পিরোজপুরে দুর্গাপূজার আনন্দ শেষে ট্রলারে করে বাড়ি ফেরার পথে কালীগঙ্গা নদীতে পড়ে নিখোঁজ হন রিনা বেপারী (৩৫) ও তার মেয়ে অর্পিতা বেপারী (৮)। ঘটনার প্রায় তিন ঘণ্টা পর শিশু অর্পিতার মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। তবে এখনও নিখোঁজ রয়েছেন তার মা রিনা বেপারী।
এদিকে, মেয়েকে হারানোর শোক আর নিখোঁজ স্ত্রীকে ফিরে পাওয়ার আকুল অপেক্ষায় ভেঙে পড়েছেন বাবা শংকর বেপারী।
মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) এমন হৃদয়বিদারক পরিস্থিতিতে দুর্ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেন পিরোজপুর-২ আসনের সংসদ সদস্য ও গৃহায়ন ও গণপূর্ত প্রতিমন্ত্রী আহম্মেদ সোহেল মঞ্জুর। এ সময় তিনি উদ্ধারকাজের অগ্রগতি সম্পর্কে খোঁজখবর নেন এবং নিখোঁজ নারীকে উদ্ধারে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, বিষয়টি খুবই দুঃখজনক। পূজার সময় যাত্রীদের অনেক চাপ ছিল। মূলত এ কারণে এই দুর্ঘটনাটি ঘটেছে বলে মনে হচ্ছে। ঘটনা শোনার পর থেকেই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকেও খোঁজ নেওয়া হয়েছে। জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের কর্মকর্তারা দ্রুত ব্যবস্থা নিয়েছেন। ডুবুরি দলও এসেছে, যেন নিখোঁজ ব্যক্তিকে উদ্ধার করা যায়।’

তিনি আরও বলেন, পিরোজপুর জেলায় স্থায়ী ডুবুরি সেবা নিশ্চিত করার বিষয়ে কার্যক্রম নেওয়া হবে। ট্রলারে যাত্রী পারাপার নিয়ে কোনো সিন্ডিকেট থাকলে তা তদন্ত করে প্রশাসন ব্যবস্থা নেবে। ঘাটে অতিরিক্ত যাত্রীর চাপ সামলাতে প্রয়োজনে আজ ও আগামীকাল রাত ১২টা পর্যন্ত ফেরি চালু রাখার ব্যবস্থা করা হবে। এ ঘাটের জনদুর্ভোগ কমাতে ফেরিটি অন্য কোথাও স্থাপন করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখা হবে। পাশাপাশি এখানে সেতু নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা ও সম্ভাব্যতা যাচাই করা হবে।
ঘটনাস্থল পরিদর্শনের সময় প্রতিমন্ত্রীর সঙ্গে ছিলেন পিরোজপুরের জেলা প্রশাসক মো. গোলাম রাব্বানী, পুলিশ সুপার মুহাম্মদ তালেবুর রহমান, নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সাজিয়া শাহনাজ তমাসহ ফায়ার সার্ভিস, নৌবাহিনী ও পুলিশের কর্মকর্তারা। তিনটা পর্যন্ত নিখোঁজের প্রায় সাড়ে ১৮ ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও রিনার সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাত ৯টার দিকে ৫০ থেকে ৬০ জন যাত্রী ও ছয়টি মোটরসাইকেল নিয়ে ট্রলারটি নাজিরপুরের শ্রীরামকাঠী প্রান্ত থেকে ভরতকাঠি ফেরিঘাটের উদ্দেশে রওনা হয়। কিছুদূর যাওয়ার পর অতিরিক্ত যাত্রী ও মোটরসাইকেলের ভারে ট্রলারটির এক পাশ কাত হয়ে যায়। একপর্যায়ে ট্রলারটি থেকে নদীতে পড়ে যায় ১৫ থেকে ২০ জন যাত্রী। এ সময় অধিকাংশ যাত্রী সাঁতরে ও স্থানীয়দের সহায়তায় তীরে উঠতে সক্ষম হন। তবে সংকর ব্যাপারীর স্ত্রী ও মেয়ে নিখোঁজ হন।
নিহত অর্পিতা বেপারী নেছারাবাদ উপজেলার গুয়ারেখা ইউনিয়নের ভরতকাঠি গ্রামের বাসিন্দা সংকর বেপারীর মেয়ে। সংকর বেপারী ঢাকার একটি প্রতিষ্ঠানে নিরাপত্তাকর্মী হিসেবে কাজ করেন। দুর্গাপূজার ছুটিতে পরিবার নিয়ে গ্রামের বাড়িতে বেড়াতে এসেছিলেন তিনি।

সোমবার রাতে স্ত্রী ও মেয়েকে নিয়ে শ্রীরামকাঠী এলাকায় পূজা দেখতে যান সংকর বেপারী। পূজা দেখা শেষে ট্রলারে করে বাড়ি ফেরার পথেই এ দুর্ঘটনা ঘটে।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের ডুবুরি দল উদ্ধার অভিযান শুরু করে। রাত ১১টা ১০ মিনিটের দিকে অর্পিতাকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। পরে তার মরদেহ পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়। রাত ১টা পর্যন্ত অভিযান চালানোর পর সাময়িকভাবে উদ্ধারকাজ বন্ধ রাখা হয়। মঙ্গলবার সকাল ৬টা থেকে ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর ডুবুরি দল আবারও অভিযান শুরু করে। কিন্তু বেলা আড়াইটা পর্যন্ত নিখোঁজ রিনা বেপারীর কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি।
সংকর বেপারী বলেন, আমার জীবনটাই তো শেষ। একমুহূর্তে স্ত্রী আর ছোট মেয়েটাকে হারালাম। স্ত্রীকে এখনো খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখন অপেক্ষায় আছি, অন্তত তার লাশের খোঁজ পাই।
নাজিরপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) তরিকুল ইসলাম জানান, অতিরিক্ত যাত্রী বোঝাইয়ের কারণে ট্রলার কাত হয়ে যাত্রীরা নদীতে পড়ে যান। নিখোঁজ মা ও মেয়ের মধ্যে মেয়েটিকে মৃত অবস্থায় উদ্ধার করে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে। এ ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা প্রক্রিয়াধীন।
নাজিরপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সাজিয়া শাহনাজ তমা বলেন, নিখোঁজ নারীকে উদ্ধারে অভিযান চলছে। এ ঘটনায় কারও অবহেলা থাকলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দীর্ঘ সময় ধরে কালিগঙ্গা নদীতে উদ্ধার অভিযান চালিয়েও রিনা বেপারীর সন্ধান না মেলায় স্বজনদের উৎকণ্ঠা বাড়ছে। নিখোঁজ নারীকে উদ্ধারে ফায়ার সার্ভিস ও নৌবাহিনীর ডুবুরি দলের অভিযান অব্যাহত রয়েছে।
সাদী মো. হিমেল/এইচএস
