আমদানি ও সরবরাহে জটিলতার কারণে দেশে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের সংকট দেখা দিয়েছে। এতে দেশজুড়ে নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্রগুলোয় বন্ধ রয়েছে রোগ নির্ণয়ের গুরুত্বপূর্ণ বেশ কয়েকটি পরীক্ষা। ক্যানসারের বিস্তার নির্ণয়ে ব্যবহৃত বোন স্ক্যান, কিডনির কার্যকারিতা পরীক্ষার ডিটিপিএ রেনোগ্রাম, থায়রয়েড ও প্যারাথায়রয়েড স্ক্যান করাতে পারছেন না অনেক রোগী। কেউ কেউ টাকা জমা দিয়ে সিরিয়াল নিয়েও অপেক্ষায় আছেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার সিরিয়াল ২০২৭ সাল পর্যন্ত গড়িয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা না হওয়ায় জটিল রোগীদের চিকিৎসার পরবর্তী ধাপ
নির্ধারণেও অনিশ্চয়তা তৈরি হয়েছে। কবে নাগাদ আইসোটোপের সরবরাহ স্বাভাবিক হবে, আর কবে এসব পরীক্ষা আবার চালু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য দিতে পারছে না সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সূত্র জানায়, বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের অধীন ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল ক্যাম্পাসে অবস্থিত ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেসে (ইনমাস) সাধারণত সপ্তাহে তিন দিন ডিটিপিএ রেনোগ্রাম পরীক্ষা করা হয়; কিন্তু আইসোটোপের সংকটে এ পরীক্ষা বন্ধ থাকায় ভোগান্তিতে পড়েছেন রোগীরা। এ পরীক্ষা করাতে প্রায় ২০০ রোগী টাকা জমা দিয়ে সিরিয়াল নিয়েছেন। টাকা জমা না দিয়েও অপেক্ষমাণ তালিকায় রয়েছেন আরও প্রায় ১০০ জন। একইভাবে বোন স্ক্যান, থায়রয়েড স্ক্যান ও প্যারাথায়রয়েড স্ক্যানের জন্যও রোগীদের সিরিয়াল দেওয়া থাকলেও আইসোটোপের অভাবে এসব পরীক্ষা এখন বন্ধ রয়েছে।
ক্যানসারের বিস্তার নির্ণয়ে গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা বোন স্ক্যান। হাড়ে ক্যানসার ছড়িয়ে পড়েছে কিনা, তা নির্ণয়সহ রোগীর অবস্থা মূল্যায়নে এ পরীক্ষা প্রয়োজন হয়; কিন্তু প্রয়োজনীয় তেজস্ক্রিয় আইসোটোপের সরবরাহ না থাকায় দুই মাসের বেশি সময় ধরে দেশের হাসপাতালগুলোয় এ পরীক্ষা বন্ধ রয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে। এতে ক্যানসারসহ বিভিন্ন জটিল রোগে আক্রান্ত ব্যক্তিরা পড়েছেন বিপাকে। চিকিৎসকের পরামর্শে পরীক্ষা করানোর জন্য অনেকে সিরিয়াল নিয়েও অপেক্ষা করছেন। কোনো কোনো প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার সিরিয়াল ২০২৭ সাল পর্যন্ত পৌঁছে যাওয়ার অভিযোগও পাওয়া গেছে।
ময়মনসিংহের ক্যানসার আক্রান্ত চম্পা আক্তার এমন পরিস্থিতির শিকার। চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী দ্রুত তার বোন স্ক্যান করানো প্রয়োজন। কিন্তু আইসোটোপের সংকটে দেশের কোথাও এ পরীক্ষা করাতে পারছেন না। কবে নাগাদ পরীক্ষা চালু হবে, সে বিষয়ে নিশ্চিত কোনো তথ্যও পাচ্ছেন না সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে। একই সংকটে পড়েছে ১৬ বছর বয়সী সানজিদা নবি আদৃতার পরিবার। লিভারের জটিল সমস্যার কারণে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী তার ডিটিপিএ রেনোগ্রাম পরীক্ষা করানো প্রয়োজন। কিন্তু দেশের কোথাও এ পরীক্ষা করাতে না পারায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছে পরিবারটি। প্রয়োজনীয় পরীক্ষা বন্ধ থাকায় রোগীদের চিকিৎসা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে।
সূত্র জানায়, গত ১৬ সেপ্টেম্বর থেকে দেশে এসব প্রয়োজনীয় আইসোটোপের সরবরাহে সংকট দেখা দেয়। এ খাতের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা আমাদের সময়কে জানান, প্রতি বছর নির্দিষ্ট একটি সময়ে রক্ষণাবেক্ষণজনিত কারণে সংশ্লিষ্ট আইসোটোপের আমদানি ও সরবরাহে বিরতি থাকে। এ বছর ১৩ থেকে ২৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এ বিরতি থাকার কথা ছিল। কিন্তু নির্ধারিত সময় পেরিয়ে গেলেও সরবরাহ স্বাভাবিক হয়নি। কেন এখনও আইসোটোপ আসছে না, সে বিষয়ে কর্তৃপক্ষ কোনো তথ্য দিচ্ছে না।
আন্তর্জাতিকভাবে ব্যবহৃত এসব গুরুত্বপূর্ণ চিকিৎসা আইসোটোপ দীর্ঘ সময় মজুদ করে রাখা যায় না। দক্ষিণ আফ্রিকার সরবরাহকারীরা বাংলাদেশে এ ধরনের আইসোটোপ সরবরাহ করে। ফলে আমদানি ও সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে দেশের নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্রগুলোয় পরীক্ষার কার্যক্রম ব্যাহত হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এবার নির্ধারিত রক্ষণাবেক্ষণ বিরতির পরও সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় সংকট দীর্ঘায়িত হয়েছে।
বাংলাদেশে তেজস্ক্রিয় আইসোটোপ আমদানি, উৎপাদন ও চিকিৎসাক্ষেত্রে সরবরাহের দায়িত্ব পালন করে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশন। কমিশনের অধীন ন্যাশনাল ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (নিনমাস) এবং ইনস্টিটিউট অব নিউক্লিয়ার মেডিসিন অ্যান্ড অ্যালায়েড সায়েন্সেস (ইনমাস) ছাড়াও দেশের বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিউক্লিয়ার মেডিসিনের পরীক্ষা করা হয়। এসব পরীক্ষার মাধ্যমে বিভিন্ন জটিল রোগ শনাক্ত এবং রোগীর শারীরিক অবস্থা মূল্যায়ন করা হয়। আইসোটোপের সরবরাহ স্বাভাবিক না হওয়ায় দেশের বিভিন্ন প্রান্তের অসংখ্য রোগী প্রয়োজনীয় পরীক্ষা করাতে পারছেন না।
সংশ্লিষ্ট চিকিৎসকরা বলছেন, জটিল রোগের চিকিৎসায় সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পরীক্ষার ফলের ওপর নির্ভর করে পরবর্তী চিকিৎসাপদ্ধতি নির্ধারণ, চিকিৎসায় পরিবর্তন আনা কিংবা রোগীর অবস্থা সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ফলে প্রয়োজনীয় পরীক্ষা দীর্ঘদিন বন্ধ থাকলে চিকিৎসা শুরু করতে দেরি হতে পারে। যাদের চিকিৎসা চলমান, তাদের ক্ষেত্রেও পরবর্তী পদক্ষেপ নির্ধারণ পিছিয়ে যেতে পারে। এতে রোগীর শারীরিক ও মানসিক চাপ বাড়ার পাশাপাশি চিকিৎসার ব্যয়ও বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এদিকে আইসোটোপের সরবরাহ পরিস্থিতি ও পরীক্ষা পুনরায় চালুর বিষয়ে জানতে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তারা বক্তব্য দিতে রাজি হননি। সাংবাদিকদের সঙ্গে কমিশনের কর্মকর্তাদের কথা না বলার বিষয়ে কঠোর নির্দেশনা রয়েছে বলেও জানা গেছে।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ পরমাণু শক্তি কমিশনের পরিচালক (জীববিজ্ঞান বিভাগ) ও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান মাহফুজা খানের কাছে জানতে চাওয়া হলে তিনি বিরক্তি প্রকাশ করেন। মাহফুজা খান বলেন, ‘আমি কথা বলতে চাচ্ছি না। আমি এ বিষয়ে কোনো কথা বলব না।’ কেন কথা বলবেন না এবং কবে নাগাদ আইসোটোপ দেশে আসতে পারে, তা আবার জানতে চাইলে তিনি চেয়ারম্যানের পিএস মোহাম্মদ সামসুদ্দোহাকে ডাকেন। পরে সামসুদ্দোহা প্রতিবেদককে ধমক দেন এবং বেরিয়ে যেতে বলেন।
ফলে দেশে আইসোটোপের সরবরাহ কবে স্বাভাবিক হবে, আর নিউক্লিয়ার মেডিসিন কেন্দ্রগুলোয় বন্ধ থাকা পরীক্ষাগুলো কবে পুনরায় চালু হবে, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।
