রাজধানীর কারওয়ান বাজারের সার্ক ফোয়ার মোড়। দুপুরে ব্যস্ত এ সংযোগস্থল পাড়ি দিয়ে গাড়ি ছুটছে চারদিকে। এরই ফাঁকে ফাঁকে রাস্তা পার হচ্ছেন লোকজন। কেউ সতর্ক ভঙ্গিতে, কেউ আবার বেপরোয়াভাবে হাতের ইশারায় গাড়ি থামিয়ে। যদিও অল্প কিছুটা দূরেই রয়েছে ফুট ওভারব্রিজ বা পদচারী সেতু। কিন্তু সেটি ব্যবহারে যেন অনীহা রয়েছে পথচারীদের মধ্যে।
কোলে ছোট শিশুসহ এভাবেই ঝুঁকি নিয়ে চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিলেন এক পুরুষ। সঙ্গে ছিল এক নারী। নিরাপদে অন্য পাশে পৌঁছানোর পর জানতে চাওয়া হলো- মেট্রোরেলের পদচারী সেতু থাকতেও কেন এই ঝুঁকি? উত্তর এলো সংক্ষিপ্তভাবে, ‘ব্রিজটাতে অনেক ঘুরে আসতে হয়। আর তাড়া আছে।’ এরপর তিনি দাঁড়াননি।
বিজ্ঞাপন

প্রতি মিনিটে ১৬ জন পার
গত বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) সার্ক ফোয়ার মোড়ে রাস্তা পারাপারের এই দৃশ্য দেখা যায়। তবে এটি বিরল কোনো ঘটনায় নয়। ওই দিন চার দফায় আধা ঘণ্টা করে গুনে দেখা গেছে, পদচারী সেতু বা জেব্রা ক্রসিং ছাড়া মূল সড়ক পার হয়েছেন- দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত অন্তত ৩৬২ জন এবং দুপুর ১টা ২০ মিনিট থেকে ১টা ৫০ মিনিট পর্যন্ত অন্তত ৩৫৩ জন। এছাড়া সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৬টা পর্যন্ত অন্তত ৬৪১ জন এবং সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাড়ে ৭টা পর্যন্ত অন্তত ৫৩০ জন পার হন।
পর্যবেক্ষণের এই মোট দুই ঘণ্টায় পার হতে দেখা যায় এক হাজার ৮৮৬ জনকে, গড়ে মিনিটে প্রায় ১৬ জন। সবচেয়ে ব্যস্ত সময় সন্ধ্যা ৬টা থেকে সাড়ে ৬টায় এই গড় ছিল ২১ জনের বেশি, অর্থাৎ প্রতি তিন সেকেন্ডে প্রায় একজন।
বিজ্ঞাপন
চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে সবসময়ই পার হয় পথচারীরা। কেউ হাত উঁচু করে, কেউ আঙুল উঁচু করে থামতে বলে। একটু এদিক-ওদিক হলে মনে হয় চোখ দিয়ে শেষ করে ফেলবে। অনেকে তো বাপ-মা তুলে গালিগালাজ করে।- বাসচালক মনির হোসেন
কেন এই ঝুঁকি নেওয়া
নিজের বৃদ্ধ মাকে নিয়ে সড়ক পার হচ্ছিলেন এক পথচারী। মাঝে একটি গাড়ির সঙ্গে প্রায় ধাক্কা লেগে গিয়েছিল। তখন চালক বিরক্তি নিয়ে তাকিয়ে চলে গেলেন। পরে ওই পথচারীকে প্রশ্ন করলে বলেন, ‘খেয়াল করিনি। আর অফিস ধরতে হবে।’ সচেতনতার কথা বললে হাসি দিয়ে চলে যান তিনি।
নাজমুস সাকিব নামের আরেক পথচারী বলেন, ‘আমার প্রয়োজন এপাশ থেকে ওপাশে যাওয়া। এখন এজন্য কি ২০ মিনিট হেঁটে ওভারব্রিজ হয়ে আসবো? সবাই পার হচ্ছে, আমিও হলাম।’
তবে দেখা গেছে, যে জায়গা দিয়ে মানুষ রাস্তা পার হয় সেখান থেকে একপাশের পদচারী সেতুর সিঁড়ি কিছুটা দূরে হলেও অন্য পাশের সিঁড়ি কাছেই। সেতু দিয়ে ওপারে যেতে খুব ধীরে হাঁটলেও লাগে সাড়ে তিন মিনিটের মতো। রাস্তা দিয়ে পার হলে লাগে প্রায় আধা মিনিট।
বিজ্ঞাপন
কিন্তু পদচারী সেতুটিতে কোনো চলন্ত সিঁড়ি নেই। উঠতে হয় ৪৮ ধাপ ডিঙিয়ে। এক বয়স্ক পথচারী বলেন, ‘সিঁড়িতে উঠতে কষ্ট হয়, তাই মাঝরাস্তা দিয়েই যাই।’ ট্রাফিক সংকেত দিলে জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করতেন কি না- জানতে চাইলে উত্তর এলো, ‘সময় নাই।’
আরেকজন বললেন, ‘আপনি যতক্ষণ না এগোবেন, ততক্ষণ গাড়ি থামবে না। এগিয়ে গেলে গাড়ি আপনাকে মারবে না, আর আপনার সঙ্গে আরও অনেকে পার হয়ে যাবে।’
বিজ্ঞাপন

নিয়ম মেনেও পার হন পথচারীরা
তার মানে এই নয় যে, সবাই রাস্তা পার হচ্ছে ঝুঁকি নিয়ে। ব্যতিক্রমের সংখ্যাটাও কম নয়। সোমবার (১২ অক্টোবর) পর্যবেক্ষণ করে দেখা গেছে, দুপুর ১২টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত ছয়বার ট্রাফিক সিগন্যালে গাড়ি থেমেছে। এসময় জেব্রা ক্রসিং দিয়ে পথচারী পার হয়েছেন অন্তত ৩৫০ জন। বিকেল ৩টা থেকে সাড়ে ৩টা পর্যন্ত এই সংখ্যাটি প্রায় ৪০০।
যারা পদচারী সেতু বা জেব্রা ক্রসিং ব্যবহার করেন, তাদের যুক্তি ঝুঁকিকে ঘিরেই। সুয়াইব নামের এক পথচারী বলেন, ‘একটু সাবধানে চলাচলের চেষ্টা করি। মাঝরাস্তা দিয়ে পার হতে গেলে একটা রিস্ক থাকে।’
পথচারীদের বেপরোয়াভাবে পারাপারের কারণে বাসচালকদেরও কিছুটা ভয় ও ঝুঁকি নিয়ে গাড়ি চালাতে হয়। চালক মনির হোসেন বলেন, ‘চলন্ত গাড়ির সামনে দিয়ে সবসময়ই পার হয় পথচারীরা। কেউ হাত উঁচু করে, কেউ আঙুল উঁচু করে থামতে বলে। একটু এদিক-ওদিক হলে মনে হয় চোখ দিয়ে শেষ করে ফেলবে। অনেকে তো বাপ-মা তুলে গালিগালাজ করে।’
বিজ্ঞাপন
আইন আছে, প্রয়োগ নেই
সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ৪২(২) ধারা অনুযায়ী, চালক, পথচারী ও সড়ক ব্যবহারকারীকে ট্রাফিক সাইন ও সংকেত মানতে হবে। ৪২(৩) ধারায় বলা হয়েছে, সড়ক পারাপারে জেব্রা ক্রসিং, ফুটওভার ব্রিজ, আন্ডারপাস বা অনুরূপ সুবিধা থাকলে তা ব্যবহার করতে হবে। না মানলে অনধিক এক মাসের কারাদণ্ড বা অনধিক ১০ হাজার টাকা অর্থদণ্ড, অথবা দুটোই হবে। চালকের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত এক দোষ সূচক পয়েন্ট কর্তন যাবে।
কিন্তু বাস্তবে এই মোড়ে পথচারী পারাপারের জন্য কোনো জরিমানা বা মামলা হয় না। শাস্তির বিধান আছে, প্রয়োগের সম্ভাবনা শূন্য।

ট্রাফিক পুলিশ বলছে জনসচেতনতার কথা
কারওয়ান বাজার মোড়ে দায়িত্বরত ট্রাফিক সার্জেন্ট বুলবুল হোসেন স্বীকার করেন, পুলিশ থাকলে যত্রতত্র পারাপার কিছুটা নিয়ন্ত্রণে থাকে, কিন্তু পরে আবার আগের চিত্র ফিরে আসে। তিনি বলেন, ‘যতক্ষণ পর্যন্ত নিজেরা সচেতন না হবো, এটা ঠিক হবে না।’
বিজ্ঞাপন
একই সঙ্গে তিনি অবকাঠামোর কথাও তোলেন। তিনি বলেন, ‘মেট্রোরেলের বিপরীত পাশে একটা ফুট ওভারব্রিজ হলে মাঝরাস্তা দিয়ে পারাপার অনেক কমে যাবে। সবাই ব্যবহার করবে, এমন না। তবে অনেকাংশে কমবে।’
দুর্ঘটনা প্রসঙ্গে তিনি জানান, ছোটোখাটো দুর্ঘটনা ঘটে, প্রতিদিন না, তবে আবার একদিনে একাধিকবারও হয়। এই আলাপকালেই তিনি হাত দিয়ে পথচারীদের রাস্তার মাঝে দিয়ে পারাপারের দৃশ্য দেখিয়ে বলেন, ‘এটা কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করবেন?’
বিজ্ঞাপন
গাড়ি চলাচলের মাঝে যখন মোড়ে পথচারী জমবে, তখন প্রতি ১০ মিনিট পরপর ৩০ সেকেন্ডের জন্য চতুর্দিকের সব যানবাহন চলাচল একযোগে বন্ধ রাখা হবে। এই ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে পথচারীরা সম্পূর্ণ নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারবে।- সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজ
‘অল রেড সিগন্যাল’ ব্যবস্থা চালুর পরামর্শ
বিষয়টি নিয়ে কথা হয় বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সহকারী অধ্যাপক কাজী মো. সাইফুন নেওয়াজের সঙ্গে। তিনি জাগো নিউজকে বলেন, কারওয়ান বাজার একটি অত্যন্ত ব্যস্ত এলাকা। সেখানে চারদিক থেকে অনবরত যানবাহন চলাচল করার কারণে সাধারণ মানুষের জন্য রাস্তা পার হওয়াটা বেশ চ্যালেঞ্জিং এবং পথচারীদের ঝুঁকি নিয়ে হাত দেখিয়ে পার হতে হয়।
নতুন পদচারী সেতু তৈরি করার বিষয়ে তিনি জানান, কেবল পদচারী সেতু বাড়িয়ে এই সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। কারণ নিচ দিয়ে পার হওয়ার সহজ সুযোগ থাকলে মানুষ কষ্ট করে সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠতে চাইবে না। বিশেষ করে যাদের সাথে শিশু থাকে কিংবা যারা বাজারে ভারী মালামাল ও বোঝা নিয়ে যাতায়াত করেন।
এই সংকট নিরসনে অল রেড সিগন্যাল ব্যবস্থা মূল সমাধান হতে পারে বলে মনে করেন সাইফুন নেওয়াজ। তিনি বলেন, গাড়ি চলাচলের মাঝে যখন মোড়ে পথচারী জমবে, তখন প্রতি ১০ মিনিট পরপর ৩০ সেকেন্ডের জন্য চতুর্দিকের সব যানবাহন চলাচল একযোগে বন্ধ রাখা হবে। এই ৩০ সেকেন্ডের মধ্যে পথচারীরা সম্পূর্ণ নিরাপদে রাস্তা পার হতে পারবে। বিশেষ করে কারওয়ান বাজারের মতো এলাকাগুলোয়। যেখানে দুবার রাস্তা পার হতে হয়। যদি অল রেড সিগন্যাল চালু হয় তাহলে নির্দিষ্ট সময় পরপর পথচারীরা একবারে কোণাকুণি পার হয়ে সহজে চলে যেতে পারবে।
আরএএন/একিউএফ/ এমএফএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
