সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষকে হেয়প্রতিপন্ন, অপদস্থ ও ক্ষতিগ্রস্ত করার প্রবণতা থেকে নাগরিকদের সুরক্ষা দিতে নতুন আইন প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান।
একই সঙ্গে প্রস্তাবিত সাইবার আইন নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগকে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করা হবে বলেও আশ্বস্ত করেছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার (১৩ অক্টোবর) সুপ্রিম কোর্ট অডিটোরিয়ামে একটি অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, সাইবার আইন নিয়ে অংশীজনদের সঙ্গে পরামর্শ চলছে। বিভিন্ন শ্রেণিপেশার মানুষের কাছ থেকে মিশ্র প্রতিক্রিয়া এলেও সামাজিক মাধ্যমে মানুষকে হয়রানি এবং এআই ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত করার বিরুদ্ধে কার্যকর সুরক্ষাব্যবস্থা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তার বিষয়ে ব্যাপক ঐকমত্য তৈরি হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, প্রস্তাবিত আইনের ভাষা ও বিধান কী হবে, তা নিয়ে বিভিন্ন পক্ষের কাছ থেকে নানান মতামত আসছে। এসব মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। এরপর প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া অনুসরণ করে জাতীয় সংসদে বিষয়টি এগিয়ে নেওয়া হবে।
আইনমন্ত্রী স্পষ্ট করে বলেন, এখনো এটা একটা ‘র’ স্টেজে আছে, প্রাইমারি স্টেজে আছে। আমরা এখনো এটা ফাইনাল ড্রাফটিংয়ের স্টেজে যাইনি।
তিনি বলেন, প্রযুক্তির দ্রুত বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ব্যবহার মানুষের জীবনকে যেমন সহজ করছে, তেমনই এর অপব্যবহার নতুন উদ্বেগও তৈরি করছে। এআই দিয়ে তৈরি বা বিকৃত ছবি, ভিডিও কিংবা অন্যান্য কনটেন্টের মাধ্যমে কাউকে সামাজিকভাবে হেয় করা, সম্মানহানি ঘটানো কিংবা ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনে ক্ষতি করার আশঙ্কা রয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এ ধরনের অপব্যবহার থেকে মানুষকে সুরক্ষা দেওয়ার প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দিয়ে আইনমন্ত্রী জানান, সাইবার আইন নিয়ে চলমান জনপরামর্শে একটি বিষয়ে বিভিন্ন পক্ষের মধ্যে ঐকমত্য দেখা যাচ্ছে—সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে মানুষকে যেভাবে হয়রানি করা হচ্ছে এবং এআই ব্যবহার করে ক্ষতিগ্রস্ত করা হচ্ছে, তা প্রতিরোধে আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন।
‘তবে সেই সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে আইনের ভাষা, প্রয়োগের সীমা ও বিধান নির্ধারণে সতর্কতার প্রয়োজন রয়েছে।’ অংশীজনদের মতামত পর্যালোচনা করে চূড়ান্ত খসড়া তৈরির পরই সরকার পরবর্তী পদক্ষেপ নেবে বলে জানান তিনি।
বিজ্ঞাপন
সাংবাদিকদের উদ্বেগ গুরুত্ব দিয়ে দেখবে সরকার
প্রস্তাবিত সাইবার আইন নিয়ে সাংবাদিকদের উদ্বেগের প্রসঙ্গেও নিজের অবস্থান তুলে ধরেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সাংবাদিকদের যে উদ্বেগ রয়েছে, তা সরকার বিবেচনায় রাখবে। পেশাগত দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সাংবাদিকেরা যেন অযথা আতঙ্ক বা অনিশ্চয়তার মধ্যে না থাকেন, সে বিষয়েও আশ্বস্ত করেন তিনি।
আইনমন্ত্রী বলেন, সাংবাদিকদের উদ্বেগের জায়গাগুলো বিবেচনায় নিয়েই সরকার সামনে এগোবে। এ বিষয়ে ভয় পাওয়ার কোনো কারণ নেই।

একই সঙ্গে অতীতে সাইবার-সম্পর্কিত আইনের অপব্যবহারের অভিজ্ঞতা সরকারের বিবেচনায় রয়েছে বলে উল্লেখ করেন মন্ত্রী। তার ভাষ্য, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের অপব্যবহার এবং বহুল আলোচিত ৫৭ ধারার অপপ্রয়োগের বিষয়টি মাথায় রেখেই নতুন আইনের বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, অতীতে যেসব আইনের অপব্যবহার নিয়ে সমালোচনা হয়েছে, সেসব অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে এগিয়ে যেতে হবে। বিশেষ করে সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে যেন অযৌক্তিক বাধা বা উদ্বেগ তৈরি না হয়, সে বিষয়টি গুরুত্ব পাবে।
সাইবার আইন নিয়ে সরকারের পরবর্তী পদক্ষেপ কী?
সাইবার অপরাধ মোকাবিলা এবং নাগরিকদের ডিজিটাল সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আইনগত কাঠামোয় একাধিক পরিবর্তন এসেছে।
২০২৫ সালে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ রহিত করে সাইবার সুরক্ষা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে নতুন অধ্যাদেশ জারি করে। পরবর্তী সময়ে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের প্রথম অধিবেশনে অধ্যাদেশটি সাইবার সুরক্ষা আইন, ২০২৬ নামে পাস হয়। তবে আইনটি পাসের সময়ই পরবর্তী সময়ে আরও সংশোধনী আনার পরিকল্পনার কথা সরকারের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছিল।
বিজ্ঞাপন
সেই ধারাবাহিকতায় সরকার নতুন একটি খসড়া প্রস্তুত করে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়সহ বিভিন্ন অংশীজনের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেছে। এসব আলোচনা ও মতামত পর্যালোচনার পর খসড়াটি চূড়ান্ত করা হবে। এরপর মন্ত্রিসভায় অনুমোদন সাপেক্ষে বিল আকারে জাতীয় সংসদে উত্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।
তবে আইনমন্ত্রী জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত বিধানগুলোর ভাষা ও চূড়ান্ত রূপ এখনো নির্ধারিত হয়নি। ফলে এ পর্যায়ে নতুন আইনের সুনির্দিষ্ট বিধান বা প্রয়োগের পরিধি সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর সুযোগ নেই।
বিজ্ঞাপন
সুরক্ষা ও স্বাধীনতার মধ্যে ভারসাম্যই বড় চ্যালেঞ্জ
আইনমন্ত্রী বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এআইয়ের অপব্যবহার রোধ করা যেমন জরুরি, তেমনই মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, সাংবাদিকতার স্বাধীনতা এবং নাগরিক অধিকার সুরক্ষাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। একটি কার্যকর সাইবার আইনের ক্ষেত্রে এই দুইয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করাই হবে বড় চ্যালেঞ্জ।

তিনি বলেন, একদিকে প্রযুক্তির অপব্যবহারে কোনো ব্যক্তি যেন অপমান, হয়রানি, সম্মানহানি কিংবা গুরুতর ক্ষতির শিকার না হন; অন্যদিকে আইন যেন সাংবাদিকদের পেশাগত দায়িত্ব পালন, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ কিংবা জনস্বার্থ-সংশ্লিষ্ট বিষয়ে মতপ্রকাশের পথে অযৌক্তিক বাধা হয়ে না দাঁড়ায়—এ প্রত্যাশাই এখন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
আইনমন্ত্রীর বক্তব্যে উঠে এসেছে, নতুন আইনের বিষয়ে সরকার অংশীজনদের মতামত বিবেচনা করে এগোতে চায়। অতীতের আইনি অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষা নিয়ে নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং সাংবাদিকদের উদ্বেগের যথাযথ মূল্যায়ন করা হবে কি না, তা নির্ভর করবে চূড়ান্ত খসড়ার ভাষা, বিধান ও বাস্তব প্রয়োগের ওপর।
এফএইচ/এমকেআর
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
