জ্বালানিসংকট যখন দেশের অর্থনীতি, শিল্প উৎপাদন ও কৃষিকে ক্রমাগত চাপে ফেলছে, তখন বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার বাড়ানোই হওয়া উচিত সরকারের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার। সৌরবিদ্যুৎ সেই বিকল্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ উৎস। অথচ এমন একসময়ে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প স্থাপনের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যখন সরকার নিজেই বিদ্যুৎ সাশ্রয় এবং সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার বাড়াতে উদ্যোগী হচ্ছে। একদিকে সরকারি দপ্তর ও সংস্থার ভবনে সোলার প্যানেল স্থাপনের পরিকল্পনা, অন্যদিকে কৃষিতে সৌরবিদ্যুতের ব্যবহার সম্প্রসারণের প্রকল্প বাতিল–এই পরস্পরবিরোধী নীতি শুধু প্রশ্নবিদ্ধ নয়, জ্বালানিসংকট মোকাবিলার কৌশল হিসেবেও অদূরদর্শী।
২০১৮ সালে নেওয়া প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল দেশের ছয় বিভাগের ২২ জেলার ১৫৮ উপজেলায় দুই হাজার সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচপাম্প স্থাপন। উদ্দেশ্য ছিল কৃষিতে সেচের সুবিধা বাড়ানো, সেচ মৌসুমে জাতীয় গ্রিডের ওপর চাপ কমানো এবং ডিজেলচালিত পাম্পের ওপর নির্ভরতা হ্রাস করা। কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের জন্য এই উদ্যোগের গুরুত্ব সহজেই অনুমেয়। কৃষির উৎপাদন ব্যয় কমানো, জ্বালানি আমদানির চাপ হ্রাস এবং পরিবেশবান্ধব প্রযুক্তির বিস্তার–সব দিক থেকেই প্রকল্পটি ছিল সময়োপযোগী। এমন একটি উদ্যোগের বাস্তবায়নে ব্যর্থতা থাকলে তা সংশোধন করা প্রয়োজন। কিন্তু তাই বলে প্রকল্পই বাতিল করে দেওয়া, কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য সমাধান হতে পারে না।
প্রকল্প বাস্তবায়নে গুরুতর ত্রুটি ছিল, তা অস্বীকার করার উপায় নেই। সৌরবিদ্যুৎ উৎপাদনের অভিজ্ঞতা না থাকা সত্ত্বেও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল বিদ্যুৎ বিতরণকারী প্রতিষ্ঠান বাংলাদেশ পল্লি বিদ্যুতায়ন বোর্ডকে (বাপবিবো)। এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) পরামর্শকের মাধ্যমে সম্ভাব্যতা যাচাই করা হলেও সেই সমীক্ষা যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি। সুবিধাভোগী কৃষকদের মতামতও নেওয়া হয়নি। ফলে পরিকল্পনা, কারিগরি সক্ষমতা ও বাস্তবায়ন ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা প্রকট হয়ে ওঠে। কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের অদক্ষতা বা প্রশাসনিক ভুলের শাস্তি কেন পেতে হবে কৃষকদের? কেন জনগণের অর্থে কেনা যন্ত্রপাতি অব্যবহৃত পড়ে থাকবে? আর কেনইবা একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগের সুফল থেকে বঞ্চিত হবে দেশের কৃষি খাত?
প্রকল্পের জন্য ইতালি থেকে দুই হাজার সেচপাম্প, মোটর, ইনভার্টারসহ প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি কেনা হয়েছিল। অথচ দীর্ঘ সাড়ে আট বছরে স্থাপন করা সম্ভব হয়েছে মাত্র ৬৪২টি পাম্প। এতে উৎপাদিত হয়েছে প্রায় সাড়ে ৬ মেগাওয়াট সৌরবিদ্যুৎ, যা লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ১৪ মেগাওয়াট কম। বাকি কাজ সম্পন্ন না করেই গত জুনে প্রকল্পের সমাপ্তি ঘোষণা করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে প্রকল্প বাতিলের পরিবর্তে প্রয়োজন ছিল পূর্ণাঙ্গ পুনর্মূল্যায়ন। কোথায় ভুল হয়েছে, কেন নির্ধারিত সময়ে কাজ শেষ হয়নি, কোন সংস্থার কী দায়–এসব নির্ধারণ করে একটি বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা যেত। অন্যদিকে সরকারি দপ্তর, বিভাগীয় কমিশনার, জেলা প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তাদের কার্যালয়ে সোলার প্যানেল স্থাপনের উদ্যোগ নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। তবে সরকারি ভবনে সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার বাড়ানো এবং কৃষিতে সৌরবিদ্যুৎচালিত সেচের বিস্তার–দুটি উদ্যোগই একসঙ্গে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব এবং সেটিই উপযুক্ত পন্থা বলে আমরা মনে করি। অতএব, সৌর সেচ প্রকল্প বাতিলের সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রকল্পটি বর্তমান সরকারের নির্বাচনি ইশতেহারের কৌশলপত্রের সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ বলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উল্লেখ করেছেন। সে ক্ষেত্রে এটি বাতিল না করে কীভাবে দ্রুত ও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা যায়, সরকারকে সেই পথ খুঁজতে হবে। জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে, অপচয়ের কারণ অনুসন্ধান করতে হবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে। কিন্তু প্রশাসনিক ব্যর্থতার দায়ে কৃষি ও জ্বালানি খাতের একটি সম্ভাবনাময় উদ্যোগকে বিসর্জন দেওয়া উচিত হবে না।
সরকারের কাছে প্রত্যাশা, সিদ্ধান্তটি পুনর্বিবেচনা করে প্রকল্পটি পুনরুজ্জীবিত করা হবে। ভুল পরিকল্পনা সংশোধন করা সরকারের দায়িত্ব; সেই ভুলের অজুহাতে প্রকল্প বাতিল করে জনগণের অর্থ, কৃষকের সম্ভাবনা এবং দেশের জ্বালানি-নিরাপত্তাকে ঝুঁকিতে ফেলা কোনো দায়িত্বশীল সিদ্ধান্ত হতে পারে না।
