বাংলাদেশে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার বিরুদ্ধে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে যুক্তরাষ্ট্রে হেনস্তা করার অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় সময় সোমবার বিকাল পৌনে ৪টায় নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দর থেকে হুইল চেয়ারে বের হওয়ার সময় তোপের মুখে পড়েন এ নোবেলজয়ী। এ সময় পাশে লাগেজ হাতে ছিলেন অন্তর্বর্তী সরকারের এসডিজি বিষয়ক মুখ্য সমন্বয়ক ও ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া মোরশেদ।
এদিকে মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। গতকাল এক বিবৃতিতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, অপরাধীদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর কথা যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ মিশনকে বলা হয়েছে। খবর বিডিনিউজের।
সোশ্যাল মিডিয়াতে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে দেখা গেছে, নিউ ইয়র্ক মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ইমদাদ চৌধুরী ও যুক্তরাষ্ট্র যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক মিজানুর রহমান চৌধুরীসহ কয়েকজন মুহম্মদ ইউনূসের সামনে দাঁড়িয়ে যান। তখন হুইল চেয়ার ঘুরিয়ে মুহাম্মদ ইউনূসকে টার্মিনালের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় হেনস্তাকারীরা তার পিছে ছুটতে থাকেন। একজন চিৎকার করে বলতে থাকেন, ‘ইউ কিলড থাউজ্যান্ড পিপল ইন বাংলাদেশ। ইউ টেররিস্ট! ইউ টেররিস্ট! ইউ টেররিস্ট, হোয়াই ইউ কাম হিয়ার?… হোয়াই ডিড ইউ অ্যারেস্ট টু হান্ড্রেড থাউজ্যান্ড… হি কিল্ড থাউজ্যান্ড অব পুলিশ ইন মাই কান্ট্রি। হি ডেস্ট্রয় দ্য ডেমোক্রেসি ইন মাই কান্ট্রি…।’
এ ঘটনা নিয়ে নিউ ইয়র্কের বাংলাদেশ মিশনের কর্মকর্তাদের বক্তব্য জানার চেষ্টা করা হলেও সাড়া মেলেনি। এদিকে ১১ থেকে ১৩ অক্টোবর বার্লিনে অনুষ্ঠেয় তিন দিনের বিশ্ব স্বাস্থ্য সম্মেলনে মুহাম্মদ ইউনূসের যোগ দেওয়ার কথা থাকলেও শেষ মুহূর্তে তিনি সফর বাতিল করেন। সম্মেলনে তার অংশগ্রহণের সম্ভাবনা ঘিরে ইউরোপপ্রবাসীদের কয়েকটি সংগঠনের আপত্তির পর তার এ সিদ্ধান্তের কথা জানা যায়। সম্মেলনে মুহাম্মদ ইউনূসের অংশগ্রহণের বিষয়টি আয়োজকদের পক্ষ থেকেই জানানো হয়েছিল। তবে সম্মেলনের আগ মুহূর্তে বক্তার তালিকায় তার নাম আর দেখা যায়নি।
ইউনূস স্যারের কোনো ক্ষতি হয়নি : মুহাম্মদ ইউনূসকে যুক্তরাষ্ট্রে হেনস্তার ঘটনায় তার সফরসঙ্গী লামিয়া মোরশেদ বলেছেন, স্যারের কোনো ক্ষতি হয়নি। গতকাল বেলা ৩টায় ফেইসবুকে দুই শিশুর সঙ্গে নোবেলজয়ী ইউনূসের ছবি পোস্ট করে তিনি এ কথা জানিয়েছেন। ইউনূস সেন্টারের নির্বাহী পরিচালক লামিয়া বলেছেন, জেএফকে বিমানবন্দরে ওই বর্বর লোকগুলো উনাকে (মুহাম্মদ ইউনূস) ঘিরে ধরার কয়েক মিনিট আগেই আমি এই ছবিগুলো তুলেছিলাম। পুরো পথজুড়েই ভালোবাসা ও সম্মান ছিল। তিনি একদম ভালো আছেন।
দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা চায় ঢাকা : জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ সরকার। গতকাল এক বিবৃতিতে এ অবস্থান তুলে ধরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, অপরাধীদের খুঁজে বের করে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিষয়টি স্থানীয় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানোর কথা যুক্তরাষ্ট্রে বাংলাদেশ মিশনকে বলা হয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিবৃতিতে বলা হয়, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কাছে অত্যন্ত সম্মানিত ও শান্তিতে নোবেলজয়ী অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসের ওপর চালানো এই হেনস্তার পেছনে কার্যক্রম স্থগিত সন্ত্রাসী রাজনৈতিক সংগঠন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট একদল দুর্বৃত্ত জড়িত বলে ধারণা করা হচ্ছে।
আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হবে : মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তাসহ সাম্প্রতিক সময়ে জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সংশ্লিষ্টদের বিদেশের মাটিতে হয়রানির ঘটনা স্পষ্ট সহিংসতা বলে মনে করছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা জাহেদ উর রহমান। সম্প্রতি ইতালিতে এক অভিনেত্রীকে হেনস্তার ঘটনায় সরকার যেমন ব্যবস্থা নিয়েছিল এবারও নিউ ইয়র্কে বিমানবন্দরে মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় আইনি পদক্ষেপ নেবে বলে জানিয়েছেন তিনি।
তথ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে গতকাল সাপ্তাহিক প্রেস ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের জবাবে তিনি এসব কথা বলেন। মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা প্রসঙ্গে এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ড. ইউনূস এখন আমেরিকাতে আছেন, সেখানে এয়ারপোর্টে তাকে হেনস্তার চেষ্টা করা হয়েছে। তার অপরাধ হচ্ছে, তিনি শেখ হাসিনা পালিয়ে যাওয়ার পর রাষ্ট্রের দায়িত্ব কেন নিয়েছেন। ড. ইউনূসের সরকারকে নিয়ে যৌক্তিক সমালোচনা যে কারো থাকতে পারে। আমরা দেশে বসেও অনেকে সেই সমালোচনা করেছি। আমরা যদি ভুল না করি আমাদের প্রাথমিক গণশিক্ষা প্রতিমন্ত্রীর বিরুদ্ধেও একই ধরনের আচরণ করার চেষ্টা হয়েছে আমেরিকাতে। সুতরাং যে দলটা এই ধরনের কাজ করে বেড়ায় এবং দেশের ভেতরে সন্ত্রাস এবং নানারকম সহিংসতা উসকে দেওয়ার চেষ্টা প্রকাশ্যে তাদের দলের প্রধান করে থাকেন, সেখানে আসলে রিকনসিলিয়েশনের আলাপের ব্যাপারে সরকারের যা বোঝার তা বোঝা হয়ে যায়।
নিউ ইয়র্কসহ বিদেশের মাটিতে ঘটা ঘটনাগুলোকে স্পষ্ট সহিংসতা আখ্যা দিয়ে এর জন্য কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগকে দায়ী করে তিনি বলেন, ওই দেশগুলো বলে হয়তো তারা আরও বেশি সহিংস হয়ে উঠতে পারছে না, কিন্তু এই প্রবণতা আছে। আপনাদের নিশ্চয়ই মনে আছে, একজন অভিনেত্রী (আজমেরী হক বাঁধন) যিনি জুলাই আন্দোলনের সঙ্গে সলিডারিটি দেখিয়েছেন, সেই কারণে তিনিও হেনস্তার মুখোমুখি হয়েছেন। এগুলো কোনো প্রেসার গ্রুপ ট্রুপ কিছু না, এগুলো আওয়ামী সন্ত্রাস। আমরা এভাবেই ইন্টারপ্রেট করতে চাই এবং সেটা নিয়ে আইনি পদক্ষেপ আমাদের সরকারের পক্ষ থেকে, ওই অভিনেত্রীর ক্ষেত্রে কিন্তু সেটার প্রসেস শুরু হয়েছে। আমরা ভবিষ্যতেও করব।
গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের জন্য ক্ষমা না চেয়ে আওয়ামী লীগ ক্রমাগত সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড, বিদেশে মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা ও দেশে অস্থিরতাকে উসকে দেওয়ার অপচেষ্টা অব্যাহত রাখায় তাদের সঙ্গে কোনো ধরনের রিকনসিলিয়েশন বা সমঝোতার কোন সুযোগ নেই বলেও মত দেন তিনি।
মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছেন জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান। এ বিষয়ে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সরকারকে আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। আর বিগত অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা মুহাম্মদ ইউনূসসহ সকল সদস্যের নিরাপত্তা নিশ্চিতে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন জাতীয় নাগরিক পার্টি–এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম।
