পাকিস্তানের কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফের (পিটিআই) নেতৃত্বাধীন খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের সরকার স্থগিত করেছে কেন্দ্রীয় সরকার। প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা জারির পর এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পিটিআই একে জরুরি অবস্থার আড়ালে অভ্যুত্থান হিসেবে অভিহিত করেছে। অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় সরকারের দাবি, প্রদেশটিতে জঙ্গি তৎপরতা দমনে ব্যর্থ হয়েছে স্থানীয় প্রশাসন।
রোববার পাকিস্তানের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলীয় আফগানিস্তান সীমান্তবর্তী খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশে জরুরি অবস্থা জারি করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি। প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের পরামর্শ ও মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে এ পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে প্রেসিডেন্টের দপ্তর জানিয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রাদেশিক সরকার স্থগিতের ফলে সেখানে কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিনিধি হিসেবে নতুন গভর্নর দায়িত্ব পালন করবেন। পাকিস্তানের আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার জানিয়েছেন, প্রাথমিকভাবে ছয় মাসের জন্য গভর্নর দায়িত্বে থাকবেন। তবে পরিস্থিতি বিবেচনায় এ মেয়াদ বাড়ানো হতে পারে। এদিকে, প্রদেশটিতে সেনা মোতায়েনের সিদ্ধান্তের কথা জানিয়েছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।
পিটিআইয়ের মুখপাত্র ও ইমরান খানের ঘনিষ্ঠ সহযোগী জুলফিকার বুখারি সরকারের এ সিদ্ধান্তের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তার ভাষায়, এটি ‘জরুরি অবস্থার ছদ্মবেশে একধরনের অভ্যুত্থান’। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এ পদক্ষেপ পাকিস্তানে আরও রক্তপাত ও অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করতে পারে। তার অভিযোগ, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পরিকল্পিত বিক্ষোভ ঠেকাতেই সরকার এমন সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
সরকারের এ পদক্ষেপের সমালোচনা করেছেন জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম-ফজল (জেইউআই-এফ) দলের প্রধান মাওলানা ফজলুর রহমানও। পিটিআইয়ের সঙ্গে সরকারের আলোচনায় মধ্যস্থতার দায়িত্বে থাকা এই নেতা বলেন, জরুরি অবস্থা জারি গণতন্ত্রের ওপর একধরনের আঘাত।
সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যর্থতার অভিযোগ
পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও সামরিক বাহিনীর অভিযোগ, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জঙ্গি তৎপরতা নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হয়েছে পিটিআইয়ের নেতৃত্বাধীন প্রাদেশিক সরকার। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে প্রদেশটিতে জঙ্গি হামলার ঘটনা বেড়েছে বলেও দাবি তাদের।
তবে পিটিআই এসব অভিযোগ প্রত্যাখ্যান করেছে। দলটির বক্তব্য, জঙ্গিবাদ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থ ও সরঞ্জাম কেন্দ্রীয় সরকার সরবরাহ করেনি। ফলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রাদেশিক প্রশাসনকে পর্যাপ্ত সহায়তা দেওয়া হয়নি।
পাকিস্তানের আইন অনুযায়ী, জরুরি পরিস্থিতিতে কেন্দ্রীয় সরকার প্রাদেশিক কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব গ্রহণ করতে পারে। সেই সাংবিধানিক বিধান অনুসরণ করেই এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে সরকার।
এদিকে, প্রদেশটির আগের দায়িত্বে থাকা মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির চলাফেরার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে বলে রয়টার্সকে জানিয়েছেন তার এক ঘনিষ্ঠ সহযোগী।
ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভ
প্রাদেশিক সরকার স্থগিতের সিদ্ধান্ত এমন এক সময়ে এল, যখন ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে তার সমর্থকদের ইসলামাবাদ অভিমুখে বিক্ষোভ মিছিল করার প্রস্তুতি চলছে। এর আগে গত সপ্তাহে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জড়ো হয়েছিলেন পিটিআইয়ের সমর্থকেরা।
পরিকল্পিত ওই কর্মসূচির আগে দলটির কয়েক শ নেতা-কর্মীকে আটক করা হয়। ইমরান খানের তিন বোনকেও আটক করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। পিটিআইয়ের দাবি, সাম্প্রতিক বছরগুলোর মধ্যে এটি তাদের বিরুদ্ধে চালানো অন্যতম কঠোর দমন অভিযান।
ইসলামাবাদে বিক্ষোভকারীদের পার্লামেন্টের দিকে অগ্রসর হওয়া ঠেকাতে ব্যাপক নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। শহরটিতে কয়েক দশ হাজার নিরাপত্তাকর্মী মোতায়েনের পাশাপাশি গুরুত্বপূর্ণ সড়কে কনটেইনার বসানো হয়েছে, যাতে প্রয়োজন হলে চলাচল বন্ধ করে দেওয়া যায়।
২০২৪ সালের নির্বাচনে ইমরান খানের সমর্থিত প্রার্থীরা সবচেয়ে বেশি আসনে জয়ী হলেও তারা কেবল খাইবার পাখতুনখাওয়াতেই সরকার গঠন করতে পেরেছিলেন। ইমরানের সমর্থকদের অভিযোগ, নির্বাচনে সামরিক বাহিনী তাদের বিরুদ্ধে কারচুপি করেছে। তবে সামরিক বাহিনী এ অভিযোগ অস্বীকার করেছে।
দুই বছর ধরে হামলার দাবি শাহবাজের
পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ বলেছেন, গত দুই বছর ধরে দেশটির নিরাপত্তা বাহিনী ও সাধারণ মানুষ হামলার শিকার হচ্ছেন। তার বক্তব্য, এ পরিস্থিতিতে সরকার নীরব দর্শক হয়ে থাকতে পারে না।
এদিকে, পাকিস্তানের অভ্যন্তরে হামলা চালানো জঙ্গিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগে আফগানিস্তানকেও দায়ী করেছে ইসলামাবাদ। পাকিস্তান সরকারের অভিযোগ, পিটিআই আফগানিস্তানের তালেবান সরকার এবং পাকিস্তানে তাদের সহযোগী গোষ্ঠীগুলোর প্রতি সহানুভূতিশীল। তবে এসব অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছে সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলো।
ইমরান খান ২০২৩ সাল থেকে কারাবন্দি। রাষ্ট্রীয় উপহারসংক্রান্ত অনিয়ম, সহিংসতায় উসকানি ও বেআইনি বিয়ের অভিযোগসহ বিভিন্ন মামলায় তার বিরুদ্ধে সাজা হয়েছিল। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, তার একটি ছাড়া বাকি সব দণ্ড স্থগিত বা বাতিল হয়েছে; এসব বিষয়ে আপিল বিচারাধীন রয়েছে। ইমরান খান তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।
খাইবার পাখতুনখাওয়ায় জরুরি অবস্থা জারি এবং প্রাদেশিক সরকার স্থগিতের ঘটনায় পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার ও পিটিআইয়ের মধ্যে বিরোধ আরো তীব্র হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে বিক্ষোভের প্রস্তুতি এবং নিরাপত্তা পরিস্থিতি ঘিরে দেশটির রাজনৈতিক অঙ্গনে উত্তেজনা বাড়ছে।
সূত্র: দ্য গার্ডিয়ান ও রয়টার্স
