সংবাদ · অর্থনীতি
মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধে বিশ্ব অর্থনীতিতে চরম অনিশ্চয়তা
১৩/১০/২০২৬

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির ওপর ভর করে বৈশ্বিক অর্থনীতি ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করলেও আন্তর্জাতিক জ্বালানি সংকটের অনিশ্চয়তা ও মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধাবস্থা আন্তর্জাতিক প্রবৃদ্ধির গতিকে শ্লথ করে তুলছে।আজ প্রকাশিত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ফ্ল্যাগশিপ ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউটলুক’ প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ২০২৬ সালে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ৩ দশমিক ১ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে। সংস্থাটি তাদের গত জুলাইয়ের প্রতিবেদনে ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির যে কথা জানিয়েছিল, এবারের হিসাবের মান তার চেয়ে সামান্য বেশি হলেও সার্বিক অর্থনীতি এখনো নানা চাপে জর্জরিত।আইএমএফের তথ্যমতে, আগামী ২০২৭ সালে বিশ্ব অর্থনীতির প্রবৃদ্ধি কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছানোর সম্ভাবনা থাকলেও তা সদ্য বিদায়ী ২০২৫ সালের ৩ দশমিক ৫ শতাংশ অর্জনের তুলনায় বেশ কম। প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, এআই প্রযুক্তি, ডেটা সেন্টার ও আনুষঙ্গিক অবকাঠামো খাতে আন্তর্জাতিক স্তরে বিশাল অংকের মূলধন ঢালার কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত অর্থনীতির দেশগুলো এবং প্রযুক্তি সরবরাহকারী রাষ্ট্রগুলো প্রত্যক্ষভাবে সুবিধা পাচ্ছে।এআই খাতের দ্রুত সম্প্রসারণ সফল হলে ২০২৯ সালের মধ্যে বিশ্বের সামগ্রিক মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) অতিরিক্ত শূন্য দশমিক ৬ শতাংশ পর্যন্ত বাড়তে পারে। তবে বিনিয়োগকারীদের মনমতো উৎপাদনশীলতা না বাড়লে শেয়ারবাজার এবং সাধারণ মানুষের ভোগব্যয়ে বড় ধরনের ধাক্কা লাগার আশঙ্কাও বাদ দেওয়া যাচ্ছে না।এদিকে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা নিয়ে আগের হিসাব অনেকটাই কমিয়ে এনেছে বৈশ্বিক এই ঋণদাতা সংস্থাটি। আন্তর্জাতিক সংকট ও অভ্যন্তরীণ পরিস্থিতির টানাপোড়েনে বাংলাদেশে জিডিপি প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস ৩ দশমিক ২ শতাংশে নামিয়ে এনেছে আইএমএফ, যা তাদের গত এপ্রিলের পূর্বাভাসে ঘোষিত ৪ দশমিক ৩ শতাংশের চেয়ে বেশ কম।আন্তর্জাতিক জ্বালানি তেলের বাজার ও বিশ্বব্যাপী দ্রব্যমূল্যের উর্ধ্বগতি নিয়ে কড়া আশঙ্কার কথা জানিয়েছে আইএমএফ।প্রতিবেদনে সতর্ক করে বলা হয়েছে, চলতি বছর আন্তর্জাতিক মূল্যস্ফীতি গড়ে ৪ দশমিক ৭ শতাংশের মতো থাকলেও মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সামরিক রক্তক্ষয় দীর্ঘস্থায়ী হলে কিংবা তেল সরবরাহে কোনো বিঘ্ন ঘটলে পরিস্থিতি মারাত্মক মোড় নিতে পারে। বিশেষ করে ২০২৭ সালের শুরু পর্যন্ত যদি আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩০ ডলারে উঠে যায়, তবে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি একলাফে ৫ দশমিক ২ শতাংশ পার হয়ে যাবে এবং বিশ্ব প্রবৃদ্ধির হার আরও নিচের দিকে নামবে।আঞ্চলিক প্রবৃদ্ধির বিচারে বিশ্বের প্রধান প্রধান অর্থনৈতিক পরাশক্তিগুলোর একেকটির চিত্র একেক রকম। যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনীতিতে চলতি বছর ২ দশমিক ৩ শতাংশ, ইউরোজোনে ১ দশমিক ১ শতাংশ এবং যুক্তরাজ্যে ১ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধির পূর্বাভাস দিয়েছে সংস্থাটি। এশিয়ার বাজারে চীনের জিডিপি প্রবৃদ্ধি চলতি বছর ৪ দশমিক ৫ শতাংশ এবং আগামী বছর ৪ শতাংশের ঘরে নামতে পারে, যা ভারতের ক্ষেত্রে প্রতি বছর ৭ শতাংশ হারে অব্যাহত থাকার সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে।অন্যদিকে যুদ্ধ পরিস্থিতি ও খনিজ উৎপাদনের সীমাবদ্ধতার কারণে মধ্যপ্রাচ্যের অর্থনৈতিক পাওয়ার হাউসগুলোর ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব পড়েছে। এতে চলতি বছর সৌদি আরবের অর্থনীতি ৩ দশমিক ৩ শতাংশ সংকুচিত হতে পারে এবং ইরান, ইরাক, কুয়েত, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতেও লক্ষণীয় ধস নামার সম্ভাবনা স্পষ্ট।
বৈশ্বিক অর্থনীতির অন্যতম বড় ঝুঁকি হিসেবে বিভিন্ন দেশের মাত্রাতিরিক্ত সরকারি ঋণ এবং বিশাল বাজেট ঘাটতিকে চিহ্নিত করেছে আইএমএফ। প্রতিবেদনে সরাসরি বার্তা দেওয়া হয়েছে, ঋণের ভার বেড়ে গেলে যেকোনো দেশের রাষ্ট্রীয় তহবিল নতুন কোনো দুর্যোগ সামলানোর সক্ষমতা হারিয়ে ফেলে।এমনকি সুদের বোঝা মেটাতে গিয়ে শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও জনকল্যাণমূলক খাতে অর্থ বরাদ্দের সুযোগ হারিয়ে যায়। এই অবস্থা মোকাবিলায় অবিলম্বে আর্থিক কাঠামো পুনর্গঠন, টেকসই ঋণ ব্যবস্থাপনা গ্রহণ এবং ভবিষ্যতে উদ্ভূত যেকোনো আর্থিক আঘাত সামলাতে বাজেট সক্ষমতা বাড়ানোর কোনো বিকল্প নেই বলে আইএমএফের প্রতিবেদনে জোর তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
মূল প্রতিবেদনে যান ↗