বান্দরবানের আলীকদম উপজেলায় পাহাড়ের বুক চিরে বয়ে গেছে দৃষ্টিনন্দন প্রশস্ত সড়ক। সড়কে বদলেছে একসময় দুর্গম বলে পরিচিত কুরুকপাতা ইউনিয়নের যোগাযোগের চিত্র। কিন্তু সড়ক যেখানে শেষ, সেখান থেকেই যেন শুরু হয় মানুষের আরেক বাস্তবতা। সূর্য ডুবলেই অন্ধকার ভুতের নগরীতে পরিণত হয় পাহাড়ি পল্লীগুলো। বিদ্যুতের সংযোগ না পৌঁছানোয় কুপী বাতির আলোয় পড়াশোনা করে শিক্ষার্থীরা। অসুস্থ হলে ছুটতে হয় দূরের উপজেলা সদরে। কৃষকের উৎপাদিত পণ্য বাজারে নিতে গুনতে হয় বাড়তি পরিবহণ খরচ। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেটের সেবাও নেই। মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক এবং ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব ভবনও নেই এখানে। সড়ক যোগাযোগ থাকলেও এই দুর্গম কুরুকপাতায় মানুষের জীবনযাত্রার মান মোটেও বদলায়নি।
স্থানীয়রা জানায়, মিয়ানমার সীমান্তঘেঁষা আলীকদম উপজেলার এই কুরুকপাতা ইউনিয়নে প্রায় ১৭ হাজার মানুষের বসবাস। ম্রো, ত্রিপুরা, খুমিসহ বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষ পাহাড়ের দুর্গম পাড়াগুলোতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে বসবাস করেন। কুরুকপাতা বাজার ও পৌহমুহুরী পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হলেও ইউনিয়নের অনেক প্রত্যন্ত এলাকায় এখনও পৌঁছেনি সেই সুবিধা।
দিনের আলোয় পাহাড়ি জনপদটির চিত্র বদলে যায়। কিন্তু সূর্য ডোবার সঙ্গে সঙ্গে অনেক ঘরে নেমে আসে অন্ধকার। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ এখনও পৌঁছেনি। কেউ সৌরবিদ্যুৎ ব্যবহার করে, কেউ বা কেরোসিনের বাতি জ্বালায়। প্রয়োজনের সময় মুঠোফোনের আলোও হয়ে ওঠে ভরসা।
ক্রিটলাইপাড়ার বাসিন্দা রইচুং ম্রো বলেন, সড়ক হয়েছে কিন্তু নেটওয়ার্ক, বিদ্যুৎ কোনো কিছুই পৌঁছায়নি। যার কারণে সবাইকে সোলার বাতি আর কেরোসিন ব্যবহার করতে হচ্ছে এখনও।
কুরুকপাতার প্রত্যন্ত এলাকা থেকে আলীকদম উপজেলা সদরের দূরত্ব প্রায় ২৫ থেকে ৩০ কিলোমিটার। সড়ক থাকলেও অনেক পাড়ায় যেতে হয় মাতামুহুরী নদীপথে। আবার কোনো কোনো এলাকায় কয়েক ঘণ্টা পাহাড়ি পথ হেঁটে যেতে হয়। দুর্গম এই জনপদের বাসিন্দাদের সবচেয়ে বড় ভোগান্তি চিকিৎসাসেবা নিয়ে। ইউনিয়নে পূর্ণাঙ্গ কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র না থাকায় সাধারণ চিকিৎসার জন্যও উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওপর নির্ভর করতে হয়। প্রত্যন্ত এলাকা থেকে শিক্ষা, চিকিৎসা, সরকারি সেবা কিংবা জরুরি যোগাযোগ—সব ক্ষেত্রেই বাড়তি সময় ও খরচ গুনতে হয় বাসিন্দাদের।
স্থানীয় রামপু ম্রো বলেন, রাতে কেউ অসুস্থ হলে সবচেয়ে বেশি ভয় লাগে। কাছাকাছি চিকিৎসার ব্যবস্থা নেই। রোগী নিয়ে বের হতে হয় অনেক দূরের পথে। সময়মতো চিকিৎসা পাওয়া যাবে কি না, সেই চিন্তাই আগে আসে।
সিগরুং ত্রিপুরা বলেন, শহরে যে চিকিৎসা বা পরীক্ষা সহজে করা যায়, আমাদের এখানে সেটা করতে পুরো দিন চলে যায়। গরিব মানুষের জন্য যাতায়াতের খরচও কম নয়। আর জন্মনিবন্ধনের জন্য শহরে আসা-যাওয়ায় হাজার টাকার বেশি চলে যায়।
কুরুকপাতার মানুষের বড় অংশ কৃষিনির্ভর। পাহাড়ি ঢাল জুম ও নদীর কিনারে নানা ধরনের ফসল ফলায় তারা। কিন্তু উৎপাদনের পর বাজারে পৌঁছানোই আরেক চ্যালেঞ্জ। দুর্গম এলাকা থেকে কৃষিপণ্য পরিবহণে খরচ বেশি। বাজারে পৌঁছানোর পরও পণ্যের দামের ওপর কৃষকের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীলতার কারণে উৎপাদন খরচ, পরিবহণ ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ভারসাম্য থাকে না। ফলে কঠোর পরিশ্রমের পরও কাঙ্ক্ষিত আয় থেকে বঞ্চিত হয় অনেক কৃষক।
সিংপাও ম্রো বলেন, শহর দূরে হওয়ায় কৃষিপণ্যের নায্যমূল্য পাই না। কলাছড়া, মিষ্টিকুমড়া, জুমের নানা কৃষি শহরে গেলে দাম কমে যায়। আমরা খুব কষ্টের মধ্যে আছি।
কুরুকপাতার সমস্যা এখানেই শেষ নয়। নেই নিরবচ্ছিন্ন মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা। নেই মাধ্যমিক বিদ্যালয়। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয়ও নেই। ফলে ইউনিয়ন পরিষদের নাগরিকসেবা পেতেও অনেককে ছুটতে হয় উপজেলা সদরে। আর কুরুকপাতা বাজার ও পৌহমুহুরী পর্যন্ত সড়ক যোগাযোগের উন্নতি হলেও ইউনিয়নের প্রত্যন্ত পাড়াগুলো এখনও বিচ্ছিন্ন। ফলে আধুনিক যোগাযোগ ব্যবস্থার সুবিধা পুরো ইউনিয়নের মানুষের কাছে পৌঁছেনি।
যোগেন্দ্র কারবারিপাড়ার চিংচাহ্লা তংচঙ্গ্যা বলেন, গ্রামে বিদ্যুৎ আনতে ৬০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে কর্মচারীদের। এরপর বিদ্যুৎ এলেও শাখা প্রশাখা দেয়নি। আর শাখা প্রশাখা লাইন দিতে ২০-২৫ হাজার টাকা দাবি করছে বিদ্যুৎ বিভাগের লোকজন। যার কারণে অনেক গ্রামে বিদ্যুৎ পৌঁছায়নি।
রঞ্জন তংচঙ্গ্যা বলেন, বিদ্যুতের মিটার আর শাখা প্রশাখা নিতে গেলে ২০-৩০ হাজার টাকা দিতে হবে। এখানে সবাই গরিব দিন এনে দিন খায়। এত টাকা কীভাবে দিবে। মাত্র চার বাড়ি বিদ্যু জ্বলে অনান্য গ্রাম ও মানুষের বাড়িতে বিদ্যুৎ দূরের কথা সেই আগের যুগের মতো সোলার আর চেরাগ আলোতে দিনপার করতে হচ্ছে।
কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, আমার ইউনিয়ন এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট সুবিধা নেই। এ কারণে আলীকদম সদর ইউনিয়ন এলাকায় একটি ভাড়া করা কক্ষ থেকে ইউনিয়নের কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে। এতে সাধারণ মানুষকে সেবা দিতে সমস্যা হচ্ছে।
বিষয়টি নিশ্চিত করে আলীকদম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, আলীকদমের কুরুকপাতা ইউনিয়নের নিজস্ব কার্যালয় নেই। কুরুকপাতাসহ এসব ইউনিয়নের অবকাঠামো উন্নয়নে কাজ চলছে। তবে রিজার্ভ ফরেস্ট হওয়ায় বনবিভাগের আপত্তির কারণে ইউনিয়ন পরিষদের ভবন নির্মাণে জটিলতা রয়েছে। এ বিষয়ে বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের অনাপত্তির জন্য চিঠি পাঠানো হচ্ছে।
ইউএনও আরও জানান, কুরুকপাতায় মাধ্যমিক বিদ্যালয়, কমিউনিটি ক্লিনিক বা ইউনিয়ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র, বিদ্যুৎ ও মোবাইল নেটওয়ার্ক—এসব সুবিধার ঘাটতি রয়েছে। সেখানে কীভাবে নেটওয়ার্ক সুবিধা আনা যায়, সে বিষয়ে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নেটওয়ার্ক স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হবে।
