বাংলাদেশের স্বল্পোন্নত দেশ (এলডিসি) থেকে উত্তরণের প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া পাওয়ার আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রীর পরিকল্পনা ও অর্থ মন্ত্রণালয়বিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর।
তিনি বলেন, উত্তরণের সময়সীমা বাড়ানোর প্রক্রিয়া এগিয়ে চলছে এবং এ বিষয়ে জাতিসংঘের সদস্যদেশ ও সংশ্লিষ্ট অংশীজনদের সমর্থন আদায়ে বাংলাদেশ কাজ করছে। ২০২৯ সাল পর্যন্ত প্রস্তুতির সময় বাড়ানোর বিষয়ে ঐকমত্য প্রতিষ্ঠার আশা প্রকাশ করে তিনি এ ক্ষেত্রে ডেনমার্ক, ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) ও অন্যান্য দেশের সহযোগিতা কামনা করেন।
বিজ্ঞাপন
সোমবার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার উত্তরায় বিজিএমইএ কমপ্লেক্সে তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএর ‘ইএসজি প্ল্যাটফর্ম’ উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে তিনি এসব কথা বলেন।
রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, বাংলাদেশের এলডিসি উত্তরণকে টেকসই করতে যথাযথ প্রস্তুতি, অর্থনৈতিক সংস্কার এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতা প্রয়োজন।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, এলডিসি উত্তরণ নিয়ে কমিটি ফর ডেভেলপমেন্ট পলিসির (সিডিপি) সুপারিশের পর বিষয়টি জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) হয়ে সাধারণ পরিষদের প্রক্রিয়ায় এগিয়েছে। একই সঙ্গে গ্রুপ অব ৭৭ ও চীনের সঙ্গে আলোচনা এবং অনানুষ্ঠানিক দর-কষাকষিও চলছে।
তিতুমীর বলেন, আগের সরকারের সময়ে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতির ঘাটতি ছিল। ফলে উত্তরণ-পরবর্তী চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় বাড়তি প্রস্তুতির সময় বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এ বিষয়ে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সহযোগিতা প্রয়োজন।
জ্বালানির ব্যয় ও সরকারের উদ্যোগ
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে জ্বালানির ব্যয় বেড়েছে উল্লেখ করে উপদেষ্টা রাশেদ আল তিতুমীর বলেন, গত আট মাসে এ খাতে অতিরিক্ত ৪.১২ মিলিয়ন ডলার ব্যয় করতে হয়েছে। এ পরিস্থিতিতেও অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখা এবং সংস্কার কার্যক্রম এগিয়ে নিতে সরকার কাজ করছে।
বিজ্ঞাপন
তিনি বলেন, অতীতেও বিভিন্ন সংকট মোকাবিলায় জনগণের আস্থা নিয়ে বাংলাদেশ এগিয়ে গেছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে বর্তমান চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় সরকার সংস্কার কার্যক্রম অব্যাহত রাখতে চায়।
তার মতে, বাংলাদেশের অর্থনীতির প্রতি আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও বহুপাক্ষিক প্রতিষ্ঠানগুলোর আস্থা অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ।
বিজ্ঞাপন
জ্বালানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে মাতারবাড়ীকে এনার্জি হাব হিসেবে গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি। পাশাপাশি বিনিয়োগ বাড়াতে নীতির ধারাবাহিকতা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন।
এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, করনীতিতে পাঁচ বছরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যাতে বিনিয়োগকারীরা দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা করতে পারেন এবং ব্যবসায়িক পরিবেশ আরও অনুকূল হয়।
অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও কর্মসংস্থান
তিতুমীর বাংলাদেশের বর্তমান অর্থনৈতিক পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে বলেন, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থানের সংকট এবং জ্বালানির বাড়তি ব্যয় অর্থনীতির ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
বিজ্ঞাপন
তার মতে, শিক্ষিত তরুণদের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করা এবং শ্রমবাজারে নারীর অংশগ্রহণ বাড়ানো টেকসই প্রবৃদ্ধির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
তিনি অতীতের অর্থনৈতিক পরিবর্তনের উদাহরণ টেনে বলেন, নতুন আয়ের উৎস তৈরি, কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ এবং দারিদ্র্যবিমোচনের উদ্যোগ বাংলাদেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে ভূমিকা রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতেও উৎপাদনশীল বিনিয়োগের মাধ্যমে কর্মসংস্থান বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে।
সংস্কার ও বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগ
বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে পাঁচটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলেন উপদেষ্টা। এগুলো হলো নীতির ধারাবাহিকতা, ব্যবসা পরিচালনার পরিবেশ উন্নয়ন, অর্থায়নের সুযোগ সম্প্রসারণ, জ্বালানি সরবরাহ নিশ্চিত করা এবং যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন।
বিজ্ঞাপন
তিনি জানান, করনীতিতে পাঁচ বছরের স্থিতিশীলতা বজায় রাখা, ব্যবসা পরিচালনার প্রতিবন্ধকতা কমানো এবং শিল্প খাতে অর্থায়নের সুযোগ বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নবায়নযোগ্য জ্বালানি, নতুন গ্যাসক্ষেত্র অনুসন্ধান, এলএনজি ও এলপিজি সরবরাহ এবং ভাসমান সংরক্ষণ ও পুনর্গ্যাসীকরণ টার্মিনালের (এফএসআরইউ) সক্ষমতা বাড়ানোর পরিকল্পনার কথাও তুলে ধরেন তিনি।
ঢাকা-চট্টগ্রাম যোগাযোগ, রেলপথের উন্নয়ন এবং দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে বিনিয়োগ বাড়ানোর উদ্যোগকে অর্থনৈতিক কার্যক্রম সম্প্রসারণের অংশ হিসেবে উল্লেখ করেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
সামাজিক সুরক্ষা ও দারিদ্র্যবিমোচন
রাশেদ আল তিতুমীরের মতে, অর্থনৈতিক সংস্কারের সুফল সাধারণ মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির কার্যকর বাস্তবায়ন জরুরি। এ প্রসঙ্গে তিনি ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির কথা উল্লেখ করে বলেন, এটি মূল্যস্ফীতির চাপে থাকা নিম্ন আয়ের মানুষের সহায়তায় ভূমিকা রাখতে পারে।
তিনি শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে সরকারি ব্যয় বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরেন। তার বক্তব্য অনুযায়ী, উৎপাদনশীল বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং অভ্যন্তরীণ রাজস্ব বাড়ানোর মাধ্যমে সামাজিক খাতে ব্যয় সম্প্রসারণের সুযোগ তৈরি করা সম্ভব।
টেকসই প্রবৃদ্ধিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সম্ভাবনা কাজে লাগাতে আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান ও উন্নয়ন অংশীদারদের সহযোগিতার ওপরও গুরুত্ব দেন উপদেষ্টা। তার মতে, সামষ্টিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা, ধারাবাহিক সংস্কার এবং বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ নিশ্চিত করা গেলে এলডিসি উত্তরণের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা সহজ হবে।
বক্তব্যের শেষাংশে বিজিএমইএর উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি পরিবেশ, সামাজিক দায়বদ্ধতা ও সুশাসন—এই তিনটি বিষয়কে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান জানান। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বাসযোগ্য পৃথিবী নিশ্চিত করতে ব্যবসা ও শিল্প খাতে পরিবেশগত, সামাজিক ও সুশাসনসংক্রান্ত মানদণ্ড অনুসরণের প্রয়োজনীয়তার কথাও বলেন তিনি।
আইএইচও/বিএ
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
