আলট্রাসাউন্ড তরঙ্গে কমবে সিজোফ্রেনিয়ার বিভ্রান্তি
প্রকাশ: ২৫ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:৫৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->মস্তিষ্কের গভীরে আলট্রাসাউন্ড তরঙ্গ প্রয়োগ করে সিজোফ্রেনিয়ার রোগীদের ভুল বা অযৌক্তিক ধারণা কমানোর নতুন এক সম্ভাবনার কথা জানিয়েছেন বিজ্ঞানীরা। চিকিৎসা বিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ট্রান্সক্রেনিয়াল আলট্রাসাউন্ড স্টিমুলেশন। সম্প্রতি প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, এই প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে সিজোফ্রেনিয়াজনিত বিভ্রান্তি উল্লেখযোগ্য হারে দূর করা সম্ভব।
যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্ক ইউনিভার্সিটি গ্রসম্যান স্কুল অব মেডিসিনের গবেষকদের পরিচালনায় গবেষণাটি সম্পন্ন হয়। এতে সিজোফ্রেনিয়া ও সিজোঅ্যাফেক্টিভ ডিসঅর্ডারে আক্রান্ত ১০ জন রোগীকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই ধরনের রোগীদের মনে প্রায়ই বাস্তবতাহীন ধারণা বা বিভ্রান্তি তৈরি হয়। উদাহরণস্বরূপ, কোনো প্রমাণ ছাড়াই তারা মনে করতে পারেন কেউ তাদের পেছনে লেগেছে অথবা বড় কোনো বিপদ আসতে যাচ্ছে।
পরীক্ষায় রোগীদের মাথায় একটি বিশেষ ডিভাইস বসিয়ে ১০ মিনিট স্থায়ী আলট্রাসাউন্ড সেবা দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে তাদের অবস্থা পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, অন্তত এক সপ্তাহের জন্য তাদের এই বিভ্রান্তিকর ধারণার তীব্রতা কমে এসেছে। রোগীদের ওপর একই সঙ্গে একটি ছদ্ম চিকিৎসাও প্রয়োগ করা হয়েছিল, যার তুলনায় আসল আলট্রাসাউন্ড তরঙ্গের ফলাফল ছিল অনেক বেশি কার্যকর ও ইতিবাচক।
সিজোফ্রেনিয়া চিকিৎসায় সাধারণ অ্যান্টিসাইকোটিক ওষুধ ব্যবহার করা হয়। কিন্তু এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া হিসেবে ওজন বৃদ্ধি ও উচ্চ রক্তচাপের মতো সমস্যা দেখা দেয়। আলট্রাসাউন্ডের এই নতুন পদ্ধতি মস্তিষ্কের নির্দিষ্ট স্থানে সরাসরি কাজ করায় মানবদেহে সাধারণ ওষুধের মতো ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে না। ফলে এটি প্রচলিত চিকিৎসার বিকল্প হিসেবে এক নতুন আশার আলো দেখাচ্ছে।
গবেষক দলের সদস্য ও মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ড. ডোনাল্ড গফ জানান, যদিও প্রাথমিক পর্যায়ে এর সুনির্দিষ্ট মেয়াদি উপকারিতা নিয়ে চূড়ান্ত মন্তব্য করা কঠিন, তবে বিষয়টি সত্যিই ইতিবাচক। মস্তিষ্কের বিশেষ অঞ্চল ‘গ্লোবাস প্যালিডাস ইন্টারনাস’-কে লক্ষ্য করে এই পরীক্ষা চালানো হয়। মস্তিষ্কের ভেতরের সার্কিটে উদ্দীপনা ও প্রতিরোধের মধ্যে ভারসাম্যহীনতার কারণে যে বিভ্রান্তি তৈরি হয়, এই প্রযুক্তি তা নিয়ন্ত্রণে কাজ করে।
চৌম্বক ক্ষেত্র ব্যবহার করে চিকিৎসা দেওয়ার অন্যান্য নন-ইনভেসিভ পদ্ধতির তুলনায় আলট্রাসাউন্ডের তরঙ্গ মস্তিষ্কের অনেক গভীরে প্রবেশ করতে পারে। লেন্স যেভাবে আলোকে একবিন্দুতে কেন্দ্রীভূত করে, আলট্রাসাউন্ড ট্রান্সডিউসার ঠিক সেভাবে মস্তিষ্কের গভীরে তরঙ্গ পৌঁছে দেয়। অস্ত্রোপচার না করে মস্তিষ্কের গভীর স্তরে পৌঁছানোর এমন সহজ উপায় চিকিৎসাবিজ্ঞানে বেশ বিরল।
গবেষণায় অংশ নেওয়া রোগীদের মধ্যে সামান্য ক্লান্তি বা মাথাব্যথার মতো সাময়িক পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা গেছে। তবে বিজ্ঞানীরা মনে করছেন এগুলো খুব মারাত্মক কোনো প্রভাব ফেলবে না। এমনকি অন্য গবেষক দলও সিজোফ্রেনিয়া রোগীদের হ্যালুসিনেশন কমানোর জন্য মস্তিষ্কের স্ট্রিয়াটাম অঞ্চলে আলট্রাসাউন্ড উদ্দীপনা ব্যবহার করে সাফল্য পেয়েছেন।
পিটসবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যার সহযোগী অধ্যাপক দীপক সরপাল বলেন, মস্তিষ্কের ভেতরের গভীর অংশগুলোতে লক্ষ্য করে সফলভাবে চিকিৎসা করার ঘটনা খুব একটা দেখা যায় না। অস্ত্রোপচার করে মস্তিষ্কে ইলেকট্রোড বসানোর মতো আক্রমণাত্মক পদ্ধতির চেয়ে আলট্রাসাউন্ড অনেক বেশি নিরাপদ। তবে, তিনি এই গবেষণার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিলেন না।
গবেষকরা বর্তমানে আরও বেশি সংখ্যক রোগীর ওপর বিভিন্ন মাত্রার আলট্রাসাউন্ড তরঙ্গ প্রয়োগ করে এই পদ্ধতির কার্যকারিতা ও সঠিক ডোজ নিশ্চিত করার পরিকল্পনা করছেন। সিজোফ্রেনিয়া ও সম্পর্কিত মানসিক জটিলতায় ভুগতে থাকা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের চিকিৎসার ক্ষেত্রে বিজ্ঞানীদের এই নতুন গবেষণা একটি যুগান্তকারী অগ্রগতি হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
আরও পড়ুন
মহাবিশ্ব সৃষ্টির নতুন ধারণা মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে সময়ের সূচনা হয়নি
প্রকাশ: ২৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৪:৪৪ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->মহাবিশ্বের সৃষ্টি ও উৎপত্তি নিয়ে প্রচলিত বিগ ব্যাং বা মহাবিস্ফোরণ তত্ত্বের বাইরে নতুন এক তত্ত্বের নাম ‘একপাইরোটিক’ মহাবিশ্ব ধারণা। মহাবিশ্ব সৃষ্টি নিয়ে বিজ্ঞানীদের সাধারণ যে তত্ত্ব প্রচলিত আছে, এটি মূলত তার একটি বিকল্প ভাবনা। নতুন এই মতবাদ অনুযায়ী মহাবিস্ফোরণের মাধ্যমে সময়ের সূচনা হয়নি।
প্রচলিত ল্যামডা-সিডিএম তত্ত্বে বলা হয়, সৃষ্টির শুরুতে এক দ্রুত ‘ইনফ্লেশন’ ঘটেছিল। এই প্রক্রিয়া বর্তমান ফ্ল্যাট বা সমতল মহাবিশ্বের রূপ দিয়েছে। এর কোনো প্রত্যক্ষ প্রমাণ না থাকলেও বিজ্ঞানীদের বড় একটি অংশ এই তত্ত্বে বিশ্বাস করেন। কারণ, এর সাহায্যে মহাবিশ্বের অনেক জটিল কাঠামোর ব্যাখ্যা সহজ হয়।
অন্যদিকে একপাইরোটিক তত্ত্ব অনুযায়ী, সময়ের কোনো নির্দিষ্ট শুরু নেই। এখানে বিগ ব্যাং তত্ত্বকে দুই ব্রেনের সংঘর্ষের ফল হিসেবে দেখা হয়। পাঁচ মাত্রার স্থান-কালের ভেতর দুটি তিন মাত্রার জগৎ একে অপরের সঙ্গে ধাক্কা খেয়ে এটি তৈরি হয়েছে। বর্তমান মহাবিশ্বের কাঠামো মূলত এই সংঘর্ষের আগের ঘটনা দ্বারা নির্ধারিত হয়। ফলে এতে তথাকথিত ইনফ্লেশনের কোনো প্রয়োজন থাকে না।
প্রচলিত তত্ত্বের অন্যতম দুর্বল দিক হলো সিঙ্গুলারিটি। এতে মনে করা হয় একসময় পুরো মহাবিশ্ব একটিমাত্র ক্ষুদ্র বিন্দুতে পুঞ্জীভূত ছিল। একপাইরোটিক ধারণা এই সিঙ্গুলারিটিকে এড়িয়ে যায়। তবে এই তত্ত্বটিও পুরোপুরি নিখুঁত নয়। কারণ এটি অনুযায়ী কিছু নেতিবাচক শক্তিকণা তৈরি হয়, যা মহাবিশ্বকে ধ্বংস করে দিতে পারে।
দুই তত্ত্বের মধ্যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গ ও গ্যালাক্সির বণ্টনের ধারণায় বেশ পার্থক্য রয়েছে। বর্তমানে একপাইরোটিক তত্ত্বের পক্ষে তেমন জোরালো কোনো পর্যবেক্ষণমূলক প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে এটি বিজ্ঞানীদের কাছে চমৎকার এক বিকল্প ধারণা হলেও পদার্থবিদদের কাছে বিগ ব্যাং তত্ত্বই এখনো সবচেয়ে বেশি গ্রহণযোগ্য।
আরও পড়ুন
লং মার্চের ৯০তম বার্ষিকীতে মহাকাশ থেকে নভোচারীদের বার্তা
প্রকাশ: ২৩ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৪ পিএম
চায়নিজ মহাকাশচারী
-->চীনের সাধারণ কর্মজীবী ও কৃষকদের রেড আর্মির লং মার্চের ৯০তম বার্ষিকী উপলক্ষে একটি ভিডিওবার্তা পাঠিয়েছেন থিয়ানকং মহাকাশ স্টেশনে অবস্থানরত শেনচৌ-২৩ নভোচারীরা। বুধবার পাঠানো এ বার্তায় আধুনিক চীনের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক অভিযানের কথা তুলে ধরা হয়।
১৯৩৪ থেকে ১৯৩৬ সাল পর্যন্ত লং মার্চ ছিল চীনের গণমানুষের একটি সামরিক অভিযান।
পরবর্তী সময়ে এটি আধুনিক চীনের ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পরিণত হয়। অভিযানে সেনারা দেশের দুর্গম অঞ্চল পাড়ি দিয়ে নতুন বিপ্লবী ঘাঁটি প্রতিষ্ঠা করেন। এই অভিযান সহনশীলতা ও অধ্যবসায়ের প্রতীক হয়ে ওঠে। সেনাদের কেউ কেউ ১২ হাজার ৫০০ কিলোমিটার পর্যন্ত পথ পাড়ি দেন। এ সময় তাদের ক্ষুধা, তৃষ্ণা ও তীব্র শীত সহ্য করতে হয়।
শেনচৌ-২৩-এর কমান্ডার চু ইয়াংহু ও তার দুই সহযাত্রী চাং চিইয়ুয়ান ও লি চিয়াইয়িং তাদের অভিযানে লং মার্চের চেতনা কীভাবে অনুপ্রেরণা জোগায়, তা তুলে ধরেন।
চু বলেন, ‘৯০ বছর আগে চীনের জাতির অস্তিত্ব রক্ষায় লড়াই করেছিলেন রেড আর্মির সদস্যরা। নিজেদের রক্ত ও জীবন দিয়ে তারা নদী ও পর্বত পাড়ি দিয়েছেন। অদম্য মনোবল নিয়ে ১২ হাজার ৫০০ কিলোমিটারের যাত্রাপথে তারা মানুষের সহনশীলতার সীমা অতিক্রম করেছিলেন। তাদের রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার আজও জীবন্ত।’
প্রথমবারের মতো মহাকাশে যাওয়া চাং বলেন, ‘গত ৭০ বছর ধরে জাতীয় পুনর্জাগরণের লক্ষ্যে চীনের মহাকাশ কর্মসূচিতে প্রজন্মের পর প্রজন্মের মহাকাশ পেশাজীবী নিজেদের নিয়োজিত রেখেছেন। অবিচল নিষ্ঠায় তারা দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য অর্জন করেছেন। মহান লং মার্চের নামে নামকরণ করা রকেটগুলো একের পর এক মহাকাশে পাঠিয়েছেন তারা। এসব পেশাজীবী দেশের জন্য ক্রমাগত নতুন উচ্চতায় পৌঁছেছেন এবং বারবার গভীর মহাকাশের নতুন অভিযানে যাত্রা করেছেন।’
মহাকাশে যাওয়া চীনের বিশেষ প্রশাসনিক অঞ্চলের প্রথম নভোচারী লাই কাং-ইয়িং বলেন, ‘এই মুহূর্তে চীনের জনগণের নির্মিত মহাকাশের আবাসস্থল মহাকাশ স্টেশন থেকে আমরা আমাদের নীল গ্রহের দিকে তাকিয়ে আছি। ৯০ বছর পেরিয়ে গেছে। তবুও লং মার্চের চেতনা কখনো ম্লান হয়নি। এই চেতনা শুধু পৃথিবী থেকে বিস্তৃত হয়ে নক্ষত্রের বিশাল সমুদ্রে পৌঁছেছে।’
কমান্ডার চুসহ এই তিন নভোচারী চলতি বছরের ২৪ মে শেনচৌ-২৩ মহাকাশযানে করে যাত্রা শুরু করেন। ২৫ মে তারা থিয়ানকোং মহাকাশ স্টেশনে প্রবেশ করেন। সূত্র: সিএমজি
আরও পড়ুন
পৃথিবী থেকে সবচেয়ে দূরে থাকবে চাঁদ, ১৬ অক্টোবর কী প্রভাব পড়বে পৃথিবীতে?
প্রকাশ: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম
আপডেট: ১৪ অক্টোবর ২০২৬, ০৫:২৩ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->পৃথিবীর একমাত্র উপগ্রহ চাঁদ প্রতিনিয়ত পৃথিবীকে প্রদক্ষিণ করছে। তবে পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্ব সব সময় এক থাকে না। এর কারণ, চাঁদের কক্ষপথ পুরোপুরি বৃত্তাকার নয়, বরং উপবৃত্তাকার। তাই প্রদক্ষিণের সময় কখনও চাঁদ পৃথিবীর কাছে আসে, আবার কখনও দূরে সরে যায়। পৃথিবীর সবচেয়ে কাছের অবস্থানকে বলা হয় পেরিজি (Perigee) এবং সবচেয়ে দূরের অবস্থানকে বলা হয় অ্যাপোজি (Apogee)।
জ্যোতির্বিজ্ঞানের হিসাব অনুযায়ী, ২০২৬ সালের ১৬ অক্টোবর চাঁদ পৃথিবী থেকে তার কক্ষপথের সবচেয়ে দূরবর্তী অবস্থানে পৌঁছাবে। এ সময় পৃথিবীর কেন্দ্র থেকে চাঁদের দূরত্ব হবে আনুমানিক ৪ লাখ ৪ হাজার ৬০০ কিলোমিটার। তবে বাংলাদেশে স্থানীয় সময় অনুযায়ী, এই ঘটনা ঘটবে ১৭ অক্টোবর ভোর ৪টা ৫৪ মিনিটের দিকে।
পৃথিবী থেকে চাঁদের গড় দূরত্ব প্রায় ৩ লাখ ৮৪ হাজার ৪০০ কিলোমিটার। ফলে অ্যাপোজির সময় চাঁদ গড় দূরত্বের তুলনায় অনেকটা দূরে থাকবে।
এই দূরত্ব বাড়ার কারণে পৃথিবীতে কী ধরনের পরিবর্তন ঘটবে? সমুদ্রের জোয়ার-ভাটা, রাতের আকাশ কিংবা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে কি এর কোনো প্রভাব পড়বে? চলুন, জেনে নেওয়া যাক।
চাঁদ দূরে সরে গেলে জোয়ার-ভাটায় কী প্রভাব পড়ে?
চাঁদের মহাকর্ষীয় আকর্ষণ পৃথিবীর সমুদ্রের জোয়ার-ভাটার অন্যতম প্রধান কারণ। সূর্যের মহাকর্ষীয় আকর্ষণও জোয়ার-ভাটাকে প্রভাবিত করে। চাঁদ পৃথিবীর কাছে থাকলে তার জোয়ার সৃষ্টিকারী প্রভাব সাধারণত বেশি হয়। অন্যদিকে, চাঁদ দূরে থাকলে এই প্রভাব কিছুটা কমে যায়।
সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে এই ঘটনায় বড় কোনো পরিবর্তন ঘটার আশঙ্কা নেই। জেলে, নাবিক এবং উপকূলীয় এলাকার বাসিন্দাদেরও শুধু চাঁদের দূরত্বের কারণে বিশেষ কোনো সতর্কতা নেওয়ার প্রয়োজন নেই। তবে সমুদ্রযাত্রা ও মাছ ধরার ক্ষেত্রে স্থানীয় আবহাওয়া এবং জোয়ার-ভাটার পূর্বাভাস অনুসরণ করা জরুরি।
চাঁদ পৃথিবী থেকে দূরে থাকলে আকাশে তার আপাত আকার কিছুটা ছোট দেখায়। পৃথিবী থেকে চাঁদের দূরত্বের পরিবর্তনের কারণে তার আপাত ব্যাস কাছের ও দূরের অবস্থানের মধ্যে প্রায় ১৪ শতাংশ পর্যন্ত ভিন্ন হতে পারে।
চাঁদের আপাত আকারের পাশাপাশি তার উজ্জ্বলতাও কিছুটা কমতে পারে।
চাঁদ শুধু রাতের আকাশের সৌন্দর্য বাড়ায় না; পৃথিবীর জোয়ার-ভাটা এবং দীর্ঘমেয়াদি গতিশীলতার ওপরও এর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রয়েছে। বিজ্ঞানীদের পরিমাপ অনুযায়ী, চাঁদ বর্তমানে প্রতি বছর গড়ে প্রায় ৩ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার করে পৃথিবী থেকে দূরে সরে যাচ্ছে। অ্যাপোলো অভিযানের সময় চাঁদে স্থাপন করা প্রতিফলক ব্যবহার করে লেজার রশ্মির মাধ্যমে এই দূরত্ব অত্যন্ত নির্ভুলভাবে মাপা হয়েছে।
চাঁদের জোয়ার-ভাটাজনিত প্রভাব পৃথিবীর ঘূর্ণনকে অত্যন্ত ধীরে ধীরে মন্থর করছে। এর ফলে দীর্ঘ সময়ের ব্যবধানে পৃথিবীর দিনের দৈর্ঘ্য বাড়ে এবং চাঁদের কক্ষপথও প্রসারিত হয়।
চাঁদ অ্যাপোজিতে পৌঁছানো একটি স্বাভাবিক জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক ঘটনা। এ নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কোনো কারণ নেই।
অমিয়/
আরও পড়ুন
চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল জয় শৈবালের কৌতূহল থেকে মস্তিষ্কের রহস্যভেদ
প্রকাশ: ১০ অক্টোবর ২০২৬, ০৩:০১ পিএম
ছবি: সংগৃহীত
-->আলো দেখলে যে এককোষী শৈবাল চোখের পলকে নিরাপদ দূরত্বে সরে যেতে পারে, সেই সাধারণ কৌতূহল থেকে উন্মোচিত হয়েছে আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানের এক বিপ্লব। এককোষী ক্ল্যামাইডোমোনাসের ভেতর বৈদ্যুতিক সিগন্যাল তৈরির রহস্য ভেদ করতে গিয়ে বিজ্ঞানীরা এমন এক প্রযুক্তির দুয়ার খুলে দিয়েছেন, যা দিয়ে এখন সুনির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে আলো দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। যুগান্তকারী এই ‘অপ্টোজেনেটিক্স’ প্রযুক্তির উদ্ভাবন ও প্রসারের স্বীকৃতিস্বরূপ ২০২৬ সালের চিকিৎসাবিজ্ঞানের নোবেল পুরস্কার অর্জন করেছেন যুক্তরাষ্ট্রের কার্ল ডাইসেরথ এবং জার্মানির পিটার হেগেমান ও গেয়র্গ নাগেল।
যে প্রশ্নের উত্তর লুকিয়ে ছিল শৈবালে
মস্তিষ্ক কীভাবে আমাদের সচেতন অভিজ্ঞতা, স্মৃতি বা ভয় তৈরি করে, গত শতাব্দীর শেষভাগে এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিলেন বিখ্যাত বিজ্ঞানী ফ্রান্সিস ক্রিক। তার দীর্ঘদিনের ধারণা ছিল, আলো ব্যবহার করে হয়তো নির্দিষ্ট স্নায়ুকোষকে নিখুঁত মুহূর্তে সক্রিয় করা সম্ভব। কিন্তু সে সময়ের প্রযুক্তি দিয়ে মিলিসেকেন্ডের ব্যবধানে কাজ করা মস্তিষ্কের কোষগুলোকে আলাদা করে শনাক্ত বা সক্রিয় করা ছিল অসম্ভব।
এই জটিল সমস্যার সমাধান মেলে শৈবালে। ক্ল্যামাইডোমোনাসের কোষঝিল্লিতে থাকা বিশেষ আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিন আলো পড়ার সঙ্গে সঙ্গে চ্যানেল খুলে দেয়, যার ফলে ভেতরে আয়ন চলাচল করে বৈদ্যুতিক অবস্থার পরিবর্তন ঘটায়। নব্বইয়ের দশকের শুরুতে জার্মান গবেষক পিটার হেগেমান ও তার সহকর্মীরা এই রহস্যের গভীরে প্রবেশ করেন। পরবর্তী সময়ে ২০০০ সালে তারা এমন দুটি জিন খুঁজে পান, যেখান থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ channelrhodopsin-2 বা ChR2 প্রোটিন শনাক্ত করা হয়। এই প্রোটিন আলোর সংস্পর্শে আসার মাত্র শূন্য দশমিক ২ মিলিসেকেন্ডের মধ্যে কাজ শুরু করতে পারে।
গবেষণাটিকে অন্য এক উচ্চতায় নিয়ে যান কার্ল ডাইসেরথ। তার মূল ভাবনা ছিল, শৈবালের এই আলোক-সংবেদনশীল প্রোটিনের জিন যদি পরীক্ষাগারে অন্য কোনো প্রাণীর স্নায়ুকোষে প্রবেশ করানো যায়, তবে কি আলো ফেলার মাধ্যমে সেখানে সিগন্যাল তৈরি করা সম্ভব?
এই ধারণার বাস্তব রূপ দিতে ইঁদুরের স্নায়ুকোষে channelrhodopsin-2-এর জিন প্রবেশ করানো হয়। বিজ্ঞানীরা দেখতে পান, জিন নেওয়ার পর কোষগুলো নিজে প্রোটিনটি তৈরি করছে এবং সেখানে নীল আলো ফেললে নিখুঁতভাবে বৈদ্যুতিক নার্ভ সিগন্যাল তৈরি হচ্ছে। শুধু তাই নয়, সেই সিগন্যাল কোষের সীমানা পেরিয়ে সংযুক্ত অন্যান্য স্নায়ুকোষেও স্বাভাবিকভাবে ছড়িয়ে পড়তে সক্ষম হয়। ২০০৫ সালে এই অভাবনীয় সাফল্যের ফলাফল প্রকাশিত হওয়ার পর বছরখানেক বাদে এই নতুন পদ্ধতির আনুষ্ঠানিক নাম দেওয়া হয় ‘অপ্টোজেনেটিক্স’।
আচরণ ও স্মৃতির নিয়ন্ত্রণ
নতুন এই পদ্ধতি হাতে পাওয়ার পর চিকিৎসাবিজ্ঞানে শুরু হয় একের পর এক রোমাঞ্চকর পরীক্ষা। ২০০৭ সালে জীবন্ত ইঁদুরের মস্তিষ্কে অপটিক্যাল ফাইবার বসিয়ে নীল আলোর সাহায্যে মোটর কর্টেক্সের কোষ সক্রিয় করে তাদের নড়াচড়া করানোর সাফল্য পাওয়া যায়। একই প্রযুক্তির মাধ্যমে ঘুম ও জাগরণের সঙ্গে জড়িত কোষগুলো নিয়ন্ত্রণ করার পরীক্ষাও সফল হয়।
পরবর্তী সময়ে ২০১২ সালে ডাইসেরথ ও সুসুমু তোনেগাওয়াসহ অন্য গবেষকরা স্মৃতির গভীরে আলো ফেলতে সক্ষম হন। ইঁদুরের ভয় পাওয়ার অভিজ্ঞতার সময় সক্রিয় থাকা স্নায়ুকোষগুলো চিহ্নিত করে পরবর্তী সময়ে নিরাপদ পরিবেশে আলোর মাধ্যমে কেবল ওই কোষগুলোকে পুনরায় সক্রিয় করা হয়। ফলাফল হিসেবে দেখা যায়, কোনো বাহ্যিক কারণ ছাড়াই কেবল কোষগুলো উদ্দীপিত হওয়ার কারণে ইঁদুরটি আগের মতো ভয়ার্ত আচরণ করছে। নির্দিষ্ট স্মৃতির সঙ্গে জড়িত নিউরাল সার্কিটগুলো যে এভাবে আলাদা করে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব, অপ্টোজেনেটিক্স সেটাই প্রমাণ করেছে।
সম্ভাবনার নতুন দিগন্ত
মস্তিষ্কের জটিল নেটওয়ার্ক বা নিউরাল সার্কিট কীভাবে কাজ করে, তা অনুধাবনে বিজ্ঞানীরা এখন ঘুম, ভয়, তৃষ্ণা কিংবা খাদ্যানুসন্ধানের মতো আচরণগুলো নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারছেন। চিকিৎসার ক্ষেত্রে এর ব্যবহার এখনো প্রাথমিক পর্যায়ে থাকলেও রেটিনাইটিস পিগমেন্টোসার মতো রোগে দৃষ্টিশক্তি হারানো রোগীদের ক্ষেত্রে এবং শ্রবণক্ষমতা পুনরুদ্ধারে কক্লিয়ার ইমপ্লান্টের কার্যকারিতা বাড়াতে এই প্রযুক্তির পরীক্ষামূলক প্রয়োগ শুরু হয়েছে।
একটিমাত্র সাধারণ কৌতূহল থেকে শুরু হওয়া এই দীর্ঘ পথচলা আজ বিজ্ঞানীদের হাতে এমন এক জাদুকরী চাবি তুলে দিয়েছে, যার সাহায্যে মানব মস্তিষ্কের জটিল ও অন্ধকার জগতের গভীরে আলোর রোশনাই জ্বালানো সম্ভব হচ্ছে।
সুইডেনের ক্যারোলিনস্কা ইনস্টিটিউট থেকে বাংলাদেশ সময় ৫ অক্টোবর বিকেল সাড়ে ৩টায় তাদের নাম ঘোষণা করা হয়। নোবেলজয়ী বিজ্ঞানীরা পাবেন একটি মেডেল, একটি সনদপত্র এবং ১ কোটি ২০ লাখ সুইডিশ ক্রোনা। যেসব বিভাগে একাধিক নোবেলজয়ী থাকবেন, তাদের মধ্যে এই অর্থ ভাগ হয়ে যাবে।
বিজ্ঞান, শান্তি ও সাহিত্যে অবিস্মরণীয় অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে ১৯০১ সাল থেকে সুইডিশ বিজ্ঞানী ও ব্যবসায়ী আলফ্রেড নোবেলের ইচ্ছানুসারে এই পুরস্কার দেওয়া হচ্ছে।
