কয়েক দিন আগে যশোর শহরে হামলার শিকার হন জনপ্রিয় অভিনেতা সমু চৌধুরী। রক্তাক্ত অবস্থায় তাকে হাসপাতালে নেওয়া হলে মাথায় তিনটা সেলাই দেওয়া হয়। প্রাথমিক চিকিৎসা শেষে বাড়িতে ফিরে যান। এরই মধ্যে তার বেশ কিছু ভিডিও সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়েছে, তা থেকে জানা যায়—কুষ্টিয়ায় লালনের মেলায় গিয়েছেন এই অভিনেতা। তার অপ্রকৃতস্থ আচরণ, নেশা গ্রহণের দৃশ্যও কোনো কোনো ভিডিওতে দেখা যায়।
এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতাকে এমন অবস্থায় দেখে ব্যথিত, রীতিমতো উদ্বিগ্ন তার ভক্ত-অনুরাগীরা। কেউ কেউ রাইজিংবিডির অফিসে ফোন করে সমু চৌধুরীর বর্তমান অবস্থান, শারীরিক অবস্থা জানতে চেয়েছেন। কিন্তু সমু চৌধুরী এখন ঠিক কোথায় অবস্থান করছেন সে বিষয়ে সঠিক তথ্য জানা যায়নি। তবে সমু চৌধুরীকে স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে অনেকে শোবিজ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি, সংগঠন বা সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
সম্প্রতি যশোরে হামলার শিকার হন সমু চৌধুরী
নাট্যকার নাসির খানের লেখা বেশ কিছু নাটকে অভিনয় করেছেন সমু চৌধুরী। প্রিয় অভিনেতাকে নিয়ে সোশ্যাল মিডিয়ায় দীর্ঘ একটি পোস্ট দিয়েছেন তিনি। এই নাট্যকার বলেন, “আমার লেখা বেশ কিছু নাটকে এক সময়ের জনপ্রিয় অভিনেতা সমু চৌধুরী অভিনয় করেছেন। তরুণ বয়সে কী সৌম্য দেখতে ছিলেন সমু চৌধুরী। সেই সময়ের দর্শকেরা আজও পর্দায় সমু চৌধুরীকে দেখলে নস্টালজিক ফিল করেন। অতীত মনে করিয়ে দেয় তার উপস্থিতি। কিন্তু বর্তমানে তার জীবনাচরণ এলোমেলো হয়ে গেছে। বোঝা যায় যে তাকে গাইড করার, অ্যাডভাইস করার, নিয়ন্ত্রণ করার কেউ আসলে নাই। যতদূর জানি উনি একা থাকেন এবং মানসিকভাবে সুস্থই। কিন্তু মানুষের মানসিকতা বা মস্তিষ্ক যখন স্ট্রেচের ভেতর থাকে, তখন নিজের প্রতি বিতৃষ্ণা জাগে। জীবনের খেই হারিয়ে ফেলে মানুষ।”
প্রশ্ন ছুড়ে দিয়ে নাসির খান বলেন, “সেই সময়টা মানুষকেই মানুষের পাশে থাকতে হয়। সেই মানুষ কি একটাও নেই সমু চৌধুরীর জীবনে! ধরা যাক, তার পরিবার পরিজন নেই। ব্যক্তিগত ক্লেশে তারা তাকে ত্যাগ করেছে বা সেই তাদেরকে ত্যাগ করেছে। কিন্তু এই যে এতকাল তিনি যাদের সাথে চললেন ফিরলেন, তারাও কি তার একটা পরিবার হয়ে উঠেছিল না? তাদের প্রিয় সমুদাকে নিয়ে তাদের ভাবনা কী? কন্ট্রিবিউশন কী? তার সহকর্মীরা কোথায়? কোথায় শিল্পী সংঘ? কোথায় সংস্কৃতি মন্ত্রণালয়? কেউই কি নেই দেখার? করার কি কিছুই নেই?”
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া ভিডিওতে এমন অবস্থায় দেখা যায় সমু চৌধুরীকে
নাসির খান মনে করেন সমু চৌধুরীর চিকিৎসা দরকার, ভালোবাসা দরকার। তার ভাষায়—“তার চিকিৎসা দরকার। নির্ভরতা দরকার। দরকার কাউন্সেলিং। দরকার একটু ভালোবাসার হাত। সবাই মিলে চেষ্টা করলে কি উনাকে একটু হলেও স্বাভাবিক রাখা যেত না? যাক না যাক, ‘মানুষ মানুষের জন্য’ আদর্শকে ধারণ করলে অন্তত চেষ্টা তো করে দেখা যেত। উনি উনার পারসোনালিটি আর ফিজিক্যাল কন্ডিশনের অবস্থা দিন দিন যা করছেন, তাতে উনাকে আর কেউ কাজ দেবে কি না সেটাও ভাববার। একসময়ের উজ্জ্বল তারকা কি তবে শেষ সময়ে এসে এমন বিশ্রীভাবে ঝরে পড়বে!”
সরকার শাহীন নামে একজন সোশ্যাল মিডিয়ায় সমু চৌধুরীর দুটো ছবি পোস্ট করে আফসোস প্রকাশ করেছেন। তিনি বলেন, “১৯৯৮ সালের বন্যার পর আমার নানা, অবসরপ্রাপ্ত আর্মি হাবিলদার ওমর আলী বাড়িতে সাদাকালো টিভি নিয়ে আসেন। সেই সময়কার দিনে সমু চৌধুরী কতটা স্মার্ট একবার ভেবে দেখেন। আর পরের ছবিটা এখনকার সময় সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘুরে বেড়াচ্ছে। মানুষের জীবনে যশ-খ্যাতি, যৌবন, সৌন্দর্য, টাকা-পয়সা কোনোটাই চিরস্থায়ী নয়।”
একটি ভিডিও থেকে জানা যায়, লালনের আখড়ায় গিয়েছেন সমু চৌধুরী। ভিডিও থেকে ছবির স্ক্রিনশট নেওয়া হয়েছে
সমু চৌধুরীর একটি সাক্ষাৎকারের প্রসঙ্গ টেনে সরকার শাহীন বলেন, “প্রিয় অভিনেতা কোনো এক সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, “উনি উনার মায়ের জন্য বিয়েটাই করেন নাই। বলে রাখা ভালো, উনার মা মানসিক ভারসাম্যহীন একজন মানুষ ছিলেন। আল্লাহ সবাইকে সুস্থ রাখুন।”
সমু চৌধুরীর চিকিৎসার ব্যবস্থা করার আহ্বান জানিয়ে হাসিব আহমেদ নামে একজন লেখেন, “সমু চৌধুরী মাদকাসক্ত, তার চিকিৎসা প্রয়োজন, তার পরিবার যদি তার চিকিৎসার ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে রাষ্ট্র অথবা অভিনয়শিল্পী সংঘের উচিত তার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।” আফসোস করে মমতাজ উদ্দিন নামে একজন লেখেন, “আমাদের দেশে এবং পাশের দেশে অনেক অভিনেতা-অভিনেত্রীকে জীবনের শেষ দিকে করুণ দুর্দশা হতে দেখলাম। কষ্ট লাগে। আসলে এমন হবার কথা না, হতে দেওয়া উচিত না।”
সোশ্যাল মিডিয়ায় ভেসে বেড়াচ্ছে সমু চৌধুরীর ছবিটি
নাট্যকার নাসির খানের প্রশংসা করে তার পোস্টে হাসান মাহমুদ খান লেখেন, “আপনাকেই একমাত্র কথা বলতে দেখলাম। এছাড়া মিডিয়ার কোনো লেখক, কথিত শিল্পী বলতে কোনো নায়ক-নায়িকা, গায়ক-গায়িকা, কবি, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী, কথিত সংঘ, ডিরেক্টর বা শীর্ষস্থানীয় কাউকে এ পর্যন্ত কোনো কথা বা চিন্তা করতে দেখি নাই।”
সমু চৌধুরীর পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহের কথা প্রকাশ করে কিছু পরিকল্পনাও জানান হাসান মাহমুদ খান। তিনি লেখেন, “যেটা একজনের জন্য বোঝা, সেটা একাধিক লোকের জন্য সোজা। চলুন আপনি, আমি আমরা সবাই মিলে উনার পাশে দাঁড়াই। আমি প্রয়োজনে ডিরেক্টর ফজলে আজিম জুয়েল ভাই, পাভেল ভাই (আজাদ আবুল কালাম) শ্যামল জাকারিয়া ভাই, শামছি সাইকা আপা উনাদের সাথে কথা বলতে পারি। আপনি উদ্যোগটা নিন। আমি মানুষের দ্বারে দ্বারে যাব। উনার থাকার জায়গা না থাকলে আমি দিব। খাবার আল্লাহ ব্যবস্থা করে দিবেন। উনাকে কোথায় পাওয়া যাবে?” সোশ্যাল মিডিয়ায় এমন অসংখ্য মন্তব্য ভেসে বেড়াচ্ছে। তবে এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠন বা শিল্পীকে সমু চৌধুরীর পাশে দাঁড়ানোর খবর পাওয়া যায়নি।
সমু চৌধুরীর সেলফিতে তার মা জয়নব চৌধুরী
ছাত্রজীবনে যশোর উদীচী শিল্পী গোষ্ঠীর সঙ্গে যুক্ত ছিলেন সমু চৌধুরী। টানা ১০ বছর উদীচীর হয়ে পথনাটক, মঞ্চনাটক ও গণসংগীত করেছেন। পরে ঢাকা উদীচী, ঢাকা থিয়েটার, নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত হন। ১৯৯০ সালে আতিকুল হক চৌধুরীর ‘সমৃদ্ধ অসীম’ নাটকের মধ্য দিয়ে টিভি নাটকে যাত্রা শুরু করেন। এরপর ‘জন্মভূমি’, ‘সাতপৌরে কাব্য’, ‘এই সময়ের গল্প’, ‘জিনের বাদশা’, ‘সোনালী রোদ্দুর’, ‘এবং আমি’, ‘সবুজের হলুদ ব্যাধি’, ‘দূরের আকাশ’ প্রভৃতি নাটকে অভিনয় করে দর্শক হৃদয়ে জায়গা করে নেন।
এক সময় অভিনয়ে ব্যস্ত সময় কাটিয়েছেন সমু চৌধুরী
বেশ কিছু চলচ্চিত্রেও অভিনয় করেছেন সমু চৌধুরী। এ তালিকায় রয়েছে—‘আদরের সন্তান’, ‘নদীর নাম মধুমতী’, ‘দোলন চাঁপা’, ‘শত জনমের প্রেম’, ‘মায়েল অধিকার’, ‘দেশ দরদি’, ‘মরণ নিয়ে খেলা’, ‘প্রেমের নাম বেদনা’, ‘যাবি কই’, ‘সুন্দরী বধূ’, ‘জুম্মন কসাই’, ‘হৃদয় থেকে পাওয়া’, ‘গোলুই’ প্রভৃতি।
