হাদিসে আছে নবীজি (সা.) এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, "তুমি এবং তোমার সমস্ত সম্পত্তি তোমার বাবার"। মহাগ্রন্থ আল কুর'আনে আল্লাহ্ শিখিয়েছেন, "রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগীরা"
লে. জেনারেল আব্দুল্লাহিল আমান আযমী (অব:)
হাদিসে আছে নবীজি (সা.) এক ব্যক্তিকে বলেছিলেন, "তুমি এবং তোমার সমস্ত সম্পত্তি তোমার বাবার"। মহাগ্রন্থ আল কুর'আনে আল্লাহ্ শিখিয়েছেন, "রাব্বির হামহুমা কামা রাব্বা ইয়ানি সাগীরা"। কুরআনে আরো আছে, "ওয়াবিল ওয়ালিদানে ইহসানা", অর্থাৎ পিতা-মাতার প্রতি ইহসান করতে। আমাদের (সন্তানদের) দিয়ে "উহ” শব্দটিও উচ্চারণ করতে না হয় ইসলামে এ নির্দেশও রয়েছে। আজ আমি এত বড় হয়েছি, শরীরে, বয়সে, বিদ্যা-বুদ্ধি-বিত্ততে; কিন্তু, যখন জন্ম নিয়েছিলাম তখন কি অবস্থা ছিল আমার? আমার শৈশব কি করে কাটলো? কাদের আদর-স্নেহ, মায়া-মমতা-ভালোবাসা আমাকে আজ এত্ত বড় হতে সাহায্য করেছে? উনারা আমার জন্য এন্ড কষ্ট না করলে সেই শৈশবেই তো আমার জীবন শেষ হয়ে যেতো, আজকের এই আমি হওয়া তো দূরের কথা। আর, সেই পিতা-মাতাকেই আজ আমরা অবহেলা করছি কেবলমাত্র দুনিয়ার ভোগের জন্য। আজ আমরা দুনিয়ার চাকচিক্যে পাশ্চাত্যের অন্ধ অনুকরণে "সভ্য" সাজতে গিয়ে বাবা-মাকে কি পরিমাণ অবজ্ঞা আর অবহেলা করছি তা আর নতুন করে লেখার কোন প্রয়োজন নেই। আমাদের আশেপাশে খেয়াল করলেই অনেক বাবা-মা এর যে করুণ চিত্র দেখা যায়, তা সত্যিই বেদনাদায়ক।
আমরা প্রত্যেকেই আশা করি দীর্ঘ জীবন লাভ করার। আল্লাহ্ যদি আমাদের বার্ধক্য পর্যন্ত বাঁচিয়ে রাখেন, তাহলে আমাদের সন্তানরা আমাদের সাথে কিরূপ আচরণ করবে বলে আমরা আশা করি তা আমাদের সন্তানদের বাস্তবে না দেখালে ওরা শিখবে কোত্থেকে? আমাদের সন্তানরা আমাদেরকে আমাদের বাবা-মা'দের সাথে যেমন আচরণ করতে দেখবে, তারাও তেমনটাই শিখবে। কিন্তু, আশ্চর্য হলো, আমরা আমাদের বাবা-মা'দের সাথে ভালো আচরণ না করেও আশা করছি আমাদের সন্তানরা আমাদের বার্ধক্যে (যদি পৌঁছাই) আমাদের সাথে ভালো আচরণ করবে। ইংরেজিতে বলে, " Children see, Children do "। আমরা আমাদের Children দেরকে কি ভালো কিছু দেখাতে পেরেছি? শিখাতে পারছি?
এবারে বাবার প্রসঙ্গ। উনার কিছু কিছু কথা ইদানীং মনকে খুব নাড়া দেয়, চোখের পানি ফেলি। বৃদ্ধ বয়সে অসহায় বন্দি জীবনে তিনি কত কষ্টই না করেছেন, তা ভেবে বুকটা ভারি হয়ে ওঠে। বন্দি বাবার সাথে দু'সপ্তাহ পর পর আমাদের দেখা হতো, তাও মাত্র তিনজন, ৩০ মিনিটের জন্য। "তোমাদের সাথে সাক্ষাতের দিনটি আমার কাছে ঈদের দিনের মত। সকাল থেকেই অপেক্ষা করতে থাকি তোমাদের জন্য। যখন তোমাকে দেখি, তখন অনেক শান্তি লাগে, জীবনটা ঠাণ্ডা হয়ে যায়”- এই কথাগুলো প্রায়ই ফেরেশতাতুল্য নিষ্পাপ, নিরপরাধ, বিশ্ববরেণ্য ইসলামি চিন্তাাবিদ অধ্যাপক গোলাম আযম, আমার বাবা, কারাবন্দি অবস্থায় আমাকে বলতেন। ৯১ বৎসরের বৃদ্ধ বাবার মুখে এই কথাগুলো শুনলে মনটা সত্যিই খুশিতে ভরে যেত এই ভেবে যে, 'এমন নেক একজন পিতার মুখ থেকে এমন কথা শুনতে পেরে পৃথিবীর সকল সম্পত্তির মালিক হওয়া থেকেও বেশি ভাগ্যবান বলে মনে হতো নিজেকে'। আল্লাহর শুকরিয়া জানাতাম মনে মনে। কিন্তু, সাথে সাথেই ভীষণ কষ্টও হতো বৃদ্ধ বাবার এই অসহায় অবস্থা দেখে। নিজেকেও খুব অসহায় মনে হতো কিছু করতে না পারার কারণে, অশুভ শক্তির কাছে পরাজিত ভেবে। মাঝে মাঝে তিনি আরও বলতেন, "রবীন্দ্রনাথের একটি কথা এখন আমার জন্য খুব প্রযোজ্য। সেটা হলো, 'স্নেহ যত প্রবল, অকারণ আশঙ্কা তত বেশি'। তোমাকে নিয়ে আমার খুউব চিন্তা হয়। সবসময়ই এক অজানা আশঙ্কা হয়"। তিনি জানতেন যে, জালিমরা তাকে "শায়েস্তা" করতে গিয়ে তার ছেলে হবার কারণে আমার উপরও জুলুম করেছে, করছে। তাই তার এ আশঙ্কা।
১১ জানুয়ারি ২০১২তে অধ্যাপক গোলাম আযমকে ট্রাইব্যুনাল থেকে জামিনের আবেদন নাকোচ করে কারাগারে পাঠানো হয়। কারাগার থেকে ঐদিনই উনাকে চিকিৎসার জন্য হাসপাতালের 'প্রিজন সেল' এ পাঠানো হয়, যেখানে তিনি আমৃত্যু থেকেছেন। বিচার চলাকালীন ৯০ বৎসরের এই বৃদ্ধ জামিনে থাকলে কার কি ক্ষতি বা সমস্যা হতো তা কোন সুস্থ ও বিবেকবান মানুষের কাছেই বোধগম্য নয়। এভাবে উনাকে কারারুদ্ধ যারা করেছিলেন তাদের ব্যাপারে আল্লাহর আদালতে মামলা রুজু করেছি। তিনি বিচার করবেন- করে জানি না, তবে করবেন নিঃসন্দেহে ইনশাআল্লাহ।
উনি কারারুদ হয়েছিলেন মিথ্যা মামলায়। ট্রাইব্যুনালের 'চেয়ারম্যান' স্বয়ং ছিলেন অধ্যাপক আযম এর 'ফাঁসি দাবিদার গোষ্ঠীর একজন একনিষ্ঠ কর্মী'। এই মামলা যারা করেছেন তারা বিচারে কঠিন রায় দিবে' এটা সকলেরই কমবেশি জানা ছিল। গ্রেফতারের পূর্বে অধ্যাপক গোলাম আযম বলেছিলেন, রায় তো হয়েই আছে, এখন বিচারের নাটক" করবে। আমরা দুনিয়ার রায় নিয়ে চিন্তিত ছিলাম না। আখেরাতের আদালতে আল্লাহর চূড়ান্ত রায়ই আমাদের কাম্য। এক মন্ত্রী (সব নির্বাচনেই যার দলের শতভাগ প্রার্থীর জামানত বাজেয়াপ্ত হয়) তো বলেই ফেলেছেন যে, "গোলাম আযম বয়সের ভারে ফাঁসির কাষ্ঠে যেতে না পারলে আমি তাকে পাঁজাকোলা করে ফাঁসির কাষ্ঠে নিয়ে যাবো"। এগুলো নিয়ে আমরা চিন্তিত ছিলাম না। আমার বাবা আমাদের শিখিয়েছেন জীবন-মৃত্যুর ফায়সালা আসমানে হয়, জমিনে নয়"। তিনি আরও শিখিয়েছেন, "আল্লাহ ছাড়া কাউকে ভয় করা জায়েজ নয়"। তাই, আমরা উনার কারাবাস বা মৃত্যু নিয়ে পেরেশান ছিলাম না। কেমন মানুষ ছিলেন অধ্যাপক গোলাম আযম? এর উত্তর এদেশের লাখো মানুষ দিতে পারবেন। যারা তার সংস্পর্শে এসেছেন, তাদের জীবনটাই পাল্টে গেছে। তিনি ছিলেন এক পরশ পাথর, সকলের জন্য অনুকরণীয় এক প্রেরণার পরশমণি। মানবিক অসংখ্য গুণের সমাহার ছিল তার মাঝে, এক বিরল সমন্বয়ে। কাছে থেকে না দেখে বিশ্বাস করা কঠিন যে, একজন মানুষ কি করে এতসব গুণের অধিকারী হতে পারেন।
বিদ্যা, বুদ্ধি, মেধা, সৃজনশীলতা, মননশীলতার এক অনন্য সাধারণ সমন্বয় এই মানুষটির মাঝে। ধীর, স্থির, শান্ত, মার্জিত ও পরিশীলিত এই ব্যক্তিটিকে কেউ কোনদিন উত্তেজিত হতে দেখেনি, উচ্চকণ্ঠে কথা বলতে শোনেনি, চিৎকার চেঁচামেচি করতে দেখেনি। সদা হাস্যোজ্জ্বল অধ্যাপক আযম সকলকেই অতি সহজেই আপন করে নিতেন তার সম্মোহনী ব্যক্তিত্বের দ্বারা। যারা তাকে দেখেছেন, চিনেন, জানেন সকলেই নিঃসংকোচে এই মানুষটিকে ভালোবেসে, শ্রদ্ধা করে, নিজেকে ধন্য মনে করেন। ইংরেজি "কারিশমা" শব্দটি বাংলায় একশব্দে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। কারিশমা শব্দটির বাস্তব রূপ অধ্যাপক গোলাম আযম। যারা তার প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করে, তার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করে, আক্রোশ দেখায়, তার প্রতি প্রতিহিংসাপরায়ণ, তারা অজ্ঞতাবশতঃই এসব করে থাকে। যাদের Charismatic কোন ব্যক্তিত্ব দেখার সৌভাগ্য হয় নি, তাদের জন্য এই মানুষটি ছিলেন এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ। কী এক অদ্ভুত সম্মোহনী শক্তি এই মানুষটির চেহারায়, চাহনিতে। এত গভীর উনার দৃষ্টিশক্তি, কারো দিকে তাকালেই মনে হয় তিনি সবকিছু বলে দিতে পারতেন। আর তার শত্রুরও যদি তার সামনে পাঁচ মিনিটের জন্য বসে, তার চোখে চোখ রেখে কথা বলার সুযোগ হতো, সেই "শত্রু" তার ভক্ত হয়ে যেতো। এ ধরনের বাস্তব উদাহরণ অনেক আছে উনার জীবনে। এটাই সম্ভবত একটা মূল কারণ ছিল যার জন্য ২৩টি বৎসর (১৯৭১-১৯৯৪) উনার নাগরিকত্ব হরণ করে রেখে উনাকে জনসমক্ষে আসতে দেয়া হয় নি এবং সারা জীবন উনার বিরুদ্ধে মিথ্যাচার করা হয়েছে।
সততা, নিষ্ঠা, আন্তরিকতা, সত্যবাদিতা, পরপোকারিতা, দয়ালু, ভদ্রতা, মার্জিত, শালীনতা, স্বল্পভাষী, সদাহাস্য, সাধুতা, নম্রতা, নমনীয়তা, মিষ্টভাষী, মেধাবী, ধৈর্যশীল, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, প্রজ্ঞাবান, চিন্তাবিদ, দার্শনিক, অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন, প্রত্যুৎপন্নমতি, শান্ত, কী গুণ ছিল না উনার মাঝে? বাংলা ডিকশনারি দেখে আরও যা যা শব্দ আছে মানুষের গুণাবলী বর্ণনার জন্য তার প্রায় সবই উনার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, এবং যেটার যতটুকু পরিমাণ প্রয়োজন ততটুকু, কম নেই, বরং ক্ষেত্রবিশেষে একটু বেশিই ছিল। মনে হয়, মহান আল্লাহ সকল মাধুরী মিশিয়ে উনাকে সৃষ্টি করেছেন, যেমনটি শিল্পী তার সমস্ত কিছু ঢেলে দেয় কোন কর্ম সম্পাদনে।
এদেশের মাটি ও মানুষকে ভালোবেসে এদেশের জন্য নিঃসংকোচে, নির্দ্বিধায়, হাসিমুখে নিজের পুরোটা জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন এই মানবপ্রেমী মানুষটি। নিরহংকারী, নির্লোভ, নির্মোহ এই মানুষটি সবসময়ই নিরবে কাজ করে গেছেন; অর্থ, সম্পদ, যশ, খ্যাতি, আত্মপ্রচার ও আত্মপ্রতিষ্ঠা, এসবের কোনটাই উনাকে হাতছানি দেয়নি, প্রলুব্ধ করতে পারেনি, উনার আদর্শ থেকে বিচ্যুত করতে পারেনি। রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব ছেড়ে দিয়ে ১৯৫৫ সাল থেকেই আল্লাহর জমিনে আল্লাহর দীন কায়েমের জন্য নিজের জীবনকে উৎসর্গ করেছেন। সার্বক্ষণিক সাংগঠনিক কাজ নিয়ে ব্যস্ত থেকেছেন আজীবন। মাসে প্রায় ২০ দিনই সারা দেশে সফরে থাকতেন। বাকি যে ক'দিন ঢাকায় থাকতেন, প্রায় সবদিনই সকালে ঘুম থেকে উঠে বেরিয়ে যেতেন, ফিরতেন রাতে। তবে, যখন বাসায় থাকতেন তখন তিনি চেষ্টা করতেন সবাইকে কিছু কিছু সময় দেয়ার। এ নিয়ে আমাদের কারও, এমনকি আমার আম্মারও, কোন ক্ষোভ ছিল না। বরং, উনাকে এই যে না পাওয়া, সেটা উনার মহান ত্যাগ ও মহৎ কাজের সহায়তায় আমাদের "ক্ষুদ্র ত্যাগ" বলেই আমরা মনে করেছি।
যারা অধ্যাপক গোলাম আযম'কে কাছে থেকে চিনেন, জানেন, তারা সকলেই অবহিত যে, তিনি কখনোই বিলাসী বা আয়েশী জীবনযাপন করেন নি। অত্যন্ত সাদামাটা জীবনযাত্রাই তার সারাজীবনের অভ্যাস। সহজ সরল জীবনযাপনে অভ্যস্ত এই মানুষটি দামি কোন কিছু কখনো ব্যবহার করতেন না। অর্থ ও বিত্তের প্রতি উনার কোনদিনও সামান্যতম লোভ ছিল না, হয়নি। কেউ কিছু উপহার দিলে গ্রহণ করেন সুন্নত হিসেবে। যদি নিজের কাজে না লাগে বা যদি ওটা নিজের থেকে থাকে, তাহলে পরবর্তীতে তিনি সেটা কাউকে উপহার দিয়ে দিতেন। দেয়ার সময় একজন আবার বলেও দিতেন যে, 'আমাকে দিয়েছিল। এটা আমি ব্যবহার করছি না বা আমার লাগছে না। তোমার কাজে লাগতে পারে'। কোন ভনিতা নেই।
আমার বাবা কারও সাথে কোনদিন রেগেছেন, বা রাগ করে কথা বলেছেন, এমনটা শোনা যায়নি। আমরা ৬ ভাই কোনদিন বাবার হাতে একটা থাপ্পড় খেয়েছি বা ধমক খেয়েছি, এমন নজির আমার জানা নেই। বড়জোর মৃদু ভর্ৎসনা, তাও জীবনে দু'-একবারের বেশি নয়। অপরাধ করে উনার কাছে হাজির হলে, উনার এক চাহনিই আমাদের জন্য যথেষ্ট ছিল। আমাদের সংশোধনের যেই পদ্ধতিটি তিনি অনুসরণ করতেন তা হলো- কাছে ডেকে নিয়ে, আদর করে ধরে বুঝাতেন। যে কোন অন্যায় করলে, ওটা কেন করেছি, ওটা না করে পারা যেত কি না, করাটা ঠিক হয়েছে কি না, কি ভুল হয়েছে ইত্যাদি প্রশ্ন করে করে আমাদের মধ্যে থেকেই আমাদের ভুলের বিশ্লেষণটা বের করে নিয়ে আসতেন। এতে অনুশোচনা বোধটাও তীব্র হতো। উনার উপর কোন রাগ বা ক্ষোভ হতো না, যা ঐ বয়সে হওয়াটা স্বাভাবিক। বরং, আত্মবিশ্লেষণ পদ্ধতি শেখা হয়ে যেত। তিনি আমাদের বিবেকের কাছে আমাদের দায়বদ্ধতাটা আমাদের মাঝে ঢুকিয়ে দিয়েছেন। এই পদ্ধতির সুফল সারাজীবন পেয়েছি, এখনো পাচ্ছি।
উনার মত এত সুশৃঙ্খল, নিয়মতান্ত্রিক, রুটিনমাফিক জীবনযাপন কেউ কোনদিন আর কাউকে দেখেছেন বলে শোনা যায়নি। নিজের ব্যাগ, কাপড় নিজে গুছাতেন তিনি।
কাউকে করতে দিতেন না। গুছানোর সময় প্রত্যেকটা কাপড়ের ভাঁজ টান টান থাকবে, যা যা রাখা হচ্ছে সে সবের লেভেল সমান হবে, যেটা আগে দরকার হবে সেটা উপরে থাকবে ইত্যাদি। আমরা যোগান দিতাম, কিন্তু গোছানোর কাজটা উনি নিজেই করতেন, কাউকে করতে দিতেন না; এটা উনার সারাজীবনের চর্চা। শেষবার গ্রেফতার হবার আগে, ১১ জানুয়ারি ২০১২তে সকালে কোর্টে যাবার পূর্বেও উনার নিজের ব্যাগ উনি নিজেই গুছিয়েছেন, এই ৯০ বৎসর বয়সে, এবং নিখুঁতভাবে।
উনার আলমারি, বুক শেলফ, পড়ার টেবিল, এসব জায়গায় কোন জিনিসটা কোথায় থাকবে তা উনার সুনির্দিষ্ট। অন্ধকারে চোখ বন্ধ করেও উনি প্রয়োজনীয় জিনিস বের করে আনতে পারতেন। কারাগার থেকে মাঝে মাঝে এটা-ওটার প্রয়োজন হলে আমাকে বলতেন, 'আমার আলমারির বাঁয়ের দরজা খুলে উপর থেকে তিন নম্বর তাকের পেছনের বাম কোনায় হাত দিলে টুপি পাবে, ওটা পাঠিয়ে দিও'। কিংবা, 'আমার চেম্বারের এত নম্বর শেলফের এত নম্বর তাকের মাঝামাঝি অমুক বইটা আছে পাঠিয়ে দিও'। উনি এত গোছানো ও সসংগঠিত যে তা না দেখলে বিশ্বাসই করা যায় না।
হিংসা-বিদ্বেষ, রাগ-ক্ষোভ, প্রতিহিংসা, জিঘাংসা, স্বার্থপরতা ইত্যাদি শব্দ উনার ডিকশনারিতে ছিল না। কোনদিন কারও সাথে উনি এগুলো প্রয়োগ করেছেন তা কেউ বলতে পারবে না। যারা উনার জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত, উনার আদর্শের কাছে পরাভূত হয়ে উনার বিরুদ্ধে বিষোদগার করে, চার দশক ধরে মিথ্যাচার আর অপপ্রচার করে করে যারা নিজেদের জীবর উৎসর্গ করে দিয়েছে, তাদের বিরুদ্ধেও উনাকে একটু কটু কথা বলতে শুনিনি। কারও ব্যাপারে কোনদিন কোন সমালোচনা করতে শুনিনি। আমরা উনার সামনে সমালোচনা করলে তিনি নিষেধ করেছেন। নিঃসঙ্গ একাকি বন্দি জীবনেও কারও বিরুদ্ধে, এমন কি যাদের কারণে উনার এত কষ্ট, তাদের বিরুদ্ধেও কোন অভিযোগ ছিল না নিরহংকারী এই মানুষটির।
দোষ-গুণ মিলিয়েই মানুষ। উনার মধ্যে দোষ খুঁজে বের করতে হলে গবেষণা বা সাধনা করতে হবে বলে আমার ধারণা। তবে হ্যাঁ, আমার এক আত্মীয়ের চোখে উনার একটি "দোষ" ধরা পড়েছে। তা হলো, তিনি সবাইকে খুউব সহজেই বিশ্বাস করতেন! কত্ত বড় "দোষ"!! আর, যদি উনার গুণের কথা বলতে হয় তাহলে বলবো, একটা মানুষের মধ্যে যত রকমের ভালো গুণ থাকতে পারে, তার প্রায় সবই উনার মধ্যে বিদ্যমান, এবং সেসব রয়েছে এক অবিশ্বাস্য ও অপূর্ব সংমিশ্রণে।
গোলাম আযম। আর তাই আজ সারা বিশ্বব্যাপী লাখে এক আশ্চর্য মানুষ, আল্লাহর এক অপূর্ব সৃষ্টি ছিলেন অধ্যাপক শিক্ষিত মানুষ উনাকে তাদের "রূহানি পিতা" বলে নিজেদের মনে ঠাঁই দিয়েছেন এবং তেমনটি শ্রদ্ধা করেন। তারা উনার জন্য রোযা রাখেন, তাহাজ্জুদ নামায পড়ে চোখের পানি ফেলে দো'য়া করেন। কাবায় এবং মসজিদে নববীতে দৈনিক উনার জন্য বিশেষ দো'য়া করা হয়। পৃথিবীতে এমনটা কয়জনের ভাগ্যে জুটে? কেবলমাত্র আল্লাহর জন্যই উনার প্রতি মানুষের ভালোবাসা, স্বার্থের জন্য অধ্যাপক আযম'কে এত ভালোবাসেন না।
যারা অধ্যাপক গোলাম আযম এর বিরুদ্ধাচারণ করেন, আমি নিশ্চিত, তারা উনার সম্পর্কে না জেনে কেবলমাত্র মিথ্যা প্রচারে প্রভাবিত হয়েই তা করেন। তাদের প্রতি আমার বিনীত অনুরোধ-
উনার জীবনী পড়ুন। (১) অধ্যাপক গোলাম আযম সম্পর্কে জানার চেষ্টা করুন, (২) চিন্তা করে দেখবেন সমগ্র বিশ্বব্যাপী লাখ লাখ মানুষ কেন এই মানুষটিকে এত ভালোবাসে? কেন তার জন্য জীবন দিতে প্রস্তুত? কেন দৈনিক তার জন্য চোখের পানি ফেলে? নফল নামায পড়ে, রোযা রেখে এই মানুষটির জন্য দো'য়া করে? এটা কি কেবল দুনিয়ার কোন মোহ বা স্বার্থে?
সবশেষে আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা পাঠকদের জানাতে চাই। আমার বাবা সম্পর্কে কিছু লিখতে গিয়ে আমার মা সম্পর্কে যতটুকু না লিখলে বাবা সম্পর্কে লেখাটা অসম্পূর্ণ থেকে যাবে ততটুকু লেখার প্রয়োজনে এ লেখাটুকু দিলাম। অধ্যাপক গোলাম আযম'কে আজকের বিশ্ববরেণ্য সর্বজন শ্রদ্ধেয় লাখো মানুষের চোখেরমণি হিসেবে গড়ে উঠতে পর্দার অন্তরালের মূল এবং মূখ্য ভূমিকা পালন করেছেন আমার স্নেহময়ী মা। অধ্যাপক গোলাম আযম আজ যেই অবস্থানে এসেছেন, তিনি এই অবস্থানে হয়তো আসতে পারতেন না, যদি আমার মা সারাটা জীবন (১৯৫১ সালে বিয়ের পর হতে) নিরলসভাবে, নীরবে উনার সকল কর্মকাণ্ডে সার্বক্ষণিক সহায়তা না দিতেন। অসীম ধৈর্য ও সীমাহীন সহ্যশক্তির অধিকারী আমার মা, আমার বাবার সাথে উনার বিয়ের পর হাতের মেহেদি না শুকাতেই দেখলেন, তার প্রাণপ্রিয় স্বামী ভাষা আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার অপরাধে কারাগারে। সেই থেকে শুরু: আজীবন নীরবে সকল কষ্ট স্বীকার করে এই মানুষটার কাজে যত রকমের সাহায্য ও সহযোগিতা প্রয়োজন নিজের সবকিছু বিলীন করে দিয়ে তার যোগান দিয়েছেন। জয়েন্ট ফ্যামিলির বড় বউ হিসেবে এসে একাই সামাল দিয়েছেন সংসারের সব কাজ। সেই সাথে স্বামীর সংগ্রামে তাকে শক্তি যুগিয়েছেন, ৬ ছেলেকে মানুষ করেছেন। তিনি একজন সফল মা, আমাদের বৃহত্তর পরিবারের বর্তমান মুরব্বি এবং সকলের প্রিয়, আদরণীয়, পরম শ্রদ্ধার পাত্র। মা'র কাছে শুনেছি, উনার বিয়ের কয়েক বছর পর বাবা যখন ইসলামি আন্দোলন শুরু করলেন, তখন মাসের বেশির ভাগ সময়ই বাবা বাসার বাইরে থাকায় সংসার-সন্তান সামলাতে তিনি হাবুডুবু খেতেন। ঐ সময় একদিন বাবাকে অত্যন্ত বিনয়ের সাথেই নিজের এই কষ্টের কথা বলেছিলেন। হাসিমাখা মুখে বাবার জবাব ছিল, "তুমি কি চাও না যে জান্নাতে আমরা আবার একসাথে থাকি"? ব্যস, আর কোনদিন কোন কথা বলেন নি আমার মা, শুধু নীরবে ত্যাগ স্বীকার করেই গিয়েছেন, আর আজকের বিশ্বখ্যাত এই সিপাহসালার তৈরিতে রসদ যুগিয়েছেন।
বাবার ইন্তিকালের পর আমি নতুন করে উপলব্ধি করেছি যে, তিনি আমার "বায়োলজিক্যাল পিতা" হলেও এই পৃথিবীর লাখ লাখ মানুষের "রূহানি পিতা'র আসনে তিনি দৃঢ়ভাবে অবস্থান করছেন। উনার ইন্তিকালের পর সমগ্র বিশ্বের লাখ লাখ মানুষ উনার ব্যাপারে তাদের হৃদয় নিংড়ানো যে আবেগ ও ভালোবাসা দেখিয়েছেন তা সত্যিই বিরল। ডিজিটাল পৃথিবীর এই যুগে যেকোন দেশের, যেকোন মতের, যেকোন পথের, যেকোন একব্যক্তির পক্ষে এত বড় প্রাপ্তি আর আছে বলে আমার জানা নেই। উনার মত "জীবন্ত কিংবদন্তী"র সন্তান হওয়া সত্যিই এক বিরল ভাগ্য। তাই, এমন এক মহান ব্যক্তির সন্তান হওয়ার সৌভাগ্য অর্জন করায়, নিজেকে ধন্য মনে হয়েছে। অধ্যাপক গোলাম আযম এর মত মানুষের ছেলে হিসেবে জন্ম নিয়ে আমার জন্ম সার্থক। মহান আল্লাহর কাছে বিনয়াবনত চিত্তে লাখ শুকরিয়া আদায় করছি এমন মহান ব্যক্তিত্বের সন্তান হিসেবে আমাকে দুনিয়াতে পাঠানোর জন্য। সকলের নিকট দো'য়া চাই দুনিয়াতে যেন এমনভাবে জীবনযাপন করে যেতে পারি যাতে আমার কারণে আখেরাতে আমার বাবা-মা'র মুখ উজ্জ্বল হয়।
অধ্যাপক আযম এর মত ক্ষণজন্মা মানুষ শতাব্দীতে দু'-একজন জন্মায়। উনার মত ব্যক্তিদের জন্যই "জীবন্ত কিংবদন্তী" কথাটার উদ্ভব। এ দেশের মাটি, বাতাস, পানি ধন্য তিনি জন্মেছিলেন এ দেশে। দো'য়া করি, "হে আল্লাহ্, আমাদের এই হতভাগা জাতির বিবেক জাগ্রত করে দাও, এদেশের মানুষকে বোঝার ক্ষমতা দিও অধ্যাপক গোলাম আযম কেমন মানুষ ছিলেন। তারা কি হারিয়েছে তা হারানোর আগে না বুঝলেও এখন তাদের বুঝ দাও, আমিন"।
আল্লাহ তা'য়ালা যুগের নকিব তার এই বান্দাকে দুনিয়াতে যেই সম্মান দিয়েছেন তা বিরল। দো'য়া করি, মহান আল্লাহ তার প্রিয় এই বান্দাকে আদালতে আখেরাতে আরও অনেক বেশি সম্মানিত করুন, জান্নাতুল ফেরদাউস নসিব করুন, আমিন।
লেখক: মরহুম অধ্যাপক গোলাম আযম এর চতুর্থ পুত্র।
