ফ্রান্সে শহরে শহরে কারফিউ। ইউরোপের রাস্তায় ক্ষোভ বাড়ছে। ফ্রান্সে বিক্ষোভের পর জনশৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে ফরাসি সরকার কয়েকটি শহরে আংশিক কারফিউ ও সমাবেশের ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করেছে। অর্থনৈতিক অসন্তোষ থেকে শুরু হওয়া বিক্ষোভ নিয়ন্ত্রণে সরকারকে কঠিন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে। প্রধানমন্ত্রী সেবাস্তিয়াঁ লেকর্নু প্যারিসজুড়ে পূর্ণাঙ্গ কারফিউয়ের সম্ভাবনা নাকচ করলেও পরিস্থিতি মোকাবিলায় জরুরি পদক্ষেপের কথা বলেছেন।
এই অস্থিরতার মধ্যেই মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের মন্তব্য নতুন করে বিতর্ক উসকে দিয়েছে। তার দাবি, অভিবাসন অব্যাহত থাকলে প্যারিস অচিরেই ‘মুসলিম শহর’ হয়ে যাবে। কথাটি শুধু একটি শহরের জনসংখ্যা নিয়ে ভবিষ্যদ্বাণী নয়; এর মধ্যে রয়েছে অভিবাসন, ধর্মীয় পরিচয়, ইউরোপের সাংস্কৃতিক ভবিষ্যৎ এবং পশ্চিমা রাজনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বিতর্ক।
কিন্তু প্রশ্ন হলো, ফ্রান্সের রাস্তায় যে মানুষগুলো বিক্ষোভ করছেন, তাদের সবাই কি অভিবাসনের বিরুদ্ধে? জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির দাম, শিক্ষাব্যবস্থার সংকট, কর্মসংস্থান ও সরকারি সেবার মান নিয়ে যাদের ক্ষোভ, তাদের অসন্তোষের ব্যাখ্যা কি কেবল মুসলিম ও অভিবাসীদের দায়ী করে দেওয়া যায়?
ইউরোপে প্রায় এক দশক বসবাসের অভিজ্ঞতা থেকে আমার উপলব্ধি, এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হলে রাজনৈতিক স্লোগানের বাইরে গিয়ে বাস্তবতা দেখতে হবে। কারণ, অভিবাসন ইউরোপের একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ইস্যু হলেও ইউরোপের প্রতিটি সংকটের ব্যাখ্যা অভিবাসীদের মধ্যে খোঁজা বাস্তবতার সরলীকরণ।
ফ্রান্সের সাম্প্রতিক বিক্ষোভের দিকে তাকানো যাক। ১৭ অক্টোবরের বিক্ষোভে শিক্ষার্থী, শ্রমিক, ট্রেড ইউনিয়নকর্মী এবং আগে বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলনে অংশ নেওয়া মানুষ রাস্তায় নামেন। জীবনযাত্রার ব্যয়, জ্বালানির মূল্যবৃদ্ধি, সরকারি সেবার অবনতি ও অর্থনৈতিক চাপ ছিল তাদের ক্ষোভের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। পরে বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ সহিংস হয়ে ওঠে। ফরাসি সংবাদমাধ্যম লে মোঁদ এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনেও এই অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রেক্ষাপট উঠে এসেছে।
এখানে দুটি বিষয় আলাদা করে দেখা জরুরি। প্রথমত, শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভকারীদের দাবি। দ্বিতীয়ত, সেই বিক্ষোভের সুযোগে লুটপাট, অগ্নিসংযোগ ও পুলিশের ওপর হামলায় জড়িত ব্যক্তিদের কর্মকাণ্ড।
দ্বিতীয় এই ধরনের অপরাধকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না। রাষ্ট্রের দায়িত্ব নাগরিকের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, অপরাধীদের আইনের আওতায় আনা এবং জনজীবনে স্বাভাবিক অবস্থা ফিরিয়ে আনা। কিন্তু কিছু মানুষের সহিংসতার দায় পুরো বিক্ষোভকারী জনগোষ্ঠীর ওপর চাপানো যেমন অন্যায়, তেমনি অপরাধীদের পরিচয় যাচাই না করেই সবকিছুর জন্য অভিবাসীদের দায়ী করাও যুক্তিসংগত নয়।
ট্রাম্পের বক্তব্যের রাজনৈতিক তাৎপর্য এখানেই। তিনি ফ্রান্সের অস্থিরতাকে অভিবাসনের বিপদ হিসেবে তুলে ধরছেন। অথচ কোনো ঘটনার সঙ্গে অভিবাসনের সম্পর্ক প্রতিষ্ঠা করতে হলে প্রমাণ প্রয়োজন। কারা সহিংসতায় অংশ নিয়েছেন, তাঁদের উদ্দেশ্য কী ছিল, বিক্ষোভের মূল দাবি কী এবং অপরাধের সঙ্গে অভিবাসননীতির কোনো প্রত্যক্ষ যোগসূত্র আছে কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর ছাড়া একটি পুরো জনগোষ্ঠীকে দায়ী করা রাজনৈতিক বক্তব্য হতে পারে, নিরপেক্ষ বিশ্লেষণ নয়।
অভিবাসন নিয়ে ইউরোপের উদ্বেগ বাস্তব। কিন্তু সেই উদ্বেগের অস্তিত্ব আর নির্দিষ্ট বিক্ষোভের কারণ হিসেবে অভিবাসনকে চিহ্নিত করা এক বিষয় নয়।
মুসলিম পরিচয় কি সংকটের মূল কারণ? ট্রাম্পের ‘প্যারিস মুসলিম শহর হয়ে যাবে’ মন্তব্যের পেছনে একটি রাজনৈতিক ধারণা কাজ করে: অভিবাসন বাড়লে ইউরোপ তার নিজস্ব সাংস্কৃতিক পরিচয় হারাবে। এই বক্তব্যের জনপ্রিয়তা আছে, বিশেষ করে যারা নিজেদের অর্থনৈতিক নিরাপত্তা, সামাজিক অবস্থান কিংবা জাতীয় পরিচয় নিয়ে উদ্বিগ্ন, তাদের একটি অংশের মধ্যে। কিন্তু এখানে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে।
প্রথমত, অভিবাসী মানেই মুসলিম নন। ইউরোপে অভিবাসীদের মধ্যে রয়েছেন খ্রিষ্টান, মুসলিম, হিন্দু, বৌদ্ধ, ইহুদি, অন্য ধর্মাবলম্বী এবং কোনো ধর্মের সঙ্গে নিজেদের পরিচিত না করা মানুষও। তাদের দেশ, ভাষা, সংস্কৃতি, পেশা ও অভিবাসনের কারণও আলাদা।
দ্বিতীয়ত, মুসলিম মানেই অভিবাসী নন। ফ্রান্সে জন্ম নেওয়া একজন মুসলিম ফরাসি নাগরিকও এই দেশের সমাজের অংশ। তার ধর্মীয় পরিচয়কে বিদেশি পরিচয়ের সমার্থক হিসেবে দেখলে নাগরিকত্বের ধারণাটিই দুর্বল হয়ে পড়ে।
ফ্রান্সের সরকারি পরিসংখ্যান সংস্থা ইনসের ধর্মীয় পরিচয়বিষয়ক গবেষণায় দেখা গেছে, দেশটির মূল ভূখণ্ডের জনসংখ্যার প্রায় ১০ শতাংশ নিজেদের মুসলিম হিসেবে পরিচয় দেন। এই পরিসংখ্যানটি ২০১৯-২০২০ সালের জরিপভিত্তিক। অর্থাৎ মুসলিম জনগোষ্ঠী ফরাসি সমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ, কিন্তু তাদের উপস্থিতি থেকে প্যারিসের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক বা সাংস্কৃতিক পরিচয় সম্পর্কে ট্রাম্পের ভবিষ্যদ্বাণী প্রমাণিত হয় না।
তৃতীয়ত, কোনো সমাজে অভিবাসন বাড়লে আবাসন, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও কর্মসংস্থানের ওপর চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে জনসংখ্যা দ্রুত বাড়লেও সরকারি বিনিয়োগ, অবকাঠামো ও কর্মসংস্থানের সুযোগ সেই হারে না বাড়লে স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ জন্মানো অস্বাভাবিক নয়। এই সমস্যাগুলোকে অস্বীকার করাও সমাধান নয়।
তবে সেই চাপের জন্য কে কতটা দায়ী, তা নির্ধারণ করতে হবে তথ্যের ভিত্তিতে। বাড়িভাড়া বাড়ার পেছনে আবাসনের ঘাটতি, বিনিয়োগকারীদের ভূমিকা, সুদের হার ও নগর পরিকল্পনার প্রভাব থাকতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়তে পারে আন্তর্জাতিক বাজার ও ভূরাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে। শিক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা তৈরি হতে পারে দীর্ঘদিনের বিনিয়োগের ঘাটতি ও প্রশাসনিক ব্যর্থতা থেকে।
এসব সমস্যার প্রতিটিকে অভিবাসনের ফল বলে চালিয়ে দিলে প্রকৃত কারণগুলো আড়ালে থেকে যাবে।
ইউরোপের রাজনীতিতে অভিবাসনবিরোধী দলগুলোর উত্থান নতুন নয়। ফ্রান্সের ন্যাশনাল র্যালি, স্পেনের ভক্স, ইতালির ব্রাদার্স অব ইতালি এবং পর্তুগালের শেগার মতো রাজনৈতিক শক্তি অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ, সীমান্ত সুরক্ষা ও জাতীয় পরিচয়কে নিজেদের রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ করেছে।
এই দলগুলোর জনপ্রিয়তার পেছনে অভিবাসন নিয়ে মানুষের উদ্বেগ যেমন রয়েছে, তেমনি রয়েছে প্রচলিত রাজনৈতিক দলগুলোর ওপর আস্থার সংকট, জীবনযাত্রার ব্যয়, সামাজিক নিরাপত্তা এবং অর্থনৈতিক বৈষম্য।
ফলে অর্থনৈতিক সংকট যখন তীব্র হয়, তখন অভিবাসন একটি সহজ রাজনৈতিক ব্যাখ্যা হয়ে উঠতে পারে। মানুষের কাছে বলা যায়, বিদেশিরা আসছে বলেই চাকরি কমছে, বাড়িভাড়া বাড়ছে কিংবা সরকারি সেবার মান নেমে যাচ্ছে। এই বক্তব্য বোঝানো সহজ। কিন্তু অর্থনীতির বাস্তবতা এত সরল নয়।
১৭ অক্টোবরের ফ্রান্সের বিক্ষোভের পর ট্রাম্পের বক্তব্য সেই রাজনৈতিক কৌশলেরই একটি উদাহরণ। ফরাসি সরকারের জন্য এটি জনশৃঙ্খলা রক্ষার সংকট। বিক্ষোভকারীদের একটি বড় অংশের জন্য এটি জীবনযাত্রার ব্যয়ের সংকট। আর ট্রাম্পের রাজনৈতিক বয়ানে এটি অভিবাসননীতির ব্যর্থতা।
একই ঘটনাকে তিনটি ভিন্নভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। এর মধ্যে কোন ব্যাখ্যাটি কতটা বাস্তবসম্মত, তা নির্ভর করবে প্রমাণের ওপর।
এখানে আরেকটি বিষয় মনে রাখা দরকার। ইউরোপের সব সরকার বা সব রাজনৈতিক দল অভিবাসন নিয়ে একই অবস্থানে নেই। কেউ কঠোর সীমান্ত নিয়ন্ত্রণের পক্ষে, কেউ বৈধ শ্রম অভিবাসনকে অর্থনীতির প্রয়োজন হিসেবে দেখছে। ফলে গোটা ইউরোপকে অভিবাসনবিরোধী একক রাজনৈতিক শিবির হিসেবে বর্ণনা করাও সঠিক হবে না।
অভিবাসীরা কি ইউরোপের বোঝা? এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে আবেগ নয়, অর্থনৈতিক তথ্যের দিকে তাকানো দরকার।
ইউরোপীয় কমিশনের অর্থনৈতিক ও আর্থিক বিষয়ক মহাপরিচালকের ২০২৬ সালের ১৩ জানুয়ারি প্রকাশিত Migration, Mobility and the EU Labour Market: Recent Developments গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মধ্যে ইউরোপীয় ইউনিয়নের বাইরের দেশে জন্ম নেওয়া মানুষের অনুপাত ২০১৪ সালের প্রায় ৮ শতাংশ থেকে বেড়ে ২০২৪ সালে ১২ শতাংশের বেশি হয়েছে।
গবেষণাটিতে আরও বলা হয়েছে, অভিবাসন সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্মসংস্থান বৃদ্ধিতে উল্লেখযোগ্য অবদান রেখেছে। বাইরের দেশে জন্ম নেওয়া কর্মীদের কর্মসংস্থান বৃদ্ধি বিভিন্ন খাতে শ্রমিকের ঘাটতি কমাতেও সাহায্য করেছে।
এই তথ্য থেকে অবশ্য এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না যে অভিবাসনের কোনো সমস্যা নেই কিংবা প্রত্যেক অভিবাসীই অর্থনীতিতে সমান অবদান রাখেন। বৈধ ও অনিয়মিত অভিবাসনের বাস্তবতা আলাদা। কাজের অনুমতি, ভাষাগত দক্ষতা, যোগ্যতার স্বীকৃতি এবং শ্রমবাজারে প্রবেশের সুযোগও গুরুত্বপূর্ণ।
কিন্তু গবেষণাটি অন্তত একটি বিষয় পরিষ্কার করে: অভিবাসীদের সবাইকে অর্থনৈতিক বোঝা হিসেবে দেখার কোনো ভিত্তি নেই।
ইউরোপের কৃষি, নির্মাণ, পরিবহন, পর্যটন, রেস্তোরাঁ, স্বাস্থ্যসেবা এবং পরিচর্যা খাতে বিদেশে জন্ম নেওয়া বহু মানুষ কাজ করেন। তারা কর দেন, পণ্য ও সেবা উৎপাদন করেন, ভাড়া পরিশোধ করেন এবং স্থানীয় অর্থনীতিতে ভোগব্যয় করেন। তাদের শ্রম ছাড়া ইউরোপের বেশ কিছু খাতের স্বাভাবিক কার্যক্রম কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
অবশ্য অভিবাসী শ্রমিকদের শোষণ, কম মজুরি, অনিরাপদ কর্মপরিবেশ ও অবৈধ নিয়োগের সমস্যাও রয়েছে। এগুলো মোকাবিলায় কঠোর আইন প্রয়োগ দরকার। কিন্তু শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করার পরিবর্তে শ্রমিকের জাতীয়তা বা ধর্মকে সমস্যার মূল হিসেবে চিহ্নিত করলে সমাধান হবে না।
এ বছরের ফুটবল বিশ্বকাপ অভিবাসন ও পরিচয় নিয়ে আলোচনায় একটি প্রাসঙ্গিক উদাহরণ। ফ্রান্সের ফুটবলব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিয়েছে। ফরাসি জাতীয় দলেও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক ও পারিবারিক পটভূমির খেলোয়াড় রয়েছেন। তারা ফ্রান্সের হয়ে বিশ্বকাপ জিতেছেন, দেশের জাতীয় সংগীত গেয়েছেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে ফরাসি পতাকাকে প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
২০২৬ বিশ্বকাপের খেলোয়াড়দের নিয়ে লে মোঁদ-এর ৩০ জুনের বিশ্লেষণে দেখা যায়, টুর্নামেন্টের ১ হাজার ২৪৮ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে ৯৯ জনের জন্ম ফ্রান্সে হলেও তারা ফ্রান্সের পরিবর্তে অন্য দেশের জাতীয় দলের হয়ে খেলেছেন। এই খেলোয়াড়দের সবাই ফ্রান্সে ফুটবল প্রশিক্ষণও পেয়েছেন। তাদের মধ্যে রয়েছেন আলজেরিয়া, সেনেগাল, আইভরি কোস্ট, তিউনিসিয়া ও মরক্কোর প্রতিনিধিরা।
এই তথ্যের তাৎপর্য শুধু ফুটবলে সীমাবদ্ধ নয়। এটি দেখায়, একটি দেশের শিক্ষা, প্রশিক্ষণ ও সামাজিক পরিবেশে গড়ে ওঠা প্রতিভা আন্তর্জাতিক পর্যায়ে অবদান রাখতে পারে—এমনকি সেই প্রতিভা শেষ পর্যন্ত অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করলেও।
বিশ্বকাপের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, জাতীয় দলের পরিচয় সব সময় জন্মস্থান দিয়ে নির্ধারিত হয় না। পারিবারিক শিকড়, নাগরিকত্ব ও ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তও ভূমিকা রাখে। দ্য গার্ডিয়ান-এর ২২ জুলাই প্রকাশিত বিশ্বকাপ বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ২০২৬ সালের টুর্নামেন্টে প্রায় ২৩ দশমিক ৬ শতাংশ খেলোয়াড় তাদের জন্মদেশের পরিবর্তে অন্য দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন।
তবে ফুটবলের সাফল্য দিয়ে অভিবাসননীতির সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া যায় না। একজন তারকা ফুটবলারের সাফল্য কোনো অভিবাসী জনগোষ্ঠীর সামগ্রিক আর্থসামাজিক অবস্থার পূর্ণ প্রতিচ্ছবিও নয়।
তারপরও বিশ্বকাপ একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়: বহুমাত্রিক পরিচয় এবং জাতীয় প্রতিনিধিত্ব পরস্পরের বিরোধী হওয়া বাধ্যতামূলক নয়।
ফ্রান্সের হয়ে খেলা কোনো খেলোয়াড়ের পারিবারিক শিকড় আফ্রিকায় থাকতে পারে। তিনি একই সঙ্গে ফরাসি নাগরিক, ফরাসি ফুটবলের গর্ব এবং অভিবাসী পরিবারের সন্তান হতে পারেন। তার পরিচয়ের একটি অংশকে স্বীকার করতে গিয়ে অন্য অংশকে অস্বীকার করার প্রয়োজন নেই।
যে সমাজ অভিবাসী পরিবারের সন্তানদের প্রতিভা বিকাশের সুযোগ দিয়ে বিশ্বমঞ্চে সাফল্য অর্জন করে, সেই সমাজের জন্য তাদের পরিচয়কে কেবল বোঝা হিসেবে দেখা নিঃসন্দেহে একটি বৈপরীত্য।
ইউরোপের রাজনৈতিক পরিবর্তন বাংলাদেশের মানুষের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ, বহু বাংলাদেশি এখানে কাজ করেন, পড়াশোনা করেন, ব্যবসা করেন এবং পরিবার নিয়ে বসবাস করেন।
অভিবাসনবিরোধী রাজনীতির প্রভাব বাড়লে বৈধ অভিবাসীদেরও কখনো কখনো সামাজিক সন্দেহ, বৈষম্য কিংবা কঠোর প্রশাসনিক নীতির মুখোমুখি হতে হতে পারে। বিশেষত যারা অনিয়মিত পথে এসেছেন, যাদের বৈধ কাগজপত্র নেই অথবা যারা শোষণমূলক কর্মপরিবেশে কাজ করেন, তাদের ঝুঁকি আরও বেশি।
তবে ইউরোপে অভিবাসননীতি কঠোর হওয়ার অর্থ এই নয় যে প্রতিটি দেশ সব অভিবাসীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। বৈধ শ্রম অভিবাসন, শিক্ষার্থী গ্রহণ এবং দক্ষ কর্মী নিয়োগের প্রয়োজনও রয়েছে। তাই বাংলাদেশের সম্ভাব্য অভিবাসীদের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো বৈধ পথে আসা, কাজের অনুমতি নিশ্চিত করা, ভাষা শেখা এবং গন্তব্য দেশের আইন ও সামাজিক রীতিনীতি সম্পর্কে সচেতন থাকা।
একই সঙ্গে ইউরোপে বসবাসরত বাংলাদেশিদেরও মনে রাখতে হবে, স্থানীয় সমাজের উদ্বেগকে উপহাস করে উড়িয়ে দিলে চলবে না। আবাসন, কর্মসংস্থান, নিরাপত্তা ও জনসেবার মতো বিষয় নিয়ে তাদেরও যুক্তিসংগত প্রশ্ন থাকতে পারে। এসব বিষয়ে সংলাপ, তথ্য ও বাস্তবসম্মত নীতিই পারস্পরিক আস্থা গড়ে তুলতে পারে।
অভিবাসীদের অধিকার রক্ষার অর্থ স্থানীয় মানুষের উদ্বেগ অস্বীকার করা নয়। আবার স্থানীয় মানুষের উদ্বেগকে স্বীকৃতি দেওয়ার অর্থ অভিবাসীদের বিরুদ্ধে বৈষম্যকে বৈধতা দেওয়াও নয়।
ফ্রান্সের বর্তমান পরিস্থিতি একটি সতর্কবার্তা। অর্থনৈতিক অসন্তোষ, সামাজিক বৈষম্য, তরুণদের অনিশ্চয়তা এবং রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা কমে গেলে তার প্রভাব রাজপথে পড়তে পারে। সহিংসতা সেই সংকটকে আরও গভীর করে এবং সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে হুমকির মুখে ফেলে।
সরকারের দায়িত্ব এসব সমস্যার কার্যকর সমাধান করা। একই সঙ্গে অপরাধের বিচার করতে হবে প্রমাণের ভিত্তিতে, কোনো ধর্মীয় বা জাতিগত পরিচয়ের ভিত্তিতে নয়।
অভিবাসন নিয়ন্ত্রণ নিয়ে ইউরোপে বিতর্ক থাকবে। সীমান্ত সুরক্ষা, বৈধ অভিবাসন, আশ্রয়প্রার্থীদের ব্যবস্থাপনা এবং সামাজিক সংহতি নিয়ে কঠিন সিদ্ধান্তও নিতে হবে। কিন্তু সেই সিদ্ধান্ত যেন বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্য হয়, রাজনৈতিক ভয় ছড়ানোর জন্য নয়।
ট্রাম্পের ‘প্যারিস মুসলিম শহর হয়ে যাবে’ বক্তব্যের জবাব তাই শুধু ধর্মীয় সহনশীলতার আহ্বানে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এর জবাব দিতে হবে বাস্তবতা দিয়ে: অর্থনৈতিক সংকটের সমাধান, কার্যকর জনসেবা, ন্যায্য কর্মসংস্থান, আবাসনব্যবস্থার উন্নতি এবং আইনের সমান প্রয়োগের মাধ্যমে।
ইউরোপের ভবিষ্যৎ শুধু অভিবাসীর সংখ্যা দিয়ে নির্ধারিত হবে না; নির্ধারিত হবে দেশগুলো তাদের অর্থনীতি, সামাজিক সংহতি, গণতন্ত্র ও বহুত্ববাদকে কতটা কার্যকরভাবে পরিচালনা করতে পারে, তার ওপর।
প্যারিসের ভবিষ্যৎ কী হবে, তা কোনো বিদেশি নেতার রাজনৈতিক মন্তব্যে স্থির হয়ে যায় না। তা নির্ধারণ করবেন ফ্রান্সের নাগরিকেরা—তাদের গণতান্ত্রিক সিদ্ধান্ত, রাষ্ট্রের নীতি এবং সমাজের সম্মিলিত অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে।
আর ইউরোপে বসবাসরত অভিবাসীদের জন্য বার্তাটি স্পষ্ট: তাদের অধিকার রক্ষা করতে হবে, দায়িত্বও পালন করতে হবে। কিন্তু কোনো সংকটের ব্যাখ্যা খুঁজতে গিয়ে তাদের সবাইকে একই অপরাধে অভিযুক্ত করা যাবে না।
কারণ, অভিবাসন নিয়ে প্রশ্ন তোলা গণতান্ত্রিক অধিকার; আর প্রমাণ ছাড়া একটি জনগোষ্ঠীকে সংকটের জন্য দায়ী করা রাজনৈতিক প্রচারণা। এ দুটির পার্থক্য বুঝতে পারাই আজকের ইউরোপের জন্য সবচেয়ে জরুরি।
লেখক: সিনিয়র সাংবাদিক ও কলামিস্ট
e-mail: [email protected]
