শহরের ইট-কাঠের দুনিয়ায় প্রান্তিক মানুষের জীবন ও স্মৃতির প্রতীকী দৃশ্যপট।ছবি: সংগৃহীত
Published on
:
4 min read
ইনকিলাব জিন্দাবাদ
ব্রজ সৌরভ চট্টোপাধ্যায়
( ১ )
ওর নাম ভবা। সকাল বেলায় ভবা গাছতলা থেকে পোঁটলা নিয়ে কাঁধে ফেলে। ওজনটা বুঝে নেয়। তারপর সামনের চা দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে পড়ে। চায়ের কেটলি থেকে ভকভক করে স্টিম বেরোয়। ভবা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে দেখে সেটা। নাক টানে। নাকে ভকভক করে একটা স্বাদু গন্ধ ইনিয়ে বিনিয়ে ঢোকে। ভবার চোখ থেকে ঘুম ঘুম পর্দাটা নড়ে ওঠে। কড়া করে উঠবে বলে রোদের প্রস্তুতি শুরু হয়। মানুষের মুখে ঝামা ঘষে দেবে বলে আলো এসে খাবলা মারতে শুরু করে ছায়ার আশেপাশে। ভবা ওর পোঁটলা থেকে ডান্ডি ভাঙা ময়লা ময়লা একটা স্টিলের কাপ বের করে এগিয়ে রাখে দোকানির দিকে। দোকানি ধূপ দেখায় গণেশকে। তারপর আরামসে তৈরি করা চা-টা ফ্লাস্কে ঢালে। সেটা আটকায়। ফের খোলে। অন্য একজন বা দুজন এরমধ্যে যেহেতু জমে যায় রোজই, দোকানি তাদের জন্যে আগে ভাঁড়ে চা ঢালে। একজন কেউ পয়সা দিলে সেটা ছবির গণেশের ফর্সা আর গোদের মতো ফুলে ওঠা পায়ে ঠেকায়। তারপর ভবাকে চা দেয়। চা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে মনে মনে রোজ দু তিনটে খিস্তিও দেয় ভবাকে রোজ। ভবা চা পেলে আস্তে আস্তে কেটে পড়ে দোকান থেকে। পোঁটলা খুলে একটা বিড়ি বার করে। সেটা ধরায়। চুমুক মারে কাপে। তারপর বলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’।
( ২ )
ভবার ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’ শুনে গাছতলার পেছনের মাঠটায় হাঁটতে আসা মোটকা লোকজন খামোকা থমকে যায় একবার। তাদের স্মার্ট ওয়াচ টুকুস করে সিগন্যাল দেয়। জানান দেয়, থামা বারণ। রাস্তা দিয়ে চলতি সাইকেলের ওপর প্যাডেল মারা লোকজনের হ্যান্ডেল একবার টাল খায়। মৃদু এবং খুব সামান্য। চায়ের দোকানে বসে থাকা খবরের কাগজ হাতে লোকটার পেছন একটুখানি চিড়বিড় করে ওঠে। বহুদিনের অর্শ বোধহয়। হাসিখুশি একজন ডাক্তারের কথা মনে পড়ে তার। ফুরিয়ে যাওয়া ভাঁড়টা যত্নে সে ফেলে দেয়। তারপর একটা সিগারেট ধরাতে গিয়ে চেপে রাখে ব্যাপারটা। ভাবে, হাগু হয়ে যেতে পারে। সিগারেটে চাপ আছে।
( ৩ )
ভবা বিড়িটা পুঁতে দেয় গাছতলার নিচে তৈরি হওয়া আলো আর ছায়ার ঝিকিমিকিতে। সাতসকালে খামোকা মাঝে মাঝে এসময় একটা পুলিশের ভ্যান পেরোয়। সারারাত্তির মাতাল ধরেছে ভ্যানটা। ধরেছে ছোটোখাটো খানকি আর তাদের সস্তা ভাতারদের। মাঝখানে ঘুম দিয়েছে পালা করে সব। এই পালা করে ঘুমের ব্যাপারটায় জুত নেই তেমন। ফলে সবারই চোখ কমবেশি লালচে। নতুন দিন যেরকম হয় আর কী ! ভবাকে পাশ কাটানোর সময় গাড়ির ড্রাইভারের সঙ্গে চোখাচুখি হয় ভবার। ভবা স্যালুট জানায়। বলে ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। এরপর ভবা বেরোয়।
( ৪ )
সামনেই ‘জনতা মেডিকেল’। ভবা রোজ দোকানের সাইনবোর্ডটা পড়ে জোরে জোরে। দোকানের কর্মচারী ধূপ দেখায়। করোনার সময় থেকে দোকানের গেটের দু-প্রান্তে একখান দড়ি টানানো আছে। যাতে ওষুধ কিনতে এসে ‘জনতা মেডিক্যাল’-এ জনতা খুব কাছে ঘেঁষতে না পারে। ভবা মানেনা এই বর্ডার লাইনটা। সাইনবোর্ড টা পড়া শেষ করে আপনমনে হাসতে থাকে ভবা। ওর হলদেটে মার্কা দাঁতের হাসিতে বিরক্ত হতে হতে আপাতত ক্লান্ত জনতা মেডিকেলের কর্মচারী। ভবা দড়ি টপকে দোকানের ভেতরে ঢুকে পড়ে। কড়া ধূপের গন্ধের সঙ্গে একটা বোঁটকা তেল চিটচিটে গন্ধ পাক খেতে থাকে দোকানে তখন। কর্মচারী লোকটা রসিক বেশ। প্রেগা কার্ড ওর হাত থেকে বিক্রি হলে ফ্যাকফেকে রকমের খুশি হয় খুব। কন্ডোম আর স্যানিটারি ন্যাপকিন ওর হাত থেকে বেরোলে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সে দেখে নেয় কিনতে আসা মানুষকে। ভেতর ভেতর জিভের লালায় মুখ ভিজে ওঠে রসিক ঠাকুরের। সাতসকালে ভবা দোকানে ঢুকতেই কর্মচারী বলে ওঠে— কী রে ভবা, কন্ডোম নিবি ? দাঁত খুলে হাসে ভবা। উফ ! কী হাসি... ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানায় ভবা। মনে মনে হিসেব করে ভবা বলে— দুটো। আর দেখায় ভিকসের কৌটোটা। কর্মচারী সত্যি সত্যিই এক প্যাকেট কন্ডোম ভবাকে এগিয়ে দেয়, আর বলে— তা লাগাবি কাকে ? আছে তোর কেউ ? ভবা ফের দাঁত কেলিয়ে হাসে। ওর চোখ কিন্তু ভিকসের কৌটো থেকে নড়েনা। হাত দিয়ে নধর কন্ডোমের প্যাকেটটা ঠেলে সরিয়ে দেয় ভবা। কর্মচারী বলে— সখ কত ! যা ভাগ এখান থেকে। লাগানোর কেউ নেই, আর কন্ডোম নেবে ! ভবা বাজারের বুড়ো ষাঁড়ের মতো পা গেঁথে রাখে দোকানের ভেতর। বিড়বিড় করে বলে— আছে আছে। জনতা আছে। লাগানো যায়। জনতা আছে। লাগাব। হেবি লাগবে। হেবি লাগবে। দে দুটো... রসিক চুড়ামণি কর্মচারী দুটো ভিকস লজেঞ্জ দেয় ভবাকে। বলে— এই নে। চুষে মরে যা শালো... ভবা অকৃপণ হলদেটে আলোর মতো হাসি ছড়ায় এরপর। একটা ভিকস লজেন্স চালান করে মুখের ভেতর। ফের বলে ওঠে— ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। লজেন্সের খোসাটা যত্নে ঢুকিয়ে নেয় ঝোলায়। দোকান ছেড়ে ভবা এগোতে থাকে।
( ৫ )
ভবা এগোলে ধীরে সুস্থে বাড়তে থাকে রোদ। ভবা রোদের হাসির মতো, অভ্যেসের মতো এগোতে এগোতে পৌঁছয় সামনের লটারির দোকানে। এখানে ভাগ্য পরীক্ষা করে আপামর জনতা। প্রায় রোজই সকালে গাঁদা ফুলের মালা ঝোলে। লাল আর হলদেটে মালা একসঙ্গে পাঞ্চ হয়ে যেদিন মোটা করে ঝোলে, বুঝতে হবে আগের রাত্তিরে কেউ লাখপতি হয়েছে এই দোকান থেকে। লটারির প্রতি ভবার অমোঘ আকর্ষণ। দোকানে টনটনে করে টানানো লটারির রেজাল্টের পাতাটা বিড়বিড় করে ভবা পড়ে আর মনে মনে হিসেব করে বত্রিশ বাহান্ন তিনশো নয় সাতশো ছত্রিশ... লটারির লোকটা ভবাকে দেখামাত্রই বলে— কী রে ভবা, একবার ট্রাই কর। কতদিন আর পুরনো কম্বল জড়িয়ে ঘুরে মরবি ! ভবা ফের হাসে। বোকা বোকা ম্যাজিক শেষে বুড়ো ম্যাজিকওয়ালা যেমন ফোকলা হেসেও মন জিতে নেয় ছোটখাটো স্কুলের লেলামার্কা বাচ্চাদের, অমন হাসি হাসে ভবা। লটারিওয়ালা রোজ এক তাড়া পুরনো লটারির টিকিট ভবার ঝোলায় ফেলে দেয় ভিক্ষা দেওয়ার মতো। ভবা নিজের ডানহাতটা কপালে মিলিটারি লোকদের মতো ঠেকায় আর বিড়বিড় করে ওঠে— ‘ইনকিলাব জিন্দাবাদ’। ভবা এগোতে থাকে।
( ৬ )
যে শহরে এই ভবা থাকে, সেখানে দুপুর নামে থতমত শুয়োরের মতো। দুপুরে ভর্তি পেট অথবা খালি পেটেই ভবা কোনো এক গাছতলা কিম্বা গাড়ি বারান্দার নীচে পেট চেপে শুয়ে ঝোলা উপুড় করে দেয়। ভবার ঝোলা থেকে উপচে পড়ে অনেককালের বাসি সমস্ত জিনিস। একটা ভাঙা চিরুনি। দুটো নষ্ট হওয়া ব্রাশ। একটা বহু পুরোনো ক্যালেন্ডার। চায়ের ভাঙা কাপ। উলাঝুলা একগাদা প্লাস্টিক। লজেন্সের মোড়ক। ছেঁড়া জামাকাপড়। জাতীয় পতাকা। সেসবের উগ্র গন্ধ...
( ৭ )
তাকে পাশ কাটিয়েই হাওয়া বইতে থাকে এক একদিন। ভবার ঘুম নামে চোখে। পিঁচুটি জন্মানো চোখ ধীরে ধীরে বন্ধ হয় ভবার। ছড়ানো ছেটানো জিনিস এলোমেলো ভাবে পড়ে থাকে তার চারপাশে। ভবা ঘুমোয়। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ভবা হাত পা নাড়ায়। মশা কিম্বা মাছি হয়তো জ্বালাতন করে ওকে। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে ভবা বিড়বিড় করে ওঠে।
( ৮ )
স্বপ্ন দেখে কি কোনো ভবা ? ওর স্বপ্নে একটা জ্যান্ত টিকটিকি আসে কি রোজ ? যেটা লেজ খসিয়েও চমৎকার থেকে গেছে পৃথিবীতে। ওর স্বপ্নে একটা পুরোনো কচ্ছপ ধীর পায়ে হেঁটেচলে ফেরে ? ভবা বিড়বিড় করে চলে। ইনকিলাব ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে ওঠে রোজ দুপুরে। জিন্দাবাদ টুক করে গামছা পেঁচিয়ে ঝুলে গেছে এই শহরে।
( ৯ )
শুধু কোথাকার কোন এক আধবুড়ো ফিল্মওলা মদ খেয়ে লিভার পচিয়ে ফেলছে শুধু। এই বিকেলের মরা আগুনটুকু ধরে রাখবে তার শেষ দৃশ্যে বলে...
