কয়েকটি কবিতা, কয়েকটি তীব্র পঙ্ক্তি। তাতেই কেঁপে উঠেছিল ব্রিটিশ ঔপনিবেশিক শাসনের ভিত। পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান জানিয়ে লেখা কাজী নজরুল ইসলামের ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা তাঁকে দাঁড় করিয়েছিল রাজদ্রোহের অভিযোগে বিচারের মুখোমুখি। কবিতার শক্তিকে ভয় পেয়ে ব্রিটিশ সরকার কবিকে কারাগারে পাঠালেও থামাতে পারেনি তাঁর কলম। বরং কারাগারের অন্ধকারেই আরও দীপ্ত হয়ে উঠেছিল তাঁর প্রতিবাদী সত্তা।
১৯২২ সালের সেপ্টেম্বর। শারদীয় দুর্গোৎসবের আমেজে মেতে উঠেছিল অবিভক্ত বাংলা। ঠিক সেই সময়ে কাজী নজরুল ইসলাম সম্পাদিত অর্ধ-সাপ্তাহিক ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার আগমনী সংখ্যায় ছাপা হয় ‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতাটি। তেইশ বছরের দুর্দমনীয় কবি নজরুলের লেখা কবিতাটি শুধু দেবী দুর্গার আবাহন ছিল না, এতে ছিল পরাধীনতার শৃঙ্খল ছিঁড়ে স্বাধীনতার উদাত্ত আহ্বান। আর এই কবিতা প্রকাশের কারণেই কবির বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগ আনা হয়।
দুর্গাপূজা উপলক্ষে প্রকাশিত ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার দ্বাদশ সংখ্যায় ছাপা হয় কবিতাটি। এতে নজরুল ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীকে পরাক্রমশালী ‘অসুর’ হিসেবে তুলে ধরেন। দেবীকে মাটির মূর্তিতে আবদ্ধ না থেকে অসুর বিনাশে জেগে ওঠার আহ্বান জানান তিনি। ভারতবাসীকে পরাধীনতার গ্লানি থেকে মুক্ত করার আকাঙ্ক্ষা প্রকাশ পায় কবিতার পঙ্ক্তিতে। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের উত্তাল সময়ে লেখা কবিতাটি ছিল ঘুমন্ত জাতিকে জাগিয়ে তোলার এক রাজনৈতিক আহ্বান।
ঐতিহাসিক এই কবিতায় নজরুল লেখেন,
“আর কতকাল থাকবি বেটি মাটির ঢেলার মূর্তি-আড়াল?
স্বর্গ যে আজ জয় করেছে অত্যাচারী শক্তি চাড়াল। দেবশিশুদের মারছে চাবুক, বীর যুবাদের দিচ্ছে ফাঁসি, ভূ-ভারত আজ কসাইখানা, আসবি কখন সর্বনাশী? দেব-সেনা আজ টানছে ঘানি তেপান্তরের দ্বীপান্তরে, রণাঙ্গনে নামবে কে আর, তুই না এলে কৃপাণ ধরে?”
‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতা প্রসঙ্গে কবি, প্রাবন্ধিক, সাংবাদিক ও নজরুল গবেষক মজিদ মাহমুদ বলেন, এ কবিতা লেখার দায়ে জাতীয় কবি নজরুল ইসলামের কারাদণ্ড বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাৎপর্যপূর্ণ ঘটনা। তাঁর কারাবরণ ঔপনিবেশিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদী শক্তির ঐতিহাসিক সাক্ষ্য। কবিকে কারাগারে নেওয়া যায়, কিন্তু তাঁর মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে বন্দি করা যায় না।
কবিতা ও রাজনৈতিক সাংবাদিকতায় নজরুলের আপসহীন অবস্থান তাঁকে ঔপনিবেশিক সরকারের রোষের মুখে ঠেলে দিয়েছিল বলে উল্লেখ করেন মজিদ মাহমুদ। তিনি বলেন, ‘আনন্দময়ীর আগমনে’র মতো কবিতা এবং ‘ধূমকেতু’র সাহসী সম্পাদকীয় বাংলা সাহিত্যে নতুন ভাষা ও চেতনার সঞ্চার করে। একই সঙ্গে পরাধীন মানুষের স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে তোলে। নজরুলের কাছে সাহিত্যচর্চা ও মুক্তিসংগ্রাম বিচ্ছিন্ন বিষয় ছিল না। তাঁর কবিতার প্রতিবাদ ও কারাগারে অনশন একই নৈতিক দৃঢ়তায় প্রকাশ পেয়েছিল।
‘আনন্দময়ীর আগমনে’ কবিতার তীক্ষ্ণ ও বিপ্লবী ভাষা তৎকালীন ব্রিটিশ শাসকগোষ্ঠীকে উদ্বিগ্ন করে তোলে। কবিতাটি সাধারণ মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে পড়লে বড় ধরনের বিপ্লব ঘটতে পারে, এমন আশঙ্কায় ১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর কলকাতার ৩২ নম্বর কলেজ স্ট্রিটে ‘ধূমকেতু’ পত্রিকার কার্যালয়ে হানা দেয় পুলিশ। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ সরকার পত্রিকাটির ওই সংখ্যাটি বাজেয়াপ্ত করে।
নজরুলের ‘যুগবাণী’, ‘বিষের বাঁশি’, ‘ভাঙার গান’, ‘প্রলয় শিখা’ ও ‘চন্দ্রবিন্দু’ গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করার উদাহরণ টেনে মজিদ মাহমুদ বলেন, নজরুলের প্রতিবাদী সাহিত্যকে ঔপনিবেশিক সরকার কতটা বিপজ্জনক মনে করত, বই বাজেয়াপ্ত করার ঘটনাগুলো তার প্রমাণ।
১৯২২ সালের ৮ নভেম্বর নজরুলের বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের অভিযোগে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়। তবে পরোয়ানা জারির সময় তিনি কলকাতায় ছিলেন না। তখন ত্রিপুরা জেলার কুমিল্লায়, বর্তমান বাংলাদেশের কুমিল্লায় অবস্থান করছিলেন কবি। ওই বছরের ২৩ নভেম্বর কুমিল্লার ঝাউতলার মোড় থেকে তাঁকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
পরে কড়া পুলিশি পাহারায় কুমিল্লা থেকে কলকাতায় নিয়ে নজরুলকে প্রেসিডেন্সি জেলে রাখা হয়। কলকাতার চিফ প্রেসিডেন্সি ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে তাঁর বিরুদ্ধে রাজদ্রোহের মামলার বিচার শুরু হয়। আদালতের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে ১৯২৩ সালের ৭ জানুয়ারি লিখিত জবানবন্দি পাঠ করেন কবি। তাঁর সেই ঐতিহাসিক বক্তব্য ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ নামে অমর হয়ে আছে।
কবি নজরুল ইনস্টিটিউট প্রকাশিত ‘রাজবন্দীর জবানবন্দী’ গ্রন্থে তাঁর সেই বক্তব্যের উল্লেখ রয়েছে। সেখানে নজরুল বলেন, ‘আমার ওপর অভিযোগ আমি রাজদ্রোহী। তাই আমি আজ রাজকারাগারে বন্দী এবং রাজদ্বারে অভিযুক্ত। আমি কবি, আমি অপ্রকাশ সত্যকে প্রকাশ করার জন্য, অমূর্ত সৃষ্টিকে মূর্তিদানের জন্য ভগবান কর্তৃক প্রেরিত। আমার বাণী সত্যের প্রকাশিকা, ভগবানের বাণী। সে-বাণী রাজবিচারে রাজদ্রোহী হতে পারে, কিন্তু ন্যায়বিচারে সে-বাণী ন্যায়-দ্রোহী নয়, সত্যদ্রোহী নয়। সে-বাণী রাজদ্বারে দণ্ডিত হতে পারে, কিন্তু ধর্মের আলোকে, ন্যায়ের দুয়ারে তাহা নিরপরাধ, নিষ্কলুষ, অম্লান, অনির্বাণ সত্য-স্বরূপ।’
রাজরোষের বাধা পেরিয়ে ১৯২৩ সালের ১৫ ডিসেম্বর বহরমপুর জেল থেকে মুক্তি পান বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের মধ্য দিয়ে তাঁর কবিতা ও গানে যে দ্রোহের চেতনা শক্তিশালী হয়ে উঠেছিল, তা পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামসহ বিভিন্ন গণতান্ত্রিক আন্দোলনেও মানুষকে অনুপ্রাণিত করেছে। শোষণ, বঞ্চনা, সাম্প্রদায়িকতা ও স্বৈরশাসনের বিরুদ্ধে তাঁর আপসহীন অবস্থান যুগে যুগে প্রতিবাদী মানুষের কণ্ঠে নতুন ভাষা ও শক্তি জুগিয়েছে।
কবিতা, ছড়া ও প্রবন্ধের মাধ্যমে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে সরাসরি প্রতিবাদ জানাতেন নজরুল। তাঁর লেখালেখির ওপর নজর রাখত ঔপনিবেশিক সরকার। তাঁর একাধিক গ্রন্থ বাজেয়াপ্ত করা হয়, লেখার কারণে তাঁকে কারাগারেও পাঠানো হয়। কিন্তু কোনো শাস্তিই তাঁর প্রতিবাদী কণ্ঠ স্তব্ধ করতে পারেনি।
পরাধীনতার শৃঙ্খল ভাঙার যে আহ্বান নজরুল জানিয়েছিলেন, তা আজও নিপীড়ন ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে প্রাসঙ্গিক। যত দিন মানুষের ওপর শোষণ-নিপীড়ন থাকবে, যত দিন মানুষ মুক্তি, সাম্য ও ন্যায়বিচারের স্বপ্ন দেখবে, তত দিন নজরুলের দ্রোহী সৃষ্টি প্রতিবাদের ভাষা হয়ে মানুষের হৃদয়ে জাগ্রত থাকবে।
The post রাজরোষে নজরুল appeared first on সুপ্রভাত বাংলাদেশ.
