দেওয়া গেলে এ তিন উপজেলা হয়ে উঠতে পারে নেত্রকোনার পর্যটন, কর্মসংস্থান ও স্থানীয় অর্থনীতির নতুন কেন্দ্র।