বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে জ্ঞানভিত্তিক অলিম্পিয়াডে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে বাংলাদেশি শিশু-কিশোরদের সাফল্য অর্জনের সুযোগ তৈরি করতে কাজ করছেন উদ্যোক্তা ও ইংরেজি শিক্ষক মো. তানভীরুল হক।
দুই দশক ধরে কলেজে অধ্যাপনার পাশাপাশি ইংরেজি ব্যাকরণ ও ভাষাবিষয়ক ৫০টিরও বেশি বই লিখেছেন তিনি। নিজের মেয়ে তাহিয়ার বিশ্ব অলিম্পিয়াডে স্বর্ণপদক অর্জনে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশে প্রতিষ্ঠা করেন ‘ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াডস বাংলাদেশ’। তার লক্ষ্য, আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর পাশাপাশি দেশকেও বিশ্বমানের অলিম্পিয়াড আয়োজনের সক্ষমতা অর্জনে এগিয়ে নেওয়া।
তানভীরুল হক জানান, ‘ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াডস’ বিশ্বের প্রায় ৫০টি অলিম্পিয়াড আয়োজক প্রতিষ্ঠানের আনুষ্ঠানিক অংশীদার। এসব প্রতিষ্ঠানের মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, সিঙ্গাপুর, অস্ট্রেলিয়া, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ভারত ও ইন্দোনেশিয়ার বিভিন্ন সংগঠন রয়েছে। এরই মধ্যে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, অস্ট্রেলিয়া, মিসর, জর্ডান, সিঙ্গাপুর, চীন, তুরস্ক, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও জাপানে আয়োজিত বিভিন্ন অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের শত শত শিক্ষার্থীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করেছে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রথম শ্রেণি থেকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা এসব প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে। ইংরেজি, বিজ্ঞান, গণিত, রসায়ন, জীববিজ্ঞান, রোবোটিকস, কোডিং, সাইবার নিরাপত্তা, চারুকলা ও ব্যবসাসহ বিভিন্ন বিষয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সুযোগ রয়েছে। এসব আয়োজনে নিজ শ্রেণির বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে জ্ঞান ও দক্ষতা যাচাই করতে পারে তারা।
আন্তর্জাতিক পর্বে অংশ নেওয়ার আগে বাংলাদেশে জাতীয় পর্যায়ে বাছাই প্রতিযোগিতা অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কৃতিত্বের ভিত্তিতে হীরা, স্বর্ণ, প্লাটিনাম, রৌপ্য ও ব্রোঞ্জ পদক দেওয়া হয়। নির্বাচিত শিক্ষার্থীরা পরবর্তী আন্তর্জাতিক পর্বে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা অর্জন করে। অংশগ্রহণকারীদের দেওয়া হয় সনদও। আন্তর্জাতিক পর্বে অংশ নিতে ভিসাসহ প্রয়োজনীয় আয়োজনেও সহযোগিতা করে প্রতিষ্ঠানটি।
প্রস্তুতির বিষয়ে তানভীরুল হক জানান, নিবন্ধিত শিক্ষার্থীদের নির্দিষ্ট পাঠ্যসূচি ও নমুনা প্রশ্ন দেওয়া হয়। প্রয়োজন অনুযায়ী আয়োজন করা হয় বিশেষ প্রশিক্ষণ ও অনুশীলনী পরীক্ষা। প্রতিযোগিতাভেদে সরাসরি উপস্থিত হয়ে কিংবা অনলাইনে পরীক্ষা দেওয়ার সুযোগ রয়েছে। লিখিত পরীক্ষা, বহুনির্বাচনী প্রশ্ন, উপস্থাপনা ও সমস্যা সমাধানের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের দক্ষতা যাচাই করা হয়। প্রাপ্ত নম্বরের ভিত্তিতে দেওয়া হয় বিভিন্ন পদক।
তানভীরুল হকের মতে, অলিম্পিয়াড শুধু পরীক্ষা নয়; আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতামূলক পরিবেশে জ্ঞান, বিশ্লেষণী দক্ষতা ও সমস্যা সমাধানের সক্ষমতা প্রমাণের সুযোগ। এর মাধ্যমে শিক্ষার্থীরা বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা ও আত্মবিশ্বাস অর্জন করতে পারে। পাশাপাশি বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি কিংবা বৃত্তির আবেদনে পাঠ্যক্রমবহির্ভূত কার্যক্রম হিসেবে অলিম্পিয়াডের সনদ বিবেচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
বাংলাদেশি শিক্ষার্থীদের সাফল্যের উদাহরণ তুলে ধরে তিনি বলেন, দেশের মেধাবী শিক্ষার্থীরা ইতিমধ্যে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতা থেকে হীরা ও স্বর্ণপদক অর্জন করেছে। চট্টগ্রামের তাহিয়া, জারিফুল আবরার, রোদশী ভৌমিক ও শরীফ তাকবির আহমেদ আন্তর্জাতিক গণিত, বিজ্ঞান ও অ্যাবাকাস প্রতিযোগিতায় পূর্ণ নম্বর পেয়ে বিশেষ কৃতিত্ব অর্জন করেছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুরে অনুষ্ঠিত আন্তর্জাতিক গণিত অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের ১২ জন অংশগ্রহণকারীর মধ্যে সাতজন স্বর্ণপদক পেয়েছে।
এ ছাড়া থাইল্যান্ডের ব্যাংককে অনুষ্ঠিত এশিয়ান চ্যাম্পিয়নস লিগের আন্তর্জাতিক ফাইনাল ২০২৬-এ বিজ্ঞান ও ইংরেজিতে স্বর্ণপদক অর্জন করেছে পূর্ণতা সাহা। বিজ্ঞানে পেয়েছে ‘ডেইলি লাইফ আইনস্টাইন’ বিশেষ সম্মাননাও।
তানভীরুল হক বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা যখন লাল-সবুজের পতাকা উঁচিয়ে ধরে, সেই আনন্দ ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। এসব সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্বে বাংলাদেশের নতুন পরিচিতি তৈরি হচ্ছে, ছড়িয়ে পড়ছে দেশের গৌরব।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি জানান, এখন তাদের লক্ষ্য বাংলাদেশে আয়োজিত অলিম্পিয়াডে বিশ্বের অন্যান্য দেশের শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা। গত জুনে তাদের আয়োজনে মালয়েশিয়ায় ইংরেজি ভাষার বিশ্বকাপ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সম্প্রতি সিঙ্গাপুর থেকে ‘ব্র্যান্ডস ফর গুড অ্যাওয়ার্ডস ২০২৬’ স্বীকৃতিও পেয়েছে প্রতিষ্ঠানটি।
তানভীরুল হকের প্রত্যাশা, ভবিষ্যতে আরও বড় পরিসরে আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতার আয়োজন করে বাংলাদেশ প্রমাণ করবে, এ দেশও বিশ্বমানের অলিম্পিয়াড আয়োজন করতে সক্ষম। একই সঙ্গে সঠিক সুযোগ পেলে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরাও বিশ্বের যে কোনো মঞ্চে বিজয় ছিনিয়ে আনতে পারে।
