আকাশে শরতের মেঘ, মাঠে কাশফুলের দোলা। গতকাল শুক্রবার শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে মর্ত্যে সূচনা ঘটেছে দেবীপক্ষের। পূজা সামনে রেখে সাতক্ষীরার মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলোতে এখন চলছে উৎসবের আমেজ। বাঁশ-খড়ের কাঠামো, মাটির প্রলেপ আর প্রতিমার মুখাবয়ব ও অলংকারের কাজ শেষে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি। বিভিন্ন নকশার মাটির তৈরি দুর্গা দর্শনের একঘেয়েমি কাটাতে এবার সাতক্ষীরা সদরের ধুলিহর-ব্রহ্মরাজপুর শ্রীশ্রী দুর্গাপূজা মণ্ডপে দেড় লক্ষাধিক দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে তৈরি করা হয়েছে এক দৃষ্টিনন্দন দুর্গা প্রতিমা। ব্যতিক্রমী এই আয়োজন দেখতে এখন থেকেই দর্শনার্থীরা মন্দিরে ভিড় জমাচ্ছেন।
মন্দির প্রাঙ্গণে গিয়ে দেখা গেছে, মাটির তৈরি অবয়বের উপর দেড় লক্ষাধিক দিয়াশলাই কাঠি নিখুঁতভাবে বসানো হয়েছে। একইসাথে লাগানো হয়েছে ১০ কেজিরও বেশি রেশমি সুতা। প্রতিটি অংশে অত্যন্ত সূক্ষ্মভাবে কাঠি বসাতে হচ্ছে শিল্পীদের; সামান্য ভুলেও নষ্ট হতে পারে পুরো নকশা। তাই প্রতিমা তৈরিতে সময় ও শ্রম দুটিই লাগছে বেশি।
প্রতিমা শিল্পী নবদ্বীপ সরকার জানান, ২০২৩ সালে কলকাতায় গিয়ে এ ধরনের কাজ দেখেছিলেন তিনি। সেই অভিজ্ঞতা থেকেই এবার সাতক্ষীরায় দিয়াশলাই কাঠি ও রেশমি সুতা দিয়ে ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। চারজন শিল্পী দিন-রাত-কখনো কখনো রাত ২টা থেকে ৩টা পর্যন্ত পরিশ্রম করে কাজ করছেন। এবার শুধু সাতক্ষীরায় নয়, কুষ্টিয়াসহ চারটি স্থানে দুর্গা প্রতিমা বানানোর দায়িত্ব পেয়েছেন তিনি। দিয়াশলাই কাঠির মাথায় থাকা বারুদের তেজস্ক্রিয়তা বা দাহ্যতা নষ্ট করতে বিশেষ আঠা ও মেডিসিন ব্যবহার করা হয়েছে, ফলে এতে কোনো ঝুঁকির আশঙ্কা নেই।
ব্রহ্মরাজপুর সার্বজনীন শ্রী শ্রী দুর্গা মন্দির পরিচালনা কমিটির সহকারী কোষাধ্যক্ষ অমিত কুমার ঘোষ জানান, শুধু প্রতিমা তৈরির কাজেই শিল্পীদের পারিশ্রমিক নির্ধারণ করা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৩০ হাজার টাকা। সব মিলিয়ে এবার পূজার আয়োজনের ব্যয় দাঁড়াচ্ছে প্রায় ৫ লাখ টাকা। তিনি আরও জানান, জমিদার পশুপতি মিত্রের আয়োজিত এই দুর্গা পূজা ২০০ বছরের বেশি সময় ধরে সোরম্বরে অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। ব্যতিক্রমী প্রতিমা তৈরির এই আয়োজন অবশ্য ব্রহ্মরাজপুরে নতুন নয়। গত বছর ১০০ কেজি চিনিগুঁড়া ধান দিয়ে তৈরি প্রতিমা দেখতে দূর-দূরান্ত থেকে দর্শনার্থীরা এসেছিলেন। সেই সাড়া থেকেই এবার আরও নতুন কিছু করার পরিকল্পনা নেয় পূজা উদযাপন কমিটি।
এদিকে, প্রতিমাটির দাহ্যতা ও নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন ওঠায় গত ১৬ সেপ্টেম্বর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অর্ণব কুমার দত্ত, সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) ও ফায়ার সার্ভিস এন্ড সিভিল ডিফেন্সের কর্মকর্তা প্রতিমাটি পর্যবেক্ষণ ও ট্রায়াল সম্পন্ন করেন। পাশাপাশি মন্দির ও দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুরো মন্দির চত্বর সিসি ক্যামেরার আওতায় আনা হয়েছে।
শুধু ব্রহ্মরাজপুর নয়, শ্যামনগর, কালীগঞ্জ, দেবহাটা, আশাশুনি, তালা ও কলারোয়াসহ জেলার বিভিন্ন মণ্ডপে মাটি, খড় ও বাঁশের কাঠামোর পাশাপাশি সাজসজ্জায় চলছে নানা শিল্পভাবনা। দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে মৃৎশিল্পী, বাঁশ ও কাঠের কারিগর, রংমিস্ত্রি এবং সাজসজ্জার কারিগরদের জন্যও তৈরি হয়েছে কর্মসংস্থান।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, সাতক্ষীরা জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক বিশ্বনাথ ঘোষ জানান, গত বছর জেলায় ৫৮৭টি পূজা অনুষ্ঠিত হলেও এবার ৫৯০টি মণ্ডপে পূজা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। গতকাল শুক্রবার শুভ মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীর মর্ত্যে আগমনের শুভ সূচনা হয়েছে। আগামী ১৭ অক্টোবর মহাষষ্ঠী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শারদীয়া দুর্গোৎসবের সমাপ্তি হবে। মা এবার আসবেন ঘোড়ায় এবং যাবেন নৌকায়।
