ব্রেইন টিউমার অত্যন্ত মারাত্মক ও জটিল একটি স্বাস্থ্যগত সমস্যা, যা সময়মতো সঠিকভাবে শনাক্ত ও চিকিৎসা না করা হলে প্রাণহানির আশঙ্কাজনক পরিস্থিতি তৈরি করতে পারে। আমাদের মস্তিষ্কের অভ্যন্তরে সুস্থ কোষগুলোর অস্বাভাবিক, অনিয়ন্ত্রিত বৃদ্ধি ঘটে যখন কোনো পিণ্ড তৈরি হয়, মূলত তাকেই বলে ব্রেইন টিউমার। ব্রেইন টিউমার সব সময় ক্যানসারপ্রবণ নাও হতে পারে; অর্থাৎ এটি ক্ষতিকর নয়, আবার ক্যানসারযুক্ত রূপ ধারণ করতে পারে। সরাসরি মস্তিষ্কের নিজস্ব কোষ থেকে যেসব টিউমারের উৎপত্তি ঘটে সেগুলোকে বলা হয় প্রাইমারি ব্রেইন টিউমার। অন্যদিকে শরীরের ভিন্ন কোনো অঙ্গের ক্যানসার কোষ যখন রক্তপ্রবাহের মাধ্যমে মস্তিষ্কে ছড়িয়ে পড়ে, তখন সেটিকে বলা হয় সেকেন্ডারি বা মেটাস্ট্যাটিক ব্রেইন টিউমার। টিউমারের সার্বিক আকার, বৃদ্ধি পাওয়ার গতিবেগ এবং মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট অবস্থানের ওপর নির্ভর করে রোগীর লক্ষণ ও উপসর্গের ধরন ভিন্ন হতে পারে। সাধারণ ও প্রাথমিক উপসর্গের মধ্যে সবচেয়ে লক্ষণীয় হলো হঠাৎ করে মাথা ধরার গতিপ্রকৃতি বদলে যাওয়া, মাঝেমধ্যেই তীব্র অসহ্য মাথাব্যথা হওয়া, কথা বলতে বা স্পষ্ট উচ্চারণে জটিলতা সৃষ্টি হওয়া এবং দৈনন্দিন হাঁটাচলায় শারীরিক ভারসাম্য বজায় রাখতে চরম অসুবিধা হওয়া। তবে মনে রাখা জরুরি যে সব মাথাব্যথাই ব্রেইন টিউমারের লক্ষণ নয়। কারণ মাথাব্যথার শতকরা এক ভাগের কম কারণ হলো এই টিউমার। ব্রেইন টিউমারজনিত মাথাব্যথা সাধারণত খুব ভোরে শুরু হয় এবং এর সঙ্গে শরীরের কোনো অংশে খিঁচুনি দেখা দিতে পারে, যা পরবর্তী সময় হাত-পা পেরিয়ে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। টিউমার যদি মস্তিষ্কের পিটুইটারি গ্ল্যান্ডে অবস্থান করে তবে চোখের দৃশ্যমান পরিধি কমে যায়; ফলে রোগী সামনের দিকে পরিষ্কার দেখলেও দুপাশের দৃষ্টি হারিয়ে ফেলে একপর্যায়ে অন্ধত্বে রূপ নিতে পারে। মস্তিষ্কের ফ্রন্টাল লোবে টিউমার হলে রোগীর আচরণ অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে, স্মৃতিশক্তি ও দৃষ্টিশক্তি দ্রুত হ্রাস পায়। আবার মস্তিষ্কের মটর এরিয়ায় এটি হলে বিপরীত পাশের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ অবশ বা প্যারালাইজড হয়ে যায়। মস্তিষ্কের নিচের প্রকোষ্ঠে টিউমার আক্রান্ত হলে ব্যক্তি স্বাভাবিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলে বারবার পড়ে যান, কানে শোনেন না এবং কথা অস্পষ্ট হয়ে আসে। টিউমার অতিরিক্ত বৃদ্ধি পেলে মস্তিষ্কের অভ্যন্তরীণ চাপ বেড়ে আকস্মিক মৃত্যুর ঝুঁকি তৈরি হয়। তবে আশার কথা হলো, টিউমারের ধরন ও রোগীর সার্বিক অবস্থা বিবেচনা করে আধুনিক চিকিৎসার সাহায্যে রোগ নির্মূল সম্ভব। টিউমার অস্ত্রোপচারযোগ্য স্থানে থাকলে অভিজ্ঞ নিউরোসার্জন তা সার্জারির মাধ্যমে পুরোপুরি ফেলে দেন, যার ওপর সার্বিক সুস্থতা অনেকাংশে নির্ভর করে। পাশাপাশি ক্যানসার কোষ ধ্বংস করতে উচ্চমাত্রার রেডিয়েশন থেরাপি, একক দিনেই নিখুঁতভাবে রোগ সারানো অত্যাধুনিক রেডিওসার্জারি এবং মুখের বড়ি বা ইনজেকশনের মাধ্যমে কেমোথেরাপি প্রয়োগ করা হয়। এ ছাড়া ক্যানসার কোষের নির্দিষ্ট প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করার জন্য নির্দিষ্ট লক্ষ্যে ড্রাগ থেরাপি অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করে। সঠিক সময়ে সচেতনতা, নির্ভুল রোগ নির্ণয় ও দ্রুত চিকিৎসা গ্রহণ নিশ্চিত করতে পারলে ব্রেইন টিউমারের আশঙ্কাজনক ঝুঁকি থেকে কার্যকরভাবে মুক্ত থাকা সম্ভব।
লেখক : সিনিয়র নিউরোসার্জারি বিশেষজ্ঞ, নিউরোসার্জারি বিভাগ, বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় এবং সিনিয়র কনসালট্যান্ট (নিউরোসার্জন), ল্যাবএইড, ধানমন্ডি, ঢাকা
