কুমারপাড়ার গরুর গাড়ি বোঝাই করা কলসি–হাঁড়ি...। হাট বসেছে শুক্রবারে..., জিনিসপত্র জুটিয়ে এনে গ্রামের মানুষ বেচে–কেনে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হাট’ কবিতায় ঐতিহ্যবাহী গ্রামীণ বাণিজ্যের ছাপ পাওয়া যায়। অতীত বাণিজ্যের এই ধারায় পটিয়ার থানার হাটেও একসময় গরুর গাড়িতে পণ্য আসত। এখন এই হাটে আসে পণ্যবোঝাই ট্রাক। নামে মাছ, সবজি আর ফলের চালান। এই হাটের ঐতিহ্য মাটির হাঁড়ি-পাতিল এখনো আছে, আছে বাঁশ-বেতের কুলা। শুধু বাহন বদলেছে। বেড়েছে কেনাবেচার পরিসর। ছোট-বড় দোকানগুলোতে প্রতি হাটে বাণিজ্যিক লেনদেন হয় দুই কোটি টাকার বেশি।
সকাল থেকেই চলে হাটের আয়োজন। দোকানিরা খুলতে শুরু করেন পেঁয়াজ-রসুনের বস্তা। মাছ সাজাতে ব্যস্ত থাকেন বিক্রেতারা। জিরা, এলাচি আর লবঙ্গের পাশে রাখা হয় ডাল ও শস্যদানা। এক কোণে সারি সারি গাছের চারা। দুপুরের মধ্যে দোকান সাজানো শেষ হলে অপেক্ষা ক্রেতার। বেলা পড়তেই মানুষের আনাগোনা বাড়ে। নানা পণ্যের দর–কষাকষি আর বিক্রেতার হাঁকডাকে মুখর হয়ে ওঠে চার একরের এই থানার হাট।
পটিয়া পৌরসভার কেন্দ্রস্থলে, রেলস্টেশনের পাশে বসে এই হাট। চট্টগ্রাম-কক্সবাজার সড়ক থেকে কয়েক মিনিটের হাঁটাপথ। রেল ও সড়ক—দুই পথেই পৌঁছানো সহজ। পণ্যবাহী গাড়িও ঢোকে। আশপাশের গ্রামের মানুষের সঙ্গে দূরের ক্রেতা-বিক্রেতারা সমবেত হন। যোগাযোগের সুবিধা থাকায় হাটটি আঞ্চলিক বাণিজ্যের বড় কেন্দ্র হয়ে উঠতে সহায়ক হয়েছে।
প্রতি শুক্র ও সোমবার এক হাজারের বেশি বিক্রেতা এখানে পণ্য নিয়ে আসেন। সর্বশেষ দুই হাটবারে ঘুরে পাওয়া গেল তাঁদের ব্যস্ত জীবনের নানা গল্প। বিশ্বকবির ‘হাট’ কবিতার বংশীবদন আর মদনের জায়গায় এখানে দেখা মেলে জব্বার, সোহেল, বদি হোসেনদের সঙ্গে। তাঁদের ব্যবসা ও সংসারের কথায় ধরা পড়ে আজকের হাটের বিস্তার।
থানার হাট পৌর বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম ও ব্যবসায়ীদের দেওয়া হিসাবে, এক হাটবারে দুই কোটি টাকার বেশি লেনদেন হয়। মাছেই বেচাকেনা প্রায় এক কোটি টাকার। সবজিতে আরও ৪০ থেকে ৫০ লাখ টাকা। অন্য পণ্যের বিক্রেতাদের বেচাকেনার তথ্য ধরে সমিতি এই আনুমানিক হিসাব কষে প্রথম আলোকে জানিয়েছে।
বহু গ্রামের পণ্য, বহু মানুষের রোজগার
থানার হাটে বিভিন্ন পাইকারের মাধ্যমে সবজি আসে চকরিয়া, চন্দনাইশ ও সাতকানিয়ার নানা কৃষকের খেত থেকে। চট্টগ্রাম নগরের রেয়াজউদ্দিন বাজার থেকেও চালান আনেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের পাশে পটিয়ার কৃষকেরা বসেন নিজের জমির ফসল নিয়ে। মাছের বাজারেও মেলে স্থানীয় পুকুরের মাছ আর দূর থেকে আসা চালান। বহু এলাকার উৎপাদিত পণ্য এভাবে এই হাটে কেনাবেচা হয়।
এখান থেকে কেনা পণ্য আবার পৌঁছে যায় পটিয়ার গ্রামে গ্রামে। কেউ সংসারের বাজার নিয়ে ফেরেন, কেউ গ্রামের দোকানে বিক্রির জন্য কেনেন। থানার হাট তাই বাইরের পণ্য সংগ্রহের পাশাপাশি স্থানীয় সরবরাহেরও কেন্দ্র। এখান থেকে পণ্যে বেশ হাতবদল হয়।
সবচেয়ে বেশি দোকান সবজির—ছয় শতাধিক। মাছের দোকান এক শর বেশি। মুদি ও মসলার দোকান প্রায় এক শটি। মাংসের দোকান ২০টি, শুঁটকি ও ফলের দোকান প্রায় ৩০টি করে এবং পান-সুপারির দোকান প্রায় ১০টি। পোশাক, মাছ ধরার জাল, গাছের চারা ও গৃহস্থালির সামগ্রীও বিক্রি হয় এই হাটে। দৈনন্দিন বাজার থেকে পারিবারিক অনুষ্ঠানের কেনাকাটা—এক জায়গাতেই নানা প্রয়োজন মেটে।
পটিয়ার ভাটিকাইন গ্রামের আবদুল জব্বার পেঁয়াজ-রসুন বিক্রি করেন। প্রতি হাটবারে তাঁর বেচাকেনা প্রায় এক লাখ টাকার। তিনি প্রথম আলোকে জানান, বিকেল থেকে রাত ১২টা পর্যন্ত ক্রেতা থাকেন। তখন দম ফেলার ফুরসত মেলে না।
সবজি বিক্রেতা মোহাম্মদ সোহেলের বিক্রি হয় ৪০ থেকে ৫০ হাজার টাকার। কোনো হাটবারে আরও বেশি। শীতে তাঁর দোকানের ব্যস্ততা বাড়ে। সোহেলের ভাষ্য, শঙ্খ নদের তীরের শীতকালীন সবজি আসতে শুরু করলে বিক্রি দ্বিগুণ হয়ে যায়। সরবরাহের সঙ্গে ক্রেতার সমাগমও বাড়ে।
মৌসুম ছাড়াও পারিবারিক আয়োজন ঘিরে হাটে পণ্যের চাহিদা বাড়ে। গ্রামের অনেক বিয়ের অনুষ্ঠানের পণ্য কেনা হয় এখান থেকে। উৎসবেও দোকানগুলো ক্রেতাদের ভিড়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে। ফলে হাটের লেনদেন সারা বছর একই রকম নয়। ফসলের মৌসুম ও মানুষের প্রয়োজনে চাহিদা ও সরবরাহ ওঠানামা করে। ফলে হাটবারগুলোতে বাণিজ্যের হিসাবও পাল্টে যায়। কখনো কম, কখনো বেশি হয়।
এই বাণিজ্যিক লেনদেনের বিক্রীত পণ্যের পুরো টাকা লাভ নয়। এর একটা অংশ ব্যয় হয় পণ্য কেনা, পরিবহন ও বিক্রির অন্যান্য খরচ মেটাতে। বিক্রীত পণ্যের লাভের পরিমাণ নিয়ে বিক্রেতারা জানান, প্রতি হাটে সব খরচ বাদ দিয়ে গড়ে ৫ থেকে ১০ হাজার টাকা লাভ হয়। পণ্য ও বিক্রির পরিমাণ অনুযায়ী এই অঙ্কও বদলায়।
এক শ থেকে হাজারের বেশি বিক্রেতার হাট
এক দিনে গ্রামীণ বাণিজ্যের বড় পসরা গড়ে ওঠেনি। গাছের চারা নিয়ে বসা বাবুল দেবনাথের সঙ্গে আলাপে উঠে এল ছোট পরিসর থেকে হাট বড় হওয়ার গল্প। সত্তরোর্ধ্ব এই বিক্রেতা নিজের নার্সারির চারা বিক্রি করেন।
থানার হাট ঘুরিয়ে প্রথম আলোর এই প্রতিবেদককে দেখালেন পৌর বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির সাধারণ সম্পাদক নুরুল ইসলাম। হাঁটতে হাঁটতে তিনি বলেন, এখানে ছোট পুঁজি নিয়েও ব্যবসা শুরু করার সুযোগ আছে। ক্রেতার সমাগম ও ভালো বিক্রি সেই সুযোগ টিকিয়ে রেখেছে।