মরমি সাধক ফকির লালন শাহের মানবতাবাদী দর্শন পাঠ্যপুস্তকে অন্তর্ভুক্ত করাসহ তার দর্শনকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেবে সরকার। নতুন প্রজন্মের কাছে লালনের জীবনদর্শন ও অসাম্প্রদায়িক চেতনা তুলে ধরতে সরকার কাজ করবে বলে জানিয়েছেন সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরী।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) বিকেল চার টায় কুষ্টিয়ার কুমারখালীর ছেঁউড়িয়ায় লালন শাহের ১৩৬তম তিরোধান দিবস উপলক্ষে তিন দিনব্যাপী লালন উৎসবের উদ্বোধনকালে তিনি এসব কথা বলেন। ঐতিহাসিক লালন আখড়াবাড়িতে উৎসবের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করা হয়।
সংস্কৃতিমন্ত্রী বলেন, লালন শাহের দর্শন মানুষে মানুষে বিভেদ দূর করে মানবতা, সাম্য ও সম্প্রীতির শিক্ষা দেয়। বর্তমান সমাজে তার চিন্তা ও দর্শনের গুরুত্ব অপরিসীম। লালনের গান ও বাণীর মধ্য দিয়ে মানুষকে ভালোবাসা, মানবিকতা এবং আত্মোপলব্ধির যে শিক্ষা পাওয়া যায়, তা সমাজে শান্তি ও সম্প্রীতি প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি আরও বলেন, লালন কেবল একজন সাধক বা বাউল শিল্পী নন, তিনি বাঙালির আধ্যাত্মিক চিন্তা, মানবতাবাদী চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক সংস্কৃতির এক অনন্য প্রতীক। তার সৃষ্টি ও দর্শন দেশ, কাল ও ধর্মের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের অন্তরে জায়গা করে নিয়েছে। এই অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণ এবং পরবর্তী প্রজন্মের কাছে পৌঁছে দেওয়া সবার দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে লালন একাডেমির সভাপতি ও কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক তৌহিদ বিন হাসানের সভাপতিত্বে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে গেস্ট অব অনার হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান। মুখ্য আলোচক ছিলেন প্রাবন্ধিক অধ্যাপক ড. রশিদুন নবী।
আলোচনা সভায় বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন সংরক্ষিত আসনের সংসদ সদস্য ফরিদা ইয়াসমিন, সাবেক সংসদ সদস্য সৈয়দ মেহেদী আহমেদ রুমী, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার আমিনুল ইসলামসহ আমন্ত্রিত অতিথিরা।
বক্তারা বলেন, লালন শাহের জীবনদর্শন ও সংগীত বাঙালির সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তার গানের প্রতিটি পঙ্ক্তিতে মানুষের পরিচয়, আত্মিক মুক্তি, মানবপ্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার প্রতিফলন ঘটেছে। জাতি, ধর্ম ও বর্ণের ভেদাভেদ ভুলে মানুষকে মানুষ হিসেবে মূল্যায়ন করার যে শিক্ষা লালন দিয়ে গেছেন, তা আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
তারা আরও বলেন, লালনের গান ও দর্শন কেবল বিনোদনের বিষয় নয়, এর সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে জীবনবোধ, আত্মজিজ্ঞাসা এবং মানবিক মূল্যবোধের গভীর শিক্ষা। নতুন প্রজন্মের মধ্যে এই দর্শন ছড়িয়ে দিতে গবেষণা, চর্চা, প্রকাশনা ও প্রাতিষ্ঠানিক উদ্যোগ আরও জোরদার করা প্রয়োজন।
আলোচনা সভা শেষে উৎসবের মূল মঞ্চে শুরু হয় লালনসংগীত পরিবেশনা। লালন একাডেমির শিল্পীদের পাশাপাশি দেশবরেণ্য লালনসংগীতশিল্পীরা ফকির লালন শাহের আধ্যাত্মিক গান পরিবেশন করেন। তাদের কণ্ঠে লালনের কালজয়ী সৃষ্টি ও মানবতাবাদী বাণী উপস্থিত দর্শক-শ্রোতাদের মধ্যে বিশেষ আবহ তৈরি করে।
লালনের গানের সুরে মুখর হয়ে ওঠে আখড়াবাড়ি প্রাঙ্গণ। তার অমর সৃষ্টি ও আধ্যাত্মিক বাণী ঘিরে ভক্ত-অনুরাগীদের মধ্যে তৈরি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ। লালনভক্ত, সাধু-গুরু, বাউলশিল্পী ও সংগীতপ্রেমীদের কাছে এ আয়োজন হয়ে ওঠে সাধুসঙ্গ, সংগীতচর্চা এবং লালনদর্শন উপলব্ধির গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।
প্রতিবছর লালন শাহের তিরোধান দিবসকে কেন্দ্র করে ছেঁউড়িয়ার আখড়াবাড়িতে দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত, সাধু, বাউল ও দর্শনার্থীর সমাগম ঘটে। লালনের গান, দর্শন ও জীবনাদর্শের প্রতি মানুষের গভীর অনুরাগ এ আয়োজনকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে।
মরমি সাধক ফকির লালন শাহ তার গান ও দর্শনের মধ্য দিয়ে মানুষকে আত্মপরিচয় অনুসন্ধান, মানবপ্রেম এবং সব ধরনের সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে ওঠার আহ্বান জানিয়েছেন। তার সৃষ্টিতে জাতপাত, ধর্মীয় বিভেদ ও সামাজিক বৈষম্যের বিরুদ্ধে মানবিক চেতনার প্রকাশ ঘটেছে। সেই চেতনা ধারণ করেই কুষ্টিয়ার ছেউড়িয়ায় প্রতিবছর অনুষ্ঠিত হয় লালন স্মরণোৎসব।
তিন দিনব্যাপী এ উৎসবের মধ্য দিয়ে লালন শাহের জীবন, কর্ম, সংগীত ও দর্শন নতুন করে আলোচনায় আসবে। একই সঙ্গে তার মানবতাবাদী চিন্তা ও অসাম্প্রদায়িক চেতনাকে নতুন প্রজন্মের কাছে পৌছে দেওয়ার প্রত্যাশা করছেন আয়োজক ও লালনভক্তরা।
