ছবি- আইজিপি ও কানাডাপ্রবাসী।
প্রবাসীদের বিমানবন্দরে হয়রানি বন্ধ, দেশে জমি-সম্পত্তি নিয়ে বিরোধের প্রতিকার এবং বিদেশে মৃত্যুবরণকারীদের মরদেহ দেশে আনার খরচ কমানোর বিষয়ে আলোচনা করেছেন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির ও কানাডাপ্রবাসী সংগঠক সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুল। এ সময় প্রবাসীদের জন্য উন্নত বিমানবন্দর সেবা নিশ্চিত করা, জমি দখল ও হয়রানিমূলক মামলা থেকে প্রতিকার এবং অসহায় প্রবাসীদের মরদেহ বিনা খরচে দেশে আনার উদ্যোগ অব্যাহত রাখার বিষয়েও কথা হয়। জাতীয় দৈনিক খোলা বাজারের সম্পাদক ও প্রকাশক মো. জহিরুল ইসলাম কলিম তাঁদের সাক্ষাৎকার নেন।
সাক্ষাৎকারে বিমানবন্দরে প্রবাসীদের হয়রানি প্রসঙ্গে আইজিপি মো. আলী হোসেন ফকির বলেন, আইনশৃঙ্খলাসংক্রান্ত সমস্যাগুলো সমাধানে পুলিশ কাজ করতে পারবে। তবে বিমানবন্দরের যেসব বিষয় বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) আওতাধীন, সেগুলো সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে সমাধান করতে হবে। বিমানবন্দরে এপিবিএন, কাস্টমস, এনএসআই, ডিজিএফআইসহ বিভিন্ন সংস্থা দায়িত্ব পালন করে। এসব সংস্থার সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে সমাধানের সুপারিশ করা প্রয়োজন।
তিনি বলেন, বিদেশ থেকে আসা যাত্রীরা বিমানবন্দরের বাইরে বের হওয়ার পর ট্যাক্সি বা গাড়ি পেতে অনেক সময় একটি চক্রের হয়রানির শিকার হন। এ ধরনের চক্রের তৎপরতা বন্ধে পুলিশ উদ্যোগ নিতে পারে। যাত্রীদের নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করতে হাইওয়ে পুলিশের একটি অ্যাপের মাধ্যমে গাড়ি বুকিংয়ের ব্যবস্থাও উন্নয়নের কাজ চলছে। এর মাধ্যমে যাত্রীরা আগে থেকেই গাড়ি বুকিং দিয়ে নিশ্চিত হতে পারবেন। দক্ষ ও অভিজ্ঞ চালকের মাধ্যমে সেবা দেওয়ার বিষয়টিও গুরুত্ব পাচ্ছে।
এ সময় কানাডাপ্রবাসী সংগঠক সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুল বলেন, প্রবাসীদের অনেকের দেশে আত্মীয়স্বজন ও জমি-সম্পত্তি রয়েছে। এসব সম্পদ নিয়ে তাঁরা প্রায়ই নানা ধরনের হয়রানির শিকার হন। কখনো তাঁদের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়। এ ধরনের হয়রানি থেকে মুক্ত থাকতে তিনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা কামনা করেন।
জবাবে আইজিপি বলেন, ভূমি জবরদখল প্রতিরোধ এবং ভুক্তভোগীদের প্রতিকার নিশ্চিত করতে বর্তমান সরকার আইন সংশোধন করেছে। এ আইনের আওতায় জমি জবরদখলের শিকার ব্যক্তিরা দ্রুত প্রতিকার পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
সাক্ষাৎকারে প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনার ব্যয় কমানোর বিষয়টিও গুরুত্ব পায়। সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুল বলেন, প্রধানমন্ত্রী প্রবাসীদের জন্য প্রবাসী কার্ড দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। এ কার্ডের সঙ্গে বিদেশে মৃত্যুবরণকারী প্রবাসীদের মরদেহ দেশে আনার জন্য বিনা খরচে বিমান পরিবহনের সুবিধা যুক্ত করার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। এ বিষয়ে প্রধানমন্ত্রী, প্রবাসীকল্যাণমন্ত্রী ও বিমানমন্ত্রীর পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সহযোগিতা চান তিনি।
জবাবে আইজিপি বলেন, বিমানের পরিচালনা ও রক্ষণাবেক্ষণে ব্যয় রয়েছে। তবে যেসব প্রবাসীর মরদেহ দেশে আনার মতো আর্থিক সামর্থ্য বা সহযোগিতা করার কেউ নেই, তাঁদের পাশে সরকার দাঁড়ায়। প্রবাসীদের প্রতি প্রধানমন্ত্রী আন্তরিক এবং তাঁদের কল্যাণে বিভিন্ন উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রবাসীরা কঠোর পরিশ্রম করে দেশে রেমিট্যান্স পাঠান, যা বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখে। তাই দেশে ফেরার পর তাঁদের প্রতি সহমর্মিতা দেখানো এবং বিমানবন্দরে উন্নত সেবা নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
আইজিপি আরও বলেন, বিমানবন্দরের সক্ষমতার সীমাবদ্ধতা থাকলেও বিদ্যমান ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন জরুরি। বিশেষ করে অভিবাসন কার্যক্রম শেষ হওয়ার পর যাত্রীদের লাগেজ সংগ্রহ থেকে শুরু করে বিমানবন্দর থেকে বের হওয়া পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সেবা নিশ্চিত করতে হবে। আন্তর্জাতিক মানের সেবা দিতে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ব্যবস্থাপনার উদ্যোগ নেওয়া হলেও প্রত্যাশিত উন্নতি হচ্ছে কি না, তা সরকার খতিয়ে দেখবে।
কানাডায় প্রবাসীদের উদ্যোগে পরিচালিত বাংলাদেশ ফিউনারেল সার্ভিসের কার্যক্রম সম্পর্কে জানতে চান খোলা বাজারের সম্পাদক ও প্রকাশক মো. জহিরুল ইসলাম কলিম। তিনি সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুলের কাছে জানতে চান, তাঁদের সংগঠন নিজেদের অর্থায়নে এ পর্যন্ত কতজনের মরদেহ বাংলাদেশে পাঠিয়েছে।
জবাবে মুকুল বলেন, তাঁদের সদস্যদের সবাই বিদেশে মৃত্যুবরণ করার পর মরদেহ দেশে আনতে চান না। তাঁদের হিসাব অনুযায়ী, ১০ জনের মধ্যে দুই থেকে তিনজন মরদেহ দেশে এনে বাবা-মায়ের পাশে সমাহিত হতে চান। কানাডায় কোনো সদস্য মারা গেলে তাঁদের সংগঠন মরদেহ পরিবহনে প্রয়োজনীয় আর্থিক ও লজিস্টিক সহায়তা দেয়। কেউ বাংলাদেশে মরদেহ আনতে চাইলে টরন্টো থেকে পরিবহনের জন্য প্রায় সাত হাজার ২০০ থেকে সাত হাজার ৩০০ কানাডীয় ডলার পর্যন্ত সহায়তা দেওয়া হয়। দেশে মরদেহ আনতে মোট ব্যয় প্রায় ১২ হাজার ২০০ থেকে ১২ হাজার ৩০০ ডলার হওয়ায় বাকি অর্থ পরিবারকে বহন করতে হয়।
তিনি বলেন, সম্প্রতি একটি মরদেহ বাংলাদেশে পাঠাতে বিমান কর্তৃপক্ষকে অর্থ দেওয়ার পাশাপাশি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমেও অতিরিক্ত অর্থ ব্যয় করতে হয়েছে। সব মিলিয়ে তাঁদের প্রায় চার হাজার ৫০০ ডলার খরচ হয়েছে। বিমান কর্তৃপক্ষ সরাসরি তাঁদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে পরিবহনের ব্যবস্থা করলে ব্যয় অনেক কমানো সম্ভব। এতে প্রবাসীদের সংগঠনের পাশাপাশি মৃত ব্যক্তির পরিবারের ওপরও আর্থিক চাপ কমবে।
এ সময় প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে মুকুল বলেন, সম্প্রতি কানাডার ম্যানিটোবায় এক বাংলাদেশি আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীর মৃত্যু হলে তাঁর মরদেহ দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়। প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশনায় মরদেহটি বিনা খরচে দেশে পাঠানো সম্ভব হয়েছে। এ জন্য বাংলাদেশ ফিউনারেল সার্ভিস ও প্রবাসীদের পক্ষ থেকে তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। এ উদ্যোগ অব্যাহত রাখারও আহ্বান জানান তিনি।
জবাবে আইজিপি বলেন, কোনো প্রবাসী অসহায় অবস্থায় বিদেশে মারা গেলে এবং তাঁর মরদেহ দেশে আনার প্রয়োজন হলে সরকার সহযোগিতা করবে। প্রবাসীদের পুলিশি সহায়তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি অন্যান্য সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট বিভাগগুলোর সঙ্গে সমন্বয় করা হবে, যাতে তাঁরা কোনোভাবেই হয়রানির শিকার না হন।
সাক্ষাৎকারের শেষ পর্যায়ে আইজিপিকে সময় দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ জানান খোলা বাজারের সম্পাদক ও প্রকাশক মো. জহিরুল ইসলাম কলিম। প্রবাসীদের পক্ষ থেকে সৈয়দ আমিনুল ইসলাম মুকুলও আইজিপি ও প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা জানান।

